৭ ফেব, ২০১৭

ফাদাক - ৬ (শেষ পর্ব): মুহাম্মদের বিশাল সম্পদ - কারা ছিলেন স্বত্বভোগী?: কুরানে বিগ্যান (পর্ব-১৫৮): ত্রাস, হত্যা ও হামলার আদেশ – একশত বত্রিশ

লিখেছেন গোলাপ

(আগের পর্বগুলোর সূচী এখানে)

"যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।"

স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর মৃত্যুকালে যে সুবিশাল অংকের সম্পদ রেখে গিয়েছিলেন (পর্ব-১৫৫), তার হিস্যা কী কারণে তাঁর কন্যা ফাতিমা, তাঁর পত্নী ও অন্যান্য নিকট-আত্মীয়দেরই একমাত্র ন্যায্য অধিকার, তাঁদের সেই ন্যায্য উত্তরাধিকারের অধিকার থেকে আবু বকর ইবনে কুহাফা যে অজুহাতে তাঁদের বঞ্চিত করেছিলেন তা কী কারণে মুহাম্মদের পরিবারের প্রতি চরম অবমাননা, অন্যায় ও প্রহসন ও কুরানের স্পষ্ট আদেশের বরখেলাপ, তার বিস্তারিত আলোচনা আগের পর্বে করা হয়েছে।

পৃথিবীর আর সব ধর্মের সাধারণ ধর্মবিশ্বাসীরা যেমন তাঁদের ধর্ম, ধর্মগ্রন্থ ও তার ইতিহাস সম্বন্ধে নিগুঢ় জ্ঞান না রেখেই তাঁদের নিজ নিজ ধর্ম নিখুঁত ও সত্য জ্ঞানে পালন করেন, সাধারণ ইসলাম বিশ্বাসীরাও তার ব্যতিক্রম নয়। আদি উৎসের ইসলামের ইতিহাসের এই সকল স্পষ্ট নথিভুক্ত গভীর ও অন্ধকার ইতিহাসগুলো যখন সাধারণ মুসলমানদের কাছে প্রকাশ করা হয়, তখন তাঁরা প্রথমেই করেন অস্বীকার (Denial)! প্রশ্ন করেন, "এ কীভাবে সম্ভব? আপনি কি বলতে চান যে, আবু বকর-উমর ও আলী-ফাতিমা কুরান-হাদিস জানতেন না?" এই প্রশ্নের অতি সহজ জবাব হলো, মুহাম্মদের এই একান্ত বিশিষ্ট অনুসারীরা ইসলামের অনুশাসন নিশ্চয়ই জানতেন! তাঁরা জেনে-শুনেই এই অন্যায় অপকর্মগুলো সম্পন্ন করেছিলেন! না জেনে কি মুহাম্মদের এই বিশিষ্ট অনুসারীরা একে অপরের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে নবীর পরিবারের বিরুদ্ধে, এ সকল অন্যায় ও অনৈতিক কর্মগুলো করতে পারতেন?

আদি উৎসের সকল মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণিত তথ্য উপাত্তগুলোর বর্ণনায় যা আমরা নিশ্চিতরূপে জানি, তা হলো, এই ঘটনার যিনি ছিলেন বিচারক, তিনিই ছিলেন বাদী ও তিনিই সাক্ষী! এমন একটি বিচারব্যবস্থা, যেখানে বিচারক নিজেই পালন করেন বাদী ও সাক্ষীর ভূমিকা, প্রতিপক্ষের যুক্তি-প্রমাণ ও সাক্ষীর সাক্ষ্যকে করেন প্রত্যাখ্যান (পর্ব-১৫৬) এবং কুরানের স্পষ্ট আদেশকে অবলীলায় করেন অমান্য, তখন সেই বিচারকের বিচারকে এক প্রহসন (পর্ব-১৫৭) ছাড়া অন্য কোনোভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ থাকে না।

