৩১ জানু, ২০১৭

চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়ার রহস্য উন্মোচন!

লিখেছেন নরসুন্দর মানুষ

মাথা ঠাণ্ডা করে বসুন: আজ প্রমাণ করার চেষ্টা করবো, মুহাম্মদ কীভাবে ও কবে চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত করেছিলেন! এটি একটি নিরস পোষ্ট, তাই মাথা ঠাণ্ডা থাকা জরুরী!

সূরা আল কামার (৫৪) (চন্দ্র); ১ থেকে ২ আয়াত;

১. সময় নিকটবর্তী এবং চন্দ্র অর্ধেক হয়েছে,
২. আর তারা কোনো নিদর্শন দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলেঃ এটাতো প্রচলিত যাদু।

একটু খটকা লাগলো কি? কিয়ামত আর চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়ার কথা আমার করা অনুবাদে পাওয়া যাচ্ছে না; তাই তো! সংযুক্ত থাকা ছবির অনুবাদের মতই হবে আপনার এতদিন ধরে পড়ে আসা অনুবাদ, তবে আজ এটা জেনে নিন, তা একটি ভুল অনুবাদ!

 

এবার নিচের সংযুক্ত ছবিতে ১নং আয়াতের বাংলায় লেখা আরবি উচ্চারণ দেখুন; কিয়ামত শব্দটি খুঁজে পেলেন কি? যদি আরবিতে না থাকে, তবে অনুবাদে কিয়ামত আসে কোন কিয়ামত থেকে?

 

উল্লিখিত আয়াতে আরবি ‘কিয়ামত’ শব্দটির অস্তিত্ব নেই, আরবি ‘ছাআত’ শব্দের অনুবাদে আরবি কিয়ামতের ব্যবহার কি ঠিক? সেই সাথে আয়াতটির মূল শব্দ ‘শাক্কা’র বর্তমান/ভবিষ্যৎ আকার ‘নুশাক্কা’র অনুবাদ করা হয়েছে ‘দ্বিখণ্ডিত হয়েছে’মূলত: ‘শাক্কা’ শব্দটির অর্থ: দু’ভাগ/ দ্বিখণ্ডিত, বিদীর্ণই নয়, বরং ফিরানো, ফিরিয়ে রাখা, অতিক্রম করা, পার হওয়া, যাওয়া-ভ্রমণ বা আবিষ্কার, ভেদ করা, অর্ধেক, আংশিক, প্রভাতের আলো, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়া, বিজলী চমকানোসহ প্রায় ৫০টি। (সুত্র: আরবি-ইংলিশ ডিকশনারি, জে এম. কাউয়ান; আধুনিক আরবি-বাংলা অভিধান; মদিনা পাব্লিকেশন)।

কোনো কোনো তাফসিরে ভবিষ্যৎ অর্থে কেয়ামতের পূর্ব লক্ষণ হিসাবে ‘চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হবে’ বলেও অর্থ করা হয়েছে। [সুত্র: বোখারী, ৫ম খণ্ড. ৫ম সংস্করণ, আজিজুল হক, ফুটনোট, পৃষ্ঠা: ৩৩৯]

বোঝা যায়, বিষয়টি নিয়ে মুসলমানদের মধ্যেই অমীমাংসিত মতভেদ রয়েছে। পূর্বেই বলা হয়েছে, অনুবাদে ব্যবহৃত আরবি শব্দ ‘কিয়ামত’ নেই, আছে ‘ছাআত’, যার অর্থ: সময়, ঘন্টা, ঘড়ি, যুগ। [সুত্র: কোরানের অভিধান; আল কোরান একাডেমী, লন্ডন; আধুনিক আরবি-বাংলা অভিধান; মদিনা পাবলিকেশন]

আমার করা অনুবাদে কিয়ামত-এর বদলে সময় এবং দ্বিখণ্ডিত-এর বদলে অর্ধেক কেন নিয়েছি, তা এই পর্বে পরিষ্কার হয়ে যাবে নিশ্চয়!


