৬ জানু, ২০১৭

সাইমুম (উপন্যাস: পর্ব ২৩)

লিখেছেন উজান কৌরাগ


কল্যাণপুর থেকে বাসের টিকেট কিনে আবির আর আমি সন্ধ্যার পর পরই মিরপুর ২ নম্বরে চ’লে এলাম। আবির বাড়িতে গিয়েছিল, আজই এলো; কচুক্ষেতে নিত্রাদির বাসায় যাবে, থাকবে চান রাতের আগের রাত পর্যন্ত। চান রাতের আগের রাতে আমরা যাব বান্দরবান; আমি, আবির, পরাগদা, শাশ্বতীদি আর আফজাল ভাই। আবিরের গার্লফ্রেন্ড প্রিয়তিও যেতে চেয়েছিল, কিন্তু পারিবারিক প্রয়োজনে ও শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে। কয়েক বছর যাবৎ আমি ঈদের সময় ঢাকায় থাকি না; বান্দরবান, সিলেট, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি কোথাও না কোথাও ঘুরতে যাই। ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করার পর দুটো ঈদ আমি বাড়িতে ছিলাম, সেই অভিজ্ঞতা সুখের নয়। ঈদের নামাজ পড়ার জন্য জোরাজুরি করেছিল বাসার সবাই, কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম। আমার পাঁচ-ছয় বছর বয়সের পর সেই প্রথম বাবা আমাকে ছাড়া ঈদের নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন গম্ভীরমুখে। মা ব্যথিত মুখে রান্নাবান্না করলেন। দাদী একবার মাকে শুনিয়ে বললেন, ‘হের লাইগাই পোলাপান বেশি নিতে অয়, পাঁচ-ছয়ডা থাকলে একটা-দুইডা গোল্লায় গেলে তার কপাল নিয়া যাউগ্গা! পোলা বেশি থাকলে কি আর একটার দিকে চাইয়া থাহন লাগে!’ 

ঈদের দিন আমি পাঞ্জাবি-পাজামা পরলাম না, নামাজও পড়লাম না। খাবার সময় হলে আমাকে খেতে ডাকলো, সবার সাথে বসে খেলাম; কিন্তু সুরটা যেন কাটা, বাড়িতে কোনো নতুন অতিথি এলে যেমন গুটিয়ে থাকে, আমিও যেন তেমনি। দুপুরের পর থেকেই বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন আসতে শুরু করলো, তাদের সঙ্গে আামি কথা বললাম, কিন্তু ইতিমধ্যে তারা আমার নাস্তিকতা সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়ায়, তাদের কথায়-আচরণে আগের সেই আন্তরিকতার ঘাটতি লক্ষ্য করলাম, আবার এমনও হতে পারে বাসার পরিস্থিতি আমার প্রতিকূলে থাকায় আমার এমন মনে হয়েছিল; তবে কেউ কেউ আমাকে জ্ঞানদানপূর্বক সুপথে ফেরার পরামর্শ দিয়েছিল। আমার মনে হয়েছিল, আমি যেন মলিন পোশাক পরিহিত এক ভিখারি, অযাচিতভাবে ঢুকে পড়েছি সকলের অভিজাত আনন্দযজ্ঞে! মনে হলো, এ বাড়ির মানুষ আর এদের আত্মীয়-স্বজনকে আমি চিনি না, দেখিনি কোনোদিন। সেই প্রথম আমি গভীরভাবে উপলব্ধি করলাম যে, আমি ভুল বাড়িতে জন্মেছি, আমার তো এ বাড়িতে জন্মানোর কথা নয়! আর তার পর থেকে যখনই বাড়ির সবাই আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার ক’রে, তখনই এক অদ্ভুত অনুভূতি হয় আমার। ঘরের ভেতর একা বসে থাকলে গা ছমছমে ভাব হয়। চারপাশে বিদ্যমান সবকিছুর অস্তিত্ব ভুলে আমি যেন এক নতুন জনপদে পৌঁছে যাই আর খুঁজতে থাকি আমার মা-বাবা, স্বজনদের। মনে হয়, এই নতুন জনপদেই আছে আমার মা-বাবা আর স্বজনরা, যারা আমারই মতো ধর্ম আর সৃষ্টিকর্তায় অবিশ্বাসী, যারা শান্ত-সৌম্য; কখনো মতের অমিল হ’লে বা তুচ্ছ কারণে রেগে যায় না, চিৎকার ক’রে কথা বলে না। আমি খুঁজতে থাকি, খুঁজতেই থাকি তাদেরকে। 

