৮ মার্চ, ২০১৭

লজ্জা

লিখেছেন উজান কৌরাগ

রাত পোহালেই শুরু দূর্গা পূজা। মা দূর্গা এবার নৌকায় চড়ে আসছেন, ফিরবেন দোলায়। মন্দিরে আসবার পথে পুরোহিত নৃপেন চক্রবর্তীর বউয়ের মুখে তেমনটাই শুনেছেন রাসমণি। না, নৃপেন চক্রবর্তীর বউ তাকে বলেননি, হাত নেড়ে ভ্রূ নাচিয়ে অন্য নারীদের বলার সময় পাশে দাঁড়িয়ে শুনেছেন তিনি। খুব সুন্দর করে কথা বলেন নৃপেন চক্রবর্তীর বউ, তার মুখে দেব-দেবীর কথা শুনলে মনে হয় তিনি তাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়; স্বয়ং লক্ষ্মী বড়বোন, ছোটবেলায় তার ভেজা প্যান্ট বদলে দিয়েছে, চুলে তেল দিয়ে মাথা আঁচড়ে বিনুনি করে দিয়েছে; গণেশ জ্যাঠতুতো দাদা, কতোবার অংক কষাতে বসে কান মলেছে, আবার আদরও করেছে; আর কার্তিক আদরের কাকাতো ছোটভাই, বনে বনে ঘুরে ঘুরে কোমরে গুঁজে দিদির জন্য নিয়ে এসেছে বঁইচি ফল অথবা রায়বাড়ির বাগান থেকে চুরি করে এনেছে পাকা কামরাঙা! 

মা দূর্গা অতোগুলো ছেলেপুলে নিয়ে স্বর্গ থেকে কী করে নৌকাযোগে ধরণীতে আসবেন, তা জানেন না রাসমণি; শুধু জানেন, মা আকাশের ওপরের স্বর্গ থেকে ধরাধামে নেমে আসবেন এবং নৌকায় চড়েই আসবেন! পৃথিবীতে মায়ের এতো এতো ছেলে-মেয়ে, তাদেরকে একবার দর্শন দিতে মাকে যে বৎসরে একবার আসতেই হয়! মা আসা মানেই তো কয়েকটা দিন মহা ধুমধামে মায়ের পূজা আর মন্দিরে মানুষের ঢল! তাতে রাসমণিদের দুটো বাড়তি পয়সা রোজগার হয়, একটু ভাল খাবার জোটে। পূজা এলে মায়ের সন্তানদের মনে মায়ার জোয়ার আসে, বুঝিবা কয়েকটা দিনের জন্য কারো কারো চৈতন্যে বৈরাগ্যভাবও জন্ম নেয়! যারা সারা বছর এক টাকা ভিক্ষে দেয় না, তারাও পূজার কয়েকটা দিনে পাঁচ-দশ টাকা হাতে ধরিয়ে দেয়। ব্যবসা-বাণিজ্যের যেমনি ভরা মৌসুম থাকে, তেমনি পূজা-পার্বণ হলো ভিক্ষুকদের ভরা মৌসুম। মন্দ মানুষের ভালমানুষি দেখানোর মৌসুম। তাই মৌসুমটা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পঞ্চমীর দিন বিকেলেই মন্দিরের চাতালের গেটে অবস্থান নিয়েছেন রাসমণি। স্নান-পায়খানা-প্রসাব বাদে পূজার দিনগুলো তিনি এখানেই কাটাবেন, এখানেই খাবেন, এখানেই শোবেন। 

