৪ এপ্রিল, ২০১৭

সৌদি আরব কি ইসলামী সন্ত্রাসীদের পক্ষে না বিপক্ষে?

মূল: খালেদ ওলীদ
অনুবাদ: আবুল কাশেম

[ভূমিকা: ডিসেম্বর ও ফেব্রুয়ারি মাসে খালেদ ওলিদের ইসলাম পরিত্যাগের জবানবন্দিরসৌদি নারীদের অবস্থা অনুবাদ করেছিলাম। তখন লিখেছিলাম, খালেদ আমাকে অনেক ই-মেইলে সৌদি আরাবের ইসলাম সম্পর্কে লিখেছিল। এখানে আমি তার আর একটি লেখা অনুবাদ করে দিলাম। উল্লেখযোগ্য যে, খালেদের এই লেখাটি একটা বইতে প্রকাশ হয়েছে। বইটার টাইটেল হলো: Why We Left Islam. - আবুল কাশেম, এপ্রিল ৪, ২০১০]

সৌদি আরব সর্বদা দাবি করে আসছে যে, তারা ইসলামী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়ছে। সে সাথে এটাও বলে যে, সৌদি আরব এক মধ্যপন্থী মুসলিম দেশ এবং তারা নরম গরম, অর্থাৎ মাঝামাঝি (মডারেট) ইসলাম সমর্থন করে। ভ্রমবশতঃ সাধারণ গোবেচারা অবিশ্বাসীরা (কাফেররা), বিশেষতঃ পাশ্চাত্যের লোকেরা, ইসলামী সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে সৌদি আরবের এই ভণ্ডামিপূর্ণ অবস্থান বিশ্বাস করে নিয়েছে। সৌদি আরবের এক আদিম অধিবাসী হিসেবে আমি এই লেখায় দেখাব, কেন এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।

সৌদি আরবের এই ভণ্ডামি ও দু’মুখো চেহারা উন্মোচনের জন্যে আমি ব্যাখ্যা করব, কীভাবে এ দেশের শিক্ষা পদ্ধতি চালানো হয়। আপনারা যখন দেখবেন ইসলাম প্রচার এবং কাফেরদের প্রতি অসীম ঘৃণা প্রকাশই হচ্ছে এই সৌদি সরকারের নীতি, তখন বুঝতে পারবেন, কেন সৌদি আরব এই ছলনা, কপটতা ও ভানের আশ্রয় নিয়েছে। যখন আপনি জানবেন যে, সৌদি সরকারের শিক্ষানীতির মূল উদ্দেশ্য হলো - যে কোনো মূল্যেই হোক বিশ্ব থেকে অনৈসলামী দূর করতে হবে তখন আপনি সৌদি আরবের বাস্তবতা স্বীকার করে নেবেন। এর থেকে কারও বুঝতে অসুবিধা হবে না যে, আজকের বিশ্বে যে সীমাহীন, অদম্য ইসলামী সন্ত্রাস চলছে, তার জন্ম কেন্দ্র হচ্ছে সৌদি আরবের শিক্ষাপদ্ধতি।

প্রথমেই আমি আলোকপাত করব এই দেশের প্রাথমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা পরিস্থিতি নিয়ে। এই শিক্ষার কেন্দ্রে আছে অ মুসলিমদের (কাফেরদের) প্রতি অপরিসীম ঘৃণা জন্মান। কাফেরদের প্রতি এই অসীম ঘৃণার জন্যই আজ সৌদি আরবের ছাত্র ও জনতা সভ্য বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কেউ বিশ্বাস করুক আর না-ই করুক, আমার মতে এটাই হচ্ছে সর্বপ্রথম সত্য।

এখানে বলা দরকার যে, মৌলবাদী ওহাবী বিদ্যালয় থেকে অন্যান্য বিদ্যালয় কিছুটা স্বতন্ত্র হলেও মোটামুটি সৌদি আরবের সব বিদ্যালয়ে একই ধরনের শিক্ষা দেওয়া হয়, আর তা হলো - ওহাবি বিদ্যালয়গুলোতে যা শেখানো হয়, তারই অনুকৃতি। রিয়াদ এবং কাসেম অঞ্চল হচ্ছে ওহাবিদের লীলাভূমি আর ইসলামী সন্ত্রাসের উৎসস্থল। আমি যেহেতু ঐ এলাকার বাসিন্দা নই, তাই ওহাবী সন্ত্রাসিদের ব্যাপারে খুঁটিনাটি লিখতে পারবো না। তবে আমি নিশ্চিত যে, সৌদি আরবের অন্যান্য এলাকার চাইতে রিয়াদ এবং কাসেম এলাকার বাসিন্দারা ওহাবীদের দ্বারা দারুণভাবে নির্যাতিত হচ্ছে।