যে সমস্ত সুন্নি ইসলাম বিশ্বাসী পণ্ডিত ও অপণ্ডিতরা (অধিকাংশই না জেনে) ফাতিমার পক্ষের দুই জন পুরুষ সাক্ষীর একজনকে ফাতিমার স্বামী ছিলেন বিধায় তা গ্রহণযোগ্য নয় আখ্যা দিয়ে আবু-বকরের এই অন্যায়, অনৈতিক ও অমানবিক কর্মের বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করেন, তারা প্রকারান্তরে আবু বকরের মতই কুরানের স্পষ্ট আদেশেরই অবমাননা করেন। এ বিষয়ে আল্লাহর রেফারেন্সে মুহাম্মদের বাণী (কুরান) অত্যন্ত স্পষ্ট:

৪:১৩৫- “হে ঈমানদারগণ, তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক; আল্লাহ্র ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান কর, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্নীয়-স্বজনের যদি ক্ষতি হয় তবুও। -----"

Ø অর্থাৎ, সাক্ষীটি যদি ঐ ব্যক্তির নিজের সন্তানও হয়, তথাপি সেই অজুহাতে তাঁকে 'অযোগ্য' বলে ঘোষণা করা কুরানের আদেশের সরাসরি বরখেলাপ! পিতা-মাতার পক্ষে বা বিপক্ষের সাক্ষীও হতে পারে তাঁর নিজ সন্তানেরা। আলী ইবনে আবু তালিব ফাতিমার স্বামী ছিলেন, সে কারণেই তাঁর সাক্ষী গ্রহণযোগ্য হয়নি, এমন উদ্ভট দাবির কোনো সত্যতা আদি উৎসে খুঁজে পাওয়া যায় না। এই কু-যুক্তিটি পরবর্তী যুগের সুন্নি পণ্ডিত ও অপণ্ডিতদের অপপ্রচার ও মিথ্যাচার।

আদি উৎসের ইমাম বুখারীর বর্ণনায় (৫:৫৯:৩৬৭) আমরা জানতে পারি যে, উমর ইবনে খাত্তাব তাঁর শাসন আমলের (৬৩৪-৬৪৪ সাল) তৃতীয় বর্ষে, ফাতিমার মৃত্যুর সাড়ে তিন বছর পর, মদিনার বানু নাদির গোত্রের কাছ থেকে লুণ্ঠিত (পর্ব-৫২ ও ৭৫) মুহাম্মদের সম্পত্তি "শর্ত সাপেক্ষে" মুহাম্মদের চাচাতো ভাই ও জামাতা আলী ইবনে আবু তালিব ও চাচা আল-আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের কাছে ফেরত দিয়েছিলেন, যার আলোচনা 'ফাতিমার মানসিক আর্তনাদ (পর্ব-১৫৪)!' পর্বে করা হয়েছে। কিন্তু তিনি ফাদাক ও খায়বারে অবস্থিত মুহাম্মদের সম্পত্তি মুহাম্মদের পরিবারের কাছে ফেরত দেননি। পূর্বপুরুষদের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হওয়ার জন্য উত্তরসূরিদের এ শর্ত বাধ্যতামূলক নয় যে, তাঁরা সেই সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ ও তা থেকে উপার্জিত অর্থ তাঁদের মৃত পূর্বপুরুষদের মতই খরচ করবেন, যদি না এই ব্যাপারে কোনো লিখিত ওসীয়ত (উইল) থেকে থাকে। আদি উৎসের বর্ণনায় যা আমরা নিশ্চিতরূপে জানি, তা হলো, আবু বকর তার দাবির সপক্ষে এই মর্মে মুহম্মদের কোনো ওসীয়ত নামা কখনোই হাজির করেননি। এমত অবস্থায় মুহাম্মদ তাঁর জীবদ্দশায় যেভাবে তাঁর বিশাল সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ করেছেন, দান-খয়রাতি করেছেন, অনুসারীদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছেন, মুহাম্মদের রেখে যাওয়া সম্পত্তির হিস্যা পাওয়ার জন্য 'মুহাম্মদের উত্তরাধিকারীদেরও মুহাম্মদের সেই পথ অনুসরণ করতে হবে', উমর ইবনে খাত্তাবের আরোপিত এমন বাধ্যবাধকতা অন্যায়, অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

প্রশ্ন হলো,
"আবু বকর ইবনে কুহাফা কী কারণে মুহাম্মদের একান্ত পরিবার ও নিকট-আত্মীয়দের ওপর এই জঘন্য অন্যায় ও পাশবিক আচরণটি করেছিলেন? 