মুহাম্মদের মৃত্যুর ৪০০ বছর পরে আবু নাঈম আহমদ ইবনে আবদুল্লাহ ইস্কাহানী (৪৩১ হি.) তার সংকলিত ‘দালায়েলুন নবুওয়াতি’হাদীস গ্রন্থে:

আতা ও জেহাক নামক দুইজনের সূত্রে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর একটি হাদিসের বর্ণনা করছেন - তিনজন কাফের নেতা ছাড়াও আছ ইবনে হিশাম, আসওয়াদ ইবনে মোত্তালেব এবং নজর ইবনে হারেস নবী মুহাম্মদের নিকট উপস্থিত হয়ে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত করার দাবি জানিয়েছিল। এই বর্ণনায় তারা স্পষ্ট দাবি জানিয়েছিল; কাফেররা বলল, আপনি যদি সত্যবাদী হন, তা হলে চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করে আমাদেরকে দেখান, যার অর্ধেক আবু কোবাইস/কুবাইস পর্বতে এবং অর্ধেক কাইকুআন পর্বতে পতিত হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, আমি যদি তা করে দিই, তাহলে তোমরা ঈমান আনবে কি? তারা বলল, হাঁ। বর্ণনাকারী বলেন, রাতটি ছিল পূর্ণিমার। রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেন, তারা (কাফেররা) যা চায়, তা যেন আল্লাহ তাকে দান করেন। অতঃপর চাঁদ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, অর্ধেক আবু কোবাইস/কুবাইস পর্বতে পতিত হয় এবং অর্ধেক কাইকুআন পর্বতে পতিত হয়”।

 
(পূর্ণাকারে দেখতে ছবির ওপরে ক্লিক করতে হবে)

সংযুক্ত ছবিটির ঠিক মাঝ বরারর ক্রেনের নিচে যে ভবনটি দেখছেন, তা মক্কার সাফা পর্বতের পাশে অবস্থিত কোবাইস/কুবাইস পর্বত-এর ওপরের বর্তমান নির্মান; আবু নাঈম আহমদ ইবনে আবদুল্লাহ ইস্কাহানীর হাদিস অনুসারে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়ে একটি অংশ এই পর্বতের চূঁড়ায় পতিত হয়! পাঠক নোট করে রাখুন বিষয়টি।

কেউ কেউ তো দাবি করেছেন যে, ভারতের মালাবার শহরেও নাকি চাঁদের দ্বিখণ্ডিত হওয়া দেখা গিয়েছিলো, যা আবার ইবনে কাসিরের ‘আল-বেদায়াহ ওয়ান নেহায়া’ নামক ইতিহাস গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে। [সুত্র: বোখারী, ৫ম খণ্ড. ৫ম সংস্করণ; আজিজুল হক; পৃষ্ঠা: ৩৪২]

আসুন, এবার একটু তাফসির থেকে ঘুরে আসি, তাফসির ইবনে আব্বাস দেখি প্রথমে (আবদুল্লা ইবনে আব্বাস, নামটি মনে রাখুন)

[54:1] And from his narration on the authority of Ibn 'Abbas that he said in the interpretation of Allah's saying (The hour drew nigh): '(The hour drew nigh) He says: the coming of the Hour drew nigh by the advent of Muhammad (pbuh) and the coming down of the smock (and the moon was rent in twain) this is also another sign of the closeness of the Day of Judgement. (‘Tanwīr al-Miqbās min Tafsīr Ibn 'Abbās’ Page-627: 2007 Royal Aal al-Bayt Institute for Islamic Thought Amman, Jordan)

এই তাফসিরে চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়াকে কিয়ামত আসন্ন হবার লক্ষণ হিসেবে বোঝানো হয়েছে। ইবনে কাসির তার তাফসির গ্রন্থে এই সুরার ব্যাখ্যার একদম শুরুতেও বলেছেন চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়াকে কিয়ামত আসন্ন হিসেবে বোঝানো হয়েছে। [সুত্র: ইবনে কাসিরের তাফসির, সুরা কামার, খন্ড-১৭, পৃষ্ঠা-১৭৯]। এছাড়া হাফেয ইবনে রজব বলেন, ‘‘আল্লাহ তাআলা চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়াকে কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার অন্যতম আলামত হিসাবে নির্ধারণ করেছেন।

তার মানে বোঝা গেলো, চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়া সমসাময়িক বিষয় নয়, কিয়ামতের লক্ষণ হিসেব চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হবে। সত্যিই কি তাই? আসুন, হাদিস খুঁজে দেখি কী পাওয়া যায়!

