১৬ জানু, ২০১৭

ফাদাক - ৩: গণিমতের উত্তরাধিকার - যুক্তি ও প্রমাণ প্রত্যাখ্যান!: কুরানে বিগ্যান (পর্ব-১৫৫): ত্রাস, হত্যা ও হামলার আদেশ – একশত ঊনত্রিশ

লিখেছেন গোলাপ

(আগের পর্বগুলোর সূচী এখানে)

"যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।"

স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই তাঁর প্রিয় অনুসারী আবু বকর ইবনে কুহাফা কী অজুহাতে তাঁর রেখে যাওয়া সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে নবী কন্যা ফাতিমা ও তাঁর অন্যান্য পরিবার সদস্যদের বঞ্চিত করেছিলেন; কী কারণে আলী ইবনে আবু তালিব মুহাম্মদের মৃত্যুর পর থেকে শুরু করে ফাতিমার মৃত্যুকাল পর্যন্ত আবু বকরের বশ্যতা স্বীকার করেননি; ফাতিমার মৃত্যুর পর কীভাবে তিনি তার মৃত স্ত্রীর নামাজে জানাজা ও দাফনকার্য সম্পন্ন করেছিলেন; কী পরিস্থিতিতে তিনি আবু বকরের বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন; ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনা আগের পর্বে (পর্ব-১৫৪) করা হয়েছে।

ইসলামের ইতিহাসে মুহাম্মদ ইবনে সা'দ (৭৮৪-৮৪৫ খৃষ্টাব্দ) এক অত্যন্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। মুহাম্মদ ইবনে ইশাক (৭০৪-৭৬৮ খৃষ্টাব্দ), আল-ওয়াকিদি (৭৪৮-৮২২ খৃষ্টাব্দ) ও আল-তাবারী (৮৩৮-৯২৩ খৃষ্টাব্দ) ছাড়াও মুহাম্মদের মৃত্যু পরবর্তী ২৯০ বছরের মধ্যে আর যে বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিক মুহাম্মদের পূর্ণাঙ্গ 'সিরাত ও মাগাজি' গ্রন্থ রচনা করেছেন, তিনি ছিলেন এই মুহাম্মদ ইবনে সা'দ (Muhammad Ibn Sa’d)। মুহাম্মদের রেখে যাওয়া লুটের মালের (গণিমত) উত্তরাধিকার প্রশ্নে ফাতিমা ও আবু বকরের বিরোধ প্রসঙ্গে তিনি যে অতিরিক্ত তথ্যটি বর্ণনা করেছেন, তা হলো এই:

মুহাম্মদ ইবনে সা'দের (৭৮৪-৮৪৫ সাল) অতিরিক্ত বর্ণনা: [1]

আফফান ইবনে মুসলিম আমাদেরকে জানিয়েছেন (তিনি বলেছেন): হামমাদ ইবনে সালামাহ আমাদের অবগত করিয়েছেন (তিনি বলেছেন): উম্মে হানির [মুহাম্মদের চাচাতো বোন, আবু তালিবের কন্যা] কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আল কালবি আমাকে যা বলেছেন, তা হলো:

'নিশ্চিতই আবু বকরকে ফাতিমা জিজ্ঞাসা করেছিল, "আপনি যখন মৃত্যুবরণ করবেন, কারা আপনার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে?" জবাবে তিনি বলেন, "আমার সন্তান ও আত্মীয়-স্বজনরা?"