>> এই প্রশ্নের সঠিক জবাব জানা হয়তো কখনোই সম্ভব নয়। কিন্তু আদি উৎসের বর্ণনায় যা আমরা নিশ্চিতরূপে জানি, তা হলো, মুহাম্মদের মৃত্যুর ঐ দিনটিতে যখন আলী, ফাতিমা ও মুহাম্মদের পরিবারের (হাশেমী গোত্র) অন্যান্য নিকট-আত্মীয় ও গুণগ্রাহী অনুসারীরা অত্যন্ত শোকাহত, মৃত মুহাম্মদের সৎকার কার্য নিয়ে ব্যতিব্যস্ত, তখন মুহাম্মদের লাশটিকে বিছানায় ফেলে রেখে আবু বকর-উমর গং ও তাদের অনুসারী কুরাইশ ও একদল আনসার মদিনার খাযরায গোত্রের অন্তর্ভুক্ত বানু সায়েদা (Banu Saidah) গোত্রের এক ছাউনির নিচে (saqifah) ক্ষমতা আহরণের নিমিত্তে উত্তপ্ত বাক বিতণ্ডার লড়াইয়ে লিপ্ত! উমর ইবনে খাত্তাবের প্রত্যক্ষ ও এক পর্যায়ে সশস্ত্র সাহায্য ও সহযোগিতায় চাতুরির আশ্রয়ে (এ বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা পরবর্তীতে করা হবে) ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন ইসলামের ইতিহাসের প্রথম খুলাফায়ে রাশেদিন আবু বকর ইবনে কুহাফা!

আদি উৎসের বর্ণনায় যা স্পষ্ট, তা হলো, মুহাম্মদ তাঁর ক্ষমতা কুক্ষিগত করার অভিপ্রায়ে তাঁর অনুসারীদের 'গণিমতের জোগান" নিশ্চিত করার ব্যাপারে ছিলেন সদা সচেষ্ট (পর্ব-১২২)! তাঁর মন্ত্র ছিলো, "কুরান (আল্লাহ বলেছেন) ও গনিমত!" আবু বকর ও উমর ছিলেন মুহাম্মদের অতি প্রিয় দুই শিষ্য। তারা মুহাম্মদের কাছে রাজনীতি শিখেছিলেন। মুহাম্মদের শিক্ষায় শিক্ষিত এই দুই শিষ্য তাদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করার অভিপ্রায়ে মুহাম্মদের মতই তাদের অনুসারীদের সুযোগ-সুবিধার জোগান নিশ্চিত করার ব্যাপারে সচেষ্ট হবেন, তাইই  কি স্বাভাবিক নয়?

আদি উৎসের বর্ণনায় যা আমরা নিশ্চিতরূপে জানি, তা হলো, মুহাম্মদের মৃত্যুশয্যা ও তাঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পরের সময়টিতে একদা মুহাম্মদের দীক্ষায় দীক্ষিত অনুসারীরা দলে দলে ইসলাম ত্যাগ করছিলো। ক্ষমতা আরোহণের পর এই সব ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে আবু-বকর উমর গং-এর নেতৃত্বে মুসলমানদের যে অমানুষিক নৃশংসতা, ইসলামের ইতিহাসে তার নাম 'রিদ্দার যুদ্ধ (wars of the Riddah or apostasy)'! তারা এই যুদ্ধে (৬৩২-৬৩৩ সাল) ইসলাম ত্যাগের অপরাধে অপরাধী অসংখ্য ইসলামত্যাগী মানুষদের হত্যা করেছেন। যে মুহূর্তে মুহাম্মদের অনুসারীরা দলে দলে ইসলাম ত্যাগ করছেন, সেই মুহূর্তে আবু বকর তার পক্ষের লোকদের দলে ধরে রাখার জন্য 'গনিমত' জোগাড় করবেন কোথা থেকে? সেই মুহূর্তে তিনি যদি ফাদাক, খায়বার ও মদিনায় অবস্থিত "মুহাম্মদের বিশাল সম্পদ" মুহাম্মদের উত্তরাধিকারীদের কাছে ফেরত দেন, তবে তিনি কীভাবে তার অনুসারী মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে রাখবেন?