বাড়ির অস্বস্তিকর দমবন্ধ পরিবেশ থেকে রেহাই পেতে বিকেলে বাসা থেকে বেরিয়েছিলাম একটা শার্ট গায়ে চড়িয়ে, কোনো বন্ধু-বান্ধব নেই। যাদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া যায়, তারা সবাই ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে গেছে। আমি রাস্তায় রাস্তায় একাই ঘুরলাম আর ঈদ উদযাপনকারীদের দেখতে লাগলাম। অধিকাংশ মানুষের কাছে ঈদের আনন্দ মানে বাসা থেকে ভরপেটে খেয়ে পার্কে আর রাস্তার ফুটপাতে ব’সে আড্ডা দেওয়া। যদিও মুহাম্মদ রাস্তায় বসতে নিষেধ করেছেন, আর রাস্তায় বসলেও রাস্তার হক আদায় করতে বলেছেন। হক আদায় হলো - দৃষ্টি সংযত রাখা, উৎপীড়ন করা থেকে বিরত থাকা, সালামের জবাব দেওয়া, সৎ কাজের আদেশ দেওয়া এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকা। অথচ অধিকাংশ তরুণ ঈদের দিন রাস্তায় ব’সে আড্ডা দেয়, হারাম হলেও অনেকে গিটার বাজিয়ে দলবদ্ধভাবে গান গায়, কেউ মেয়ে দেখলে শিস বাজায় বা ইভটিজিং করে। আমার কিছু সহপাঠী ঈদের কয়েকদিন আগেই চাঁদা তুলে মদ আর বিয়ারের কার্টুন কিনে স্টক ক’রে রাখে ঈদ উদযাপন করার জন্য! আর আমাদেরই মহল্লার আমার স্কুল-কলেজের কিছু সহপাঠী আরো অভিজাতভাবে ঈদ উদযাপন করে। ওরা আমাকেও একবার প্রস্তাব করেছিল ওদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে। উদযাপনের ধরন শুনে আমি হাঁ হয়ে গিয়েছিলাম! সঙ্গে সঙ্গে প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছিলাম। ওদের মদের স্টক তো থাকেই, সেই সঙ্গে থাকে কলগার্ল! ঈদের সময় পরিবারের সবাই গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে যাওয়ায় ওদের কারো না কারো বাসা ফাঁকা থাকেই। সেই ফাঁকা বাসায় ওদের সাত-আটজনের জন্য দু'তিনজন কলগার্ল ভাড়া ক’রে নিয়ে আসে। তারপর সারারাত চ’লে ঈদ উদযাপন!

বাসায় ফিরেছিলাম অনেক রাতে, আত্মীয়-স্বজন বাসা থেকে চ’লে যাওয়ার পর। পরপর অস্বস্তিকর দুটো ঈদ বাড়িতে কাটানোর পরই আমি সিদ্ধান্ত নিই - ঈদের সময় আর বাড়িতে থাকবো না, কোথাও ঘুরতে যাব। এরপর থেকেই আমি ঘুরতে যাই, নিজেও বিব্রত হই না, অন্যদেরকেও বিব্রত করি না। 

ন্যাশনাল বাংলা স্কুলের বিপরীত দিকের সরু গলি দিয়ে ঢুকে বাঁ-দিকের একটা বটগাছ ঘেরা বাঁধানো বেদিতে বসলাম আবির আর আমি। জায়গাটা নিরিবিলি; মাঝে মাঝে দু-চারজন মানুষ থাকে, এখন নেই; হঠাৎ হঠাৎ গাছের পাখিরা পায়খানা করে, কখনো কখনো তা গায়েও পড়ে, একদিন পড়েছিল আমার কপালের ডানদিকে; তবু এখানে আসি, কারণ জায়গাটা নিরিবিলি, আর গাছ থাকলে পাখি থাকবেই, পাখি থাকলে পায়খানাও করবে। প্রাকৃতিক ব্যাপার। 

ভীষণ গরম। পানির তৃষ্ণা পেয়েছে। আবিরকে বললাম, ‘তোরা ব্যাগে পানি আছে?’

‘আছে, তবে এ পানি আমাদের পেটে সহ্য হবে না।’

‘কেন?’ 

