২৫ মার্চ, ২০১৭

জিহাদের বাস্তবতা

লিখেছেন সাঈদুর রহমান

(লেখাটি লিখেছিলাম ২০১৪ সালের ২৭ শে সেপ্টেম্বর। জিহাদ নিয়ে বুখারী হাদিস থেকে অনেকটা বিশ্লেষণধর্মী এই লেখাটি ছিল মডারেটদের উদ্দেশ্যে।)

কেন জানি মনে হচ্ছে, আইসিসকে অনুসরণ করে আরো কয়েকটি জিহাদী দল ইসলামিক খিলাফত প্রতিষ্ঠা করার জন্য তৎপর হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশও এটার বাহিরে নয়।

জিহাদ নিয়ে কার কী ধারণা, জানা নেই। সবার কাছে হয়তো নিজ নিজ ব্যাখ্যা আছে, যা জিজ্ঞাসা করলে অবশ্যই পাওয়া যাবে। কেউ হয়তো বলবেন, বাবা-মায়ের সেবা করা এক ধরনের জিহাদ। আবার কেউ কেউ বলবেন, নিজেকে শয়তানের কাছ থেকে বাঁচিয়ে রাখাও জিহাদ। তবে হাদিস-গ্রন্থগুলো পড়লে চিত্রটা অন্যরকম লাগে। বুখারী শরীফের জিহাদ অধ্যায় থেকে কয়েকটা হাদিস বলি। হাদিসগুলো মনে রাখবেন। মানুষ কেন জিহাদে যেতে চায়, বুঝে যাবেন। এবং নিজে অবশ্যই হাদিস শরীফ খুলে পড়ে নেবেন।

১. জান্নাত হল তলোয়ারের ছায়ার নিচে। (বুখারি, খণ্ড ৪, বই ৫২, হাদিস ৭৩)।
২. আল্লাহ পাক দুই ধরনের মানুষকে হাসিমুখে বরণ করেন। যারা জিহাদে শহীদ হয় এবং যারা জিহাদে গিয়ে হত্যা করে। (বুখারি, খণ্ড ৪, বই ৫২, হাদিস ৮০)।
৩. একজন জিহাদী সেই ব্যক্তির সমান যিনি রোযা রাখেন এবং ইবাদত করেন। (বুখারি, খণ্ড ৪, বই ৫২, হাদিস ৪৬)।
৪. জিহাদে দুপুর এবং বিকেল কাটানো দুনিয়া এবং দুনিয়ার ভেতর যে কোনো কাজের থেকেও উত্তম। (বুখারি, খণ্ড, ৪, বই ৫২, হাদিস ৫০)।

কল্পনা করুন, এই কয়েকটা হাদিস আপনার সন্তানকে মসজিদ মাদ্রাসায় হুজুর পড়াচ্ছেন। তিনি মুখে সরাসরি বলছেন না, অথচ ওদেরকে মনে মনে জিহাদ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করছেন। কেউ হয়তো বলবেন এগুলো জিহাদ নয়, ব্রেইনওয়াশ। আপনাকে বলি, বুখারী শরীফ হাতে নেন। জিহাদ অধ্যায় পড়া শুরু করেন। তারপর সিদ্ধান্ত নিন, কোনটা জিহাদ আর কোনটা নয়। এই অধ্যায়ের ২৪৮ টা হাদিসের মধ্যে ৯৫ শতাংশ হাদিসই শুধুমাত্র যুদ্ধবিগ্রহ, সহিংসতা ও সন্ত্রাস নিয়ে।

এই অধ্যায়ের দুটো অ-সহিংস এবং শান্তিপূর্ণ হাদিস বলি।

৫. ...হে আল্লাহর রাসুল, কোন কোন কাজ আল্লাহর কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ। উনি বলেন .. ১. সময়মত আল্লাহকে ইবাদত করা। ২. বাবা মায়ের সেবা করা। ৩. জিহাদে অংশ নেয়া। (বুখারি, খণ্ড ৪, বই ৫২, হাদিস ৪১)।
৬. এক ব্যক্তি নবীজীর কাছে এলেন জিহাদে অংশ নেবার জন্য। উনি তাকে ফিরে যেয়ে মা-বাবার কাছে ফিরে সেবা করতে বললেন। (বুখারি, খণ্ড ৪, বই ৫২, হাদিস ২৪৮)।