সে বলে, "নবীর সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে আমাদের বঞ্চিত করার ব্যাপারে আপনার যৌক্তিকতা কী?" তিনি জবাবে বলেন, "হে আল্লাহর নবীর কন্যা! আমি তোমার পিতার জমি, সোনা, রূপা, দাস-দাসী বা সম্পত্তি উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করিনি।"

সে বলে, "আমাদের জন্য বরাদ্দকৃত আল্লাহর অংশ (খুমুস, অর্থাৎ এক-পঞ্চমাংশ [কুরান-৮:৪১]) ও আমাদের একান্ত অংশ আপনার কব্জায় আছে।" তৎক্ষণাৎ তিনি জবাবে বলেন, "আমি আল্লাহর নবীকে (তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) বলতে শুনেছি, "যা আল্লাহ আমাকে খাওয়ান, তা হলো খাদ্য। যখন আমার মৃত্যু হবে, এগুলো মুসলমানদের মধ্যে বিতরণ করতে হবে।"'------

মুহাম্মদ ইবনে উমর আমাদের জানিয়েছেন: নিজ পিতার কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে যায়েদ ইবনে আসলাম হইতে বর্ণিত তথ্যের ভিত্তিতে হিশাম ইবনে সা'দ আমাকে যা অবহিত করিয়েছেন, তা হলো:

'আমি উমরকে বলতে শুনেছি, "যেদিন আল্লাহর নবী (তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) মৃত্যুবরণ করেন, আবু বকরের প্রতি আনুগত্যের শপথ ('bayah') প্রদান করা হয়। তার পরদিন আলী-কে সঙ্গে নিয়ে ফাতিমা আবু বকরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। সে বলে, "আমার পিতা আল্লাহর নবীর (তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) সম্পত্তির হিস্যা উত্তরাধিকার সূত্রে আমার প্রাপ্য।" 

আবু বকর জিজ্ঞাসা করেন, "গৃহস্থালি জিনিসপত্র, নাকি ভূ-সম্পত্তি?" সে বলে, "আমি তাঁর ফাদাক, খায়বার ও মদিনার সাদাকা সম্পত্তির উত্তরাধিকারী, যেমন করে আপনার মৃত্যুর পর আপনার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবেন আপনার কন্যারা।"  

আবু বকর বলেন, "আল্লাহর কসম! তোমার পিতা আমার চেয়ে ও তুমি আমার কন্যাদের চেয়ে উত্তম, কিন্তু আল্লাহর নবী বলেছেন: আমরা কোনো উত্তরাধিকারী রেখে যাই না, যা আমরা রেখে যাই, তা হলো সাদাকা", অর্থাৎ, এই মহা মূল্যবান সম্পত্তি (precious property) যার সম্বন্ধে তুমি জানো। যদি তুমি বলো যে, এটি তোমার পিতা তোমাকে প্রদান করেছেন, আল্লাহর কসম! আমি তোমার সে কথা মেনে নেবো ও তোমার কথাকে সত্য বলে নিশ্চিত করবো।"

সে বলে, "উম্মে আয়মান (Umm Ayman) আমার কাছে এসে আমাকে অবগত করিয়েছে যে তিনি 'ফাদাক' আমাকে দান করেছেন।"

তিনি জিজ্ঞাসা করেন, "তুমি কি তাঁকে (নবীর) তা বলতে শুনেছো, 'এটি তোমার জন্য?' আমি তোমাকে বিশ্বাস করবো ও তোমার বিবৃতি গ্রহণ করবো।" সে বলে, "আমার যা (প্রমাণ), তা আমি আপনাকে অবগত করিয়েছি।" ---


- অনুবাদ, টাইটেল ও [**] যোগ - লেখক।

>>> আদি উৎসের ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় যে বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট, তা হলো, নবী কন্যা ফাতিমা বহুভাবে আবু বকরকে 'যুক্তি' দিয়ে, "যেমন করে আপনার মৃত্যুর পর আপনার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবেন আপনার কন্যারা", বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে, তাঁর পিতার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে সেই সম্পত্তির বিধিসম্মত মালিক হলেন তিনি!  আবু বকর তাঁর সেই অতি সহজ ও সরল যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন যে-অজুহাতে, তা হলো, "আমি আল্লাহর নবীকে বলতে শুনেছি ----।"

ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় আর যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমরা জানতে পারি তা হলো:

(১) মুহাম্মদের মৃত্যুর ঐ দিনটিতে আবু বকরকে মুসলিম জাহানের শাসনকর্তা নিযুক্ত করার পরের দিনই (‘On the following day’) ফাতিমা তাঁর পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকার প্রশ্নে কথা বলার জন্য আবু বকরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন, সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্বামী আলী ইবনে আবু তালিব। সেখানে আবু বকর ফাতিমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, "যদি তুমি বলো যে এটি তোমার পিতা তোমাকে প্রদান করেছেন, আমি তোমার সে কথা মেনে নেবো ও তোমার কথাকে সত্য বলে নিশ্চিত করবো।" প্রত্যুত্তরে যখন ফাতিমা প্রমাণ স্বরূপ তাকে জানান যে তাঁর পিতা মুহাম্মদ যে 'ফাদাক' তাঁকে দান করেছেন, তা উম্মে আয়মান তাঁকে অবগত করিয়েছেন, আবু বকর তাঁর এই 'প্রমাণ' প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ও ফাতিমার কাছে প্রশ্ন রেখেছিলেন, ফাতিমা নিজে তাঁর পিতার কাছ থেকে তা শুনেছেন কি না। মুহাম্মদ ইবনে সা'দের ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় প্রতীয়মান হয় যে, মুহাম্মদ ফাতিমাকে এই তথ্যটি কখনোই জানাননি। যদি তিনি ফাতিমাকে তা জানাতেন, তবে দাবি প্রমাণের জন্য তাঁকে উম্মে আয়মান'-এর বক্তব্যের উল্লেখ করতে হতো না। আবু বকরের যুক্তিতে, “যেহেতু ফাতিমা তাঁর পিতার কাছ থেকে তা কখনোই শোনেননি, তাই  ফাতিমার এই প্রমাণ গ্রহণযোগ্য নয়।"

আবু বকরের যুক্তিতে ফাতিমার এই 'প্রমাণ' গ্রহণযোগ্য না হলেও আদি উৎসের ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় যে বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট, তা হলো - শুধু শিয়া মুসলমানদের বর্ণিত ইসলামের ইতিহাসেই নয়, মুহাম্মদ ইবনে সা'দ (সুন্নি মুসলমান) রচিত ইতিহাসেও আমরা জানতে পারছি যে, মুহাম্মদ মৌখিকভাবে 'উম্মে আয়মান'-কে জানিয়েছিলেন যে, তিনি 'ফাদাক' ফাতিমাকে দান করেছেন।

প্রশ্ন হলো, "কে এই উম্মে আয়মান, যার বক্তব্যকে ফাতিমা 'প্রমাণ' হিসাবে উপস্থাপন করেছিলেন? কে এই মহিলা, যাকে মুহাম্মদ এমন একটি তথ্য জানিয়েছিলেন যা তিনি তাঁর কন্যা ফাতিমাকে ও জানাননি?”

(২) ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় আমরা আর যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি জানতে পারি, তা হলো, নবী কন্যা ফাতিমা খায়বার ও ফাদাকের যে-সম্পত্তির উত্তরাধিকার দাবি করছেন, তা কোনো সাধারণ সম্পত্তি ছিল না। আবু বকরের ভাষায় তা ছিলো, "মহামূল্যবান" এক সম্পত্তি।

প্রশ্ন হলো, মুহাম্মদের এই সম্পত্তির মোট মূল্য কত ছিলো?"

“কে এই উম্মে আয়মান?”