সহিহ বুখারী: খন্ড ৫: অধ্যায় ৫৮: হাদিস ২০৯

আবদুল্লাহ (ইবনে মাসউদ) (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়, তখন আমরা নবী করীম (সা) এর সঙ্গে মিনায় অবস্থান করছিলাম। তিনি আমাদিগকে বললেন, তোমরা সাক্ষী থাক। তখন আমরা দেখলাম, চাঁদের একটি খণ্ড হেরা পর্বতের দিকে চলে গেল। আবূ যুহা মাসরূকের বরাত দিয়ে আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয় মক্কা শরীফে।

আবদুল্লাহ (ইবনে মাসউদ) বর্ণিত হাদিস অনুসারে সত্যি সত্যি চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়েছে এবং সে সময় তিনি মুহাম্মদের সাথে মিনায় ছিলেন! পাঠক, নোট করে রাখুন।

মিনা, মক্কা থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দুরের একটি স্থান! নিচের ছবিটি দেখুন; এতে ১৩ নং স্থানটি মিনা, এবং ৫নং স্থানটি সাফা পর্বতের পাশে অবস্থিত কোবাইস/কুবাইস পর্বত-এর অঞ্চল! ওপরের ছবিতে থাকা নির্মানটি কেবল বর্তমানের।

 
(পূর্ণাকারে দেখতে ছবির ওপরে ক্লিক করতে হবে) 

চলুন আরও তিনটি হাদিস দেখি, বলে রাখা দরকার, প্রতিটি হাদিসের মান সহিহ্:

সহিহ মুসলিম: বই ৩৯: হাদিস ৬৭২৫:
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মিনায় আমরা রাসুলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে ছিলাম। এমতাবস্থায় হঠাৎ করে চন্দ্র বিদীর্ণ হয়ে দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। এক খণ্ড পাহাড়ের এ পাশে পড়ল এবং অপর খণ্ড পড়ল পাহাড়ের ওপাশে। তখন রাসুলুল্লাহ (সা) বললেন: তোমরা সাক্ষী থাক

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) অধ্যায়: ৫৩ হাদিস নম্বর: ৬৮১৮
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কাবাসী লোকেরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট তাদের একটি নিদর্শন (মু'জিযা) দেখানোর দাবি করল। তিনি তাদের চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়ার নিদর্শন দেখালেন।

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) অধ্যায়: ৫৩ হাদিস নম্বর: ৬৮২০
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময় চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল।

লক্ষ্য করবেন:
হাদিস বর্ণনায় ৩ জনের নাম ঘুরে-ফিরে আসে; তার মধ্যে একজন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসুদ প্রত্যক্ষদর্শী এবং তার বর্ণনায় ঘটনাটি ঘটেছে হঠাৎ করে; মানে বিষয়টি পরিকল্পিত নয় বা কুরাইশদের দাবির কারণে নয়, ২য় জন আনাস, যিনি ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন না, শুনেছেন মাত্র; ৩য় জন আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, যিনি ঘটনার পরে জন্ম নেন। [সুত্র: বোখারী, ৫ম খণ্ড. ৫ম সংস্করণ; আজিজুল হক; পৃষ্ঠা: ৩৪০]

হাদিসের আলোচনা প্রমাণ করে, মক্কা থেকে ৫ কিলোমিটার দুরের স্থান মিনায় চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়, আবদুল্লা ইবনে মাসুদ তার প্রত্যক্ষদর্শী, আর ঘটনাটি ঘটেছে হঠাৎ করে; আনাস শুনেছেন এবং ঘটনার পরে জন্মগ্রহন করা আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের মতে খণ্ডিত চাঁদের অর্ধেক অংশ সাফা পর্বতের পাশে অবস্থিত কোবাইস/কুবাইস পর্বত-এ পতিত হয়! পাঠক, যুক্তির দরকার নেই, আপাতত পুরোটাই মেনে নিই!