অনেকের কাছে হয়ত এগুলোই জিহাদ। এমন হলেই হয়তো ভাল হতো। জিহাদী দল জন্ম নিত না। তবে এগুলো জিহাদ নয়। অনেককেই বলতে শুনি, মানুষ বাকি হাদিসগুলোই মানে না, জিহাদ নিয়ে পড়ে থাকে। তাদের বলি, এভাবে দুনিয়া চলে না। জিহাদীরা আপনার আমার মত ভাবে না। তাদের দিন দুনিয়া কোরআন-হাদিসেই সীমাবদ্ধ। আপনি আমি যেভাবে চারদিক ভেবে মুক্তভাবে চিন্তা করতে পারি, তারা সেটা পারবে না। স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করে ভাল চাকরি এবং সাধারণ জীবন যাপনের চিন্তা আপনার আমার মনে থাকলেও তাদের নেই। আমাদের মত করে ভাবতে পারলে তো আর জিহাদই করত না, ডিগ্রি নিয়ে চাকরির চিন্তা করতো। তাদেরকে কোরআন-হাদিস নিয়েই থাকতে হয়। এগুলোই তাদের জীবন। তাদের চিন্তাচেতনা এগুলো নিয়েই। তাদের মতে বাহিরের জগৎ নষ্ট এবং ইসলাম থেকে অনেক বাহিরে। 

আপনাকেই কয়েকটা প্রশ্ন করি। আপনার কাছেই কোন জগৎ বেশি গুরুত্বপূর্ণ? ইহজগৎ নাকি পরজগৎ? পরজগৎ বলবেন নিশ্চয়ই। জিহাদীদের কাছেও তেমনটাই। পরজগতে আপনাদের সাথে কে থাকবে? আপনার বাবা-মা? ভাই-বোন? স্ত্রী-সন্তান?কেউ না নিশ্চয়ই। সবাইকে তাদের কৃতকর্মের ফলাফলই ভুগতে হবে, তাই না? কেউ এসে তো আপনার গডকে হাতজোড় করে বলতে পারবে না, আমার ছেলেকে মাফ করে দিন। আমার স্বামীকে মাফ করে দিন। নাকি বলবে? যারা জিহাদে নামতে চান, তাদের মনে এমন কথাগুলোই ঘুরপাক খায়। নিজের হিসেব যখন নিজেকেই দিতে হবে, সুতরাং এমন কিছু করতে হবে, যাতে জাহান্নাম এড়ানো যায় এবং জান্নাত পাওয়া যায়। অতএব ৫ নাম্বার হাদিসে উল্লেখিত তিন নাম্বার কাজটিই প্রথম দুটোকে ওভারটেক করে।

প্রথম দুটো কাজ না এড়িয়ে কীভাবে অনেকে এই হাদিস ব্যবহার করে কিভাবে জিহাদে যেতে পারে, এবার সেটা বলি। যাদের বাবা-মা নেই, তাদের জন্য খুব সোজা। অনেকে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়েই জিহাদে যায়। আবার অনেক বাবা-মা-ই তাদের সন্তানকে পুণ্য লাভের আশায় জিহাদে যেতে বাধা দেন না। ছেলে তো আর মেয়েবাজি বা জুয়া খেলতে যাচ্ছে না! আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করতেই যাচ্ছে। আবার অনেকে বাবা-মাকে না বলেই চলে যায়। কারণ তারা বোঝে, তাদের বাবা-মা বাধা দেবেন ছেলে হারানোর ভয়ে। কিন্তু কেউ তো আর আল্লাহর ঊর্ধ্বে নয়। বাবা-মা বাধা দিচ্ছেন ইমোশনাল হয়ে। কিন্তু এতে তো আর জান্নাত মিলবে না! জিহাদে গিয়ে মরলে বা মারলেই জান্নাত (১ নাম্বার )।