ও শব্দগুলো টেনে টেনে বললো, ‘মহাপবিত্র গঙ্গা-পদ্মাজল!’

‘মানে?’

গলায় কপট গাম্ভীর্য এনে বললো, ‘সে এক বিরাট রগড় রে বাপু, তোর মতো নরাধম নাস্তিক তা বুঝবে না!’

‘আরে ব্যাটা, রহস্য না ক’রে খুলে বল।’ 

‘আমার জেঠিমা, কিছুদিন আগে তীর্থে গিয়েছিলেন গয়া, কাশী, বৃন্দাবন; ওখান থেকে আর কিছু আনুন বা না আনুন বড় দুই বোতল গঙ্গাজল নিয়ে এসেছেন। পাড়ার লোকেরা হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল একটুখানি গঙ্গাজল নেবার জন্য। তীর্থ থেকে আনা গঙ্গাজল, কাউকে না দিলে যদি পাপ হয়, তাই আমার জেঠিমা সকলকেই একটু একটু ক’রে গঙ্গাজল বিতরণ করেছেন। আর তীর্থ থেকেই ফিরেই তিনি পাড়ার সবাইকে, মানে প্রায় আড়াইশো-তিনশো মানুষকে নিমন্ত্রণ ক’রে খাইয়েছেন। বৃন্দাবনে তীর্থ করতে গেলে ফিরে এসে নাকি মানুষকে অন্নভোজন করাতে হয়, নইলে পুণ্য হয় না। আমি জেঠিমাকে বলেছিলাম, “জেঠিমা, তোমার এই পঁচিশ-ত্রিশ হাজার টাকা আমাকে দাও, আমি লোকজনের কাছ থেকে চেয়ে-চিন্তে আরো কিছু টাকা এর সঙ্গে যোগ ক’রে পাড়ায় একটা লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করি। তোমার পূণ্য হোক বা না হোক, তুমি যেদিন লোকজনকে খাওয়াবে, তার পরদিন সকালেই তোমার পঁচিশ-ত্রিশ হাজার টাকায় মানুষের টয়লেট নিশ্চয় পূর্ণ করবে, এতে কারো কোনো উপকার হবে না, কিন্তু একটা লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করলে মানুষের উপকার হবে!” জেঠিমা আমাকে কী বললো, জানিস?’ 

‘কী?’

‘বললো, দূর হ, লক্ষ্মীছাড়া মুখপোড়া!’

পুরো ঘটনা আর আবিরের বলার ধরনে আমি এমনিতেই মিটিমিটি হাসছি, এবার বেশ জোরেই হেসে উঠলাম। 

আবির আবার শুরু করলো, ‘এদিকে আমার দিদির শ্বশুরবাড়ির গোত্রের দূর-সম্পর্কের একজন লোক মারা গেছেন, তার সঙ্গে দিদিদের সম্পর্কের ব্যাপারটা মনে কর এইরকম হবে আর কি - জামাইবাবুর দাদুর বাবার কাকাতো ভাইয়ের বংশধর। তাও যিনি মারা গেছেন তিনি থাকতেন পশ্চিবঙ্গের হাওড়ায়। দিদি-জামাইবাবু তাকে দেখা তো দূরের কথা, মনে হয় নামও শোনেনি। অথচ দিদিরা এখন অশৌচ পালন করছে, ওদের নিজেদের গা-গতর থেকে শুরু ক’রে ঘর-দোর সবই অশৌচ! দু'-একদিনের মধ্যেই নাকি শ্রাদ্ধ, তাই ওদের ঘরে গঙ্গাজল ছিটিয়ে অশৌচ দূর করতেই আমাকে গঙ্গাজল নিয়ে আসতে বলেছিল। মা দিদির জন্য একটা ছোট বোতলে গঙ্গাজল দিলো, আমিও ব্যাগের বাইরের এই পকেটে রাখলাম। লঞ্চ থেকে নামার আগে দেখি জলের বোতল হাওয়া, তলায় খুঁজলাম নেই! নদীর ওপারে বাসের ঝাঁকিতে ব্যাগের পকেট থেকে প’ড়ে গেল নাকি লঞ্চ থেকে কেউ নিয়ে খাবার জল মনে ক’রে খেয়ে ফেললো, জানি না। জল না পেলে তো দিদি আমাকে আচ্ছা ঝাড় দেবে। হঠাৎ মাথাটা খুলে গেল, একটা ছোট বোতল কিনে সেই বোতলের জল খেলাম, আর খালি বোতলে পদ্মার পানি ভ’রে নিয়ে এলাম!’ 