এই পরিস্থিতি সামাল দিতেই কি আবু বকর “মুহাম্মদের আমি শুনিয়াছি, 'জিবরাইলের বলেছে-'" অনুকরণে "আমি শুনিয়াছি, 'মুহাম্মদ বলেছেন--'" নামের এই অজুহাতটি হাজির করে মুহাম্মদের বিশাল সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেছিলেন? তার এই সিদ্ধান্তে নবী পরিবারের সমস্ত লোক তাঁদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন সত্যি, কিন্তু মুহাম্মদ-অনুসারীদের সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়েছিলো নিঃসন্দেহে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আবু বকর তার এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তার নিজের মসনদ ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন! অতঃপর, দুই বছর (৬৩২-৬৩৪ সাল) শাসন শেষে মৃত্যুকালে মুহাম্মদের এই অন্যতম শিষ্য রাজনীতিবিদ তার ক্ষমতা হস্তান্তর করেন উমর ইবনে খাত্তাব-কে। অর্থাৎ, মুহাম্মদের রেখে যাওয়া সুবিশাল সম্পত্তির সর্ব প্রথম স্বত্বভোগী ছিলেন এই আবু বকর ইবনে কুহাফা ও উমর ইবনে খাত্তাব!

অন্যদিকে,
মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা "ইসলাম" নামের যে বিষবৃক্ষ প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তার:

(১) সর্বপ্রথম বলি ছিলেন মুহাম্মদ নিজে! 
>> মুহাম্মদ তাঁর অমান্যকারী ও সমালোচনাকারীদের প্রতি যে কী পরিমাণ বিদ্বেষ ও ঘৃণা নিয়ে সুদীর্ঘ ২৩ বছর (৬১০-৬৩২ সাল) অতিবাহিত করেছিলেন, তার প্রাণবন্ত বর্ণনা কুরান ও আদি উৎসে বর্ণিত সিরাত ও হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত আছে। মদিনা অবস্থানকালীন সুদীর্ঘ দশ বছরের (৬২২-৬৩২ সাল) অধিকাংশ সময়ই তাঁর কেটেছিল রাহাজানি, লুণ্ঠন, দমন, নিপীড়ন, হত্যা, ভূমি-দখল ও অমানুষিক নৃশংস কর্মকাণ্ডের মধ্যে। একজন মানুষের পক্ষে এরূপ জীবন অতিবাহিত করা অত্যন্ত কষ্টের!

(২) 'দ্বিতীয়' বলি ছিলেন মুহাম্মদের একান্ত পরিবার সদস্যরা! 
>> মুহাম্মদের মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই আবু বকর-উমর গং ও ফাতিমা-আলী গং এর বিরোধ ছিলো "সূচনা মাত্র!" ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, "মুহাম্মদের মৃত্যুর (৬৩২ সাল) ৪৮ বছরের মধ্যে মুহাম্মদ অনুসারীরা তাঁর একান্ত নিকট-পরিবারের সমস্ত সক্ষম ও প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সদস্যদের প্রচণ্ড নিষ্ঠুরতায় একে একে খুন করে (পর্ব-৬৪)"।  

(৩) 'তৃতীয়' বলি হলো তাঁর অনুসারী মুসলমান সম্প্রদায়!
>> মুহাম্মদের দীক্ষায় দীক্ষিত নিবেদিতপ্রাণ অনুসারীরা একে অপরের বিরুদ্ধে নৃশংস হানাহানির সূচনা করেছিলেন মুহাম্মদের মৃত্যুর অব্যবহিত পর থেকেই (পর্ব-৮২), এখনও তা চলছে ও ভবিষ্যতের সেই সময় পর্যন্ত তা চলবে, যতদিন ইসলাম টিকে থাকবে। মুহাম্মদের মৃত্যুর প্রায় ১৪০০ বছর পরে সামগ্রিকভাবে মুহাম্মদ অনুসারীদের অবস্থান আজকের এই বিশ্ব-সমাজে কোথায়, তার আলোচনা "কুরানের ফজিলত (পর্ব-১৫)!" পর্বে করা হয়েছে।

(৪) সামগ্রিকভাবে মুহাম্মদের মতবাদের বলি হলো সমগ্র মানবসমাজ!
>> এক হিসাবে বর্ণিত হয়েছে, গত ১৪০০ বছরে মুহাম্মদের আদর্শ প্রতিষ্ঠার লড়াই জিহাদের বলি হয়েছেন প্রায় ২৩ কোটি অবিশ্বাসী, যার ৮ কোটী শুধু ভারতেই। পৃথিবীর মানুষ আজও তটস্থ!  