>> উম্মে আয়মান ছিলেন সেই মহিলা, মুহাম্মদের শিশু ও কৈশোর জীবনে যার অবস্থান ছিল তাঁর মাতা আমিনার পরেই। এই সেই মহিলা, যিনি মুহাম্মদের মাতা আমিনার সঙ্গে মুহাম্মদের শিশুকালে স্নেহ-ভালবাসা দিয়ে তাঁকে নিজ হাতে লালন পালন করেছিলেন।  উম্মে আয়মান-এর আসল নাম ছিল বারাকা বিনতে থালাবা বিন আমর (Barakah binte Tha'alaba bin Amr), এক আদি আবিসিনিয়া-বাসী মহিলা। মুহাম্মদের পিতা আবদুল্লাহ বিন আবদুল মুত্তালিব (কিংবা তাঁর মা আমিনা বিনতে ওহাব) তাঁকে ক্রীতদাসী হিসাবে ক্রয় করেন। মুহাম্মদের জন্মের আগেই তাঁর পিতা আবদুল্লাহ বাণিজ্য শেষে সিরিয়া থেকে প্রত্যাবর্তন কালে তাঁর দাদী [সালমা বিনতে আমরের (পর্ব-১২)] সম্বন্ধীয় আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য মদিনায় যাত্রাবিরতি দেন। সেখানে তিনি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর কবর হয় মদিনাতেই। মুহাম্মদের ছয় বছর বয়সের সময় তাঁর মা আমিনা শিশু মুহাম্মদ ও এই উম্মে আয়মানকে সঙ্গে নিয়ে মদিনায় তাঁর স্বামী আবদুল্লাহর (মুহাম্মদের পিতা) কবর জিয়ারতের জন্য মক্কা থেকে মদিনায় বেড়াতে যান। কবর জিয়ারত ও আত্মীয়-স্বজনদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করার পর মদিনা থেকে মক্কায় প্রত্যাবর্তন কালে মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী আল-আবওয়া (Al-Abwa) নামক স্থানে মুহাম্মদের মা আমিনা গুরুতর অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। সেখানেই তাঁকে কবর দেয়া হয়। আমিনার মৃত্যুকালে তাঁর পাশেই ছিলেন এই 'উম্মে আয়মান', সাথে ছিল সদ্য মাতৃহারা ছয় বছরের শিশু মুহাম্মদ! মৃত্যুকালে আমিনা এই মহিলাটির হাতে মুহাম্মদের দেখাশোনা ও সেবা-যত্নের অনুরোধ জানান। উম্মে আয়মান মুহাম্মদকে নিয়ে মক্কায় ফিরে আসেন। উম্মে আয়মান আমিনার কথা রেখেছিলেন। মুহাম্মদের বয়স যখন আট বছর তখন তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিবের মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে আমিনার মতোই আবদুল মুত্তালিবও শিশু মুহাম্মদকে দেখাশোনা ও সেবা-যত্নের অনুরোধ জানিয়ে যান। উম্মে আয়মান মুহাম্মদকে নিজ সন্তানের মত মাতৃস্নেহে বড় করেন।

পঁচিশ বছর বয়সে খাদিজাকে বিবাহ করার পর মুহাম্মদ উম্মে আয়মানকে দাসত্বমুক্ত করেন। দাসত্বমুক্ত হওয়ার পরও তিনি মুহাম্মদ ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে বহুকাল অতিবাহিত করেন। দাসত্বমুক্ত করার পর তাঁকে মদিনার খাযরায গোত্রের উবায়েদ ইবনে যায়েদ (Ubayd ibn Zayd) নামের এক লোকের সাথে বিবাহ দেওয়া হয়। বিবাহের পর তাঁদের যে ছেলে সন্তান হয় তার নাম রাখা হয়, "আয়মান"। অতঃপর বারাকা বিনতে থালাবার নতুন পরিচিতি 'উম্মে আয়মান (আয়মানের মা)’। তাঁদের এই বিবাহ বেশিদিন স্থায়ী হয় না। অতঃপর তাঁর বিয়ে হয় মুহাম্মদের পালিত পুত্র যায়েদ বিন হারিথার (পর্ব-৩৯) সঙ্গে। এক পুত্র সন্তান জন্ম লাভ করে। নাম রাখা হয় 'ওসামা'; ওসামা বিন যায়েদ।

চল্লিশ বছর বয়সে যখন মুহাম্মদ তাঁর নতুন মতবাদ প্রচার শুরু করেন, উম্মে আয়মান ছিলেন সেই মহিলা, যিনি ইসলামের একদম প্রথম অবস্থায় মুহাম্মদের মতবাদে দীক্ষা নিয়েছিলেন। তিনি হিজরত করেন মদিনায়। তিনি মুহাম্মদের সাথে বেশ ক'টি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। খায়বার যুদ্ধে তিনি ছিলেন মুহাম্মদের সাথে (পর্ব-১৪৭)