‘তাদের বিশ্বাস তাদের কাছে, তাই ব’লে তুই মিথ্যা বলবি!’

‘এই তোর ভূগোলের জ্ঞানও তো, দেখছি, আমার জেঠিমার মতো! তুই জানিস না যে, গঙ্গা-ই মুর্শিদাবাদে এসে পদ্মা হয়ে গেছে! ঐ গঙ্গাদ্বারেও যে জল, আমাদের পদ্মায়ও সেই একই জল।’

‘তা তো জানি!’ 

‘তাহলে আমি তো মিথ্যা বলছি না, এটাও তো গঙ্গারই জল! এটাই দিদিকে দেব।’

আমি হেসে বললাম, ‘তুই পারিসও!’

‘আগের দিনের মানুষের ভূগোলের জ্ঞান ছিল না, তাই পদ্মাপারের মানুষ রোজ পদ্মায় স্নান করার পরও দল বেঁধে ঘটা ক’রে নদীয়ায় গঙ্গাস্নানে যেতো গরুর গাড়ি বা ঘোড়ার গাড়িতে চ’ড়ে, পায়ে হেঁটেও যেতো অনেকে; পথে অনেকে মরেও যেতো। কিন্তু এখন তো সেই দিন নেই, সব গ্রামেই শিক্ষিত মানুষ আছে, ইন্টারনেট আছে, গুগল ম্যাপে চোখ বোলালেই জানা যায় যে, গঙ্গার আর পদ্মার জল একই। অনেকে জানেও, তবু মানষের অন্ধ বিশ্বাস, গঙ্গার জলের প্রতি অন্ধ ভক্তি। ফলে ঘরের কাছে পদ্মায় গঙ্গাজল রেখে টাকা খরচ ক’রে গঙ্গাস্নান করতে যায় দূরে। অতীতে কতো মানুষ এই গঙ্গাজল খেয়ে ডায়রিয়া-কলেরায় মরেছে, তা কে জানে!’

আপাতত জল কিনে এনে তৃষ্ণা মেটালাম আমরা। এরই মধ্যে শাশ্বতীদির ফোন।

‘হ্যালো দিদি...’

‘টিকিট পেয়েছিস?’

‘হ্যাঁ, পেয়েছি।’

‘আবির কোথায়?’

‘আমরা একসাথেই আছি।’

‘তোরা কি এখনো কল্যাণপুরে?’

‘না, ২ নম্বরে স্টেডিয়ামের কাছে।’

‘শোন, বাইরে থাকিস না, বাসায় চ’লে যা। গুলশানে জঙ্গি হামলা হয়েছে।’

‘বলো কী! কখন?’

‘এই তো টিভিতে লাইভ দেখাচ্ছে। গুলশানের হলি আর্টিজান নামের একটা রেস্টুরেন্টে জঙ্গিরা ঢুকে মানুষকে জিম্মি করেছে।’

‘মানুষ মারা গেছে?’

‘ভেতরে কী হচ্ছে, কেউ বলতে পারছে না। র‌্যাব-পুলিশ ঘিরে রেখেছে রেস্টুরেন্ট। বাইরে থেকে পুলিশ ঢুকতে গিয়েছিল, জঙ্গিদের ছোড়া গ্রেনেড আর গুলির আঘাতে দু’জন পুলিশ মারা গেছে, আহত হয়েছে আরো কয়েকজন। শুনছি, এরকম হামলা আরো হতে পারে, তোরা বাসায় চ’লে যা।’

‘ঠিক আছে, দিদি, আমরা একটু পরই চ’লে যাচ্ছি।’

‘আর পরশুদিন তোরা দু’জনই বাসায় আসছিস তো?’

হ্যাঁ, আসবো।’

‘আচ্ছা, রাখছি।’

‘আচ্ছা।’

আমি আবিরকে ঘটনাটা বললাম। এরই মধ্যে আমার বাসা থেকে মা ফোন করেছে, আবিরকে ফোন করেছে নিত্রাদি। আরো জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় দু’জনকেই তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে বলেছে। আমরা আসছি ব’লে ইসলামী জঙ্গিবাদ প্রসঙ্গে আলাপ চালিয়েই যাচ্ছি। কিছুক্ষণ পর বাসা থেকে আবারো মায়ের ফোন, ‘২ নম্বর থেকে আসতে এতোক্ষণ লাগে?’