নিজেকেই প্রশ্ন করুন। আপনার মনের ভেতরে কি নেই, সমাজে ইসলামিক আইন প্রতিষ্ঠা হোক? নিশ্চই আছে। আবার বলবেন, তবে কাউকে মেরে নয়। জনাব, আপনার ইসলামিক আইন প্রতিষ্ঠা হোক, এমনটা চায় মাত্র ১৫০ কোটি মানুষ। আর বাকি ৫৫০ কোটি মানুষ মোটেও এমন চায় না। তারা কেউ হিন্দু, কেউ খ্রিষ্টান, কেউ বৌদ্ধ, আর কেউ নাস্তিক। তারা সবাই চায় তাদের ধর্ম বা মতের ওপর আইন প্রতিষ্ঠা হোক। সবার কাছে সবার ধর্মই সত্য, প্রকৃত গড থেকে আগত। আপনি তাদের কী বলে ডাকেন? কাফির! মুর্তাদ! বিধর্মী! কী, বলেন না? ওরা না থাকলেও তো চলবে, তাই না? আল্লাহর আদেশ মতই রাষ্ট্র চলা চাই। কেউ বাধা দিলে প্রথমে প্রথমে প্রতিবাদ। না মানলে ব্যবস্থা তো আছেই। আপনি হয়তো পিস লাভিং অন্য ব্যবস্থাটা এড়াতে চেষ্টা করবেন। কিন্তু যারা মুখের আগে হাত চালায়, একরোখা, তাদের মাথায় থাকবে ২ নাম্বার হাদিসটা। আর ওদের মারার জন্য নিজে মরে গেলেই কি? জান্নাত তো নিশ্চিত। (হাদিস নাম্বার ৩)।

ওপরের কারণগুলো বুঝিয়ে তারা পিস লাভিং আপনাকেও ব্রেইনওয়াশ করতে পারে। মজার বিষয়, আপনি তাদের ভুলও বলতে পারবেন না। সবকিছুই কোরআন-হাদিস মোতাবেক। তারা যদি আপনাকে প্রশ্ন করে, আপনি কি চান না ইসলামিক খিলাফত প্রতিষ্ঠা হোক? ইসলাম শুধু মানলেই হলো না, খিলাফত প্রতিষ্ঠাও করতে হবে! স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার আইন মানতে হবে। আপনি কি কোনো প্রশ্নের উত্তরে "না" বলবেন? বলবেন না। কারণ "না" বললে আপনাকে কাফির মুর্তাদদের দলেই গণ্য করা হবে। এমনকি আপনার প্রাণও যেতে পারে। আপনার নরম মনকে এভাবেই বিষিয়ে তোলা হতে পারে। আপনি হয়তো আপনার চিন্তাচেতনা দিয়ে হযতো তবু এড়িযে যেতে পারবেন, কিন্তু বাচ্চারা? ১৮-২০ বছরের কিশোর-যুবকরা? যারা দিনরাত মাদ্রাসায় পড়ে থাকে, তারা?

লোকে বলে, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ ভাল। কে, কোন সময় কোন পথে চলে যায়, কেউ জানে না? না হোক আপনার সন্তান, ভাই কিংবা পরিচিত, কেউ জিহাদে যাওয়ার জন্য আপনাকে বললো বা আপনাকে যেতেও দাওয়াত দিলো ওপরের হাদিসগুলা দিয়ে। আপনি কী করবেন, ভেবে দেখেছেন? আপনি জানেন, বাংলাদেশ থেকেও অনেক ভাই-বোন আইসিসকে সমর্থন দিচ্ছে। হয়তো আপনার ছোট ভাই কিংবা বন্ধুও রয়েছে এই তালিকায়। ওদের সাথে জিহাদ নিয়ে খোলাখুলি কথা বলুন। মানবধর্ম শেখান। শুধু মুসলিম-মুসলিম নয়, হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিষ্টান সবাই যে একই পরিবারের ও পরষ্পর ভাই-ভাই, সেটা শেখান। একত্রে বসবাসে উদ্বুদ্ধ করুন। যখনই দেখবেন, কেউ এসে "এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই" বলে অন্য ধর্মের মানুষ থেকে আপনাকে আলাদা করে দিচ্ছে এবং জিহাদে যাওয়ার দাওয়াত দিচ্ছে, বুঝে নেবেন এটা ধর্ম নয়, রাজনীতির খেলা।

আরেকটা জিনিসের পার্থক্য জেনে নিন। ধর্ম পালন এবং ধর্ম প্রতিষ্ঠা - দুটো দুই জিনিস। ধর্ম প্রতিষ্ঠার কাজ ছিল আপনার নবী-রাসুলদের। আপনার দায়িত্ব এগুলো পালন করা। যখনই সেটা প্রতিষ্ঠা করতে যাবেন, তখনই রক্তারক্তি শুরু হবে। স্বয়ং আপনার নবীও এটা এড়াতে পারেননি। সর্বশেষ অনুরোধ, আপনার নেতা যে-ই হোন না কেন, তার কোনো আদেশ মানার আগে নিজের জ্ঞান, চিন্তাচেতনা ও বিবেক ব্যবহার করবেন। এগুলোকে কারো হাতে তুলে দেবেন না।