এখন দ্বিতীয় প্রশ্ন, ঠিক কবে ঘটেছিলো এই ঘটনা?

মুমিন মুসলমানগন বলেন, এই ঘটনা ঘটে নবুয়্যতের ৫ম, ৮ম অথবা ৯ম বর্ষে! এতে আবারও বোঝা যায় এবিষয়টি নিয়েও মুসলমানদের মধ্যে অমীমাংসিত মতভেদ রয়েছে। চলুন একটি সহিহ্ হাদিস দেখি:

 

নবী-পত্নী আয়েশার বর্ণনা অনুসারে, সূরা কামারের ৪৬ নং আয়াত যখন অবতীর্ণ হয়, তখন তিনি কিশোরী এবং মক্কায় ছিলেন! আয়েশা ৮ বছর কয়েক মাস বয়সে মদিনাতে আসেন, এবং মদিনা আসার ৭/৮ মাস পর ৯ বছর বয়েসে মুহাম্মদের সাথে তার দৈহিক মিলন হয়! আমার গবেষণা অনুসারে, সূরা কামারের ৪৬ নং আয়াত যখন অবতীর্ণ হয়, তখন আয়েশার বয়স খুব বেশি হলে সাড়ে তিন বছর; এবং সূরা কামার অবতীর্ণ হয় মুহাম্মদ এবং হাশিম গোত্রের বয়কটের সময়কালীন নবুয়্যতের ৭ম বর্ষে! মুমিনদের মতে, নবুয়্যতের ৫ম বর্ষে ঘটনাটি ঘটলে আয়েশা তো তখন শিশু, কারণ তার জন্ম হয় নবুয়্যতের ৪র্থ বর্ষে। [সুত্র: সিরাতে আয়েশা, জুন ২০১৫ সংস্করণ; সাইয়্যেদ সুলাইমান নদভী; রাহনুমা প্রকাশনী, ঢাকা; পৃষ্ঠা: ৩৯-৪২] আর ৮ম/৯ম বর্ষে এঘটনা ঘটার বিষয়টি আমার কাছে প্রমাণিত হয়নি। কেন, তার তালিকা আমি অবশ্যই দিয়ে দেবো। পাঠক; ৭ম বর্ষের বিষয়টি কীভাবে এতটা নিশ্চিত হয়ে বলছি, একটু পরে উত্তর মিলবে! 

এতক্ষণের আলোচনা এটা প্রমাণ করে, চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হবার ঘটনাটি কেবল গল্প বা মিথ নয়; এর পেছনে কিছু না কিছু সত্যতা আছে। প্রশ্ন হচ্ছে: সত্যটা কী? আমি, নরসুন্দর মানুষ, কয়েক বছর সময় কাটিয়েছি মুহাম্মদের নামে বর্ণনা হওয়া অলৌকিক ঘটনাগুলোকে লৌকিকভাবে ব্যাখ্যা করতে; আর এই চেষ্টার কারণে ইতোমধ্যেই মুহাম্মদের ৮০ শতাংশ মুজেজা গল্পের লৌকিক ব্যাখ্যা করতে পারি, আজকের পর্ব তার প্রমাণ দেবার চেষ্টা মাত্র!

চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ব্যাখ্যা করতে আমাকে সাহায্য করেছে ইহুদি-নাসারাদের নাসা (NASA: National Aeronautics and Space Administration. USA); আমি ৬১০ থেকে ৬৩২ সাল পর্যন্ত মক্কার আকাশের প্রতিটি মাসের চাঁদের পূর্ণিমার হিসেব নিয়েছি; সাথে নিয়েছি চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণের তালিকা; নাসার কাছে বিগত এবং আগামী মিলিয়ে ৫০০০ বছরের চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণের তালিকা আছে। বলে রাখা ভালো, মহাকাশবিজ্ঞান অবলম্বনে চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণের সঠিক সময়ের হিসেব ঘড়ি ধরে বের করা যায়!