মুহাম্মদের মৃত্যুর পর তাঁর রেখে যাওয়া ফাদাক ও খায়বারের সুবিশাল সম্পত্তির তিন শত বছর পর্যন্ত স্বত্বভোগীদের (Beneficiaries) তালিকা: [1] [2] 

(১) আবু বকর ইবনে কুহাফা (শাসনকাল, ৬৩২-৬৩৪ সাল):
>> মুহাম্মদের মৃত্যুর দিনটিতে তিনি মুহাম্মদের ফাদাক, খায়বার ও মদিনার বানু নাদির গোত্রের সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন। কিন্তু তিনি এই সম্পদের উপার্জন থেকে মুহাম্মদের পরিবার ও একান্ত নিকট-আত্মীয়দের এবং তাঁদের মৃত্যুর পর তাঁদের উত্তরাধিকারীদের ভরণ-পোষণের সাহায্য ব্যবস্থা চালু রাখেন।

(২) উমর ইবনে খাত্তাব (শাসনকাল, ৬৩৪-৬৪৪ সাল):
>> তিনি তাঁর প্রথম দুই বছর শাসন শেষে মদিনায় অবস্থিত মুহাম্মদের বানু নাদির গোত্রের সম্পত্তি "শর্ত সাপেক্ষে" মুহাম্মদের পরিবারের কাছে ফেরত দেন। তিনি ফাদাক ও খায়বারে অবস্থিত মুহাম্মদের বিশাল সম্পত্তি আবু বকরের মতই তাঁর অধিকারে রাখেন; এই সম্পদের উপার্জন থেকে আবু বকরের মতই মুহাম্মদের পরিবার ও একান্ত নিকট-আত্মীয়দের ভরণ-পোষণের সাহায্য ব্যবস্থা চালু রাখেন, কিন্তু তাঁদের কোনো একজনের মৃত্যু হলে সেই অর্থ তাঁর উত্তরাধিকারীদের ভরণ-পোষণের সাহায্য বাবদ হস্তান্তর করা বন্ধ করে দেন - যা আবু বকর চালু রেখেছিলেন (পর্ব-১৫১)।

(৩) উসমান ইবনে আফফান (শাসনকাল, ৬৪৪-৬৫৬ সাল):
>> তিনি ফাদাকে অবস্থিত মুহাম্মদের সম্পত্তিটি তার কাজিন মারওয়ান ইবনে আল-হাকাম (৬২৩-৬৮৫ সাল) কে দান করেন। অতঃপর ফাদাক মারওয়ান ও তার বংশধরদের অধিকারে থাকে উমর ইবনে আবদুল আজিজের শাসন আমল (৭১৮ সাল) পর্যন্ত।

** আলী ইবনে আবু তালিব (শাসনকাল, ৬৫৬ -৬৬১ সাল):
উসমান ইবনে আফফানের হত্যার পর এক অস্বাভাবিক পরিবেশে তিনি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন ও ক্ষমতার মসনদে বসার পরই মুসলমানদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় (পর্ব-৮২) তিনি তাঁর পাঁচ বছর ক্ষমতার প্রায় সমস্তই প্রতিপক্ষ মুসলমানদের বিদ্রোহ দমনে এতই ব্যতিব্যস্ত থাকেন যে, ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তিনি ফাদাক ও খায়বারে তাঁর উত্তরাধিকারের সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করার কোনো সুযোগ পাননি, কিংবা স্ব-ইচ্ছায় তিনি এ বিষয়ে মনোনিবেশ করেননি। উত্তরাধিকারের সম্পত্তির হিস্যা থেকে তাঁদেরকে বঞ্চিত করার ব্যাপার 'আবু বকরের সিদ্ধান্তই ছিল সঠিক', তা প্রমাণ করতে সুন্নি মতাবলম্বী পণ্ডিত ও অপণ্ডিতরা যে কু-যুক্তিগুলো সচরাচর ব্যবহার করেন, তার একটি হলো হলো এই, “আলী ইবনে আবু তালিব ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা সত্ত্বেও ফাদাক ও খায়বারের সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করেননি!"