সংক্ষেপে, উম্মে আয়মান হলেন সেই মহিলা, যিনি মুহাম্মদকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছিলেন। মুহাম্মদও তাঁকে মায়ের মতই শ্রদ্ধা করতেন। নবী-কন্যা ফাতিমা তাঁর দাবির সপক্ষে এই মহিলাটির উল্লেখ করেছিলেন, যিনি ফাতিমাকে জানিয়েছিলেন যে, মুহাম্মদ তাঁকে বলেছেন যে, তিনি 'ফাদাক' ফাতিমাকে দান করেছেন। যে আবু বকর নবী-কন্যা ফাতিমা, নবী-জামাতা আলী ইবনে আবু তালিব ও নবীর একান্ত পরিবার সদস্যদের অবলীলায় অগ্রাহ্য করতে পারেন, তিনি 'উম্মে আয়মানের বক্তব্যকে কীভাবে সম্মান করবেন?  

"মুহাম্মদের সম্পত্তির মোট মূল্য কত ছিলো?"

>> লুণ্ঠন ও ভাগাভাগি সমাপ্ত করার পর, খায়বারের সমস্ত ভূ-সম্পত্তির" মালিক হয়েছিলেন মুহাম্মদ (পর্ব-১৪৯)  তাঁর অনুসারীরা (পর্ব-১৪৮)। অতঃপর খায়বারবাসী "শ্রমিক রূপে" তাদের ঐ জমিগুলোতে কাজ করার অনুমতি পেয়েছিলেন এই শর্তে যে, মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা তাঁদেরকে যে কোনো সময় বিতাড়িত করতে পারবেন (পর্ব-১৫০)। যতদিন তারা তাঁদেরকে বিতাড়িত না করছেন, ততদিন পর্যন্ত তাঁরা তাঁদের শ্রমের বিনিময় মূল্য হিসাবে ঐ জমিগুলো থেকে উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক পাবেন, বাকি অর্ধেক পাবেন মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা। এর সরল অর্থ হলো, বিতাড়িত করার সময় তাঁদেরকে যদি আদৌ কোনো অর্থ প্রদান করার সিদ্ধান্ত উমর ইবনে খাত্তাব নিয়ে থাকেন, তবে তাঁদেরকে শুধু উৎপন্ন "ফসলের অর্ধেক" মূল্য পরিশোধ করতে হবে। যেহেতু তাঁরা তখন আর ঐ জমিগুলোর মালিক ছিলেন না (লুণ্ঠন করার পর তা এখন মুসলমানদের মালিকানাধীন), তাই তাঁদেরকে খায়বারের কোনো “জমির মূল্য" পরিশোধ করার প্রশ্নই আসে না।

অন্যদিকে,
ফাদাকবাসী মুহাম্মদের সাথে যে-চুক্তিটি সম্পন্ন করেছিলেন, তার শর্ত ছিল, "অর্ধেক ভূ-সম্পত্তি” থাকবে তাদের জন্য, আর অর্ধেক হবে আল্লাহর নবীর জন্য। এর সরল অর্থ হলো, বিতাড়িত করার সময় তাঁদেরকে তাঁদের ভাগের জমি থেকে উৎপন্ন ফল ও ফসলের মূল্য এবং তাঁদের মালিকানাধীন জমির মূল্য (সম্পূর্ণ ফাদাকের অর্ধেক জমি) পরিশোধ করতে হবে। আদি উৎসের বর্ণনায় আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি যে, যে-কারণে উমর ইবনে খাত্তাব খায়বারের ইহুদিদের সিরিয়া অভিমুখে (আল-শাম) বিতাড়িত করেছিলেন তা হলো, মৃত্যুকালে মুহাম্মদের একটি আদেশ, "আরব উপদ্বীপে যেন দু'টি ধর্মের উপস্থিতি মেনে না নেয়া হয় (পর্ব-১৫০)!" যেহেতু খায়বারের অতি নিকটে বসবাসকারী ফাদাকের জনপদবাসীরাও ছিলেন ইহুদি, সেহেতু আমরা প্রায় নিশ্চিতরূপেই ধারণা করতে পারি যে, খায়বারের ইহুদিদের বিতাড়িত করার সময় উমর ফাদাকের ইহুদিদেরও বিতাড়িত করেছিলেন। ইবনে ওয়াকিদির বর্ণনায় আমারা জানতে পারি যে, খায়বারের লোকদের বিতাড়িত করার সময় উমর “তাঁদের জমি” ও ফসলাদির মূল্য নির্ধারণ করেছিলেন। এই জমিগুলো নিঃসন্দেহে শুধুমাত্র ফাদাকের ইহুদিদের জমি! খায়বারের ইহুদিদের জমিগুলো এই হিসাবের অন্তর্ভুক্তির কোনো প্রশ্নই আসে না, কারণ, তখন খায়বারের ইহুদিদের জমিগুলোর মালিক ছিলেন মুসলমানরা।