চলুন, কী পেলাম দেখে আসি:

 
[সুত্র: www.timeanddate.com]

৬১৭ সালের অক্টোবর মাসের সৌদি আরবের ক্যালেন্ডারটি দেখুন, নিচের লাইনে চাঁদের পর্যায়কালের হিসেব আছে; দেখুন, ২০ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ছিলো পূর্ণিমা! হাদিসে বর্ণনা করা পূর্ণিমা খুঁজে পাওয়া গেলো কি? এবার দেখি, নাসা কী বলে আমাদের!

 
[সুত্র: https://eclipse.gsfc.nasa.gov/lunar.html]

৬১৭ সালের অক্টোবর মাসের ২০ তারিখ বৃহস্পতিবার ছিলো পূর্ণিমা এবং সেদিন ছিলো চন্দ্রগ্রহণ! যা মক্কা থেকে রাতের বেলা দর্শনযোগ্য ছিলো! ছবিতে ঘড়ির সময় আর আলো-ছায়ার প্রতিটি অংশ ধরে ধরে ব্যাখ্যা করা সম্ভব, তবে তা কেবল বিরক্তিই জাগাবে! তবে আপনার গবেষণার জন্য চন্দ্রগ্রহণের ব্যাখ্যাযুক্ত একটি ছবি দিয়ে দিচ্ছি; হাতে সময় থাকলে, মাথা ঘামানোর রসদ এটি!

 
[সুত্র: https://eclipse.gsfc.nasa.gov/lunar.html]

এ ঘটনা কেন নবুয়্যতের ৮ম/৯ম বর্ষে নয়, তার গবেষণার জন্য ৬১০ থেকে ৬২০ সাল পর্যন্ত পৃথিবীতে দর্শনযোগ্য চন্দ্রগ্রহণের তালিকা নিচে দিয়ে দিলাম; আগ্রহ থাকলে আরও কিছুটা সময় অবশ্যই দিতে পারেন!

 
[সুত্র: https://eclipse.gsfc.nasa.gov/lunar.html]

হয়ত আপনার কাছে পরিষ্কার হচ্ছে সবকিছুই; তবে সত্যিকারের ঘটনাটি গল্পাকারে বলবো পোষ্টের শেষে আয়াত প্রকাশের মনোজগত অংশে! এবার দ্বিখণ্ডিত চাঁদ পাহাড়ের উপরে পতিত হবার গল্পটির ব্যবচ্ছেদ করা যাক:

চলুন চাদেঁর আকার আকৃতির সাথে পৃথিবীর আকার-আকৃতির তুলনা করি -

চাদেঁর ব্যাসার্ধ: ১৭৩৭ কিলোমিটার, পরিধি: ১০,৯২১ কিলোমিটার, পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রের পরিমাণ: ৩,৭৯,৩০,০০০ বর্গকিলোমিটার। [সূত্র: https://en.wikipedia.org/wiki/Moon]

পৃথিবীর ব্যাসার্ধ: ৬৩৭১ কিলোমিটার, পরিধি: ৪০,০৭৫ কিলোমিটার, পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রের পরিমাণ: ৫১,০০,৭২,০০০ বর্গকিলোমিটার। [সূত্র: https://en.wikipedia.org/wiki/Earth]

সুতরাং পৃষ্ঠতলের হিসাবে পৃথিবীর পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল হলো ১৩.৫১ টা চাঁদের পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রেফলের সমান। এখন চাঁদ যদি সমানভাবে দ্বিখণ্ডিত হয়, তাহলে তার অর্ধ পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফলের আকার হবে ৩,৭৯,৩০,০০০ ভাগ ২ = ১,৮৯,৬৫,০০০ বর্গকিলোমিটার। সুতরাং এই খণ্ডটি পৃথিবীর কোনো অংশের উপর পড়লে সেটা ১ কোটি বর্গকিলোমিটারের বেশী জায়গা জুড়ে অবস্থান করবে। মিনা থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরের একটি পুঁচকে পাহাড়ের উপর চাঁদ পতিত হবার গল্প সত্যিই হাস্যকর; চাঁদ তো নয়, যেনো মিনিপ্যাক শ্যাম্পু, কেটে মাথায় মাখিয়ে গোসল সেরে নেওয়া!