উমাইয়া রাজবংশের শাসন কাল (৬৬১-৭৫০ সাল)

(৪) মুয়াবিয়া ইবনে আবু-সুফিয়ান (শাসনকাল, ৬৬১-৬৮০ সাল):
>> মুয়াবিয়া তাঁর শাসন আমলে মারওয়ান ও অন্যান্যদের সাথে ফাদাকের সম্পত্তির অংশীদার হন। তিনি এর এক-তৃতীয়াংশ প্রদান করেন মারওয়ান-কে, এক-তৃতীয়াংশ আমর ইবনে উসমান ইবনে আফফান-কে ও এক-তৃতীয়াংশ তার ছেলে ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া কে।

(৫) ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়া (শাসনকাল, ৬৮০-৬৮৩ সাল):
>> তিনি তার পিতা মুয়াবিয়ার ঐ ব্যবস্থা চালু রাখেন।

(৬) মারওয়ান ইবনে আল-হাকাম (শাসনকাল, ৬৮৪-৬৮৫ সাল):
>> ক্ষমতায় আসার পর মারওয়ান সম্পূর্ণ ফাদাক নিজের অধিকারে নিয়ে আসেন। অতঃপর তিনি তা প্রদান করেন তার দুই পুত্র আবদুল মালিক ও আবদুল আজিজ-কে। পরবর্তীতে আবদুল আজিজ তার অংশ দান করেন তার পুত্র উমর ইবনে আবদুল আজিজ-কে।

(৭) উমর ইবনে আবদুল আজিজ (শাসনকাল, ৭১৭-৭২০ সাল):
>> তিনি ফাদাক পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেন, "যার মানে হলো - তা যেমনটি ছিল আল্লাহর নবীর সময়কালে (পর্ব-১৫৪)।" আবু বকরের মৃত্যুর পর (৬৩৪ সাল) পর এই প্রথম ফাতিমার বংশধররা আবার ফাদাকের সম্পত্তির উপার্জন থেকে সাহায্য প্রাপ্তি শুরু করেন।

(৮) ইয়াযিদ ইবনে আবদুল মালিক (শাসনকাল, ৭২০-৭২৪ সাল):
>> তিনি উমর ইবনে আবদুল আজিজের ব্যবস্থাটি রহিত করে ফাদাক পুনরায় বাজেয়াপ্ত করেন। ফাদাক আগের মতই আবার বানু মারওয়ানের অধিকারে আসে। তারপর তা আব্বাসীয় রাজবংশ (মুহাম্মদের চাচা আল-আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিবের বংশধর)  শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত (৭৫০ সাল) একের পর এক বিভিন্ন উমাইয়া শাসকের অধিকারে থাকে।

আব্বাসীয় রাজবংশের শাসনকাল  (৭৫০-১২৫৮ সাল)

(৯) আবুল আব্বাস আস-সাফফাহ  (শাসনকাল, ৭৫০-৭৫৪  সাল):
>> আব্বাসীয় রাজবংশের প্রথম শাসনকর্তা। তিনি ফাদাক হস্তান্তর করেন ফাতিমার বংশধর আবদুল্লাহ ইবনে আল-হাসান ইবনে আল-হাসান ইবনে আলী ইবনে আবু তালিবের কাছে।

(১০) আবু জাফর আবদুল্লাহ আল-মানসুর (শাসনকাল, ৭৫৪-৭৭৫ সাল):
>> তিনি ফাতিমার বংশধরের কাছ থেকে ফাদাক বাজেয়াপ্ত করে তার নিজের অধিকারে নিয়ে আসেন।

(১১) মুহাম্মদ আল-মাহদি ইবনে আল-মানসুর (শাসনকাল, ৭৭৫-৭৮৫সাল):
>> তিনি ফাদাক ফাতিমার বংশধরদের হাতে হস্তান্তর করেন। 

(১২) মুসা আল হাদি ইবনে আল-মাহদি (শাসনকাল, ৭৮৫-৭৮৬ সাল) ও তার ভাই হারুন আর-রশিদ (শাসনকাল, ৭৮৬ -৮০৯ সাল):