আদি উৎসে আল-ওয়াকিদির বর্ণনায় আমরা জানতে পারি যে, উমর ইবনে খাত্তাব ফাদাকের জনগণদের বিতাড়িত করার সময় তাঁদের জমির যে অর্ধেক মূল্য (তাঁদের ভাগের জমির মূল্য, বাকি অর্ধেকের মালিক ছিলেন মুহাম্মদ) পরিশোধ করে সম্পূর্ণ ফাদাক হস্তগত করেছিলেন, তার পরিমাণ ছিল "পঞ্চাশ হাজার দেরহাম কিংবা তার ও বেশি।" অর্থাৎ, উমরের শাসন আমলে (৬৩৪-৬৪৪ সাল) সম্পূর্ণ ফাদাকের জমির মূল্য ছিল এক শত হাজার দিরহাম (পর্ব-১৫৩), যার অর্ধেকের মালিক ছিলেন ফাতিমার পিতা মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ। ফাতিমা আবু-বকরের কাছে ফাদাকের এই "মহামূল্যবান সম্পত্তির" উত্তরাধিকারের দাবি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন, আর আবু বকর তাঁদেরকে এই মহামূল্যবান সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার ইতিহাসের সূচনা করেছিলেন।

১৪০০ বছর আগে নির্ধারিত পঞ্চাশ হাজার দিরহাম মূল্যের এই লুটের মালটিই তখন মুহাম্মদের একমাত্র সম্পত্তি ছিল না। তাঁর বিশাল সম্পত্তি ছিলো খায়বারে, লুটের মালের এক-পঞ্চমাংশের (‘খুমুস’) হিস্যা হিসাবে; সম্পূর্ণ আল-কাতিবা অঞ্চল (পর্ব-১৪৯)! খায়বারে অবস্থিত মুহাম্মদের এই বিশাল সম্পত্তির “তখনকার বাজারমূল্য কত ছিলো” তা আমরা জানি না। কিন্তু আদি উৎসের বর্ণনায় আমরা নিশ্চিতরূপেই জানতে পেরেছি যে, এর পরিমাণ ছিল ফাদাকের মতই বিশাল, যার বিস্তারিত আলোচনা 'লুটের মাল ভাগাভাগি -আল কাতিবা অঞ্চল!' পর্বে করা হয়েছে।

এ ছাড়াও আছে মদিনায় অবস্থিত মুহাম্মদের বনি নাদির গোত্রের লোকদের কাছ থেকে লুণ্ঠিত সম্পদ (পর্ব-৭৫); যে সম্পত্তির মালিক ছিলেন শুধুই মুহাম্মদ ও তাঁর পরিবার ('ফাই')। বনি নাদির গোত্রের সেই সম্পত্তির বাজারমূল্য তখন কত ছিলো?