স্পষ্ট মনে পড়ছে আমার বিদ্যালয়ের সেই সব দিনগুলি। আমাদের শিক্ষকেরা পরতেন চরম জবরজং ও কুরুচিপূর্ন দেহ পোশাক। এ এগুলো হচ্ছে 'থয়াব' নামক লম্বা ধুতি জাতীয়, যার সাথে থাকত 'গুট্‌রা' নামের মাথায় এক চাদর। কিন্তু ওই 'গুট্‌রা'-তে থাকত না কোনো কালো চিকন রশি, যা সাধারণ আরবরা ব্যবহার করে। শিক্ষকদের সাথে আমাদেরকেও বাধ্যতামূলক ভাবে পরতে হত ঐ অস্বস্তিকর ও কুরুচিপূর্ণ আলখাল্লা। সৌদি আরবের প্রত্যেক লোক এই পোশাক দেখলেই জানে, এই বালকেরা হচ্ছে ধর্মীয় বিদ্যালয়ের ছাত্র। ধর্মীয় পোশাক ও সাধারণ পোশাকের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে এই যে, ধর্মীয় পোশাক লম্বায় একটু খাট হয় এবং মাথার কাপড়ে কোনো কালো রশি থাকে না। আরা সাধারণ পোশাক হচ্ছে ঢিলেঢালা পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত লম্বা এবং মাথার কাপড়ে থাকে কালো রশি। সৌদি আরবের সমস্ত ধর্মীয় বিদ্যালয়ের ছাত্রদের জন্য ঐ কুরুচিপুর্ণ পোশাক পরা বাধ্যতামূলক - এর কোনো ব্যতিক্রম হয় না। এর অন্যতম কারণ হলো, শিশুদেরকে শৈশব থেকেই আত্মসমর্পণ করানো হয় সৌদি আরবের ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের অবিসংবাদিত দাপট ও অপরিসীম ক্ষমতার কাছে। এই মোল্লাদের ক্ষমতার প্রতাপ একেবারে নিরঙ্কুশ, কারণ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ থেকে নির্দিষ্ট ঐ আলখাল্লা ছাড়া কেউ বিদ্যালয়ের কোথাও পা বাড়াতে পারবে না। আমার মনে আছে, কতবারই না আমরা কয়েকজন বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলাম পোষাক সংক্রান্ত ঐ কঠোর নিয়ন্ত্রণ ভঙ্গের জন্য। আবার এও হত যে, আমরা কেউ হয়তো ভুলে গেছি মাথার কাপড়টা ঠিক মতো লাগাতে। বিদ্যালয়ের শিশুদের প্রতি এমনই নিষ্ঠুর এবং কঠিন হচ্ছে সৌদি ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ। 

এখানে বলা বাহুল্য যে, শার্ট, প্যান্ট, অথবা ট্রাউজার ও টি শার্ট পরা তো একেবারই হারাম। আমাদেরকে কঠিনভাবে বলা হত যে, এ সব পোশাক-পরিচ্ছদ হচ্ছে কাফের বা অবিশ্বাসীদের। কোনো ছাত্রের যদি এমন বুকের পাটা থাকত যে, সে এধরনের পোশাক পরে বিদ্যালয়ে হাজির হবে, তবে তাকে সাথে সাথে 'কাফের' নামে আখ্যায়িত করা হত। এর পর তাকে হেন তেন ভাবে নাস্তানাবুদ করা হত, এবং তাকে রাষ্ট্র ও ধর্মের প্রতি বিশ্বাসঘাতক বলা হত।

শ্রেণীকক্ষে আমাদের শিক্ষকেরা বলতেন যে, আমাদের জাতীয় পতাকাকে সালাম করা হারাম। সরকার কিংবা অন্য কোনো মানুষের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জানানো উচিত নয়। আমাদের শিক্ষকেরা কঠোর ভাষায় বলতেন যে, সমস্ত সম্মান ও শ্রদ্ধা একমাত্র আল্লাহ্‌র জন্যেই। মজার ব্যপার হল, এতদসত্ত্বেও আমরা দৈনন্দিন বিদ্যালয় শুরু করতাম জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় পতাকাকে সালাম দিয়ে। সে সময় আমাদের মোল্লারা মুখ বুঁজে থাকতেন, কেননা ঐ সব আচার-অনুষ্ঠান সরকারী আদেশ দ্বারা কার্যকরী করা হোত। আমাদের শিক্ষকেরা শুধুমাত্র বিড়বিড় করেই তাঁদের অসন্তোষ প্রকাশ করতেন। এ ছাড়া তাঁদের আর করারও কিছু ছিল না।

এই অনুষ্ঠানের পর আমাদের প্রভাত শুরু হতো কোরআন ও হাদিস আবৃত্তির দ্বারা। এটা ছিল বাধ্যতামূলক, কোনো ব্যতিক্রম হবার নয়। এরপর শুরু হোত কাফেরদের উপহাস এবং নাজেহাল করা নিয়ে কবিতা আবৃত্তি। শেষ হোত প্যালেস্টিন, চেচনিয়া, কাশ্মীর, ফিলিপাইন এবং বিশ্বের অন্যান্য স্থানে যেখানে মুসলমানরা নির্যাতিত তাদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে। এই সব নির্যাতনের কথা, যা আমাদের শিক্ষকেরা বানিয়ে বলতেন, তখন আমরা তা সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতাম। এরপর চলত আরো কবিতা—বিশ্ব মুজাহিদিনদের (অর্থাৎ ইসলামী সন্ত্রাসীদের) প্রশংসা ও তাদের বিজয়ের কামনা করে। আমাদের শিক্ষকেরা যেসব স্থানে মুসলমানরা নির্যাতিত হচ্ছেন, সেসব স্থানের নাম মুখস্ত করিয়ে দিতেন। আমাদেরকে এই বলে উদ্বুদ্ধ করা হতো যে, ইসলামের রক্ষার জন্যে জিহাদ করা বাধ্যতামূলক। আমরা বেরিয়ে পড়তাম ঐ মুজাহিদিনদের জন্যে চাঁদা তুলবার জন্যে। ঘরে ঘরে যেয়ে আমরা বলতাম, মুজাহিদিনরা ঐ সব দেশে প্রাণপাত করছেন এবং কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করছেন।

(চলবে)