>> এই দুই শাসনকর্তা ফাতিমার বংশধরদের কাছ থেকে পুনরায় ফাদাক বাজেয়াপ্ত করে নিজেদের অধিকারে নিয়ে আসেন। অতঃপর তা আল মামুন আল-আব্বাসীর শাসন আমলের শুরু (৮১৩ সাল) পর্যন্ত তাদের উত্তরসূরি আব্বাসীয় শাসনকর্তাদের অধিকারে থাকে।

(১৩) আল মামুন আল-আব্বাসী (শাসনকাল, ৮১৩-৮৩৩ সাল):
>> তিনি ফাদাক ফাতিমার বংশধরদের কাছে হস্তান্তর করেন। অতঃপর তা আল মুতাসিম (শাসনকাল, ৮৩৩ -৮৪২ সাল) ও আল ওয়াতিখ (শাসনকাল, ৮৪২-৮৪৭ সাল) এর শাসনকাল পর্যন্ত তাদের অধিকারেই থাকে।

(১৪) জাফর আল-মুতাওয়াককিল (শাসনকাল, ৮৪৭-৮৬১ সাল):
>> তিনি ফাতিমার বংশধরদের কাছে থেকে ফাদাক বাজেয়াপ্ত করে তা তার নিজের অধিকারে নিয়ে আসেন।

(১৫) আল মুনতাসির ইবনে আল-মুতাওয়াককিল (শাসনকাল, ৮৬১ ৮৬২ সাল):
>> আল-মুতাওয়াককিল-কে হত্যা করা হয়, ক্ষমতায় আসেন তার পুত্র আল মুনতাসির। তিনি ফাদাক হস্তান্তর করেন ফাতিমার বংশধরদের কাছে।

অতঃপর, ফাদাক আবারও ফাতিমার বংশধরদের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। বর্ণিত আছে, আল মুতাদিদ (শাসনকাল, ৮৯২-৯০২ সাল) ফাদাক ফাতিমার বংশধরদের কাছে হস্তান্তর করেন, আল মুকতাফি (শাসনকাল, ৯০২-৯০৮ সাল) তা বাজেয়াপ্ত করেন ও আল মুকতাদির (শাসনকাল, ৯০৮-৯৩২ সাল) আবার তা ফাতিমার বংশধরদের কাছে হস্তান্তর করেন। এর পর 'ফাদাকের' ভাগ্যে কী ঘটেছিল, তা স্পষ্ট নয়।

>>> মুহাম্মদের মৃত্যুর পর তাঁর মালিকানাধীন সুবিশাল সম্পদগুলোর স্বত্বভোগীদের এই হলো সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। মুহাম্মদের মৃত্যুর ঐ দিনটিতেই আবু বকর ইবনে কুহাফা নবী কন্যা ফাতিমা ও তাঁর একান্ত পরিবার সদস্যদের ন্যায্য উত্তরাধিকারের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার যে-ইতিহাসের সূচনা করেছিলেন, তা অব্যাহত ছিলো শতাব্দীর পর শতাব্দী। মাঝে মধ্যে অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া মুহাম্মদের উত্তরসূরি সমস্ত শাসকগোষ্ঠী আবু বকরের দেখানো পথই অনুসরণ করেছিলেন, বঞ্চিত করেছিলেন নবী পরিবারের সদস্যদের।

[কুরানের উদ্ধৃতি সৌদি আরবের বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ (হারাম শরীফের খাদেম) কর্তৃক বিতরণকৃত বাংলা তরজমা  থেকে নেয়া, অনুবাদে ত্রুটি-বিচ্যুতির দায় অনুবাদকারীর।  কুরানের ছয়জন বিশিষ্ট ইংরেজি অনুবাদকারীর ও চৌত্রিশ-টি বিভিন্ন ভাষায় পাশাপাশি অনুবাদ এখানে]

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা: 

[1] কৃতজ্ঞতা - ইন্টারনেট আর্টিক্যাল:

[2] “THE ORIGINS OF THE ISLAMIC STATE” - a Translation from the Arabic accompanied with annotations geographic and historic notes of the "KITAB FUTUH AL-BULDAN" of Al-Imam Abul Abbas Ahmad Ibn Jabir al-Balahduri - By Philip Khuri Hitti, PhD: Volume 1; New York, Columbia University; Longmans, Green & Co, Agents; London: P. S. King A Son, Ltd.; I916, Page 53-56