সুতরাং,
ফাদাক, খায়বার ও মদিনায় অবস্থিত মুহাম্মদের মালিকানাধীন সমুদয় সম্পত্তির মোট মূল্যের পরিমাণ যে-শব্দটি দিয়ে প্রকাশ করা যেতে পারে, তা হলো, "সুবিশাল (Vast)!" এই সেই মুহাম্মদ, যে রাতের অন্ধকারে চুপি চুপি প্রায় এক বস্ত্রে মাত্র দশ বছর আগে মক্কা থেকে মদিনায় স্বেচ্ছা-নির্বাসন নিয়েছিলেন। 'জিহাদ বাণিজ্য' ছাড়া অন্য কোনো বাণিজ্যের মাধ্যমে কি মুহাম্মদ মাত্র দশ বছরে এক নিঃস্ব মানুষের অবস্থান থেকে এই সুবিশাল ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও ঐশ্বর্যশালী মানুষের মর্যাদায় উন্নীত হতে পারতেন (পর্ব-১৩৫)? 

আদি উৎসের বর্ণনায় যা আমরা নিশ্চিতরূপে জানি, তা হলো মুহাম্মদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার প্রশ্নে ফাতিমা-আলী গং ও আবু বকর-উমর গং এর মধ্যে এই যে-বিরোধ, তার মূল কারণ হলো মুহাম্মদের রেখে যাওয়া এই "সুবিশাল অংকের লুটের সম্পদ!"

ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে মুহাম্মদ ইবনে সা'দ এর মূল ইংরেজি অনুবাদের অংশটিও সংযুক্ত করছি।

The Narratives of Muhammad Ibn Sa’d (784-845 AD) [1] 

‘Affan Ibn Muslim informed us, (he said): Hammad Ibn Salamah informed us, (he said): al-Kalbi related to me on the authority of Umm Hani (she said): Varily Fatimah asked Abu Bakr, “When you die who will inherit you?’

He replied, ‘My children and relatives.” She said, “What is the Justification of your becoming inheritor of the prophet keeping away?” He replied, “O daughter of the Apostle of Allah! I did not inherit your father’s land, gold, silver, slave or property.” She said. “The share of Allah (Khums, i.e. one-fifth) which He had allotted to us and which is only our share, is in your hands.” Thereupon he replied, “I heard the Apostle of Allah, may Allah bless him, saying, ‘It is the food that Allah makes me eat. When I die it will be distributed among the Mulsims.”’ ------  

‘Muhammad Ibn Umar informed us, he said: Hisham Ibn Sa’d related to me on the authority of Zayd Ibn Aslam; he on the authority of his father, he said: I heard Umar saying, “The day when the a Apostle of Allah, may Allah bless him, died, bayah  was offered to Abu Bakr. On the following day Fatimah came to Abu Bakr and there was Ali with her. She said, ‘(I should get) my share of the inheritance of my father, the Apostle of Allah, may Allah bless him.’ Abu Bakr asked, ‘Household effects or landed property?’

She said, ‘I am heir to Fadak, Khaybar and his Sadaqat at al-Madinah, as your daughters will be your heirs when you die.’  Abu Bakr Said, ‘By Allah! Your father was better than me and you are better than my daughters, but the apostle of Allah said: We do not leave inheritance, what we leave behind, is Sadaqat”, i.e. this precious property that you know. If you say your father gave it to you, by Allah! I shall accept your words and will confirm your true words.’  She said, “Umm Ayman came to me and informed me that he had bestowed Fadak on me.’ He asked, ‘Did you hear him (Prophet) saying: It is for you? I shall believe you and accept your statement.’ She said, ‘I have informed you of (evidence) what is me.’” -----

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা: 
[1] কিতাব আল-তাবাকাত আল-কাবির – লেখক: মুহাম্মদ ইবনে সা'দ (৭৮৪-৮৪৫ খৃষ্টাব্দ), অনুবাদ এস মইনুল হক, প্রকাশক কিতাব ভবন, নয়া দিল্লি, সাল ২০০৯ (3rd Reprint), ISBN 81-7151-127-9 (set), ভলুউম ২, পৃষ্ঠা ৩৯২-৩৯৪