ভোররাতে হালকা শীত পড়তে শুরু করেছে। পূজার পর শীত আরও বাড়বে। এই ক'দিনের রোজগারে একখানা কম্বল, আর একটা কাপড় তাকে কিনতেই হবে। পরনের কাপড়খানার অবস্থা বড্ড নাজুক। কতো জায়গায় ছিঁড়েছে, তার হিসেব নেই। ছোটখাটো ছেঁড়া নয়, এক জায়গায় তো এক বিঘত ছিঁড়েছে। মুখ মুছতে মুছতে আঁচলের দিকটা এমনি ঝুলিঝাড়া হয়েছিল যে, খানিকটা ছিঁড়ে ফেলে দিতে হয়েছে, এক চিলতে আঁচল কাঁধে ফেলে রাখা গেলেও তাতে ঘোমটার কাজ চলে না। সাদা কাপড়খানায় নানান রঙের তালি পড়েছে কয়েক জায়গায়; তবু লজ্জা নিবারণ হয় না, শরীর বেরিয়ে যায়। অবশ্য দেখার মতো কী-ই আর আছে তার শরীরে! চৈত্রের শুকিয়ে যাওয়া বিলের চৌচির কালো বুকের মতোই বলিরেখা তার শরীরে। বুক দুটো শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে; যেন এককালের ডাগর স্তনের জীবাশ্ম! এখন দেখে কে বলবে, এই বুক দুটোই একদিন ডাগর ছিল, দুধের বান আসতো! লোকের নজর কাড়তো তার বুক, তিন তিনটে ছেলে-মেয়ে এই বুকের দুধ পান করেই বড় হয়েছে, মানুষটা মরে না গেলে হয়তো আরও ছেলে-মেয়ে হতো, তারাও পান করতো! 

কতোকাল যে রাসমণি ব্লাউজ পরেন না, তা তার মনেই পড়ে না! ব্লাউজের তেমন প্রয়োজনও বোধ করেন না আর, যেমন তেমন একখানা কাপড় হলেই শরীরখানা ঢেকেঢুকে রাস্তায় বসা যায়।

এবার একটা কম্বল না কিনলেই নয়। রাস্তাঘাটে থাকা, রাস্তাঘাটেই শোয়া। শীতের জ্বালা বেজায় জ্বালা। কম্বল না কিনলে হয়তো এই শীতেই মরবেন তিনি! গত শীতের আগের শীতে বসাক বাবুর বউ তার মরা শাশুড়ির ছেঁড়া কম্বলখানা দিয়েছিল, তাই দিয়েই পার করেছে দুই শীত। কিন্তু গেল শীতের একেবারে শেষ দিকে কোন হতচ্ছাড়া ঐ ছেঁড়া কম্বলখানাই হাতছাফাই করেছে এক সন্ধ্যায় তিনি পায়খানা করতে গেলে। এবারও কারো কাছ থেকে একটা পুরোনো কম্বল পেলে দিব্যি হয়, কিন্তু পরের আশায় তো আর বসে থাকা চলে না। তাই পূজার ক'টা দিনে কম্বল আর কাপড়ের টাকাটা গোছাতেই হবে। 

বিকেলটা মরে আসছে। রাসমণি উঠে গিয়ে মন্দিরের চাতালে ঢুকে একটা বেঞ্চে বসলেন। দু'জন প্রতিমা শিল্পী ব্যস্ত হাতে প্রতিমার কাজ করছে। ছেলেপুলেরা মন্দিরের চাতালে কেউ বসে আছে, কেউবা নিজেদের মধ্যে হই-হুল্লোড় করছে। কয়েকজন বড় মানুষও আছে। প্রতিমার রঙের কাজ শেষ। শুধু চোখ ফোটানো বাকি, কাপড়-চোপড় পরানোর পর সব শেষে আঁকা হবে চোখের মণি এবং তখনই কপালে পরানো হবে সোনার টিপ। গত দু'বছর যাবৎ দূর্গার কপালে শোভা পাচ্ছে সোনার টিপ। বাজারের ব্যবসায়ী দিব্যেন্দু সাহা তার মনোবাসনা পূরণ হওয়ায় গড়িয়ে দিয়েছেন। 
এখন শাড়ি পরানো হবে। মা দূর্গার শাড়ি পরানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বয়স্ক প্রতিমা শিল্পী। শাড়ির কুচি ঠিক করছে। কী সুন্দর খয়েরি রঙের শাড়ি! ওপরের কারুকাজ করা চুমকি ঝিলিক মারছে। 

