১৫ এপ্রিল, ২০১৭

বিশ্বাসের দরজায় করাঘাত!: পর্ব ১৯ – (আল্লাহ ও ইসলাম অনুসারে - হাদীস মানা হারাম!)

লিখেছেন নরসুন্দর মানুষ


কিছুদিন ধরে ইন্টারনেটে অষ্ট্রেলীয় শিয়া ইমাম শেখ মোহাম্মদ তাওহিদী-র (Imam Shaikh Mohammad Tawhidi) কিছু ভিডিও চোখে পড়ছে! তিনি সরাসরি হাদীস সংকলন সহিহ্ বুখারী-কে নিষিদ্ধ করার কথা বলছেন! তার মত অনুসারে, এই আধুনিক যুগে ইসলামের সকল ভুল ব্যাখ্যা, অনাচার আর জঙ্গিবাদের মূলে আছে বুখারীর হাদীস সংকলন! এ নিয়ে ইতিমধ্যেই সুন্নী ইমামদের জ্বালাপোড়া শুরু হয়ে গেছে! আগ্রহীরা গুগল করে সত্যতা যাচাই করতে পারেন।

যাক! অবশেষে ঘরের ভেতর থেকে কেউ ইসলামের ফাঁক-ফোঁকড়ের মূলে হাত দিতে শুরু করেছে! হোক না সে শিয়া বা সুন্নী! তবে আমার মতামত আরও মারাত্মক! যদি কোনো মুসলিম সত্যিকার অর্থে কোরআনকে সৃষ্টিকর্তার (!) বাণী হিসাবে গণ্য করেন, তবে তাঁকে কোরআন বাদে সকল হাদীস গ্রন্থকে অবশ্যই নিষিদ্ধ করতে হবে! কারণ: আল্লাহ কোরআনে একাধিকবার হাদীস মানতে নিষেধ করেছেন! কী, বিশ্বাস হচ্ছে না! চলুন, প্রমাণ করি, আল্লাহ ও ইসলাম অনুসারে - হাদীস মানা হারাম!

কোরআন নিজেকে পরিপূর্ণ জীবনবিধান দাবি করে এবং এ-ও দাবি করে কোরআন মানুষের জন্য যথেষ্ট! এর বাইরে আর কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই! কোরআনে বলা হয়েছে:

"…হুকুমের মালিক আল্লাহ ছাড়া আর কেহ নয়..." (৬:৫৭)

"এটা কি (কোরআন) তাদের জন্যে যথেষ্ট নয় যে,
আমি আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি,
যা তাদের কাছে পাঠ করা হয়।
এতে অবশ্যই বিশ্বাসী লোকদের জন্যে রহমত ও উপদেশ আছে।" (২৯:৫১)

"আল্লাহ কি তাঁর বান্দার পক্ষে যথেষ্ট নন?
অথচ তারা আপনাকে আল্লাহর পরিবর্তে অন্যান্য উপাস্যদের ভয় দেখায়।" (৩৯:৩৬)

হাদীস একটি আরবী শব্দ এবং কোরআনে হাদীস শব্দটি সরাসরি ব্যবহার করা হয়েছে, তবে অনুবাদের ক্ষেত্রে হাদীস শব্দটির ভিন্ন ভিন্ন মানে করেছেন অনুবাদকগন; যেমন: “বাণী/কথা/পর্যালোচনা/কথাবার্তা/বাক্য/ধর্মোপদেশ/কালাম/রচনা/কিতাব”। ইসলাম অনুসারে, কোরআন হচ্ছে আল্লাহর হাদীস, এবং আল্লাহ চান কোরআন ছাড়া মুসলিমগন অন্য কোনো হাদীস অনুসরণ না করুক। আমরা যদি আয়াতের বাংলা অনুবাদ করার সময় হাদীস শব্দটির অনুবাদ হাদীস-ই রেখে দেই, তবে বিষয়টি পানির মত পরিস্কার হয়ে যাবে পাঠকের কাছে! চলুন, কয়েকটি আয়াত দেখি:

কোরআন মুসলিমদের বলে:
“তারা কি প্রত্যক্ষ করেনি আকাশ ও পৃথিবীর রাজ্য সম্পর্কে এবং যা কিছু সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ তাআলা বস্তু সামগ্রী থেকে এবং এ ব্যাপারে যে, তাদের সাথে কৃত ওয়াদার সময় নিকটবর্তী হয়ে এসেছে? বস্তুতঃ এরপর আর কোন হাদীসের উপর ঈমান আনবে?” (৭:১৮৫)

“এক শ্রেণীর লোক আছে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার উদ্দেশে
অবান্তর হাদীস সংগ্রহ করে অন্ধভাবে এবং উহাকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে।
এদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।” (৩১:৬)

“এগুলো আল্লাহর আয়াত, যা আমি আপনার কাছে আবৃত্তি করি যথাযথরূপে।
অতএব, আল্লাহ ও তাঁর আয়াতের পর তারা কোন হাদীসে বিশ্বাস স্থাপন করবে।” (৪৫:৬)

“যদি তারা সত্যবাদী হয়ে থাকে,
তবে এর (কোরানের) অনুরূপ কোন হাদীস উপস্থিত করুক।” (৫২:৩৪)

“এরপরে (কোরান ছাড়া) আর কোন হাদীসে বিশ্বাস স্থাপন করবে?” (৭৭:৫০)

যেসকল পাঠক দ্বিধায় পড়ে গেছেন, তাঁদের জন্য কয়েকটি আয়াতের বাংলা উচ্চারণ দিয়ে দিলাম; খুঁজে দেখুন, হাদীস শব্দটি আছে কি না!



তো কোরআন অনুসারে হাদীস মানা কতটা যুক্তিযুক্ত মনে হচ্ছে এখন? এরপরেও যদি আপনি মুসলিম হয়ে এসকল আয়াত না মানেন এবং কোরআন বাদে সকল হাদীস গ্রন্থকে নিষিদ্ধ করতে আগ্রহী না হন; তবে আপনার জন্য রইল একটি বোনাস আয়াত!

“যে ব্যক্তিকে তার পালনকর্তার আয়াতসমূহ দ্বারা উপদেশ দান করা হয়,
অতঃপর সে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার চেয়ে যালেম আর কে?
আমি অপরাধীদেরকে শাস্তি দেব।” (৩২:২২)

এবার দেখি, ইসলামের ইতিহাস কী বলে:
খলিফা আবুবকর, আল্লাহর কোরআন ছাড়া মুহাম্মদের হাদীস পুড়িয়ে ফেলার আদেশ শোনার পর ঠিক করতে পারছিলেন না কী করবেন; দীর্ঘকাল মুহাম্মদের সাথে থাকার সময়ে তিনি মাত্র ৫০০ হাদীস সংগ্রহ করেছিলেন, কিন্তু হাদীস পুড়িয়ে ফেলার আদেশ শোনার রাতে সবগুলো হাদীস না পোড়ানো পর্যন্ত তিনি ঘুমাতে পারেননি।

খলিফা ওমর ইবনে আল-খাত্তাব তার ছেলে আব্দুল্লাহকে তারই সংগৃহীত হাদীসগুলো ধ্বংস করতে বাধ্য করেছিলেন। ওমর ইবনে আল-খাত্তাব ৪ জন সাহাবীকে হাদীস বলা থেকে বিরত থাকার জন্য আদেশ করেছিলেন। এরা হলেন:- ইবনে মাসুদ, আবু আল-দারদা, আবু মাসুদ আল আনসারি এবং আবু দার আল-গফফারি। খলিফা ওমর ইবনে আল-খাত্তাব আবু হুরায়রাকে মিথ্যাবাদী বলেছিলেন এবং তাকে এই বলে শাসিয়েছিলেন যে, যদি আবু হুরায়রা মুহাম্মদ সম্পর্কে মিথ্যা হাদীস বলা থেকে বিরত না হয়, তবে তাকে তার জন্মস্থান ইয়েমেনে ফেরত পাঠাবেন। ওমরের জীবদ্দশায় আবু হুরায়রা আর কোনো হাদীস বলেননি।