‘এই তো চ’লে আসছি, মা।’

‘জলদি বাসায় আয়, তোর বাবা রাগারাগি করছে।’

‘আচ্ছা, দশ মিনিটের মধ্যে আসছি।’ 

ফোন রেখে আবিরকে বললাম, ‘চল আজ উঠি, নইলে আবার ফোন দিয়ে রাগারাগি করবে।’

আবিরকে ২ নম্বর বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে তুলে দিয়ে আমি হাঁটতে হাঁটতে বাসায় ফিরলাম, সবাই ড্রয়িংরুমে ব’সে টেলিভিশন দেখছে, আমি ফেরায় বাসার সবাই যেন স্বস্তি পেল। গুলশানের ঘটনাটি সরাসরি দেখাচ্ছে চ্যানেলে, জঙ্গিরা হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টের ভেতরে দেশি-বিদেশি মানুষকে জিম্মি ক’রে রেখেছে । জিম্মিকারীদের হাতে বন্দী মানুষের কথা ভেবে র‌্যাব-পুলিশ বাহিনী কোনো অ্যাকশনে যাচ্ছে না, তারা ভবনটি ঘিরে রেখেছে আর জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। 

আমি গোসল ক’রে সবার সঙ্গে ভাত খেলাম, তারপর আবার বসলাম ড্রয়িংরুমে টিভির সামনে। নিরাপত্তাজনিত কারণে এখন আর সরাসরি দেখাচ্ছে না কোনো চ্যানেল। কয়েকজন ইতালিয়ান, জাপানী, একজন ভারতীয় নাগরিকসহ বাংলাদেশি নাগরিকও ভেতরে জিম্মি রয়েছে; কিন্তু ঠিক কতোজন ভেতরে জিম্মি রয়েছে, সে ব্যাপারে কোনো ধারণা দিতে পারছে না আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। 

চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে হঠাৎ দেখলাম সিএনএন-এ সরাসরি দেখাচ্ছে। ভাত খেয়ে এসে বাবা আর ছোট আপুও বসেছে টিভির সামনে। রান্নাঘরের কাজ সামলে একটু পর মাও এসে বসলো। তাদের সবার মুখে ওই একই কথা - কোরানের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে এদেরকে বিপথগামী করা হয়েছে। আমি তাদের কথা শুধু শুনলাম, কিছুই বললাম না। কী বলবো? এক কথা আর কতোবার বলা যায়! আমি তাকিয়ে আছি টিভির পর্দায়, আর ভাবছি ভেতরে জিম্মি থাকা মানুষগুলো আর তাদের পরিবারের কথা। ভেতরের মানুষগুলো জীবিত আছে নাকি তাদেরকে মেরে ফেলেছে, তা অজানা, কী ভীষণ যন্ত্রণায়-উৎকণ্ঠায় পার করছেন জিম্মিদের পরিবারের মানুষেরা। সবাই হয়তো আশায় বুক বেঁধে আছেন যে, মানুষগুলো জীবিতই ফিরবে। 

আমি বাবার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘বাবা, অনার্স শেষ হ’লে আমি আমেরিকা বা ইউরোপিয়ান কোনো কান্ট্রিতে চ’লে যাব। এই দেশে আর থাকবো না।’

মা, বাবা, ছোট আপু, তিনজনই অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকালো। 

বাবা বললো, ‘অনার্স আগে শেষ হোক, তারপর দেখা যাবে।’

মা বললো, ‘তুই বিদেশ গেলে আমাদের কী হবে?’

‘তোমাদেরও নিয়ে যাব। নাকি কাফেরদের দেশে থাকতে তোমারদের অসুবিধা হবে? এই দেশ ক্রমশ আফগানিস্তান হবে, এ ব্যাপারে আর কোনো সন্দেহ নাই। আর তালেবান-আইসিস মার্কা দেশে আমি থাকতে পারবো না, আগে থেকেই তোমাদের জানিয়ে রাখলাম।’ 