রাসমণি মা দূর্গার দিকে তাকালেন। কোমর পর্যন্ত রঙ করা, কোমরের নিচ থেকে গোড়ালির ওপর পর্যন্ত খড়িমাটির প্রলেপ দেওয়া। রাসমণি দূর্গার তলপেট এবং দুই ঊরুর মাঝখানের স্ত্রীলিঙ্গহীন মসৃণ জায়গায় চোখ রাখলেন। একটু পরেই মায়ের লজ্জা ঢেকে যাবে, ভাবলেন তিনি। একজন প্রতিমাশিল্পী এবার চেয়ারে উঠে প্রতিমার সামনে দাঁড়ালো। আরেকজন শাড়ি তুলে দিল তার হাতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেবী দূর্গার লজ্জা নিবারণ করা হলো। রাসমনি হাঁ হয়ে তাকিয়ে আছে দূর্গার দিকে। এখন বেশ মা-মা লাগছে, আর একটু আগে কেমন ঢেমনি মনে হচ্ছিল তার কাছে! এখন একে একে সব প্রতিমাকে কাপড় পরানো হবে, লজ্জা নিবারণ হবে সকলের। 

ষষ্ঠীর দিন একজন, সপ্তমীর দিন দুইজন, আর অষ্টমীর সকালে আরও একজন প্রতিদ্বন্দ্বী বেড়েছে রাসমণির। কেউ তার বয়সী, কেউবা তার চেয়ে বয়সে ছোট। একজন পুরুষ, বাকি সকলেই নারী। গেটের বাইরে দু'পাশে বসে সবাই। রাতে কেউ এখানেই ঘুমায়, কেউবা আশপাশের কোনো আড়াল মতো জায়গা খুঁজে নিয়ে ঘুমায়। অষ্টমীর দিন রাত পর্যন্ত রাসমণির চারশো সাতচল্লিশ টাকা হয়েছে। পূজার বাকি আর একদিন। এবার নবমী এবং দশমী একই দিনে। এজন্য তার একটু মন খারাপ। ভরা মৌসুমের একটা দিন কমে যাওয়া মানে দারুণ ক্ষতি! তবু তার এটুকুই সান্ত্বনা যে, কাল দিনটা ভাল গেলেই তিনি অনায়াসে একখানা সস্তার থানকাপড় আর কম্বল কিনতে পারবেন। তিনি লজ্জা ঢাকতে পারবেন আবার শীতেও কষ্ট পাবেন না। আজ সকালে মাজাভাঙা বুড়ি মাগিটা কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসলো! নয়তো আরো কিছু রোজগার হতো। 

মন্দিরে দর্শনার্থীর আনাগোনা চলে গভীর রাত পর্যন্ত। রাসমণি অপার বিস্ময়ে দর্শনার্থীদেরকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন, বিশেষত নারী দর্শনার্থীদের। মা দূর্গার মতো তাদের গায়েও ঝলমলে পোশাক, আর সেই বহু মূল্যবান পোশাক থেকে ভেসে আসা বাহারি বাসনায় তার ঘোর লেগে যায় যেন! খাঁটি গাওয়া ঘিয়ের মতো তাদের গায়ের রঙ! রাসমনির মনে হয়, নবীনদের নতুন কাটা পুকুরের লালমাটি দিয়ে ভুবন পাল যেমন এই দেবী মূর্তি গড়েছে, তেমনি ভগবানও স্বর্গের নতুন কাটা পুকুরের উৎকৃষ্ট মাটি দিয়ে গড়েছে এইসব ঘিয়ে রঙের মানুষগুলোকে! আর খগেনদের পচা পুকুরের মাটি দিয়ে ছেলেপুলেরা যেমন এবড়োথেবড়ো পুতুল বানিয়ে খেলে, তেমনি ভগবানও নরকের পচা মাটি দিয়ে খেলাচ্ছলে বানিয়েছে তাদের! ভগবান তার না দিয়েছে রঙ, না দিয়েছে গড়ন! 