৪র্থ খলিফা আলি ইবনে আবু তালেব এক খুৎবায় বলেছিলেন, "যাদের কাছে আল্লাহর রসূলের কোনো হাদীস আছে, আমি তাদেরকে অনুরোধ করবো বাড়ি যেয়ে সেগুলো মুছে ফেলতে। তোমাদের আগের মানবসমাজ ধ্বংস হয়ে গেছে তাদের ধর্মীয় পণ্ডিতদের হাদীস অনুসরণ করার জন্য এবং প্রভুর বাণী পরিত্যাগ করার জন্য।"

যায়িদ ইবনে থাবিত মুহাম্মদের মৃত্যুর ৩০ বছর পর মুয়াবিয়ার দরবারে মুহাম্মদ সম্পর্কে একটি গল্প বলেছিলেন। মুয়াবিয়ার গল্পটি ভালো লাগে এবং এটি লিখে রাখার আদেশ দেন। কিন্তু তখন যায়িদ বলেন: রসূল আমাদেরকে আদেশ করেছেন তার কোনো হাদীস কখনো না লিখতে। এই গল্পটি ইবনে হাম্বল সংকলনে আছে, এবং এই গল্প প্রমাণ করে হাদীস লেখার উপর নিষেধাজ্ঞা মুহাম্মদ মৃত্যুর আগেও তুলে নেননি।

হাদিস বিরোধীতার সবচেয়ে পুরানো দলিল পাওয়া যায় ৭৬ হিঃ (৬৯৫ খ্রিঃ) খলিফা আব্দুল মালেককে লেখা আব্দুল্লাহ ইবনে ইবাদের লেখা চিঠিতে। উক্ত চিঠিতে কুফাবাসীদেরকে ভর্ৎসনা করা হয়েছে কোরআনকে পরিত্যাগ করে মুহাম্মদের হাদীসকে ধর্মের ভিত্তি হিসাবে গ্রহন করার জন্য। "তারা এমন একটি বইতে বিশ্বাস করে, যা আল্লাহর থেকে নয়, মানুষের হাত দ্বারা রচিত এবং এটাকে রসূলের বাণী বলে দাবী করে।" (Michael Cook, Muslim Dogma, Cambridge University Press, Cambridge, 1981)  

তবে আব্বাসীয় খেলাফত সময়কালীন ও পরবর্তীতে সেলজুক খলিফাদের শাসনামলে হাদীস-বিরোধীদের সকল বই ও গ্রন্থাগার পুড়িয়ে দেয়ার কারনে হাদীস-বিরোধী লেখা ও তথ্য এখন তেমনটা পাওয়া যায় না। তবে হাদীস-বিরোধীদের উপস্থিতি ও যুক্তি সম্পর্কে জানা যায় শরিয়া আইনের জনক ও প্রবর্তক ইমাম শাফেয়ীর বই 'জিমা আল ইলম' ও ইবনে কুতাইবার লেখা থেকে। তাঁরা একথা পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন: তাঁদের সময়ে হাদীস-বিরোধিতা ছিল সর্বব্যাপী।

তো মুমিন মুসলিম ভাই-বোন-বন্ধুরা, এবার কী বলবেন? যদি আপনি কোরআনের কথা মানেন, তবে হাদীস মানার উপায় আর থাকে কি? আর যদি হাদীস না থাকে, তবে আপনাদের লালন-পালন করা ইসলামের চেহারা কেমন দাঁড়াবে, ভেবে দেখেবেন কি?

(চলবে)