আমার চোখ টেলিভিশনের পর্দায়, সারাবিশ্বের মানুষ দেখছে এই ঘটনা, জানছে যে বাংলাদেশ একটি জঙ্গিবাদী দেশ, সেখানে বিদেশীরা নিরাপদ নয়! ছিঃ! বাংলাদেশের জন্য এটা কী ভীষণ লজ্জার! সব সরকার জঙ্গি তোষণ করতে করতেই আজ দেশটাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। রাত বাড়ছে, কিন্তু আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী কোনো আশার কথা শোনাতে পারছে না; তারা কেবল চতুর্দিক থেকে ঘিরে রেখেছে ভবনটি। বাবা-মা আর ছোট আপু, একে একে সবাই ঘুমাতে চ’লে গেল। দাদী অনেক আগেই ঘুমিয়েছে। ড্রয়িংরুমে আমি একা, একসময় টিভি বন্ধ ক’রে আমিও শুতে চ’লে এলাম, মশারি টাঙিয়ে বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম; কিন্তু ঘুম আসছে না। শুয়ে শুয়েও মাথার ভেতরে একই চিন্তা, মানুষগুলো জীবিত ফিরবে তো? এই দেশের ভবিষ্যৎ কী? দ্রুত হাঁটছে আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়ার পথে। ওদের হাত থেকে কি কোনো পরিত্রাণ নেই আমাদের? নিজেই নিজেকে এই প্রশ্নগুলো করতে করতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছি। প্রসাবের চাপে পোনে ছয়টার দিকে ঘুম ভাঙলো। বাথরুম থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখলাম বাবা নিউজ চ্যানেল চালিয়ে ব’সে আছে। না, কোনো সুসংবাদ নেই; র‌্যাব, পুলিশ, সেনাবাহিনী এখনো চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে রেস্টুরেন্ট, কোনো অপারেশান চালায়নি। আমি নিজের ঘরে এসে আবার শুয়ে পড়লাম। 

ঘুম ভাঙলো বেশ বেলায়। উঠে ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখি বাবা, মা আর ছোট আপু টিভি দেখছে। সেনাবাহিনীর কমান্ডোরা সকাল সাতটা চল্লিশ মিনিটে ‘অপারেশান থান্ডারবোল্ট’ নামে অভিযান চালিয়ে ছয় জঙ্গিকে হত্যা ক’রে হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্ট নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। উদ্ধার করেছে বিশটি লাশ; যাদের নয়জন ইতালিয়ান, সাতজন জাপানী, তিনজন বাংলাদেশী ও একজন ভারতীয়। তাদেরকে গুলবিদ্ধ করে, কুপিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। তেরোজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে, যাদেরকে জঙ্গিরা স্বেচ্ছায় বাঁচিয়ে রেখেছে, এদের বেশিরভাগই হলি আর্টিজানের কর্মী। 

ছয়জন তরুণ জঙ্গির লাশ বারবার দেখাচ্ছে টেলিভিশনের পর্দায়। অপরের তো বটেই, নিজের জীবনও এদের কাছে কী তুচ্ছ! কী অবলীলায় ধর্মের নামে নিজের জীবন বিসর্জন দিলো এরা! এতো সুন্দর পৃথিবীতে বাঁচার সাধ হলো না; সাধ জাগলো, যে জগত সে দেখেনি, আজ অব্দি কেউ দেখেনি, যে জগতের কোনো অস্বিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি, সেই জগতে বাঁচার! চোদ্দশো বছর আগে একজন মানসিক রোগী-প্রতারক এক মিথ্যে অলৌকিক জগতের স্বপ্ন দেখিয়ে গেছে, আর সেই জগতে যাবার জন্য এই একবিংশ শতাব্দীর মানুষ অন্যের জীবন কেড়ে এভাবে নিজের জীবন বিসর্জন দিতে পারে! চোখ বুজে ভাবলে কেমন অবিশ্বাস্য লাগে, মনে হয় এসব রূপকথার গল্প! কিন্তু চোখ খুললেই চোখের সামনে উপস্থিত নিষ্ঠুর বাস্তবতা; সমগ্র বিশ্বে অসংখ্য মুসলিম যুবক বেহেশেতের মাদকে মত্ত হয়ে প্রায় প্রতিদিন কোথাও না কোথাও পতঙ্গের আগুনে ঝাঁপ দেবার মতো ঝাঁপ দিচ্ছে মৃত্যুর দিকে! ধর্ম মাত্রই এক ধরনের মাদক, আর নিঃসন্দেহে সবচেয়ে তীব্র এবং ভয়ংকর মাদক ইসলাম; যা দিনকে দিন অন্যদের জীবনও বিষময় ক’রে তুলছে। 

(চলবে)