এই ঘটনা যদি বাস্তব হতো, তাহলে সমগ্র আরব অঞ্চল তো বটেই, আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপ মহাদেশের ওপর এই খণ্ডটি পতিত হতো, এবং কোটি কোটি কোটি মানুষ মরা যেতো তাতে, সেইসাথে ইতিহাসে তার উল্লেখ থাকতো। বলতে গেলে, পৃথিবীর প্রাণীকূল ধ্বংস হয়ে যেতো এই ঘটনায়! কিন্তু মুহাম্মদের কিছু সাহাবী ছাড়া আর কেউই এই ঘটনা বর্ণনা করেনি? তার মানে এটা প্রমাণিত, বিষয়টি বর্ণনাকারীর দৃষ্টিবিভ্রম। কিন্তু এর পেছনেও যৌক্তিক কারণ আছে!

অনেক পেঁচিয়েছি: এবার মূল গল্পে যাই!

মূল গল্প: কুরাইশরা মুহাম্মদ এবং হাশিম গোত্রকে বয়কট করেছেন, কাবা আর মক্কায় স্বাভাবিক চলাফেরা এখন সহজ নয় তাদের জন্য। মক্কার অদুরে শিয়াবে আবু তালিব আপাতত মিলনস্থল তাদের। মুহাম্মদ এবং সাহাবীদের জন্য চরম অপমানকর সময় এখন! কিছু একটা সমাধান তো দরকার এসবের!

একদিন রাতের খাঁ-খাঁ করা পূর্ণিমায় মুহাম্মদ কিছু নবীন সাহাবীকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শিয়াবে আবু তালিব থেকে মিনায় পৌঁছুলেন; চারপাশ শুনশান, মাঝে মাঝে মরুভূমিতে বয়ে চলা বাতাসের শব্ধ শোনা যায় কেবল। চাঁদের আলো ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না, মক্কার জনগন ঘুমিয়ে পড়েছেন; যে কজন জেগে আছেন, মদ আর পতিতালয়ে নারী শরীর নিয়ে তারা মগ্ন!

মুহাম্মদ তার সাহাবীদের সামনে রেখে একটু উঁচুতে বসলেন; সাহাবীদের মধ্যে একজন কাঠকয়লায় বয়ে নিয়ে আসা আগুনে জ্বালালেন মশাল; মাটিতে পুঁতে রেখে এই বিশ্ব-সংসার সৃষ্টিকারীর প্রেরীত নবীর মুখের বাণী শুনতে শুরু করলেন সবাই! সকলেই মন্ত্রমুগ্ধ তার কথায়! চারপাশে না তাকিয়ে মুহাম্মদের মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে লক্ষ্য করে শুনছেন; হঠাৎ মুহাম্মদের মনে হলো, আশেপাশের আলো কিছুটা কমে গেলো! একটু আগেও যেমন উজ্জল আলো ছিলো, তার চেয়ে অনেকটাই কম! মুহাম্মদ আকাশের দিকে তাকালেন; অবাক হয়ে খেয়াল করলেন, একটু আগের দেখা পূর্ণিমার গোল চাঁদটি এখন অর্ধেক/আংশিক! বিদ্যুৎ চমকের মত মাথায় একটি লাইন জমা হলো স্বভাব-কবির, নিজের আঙুল চাঁদের দিকে নির্দেশ করে সাহাবীদের বললেন: দেখো! তোমরা সাক্ষী থাকো, সময় নিকটবর্তী এবং চন্দ্র অর্ধেক হয়েছে!