মন্দির যখন প্রায় খালি তখন রাসমণি টাকাগুলো কাপড়ের ছোট একটা ব্যাগে ভরে কোমরে গুঁজে রাখলো। তারপর মন্দিরের চাতালে ঢুকে এক কোনায় শুয়ে পড়লো। বাইরে শীত করছিল তার। ঘুমের মধ্যে কতো যে অলীক স্বপ্ন দ্যাখেন রাসমণি, তার কোনো অন্ত নেই! মাঝে মাঝে স্বপ্ন দ্যাখেন যে, তার ছেলের দজ্জাল বউটা তাকে 'মা' বলে ডেকে তার প্রাণ জুড়িয়ে দিচ্ছে, তাকে সেবা করছে; আবার কখনো দ্যাখেন যে, মা লক্ষ্মী তাকে একখানা টিনের ঘর আর গোলাভরা ধান দিয়েছেন! সকালের আলোয় তার এই স্বপ্ন উবে যায়, শোয় থেকে উঠে বসে হাত পাততে হয় পথচারীদের দিকে। বড় সাধ করে দুই মেয়ের নাম রেখেছিলেন লক্ষ্মী-সরস্বতী, আর ছেলের নাম কার্তিক; তারা কেউ দ্যাখে না মাকে! 

এখন সকাল। সূর্যটা দূরন্ত শিশুর মতো উঁকি দিতেই মোলায়েম রোদ ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে। মন্দিরের সংযমীরা উঠে কাজ শুরু করেছে। অন্যান্য কর্মীরা দু'-একজন করে আসছে। মাধব ঢাকি কলতলায় ওয়াক তুলছে। রাসমণি শুয়েই আছে ডানদিকে কাত হয়ে। নিমীলিত তার দুটি চোখ। কেউ কেউ তার দিকে এক পলক তাকিয়ে চলে যাচ্ছে নিজের কাজে। পিঠের সামান্য তফাতে শুয়ে আছে একটা পোয়াতি কুকুর। গোটাকতক মাছি নিঃশব্দে উড়ে উড়ে একবার কুকুরের পিঠের দগদগে ঘা, আরেকবার রাসমণির মুখে বসছে! কুকুরের ভোঁস ভোঁস নিঃশ্বাস পড়ছে চাতালের পাকা মেঝেতে, রাসমণিরও তাই! 

নারিকেল পাতার মতো সরু একফাঁলি রোদ রাসমণির বুকের ওপর আড়াআড়ি ভাবে পড়েছে। মলিন ছেঁড়া কাপড়ের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আছে তার শুকনো আমসি হয়ে ঝুলে পড়া বলিরেখাময় কালো স্তন। রোদের ফালি সেই কালোর ওপর আলো ফেলেছে। মন্দিরের সংযমী আর সাতসকালের আগত মাতব্বর গোছের মানুষের দৃষ্টি পিছল খাচ্ছে তার রৌদ্রজ্জ্বল নেতানো স্তনে!

মাটি আর খড়ের নিষ্প্রাণ সুসজ্জিত প্রতিমা অধিষ্ঠান করছে আলোকোজ্জ্বল মন্দিরের খাটিয়ায়। তার সেবা-যত্নে ভীষণ ব্যতিব্যস্ত মানুষ। তার মহিমা প্রচারে মানুষের খরচের বহর, তার লজ্জা নিবারণে পরনে ঝলমলে শাড়ি, তার সৌন্দর্য বর্ধনে কপালে সোনার টিপ! 

আর পৃথিবী নামক এই গ্রহের রক্ত-মাংসে গড়া সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত প্রাণির একজন রাসমণি একটা ইতর প্রাণির সাথে শুয়ে আছেন মন্দিরের চাতালে, তার ছেঁড়া কাপড় ভেদ করে ন্যাতার মতো ঝুলে থাকা চামড়া সর্বস্ব রোদপ্রাপ্ত মাংসটুকু খোলা চোখে দেখে হয়তো মনে হবে স্তন, আসলে তা মানবজাতির অনাবৃত মনোলিঙ্গ! মানবজাতির লজ্জা! 

ঢাকা।
আগস্ট, ২০১৫