সাহাবীরা অবাক বিস্ময়ে দেখতে থাকলেন, কীভাবে এটা করলেন তাদের নবী! অনেকক্ষণ চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইলেন সবাই; পৃথিবী আর চাঁদের স্বাভাবিক গতির কারণে, অর্ধেক/আংশিক চাঁদ তার জায়গা পরিবর্তন করলো দ্রুতই, সাহাবীদের মনে হলো, চাঁদের এই অর্ধেক অংশটি মিনা থেকে সরে গিয়ে মক্কার পাহাড়ের নিচে হারিয়ে গেলো!

আল্লার কাছ শুকরিয়া আদায় করলেন সবাই, যখন তারা মক্কায় ফিরলেন, অনেককেই বললেন এই ঘটনার কথা। কেউ কেউ বললো: হ্যাঁ দেখেছি, তবে আমাদের দেখা চাঁদের অর্ধেক অংশটি কাইকুআন পর্বতে পতিত হয়েছে। প্রতিটি বর্ণনাকারী তার দেখার জায়গা থেকে চাঁদকে দূরে সরে যেতে দেখেছে, তাই সকলের কথাই আপেক্ষিক সত্য!

মুহাম্মদের সাহাবীরা এটাকে মুহাম্মদের মুজেজা হিসেবে মেনে নিলেন, এবং প্রচার করতে লাগলেন। খবর পৌঁছালো কুরাইশদের কাছে; কুরাইশরা আশেপাশের জনবসতি ও তায়েফে খোঁজ নিলেন, দু'-একজন করে প্রত্যক্ষদর্শীও পাওয়া গেলো সব জায়গাতেই, সত্যি সত্যি অনেকেই সেদিন রাতে অর্ধেক/আংশিক চাঁদ দেখেছে!

এই একবিংশ শতকে এসে না দেখেও যখন কোটি কোটি মানুষ বিশ্বাস করে, চাঁদে সাঈদীকে দেখা গেছে, সেখানে ৬১৭ সালের ২০ অক্টোবর ঘটে যাওয়া একটি চন্দ্রগ্রহণের ঘটনা চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার গল্পে পরিণত হতে সময় লাগলো না! মুহাম্মদের নবুয়্যতে অবিশ্বাসী কুরাইশরা এটা এক ধরনের প্রচলিত যাদু বলে মত দিলেন, কারণ এর আগেও তারা চন্দ্রগ্রহণ দেখেছেন।

কালপ্রবাহের সাথে সাথে গল্পের গরু গাছ থেকে চাঁদে উঠে সাঈদীর অপেক্ষা করতে লাগলো! অর্ধেক/আংশিক হয়ে গেলো দ্বিখণ্ডিত, (যেমন: এখন আমরা সন্দেশ বলতে একধরনের মিষ্টি খাবার বুঝি, অথচ একশ বছর আগে সন্দেশ মানে ছিলো বার্তা/সংবাদ!); ‘শাক্কা’ শব্দের মানে বদলে গেলো সময়ের সাথে সাথে, আর আমরা পেলাম মুহাম্মদের সবচেয়ে বড় মুজেজার নামে তিল থেকে তাল হয়ে যাওয়া একটি গল্প! 

তবে একথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, এই গল্পটি একেবারে শূন্য থেকে জন্ম নেয়নি! অলৌকিক বর্ণনাটি একটি লৌকিক ঘটনার অতিরঞ্জন মাত্র। মুহাম্মদ বরাবরের মত ক্রেডিট নিয়ে পূর্ণাঙ্গ সূরা কামার নিয়ে এলেন; যার প্রথম দুটি লাইনের সঠিক অনুবাদ হলো:

১. সময় নিকটবর্তী এবং চন্দ্র অর্ধেক/আংশিক হয়েছে,
২. আর তারা কোনো নিদর্শন দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে: এটাতো প্রচলিত যাদু।

প্রমাণিত! 

(এই পর্বটি আবুল কাশেম, গোলাপ মাহমুদ ও ধর্মপচারক-এর জন্য উৎসর্গকৃত!)