২ জানু, ২০১৭

সাইমুম (উপন্যাস: পর্ব ২২)

লিখেছেন উজান কৌরাগ


সে যে কিছুটা ভয় পেয়েছে, তা তার চোখ-মুখ দেখেই বুঝলাম। তাকে আশ্বস্ত করতে মৃদু হেসে বললাম, ‘ভাই, থামলেন কেন? গাইতে থাকুন।’ 

তবু সে অবিশ্বাসী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। হয়তো সে আমাকে বিশ্বাস করতে পারছে না, এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, কেননা মানুষ বিশ্বাসী হয়ে এসেই তো চালিয়ে দেয় অবিশ্বাসের ছুরি! আমি ভাবলাম, লোকটা নিশ্চয় হিন্দু সম্প্রদায়ের, রাস্তার ওপাশের হিন্দুপল্লীতে তার বাড়ি; আমাকে মুসলমান ভেবে ভয় পাচ্ছে। বললাম, ‘আপনি কি ভয় পাচ্ছেন? আমাকে ভয় পাবার কোনো কারণ নেই। আপনার গান ভাল লাগছে, তাই দাঁড়িয়ে শুনছি।’ 

তার মুখ কিছুটা উজ্জ্বল হলেও সন্দেহ পুরোপুরি গেল না। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী নাম আপনার?’

‘আফজাল।’

এবার আমার বিস্মিত হবার পালা! মাঝারি গড়নের হালকা-পাতলা একজন মানুষ, মুখে চার-পাঁচদিন না-কামানো খোঁচাখোঁচা দাড়ি, পরনে লুঙ্গি, গায়ে বহুবার ধোয়া সাদামাটা একটা চেক জামা, নৌকার ওপর চিৎ হয়ে দু'হাত মাথার নিচে দিয়ে শুয়ে গান গাইছে। দেখে মনে হয় না অ্যাকাডেমিক শিক্ষাও খুব বেশিদূর, তবে চোখে-মুখে বুদ্ধিদীপ্তির ছাপ আছে, আছে সারল্যও। এরকম একজন মানুষ অমুসলিম হ’লে তার মুখে ‘শোনো মওলানা, মসজিদ ঘরে আল্লা থাকে না’ গানটি বেশি স্বাভাবিক মনে হতো। কিন্তু এর নাম যে আফজাল, একে নাস্তিক ভাবা অসম্ভব, সাধারণভাবে একে মুসলমান ভেবে নেওয়াই স্বাভাবিক! যেখানে এই বয়সের এবং এই শ্রেণীর অনেক মুসলমানকে রোজার দিনে টুপি পরা অবস্থায় দেখতেই আমার চোখ অভ্যস্ত, সেখানে এ কিনা গাইছে ইমলামবিরোধী গান! আফজাল সম্পর্কে দারুণ কৌতূহল জাগলো আমার।

তাকে আরো সহজ করতে বললাম, ‘আফজাল ভাই, আপনার কণ্ঠটা বেশ সুরেলা।’

প্রশংসা শুনে তার চোখে-মুখে লাজুক ভাব পরিস্ফুট হলেও ভেতরের সন্দেহ পুরোপুরি দূর না হওয়ায় সে বললো, ‘আপনারে তো আগে দেখি নাই?’

‘আমি প্রত্যেক শুক্রবার সকালে গার্ডেনে হাঁটতে এসে এখানে বসি।’

‘ও, আমি আজকাল এট্টু বেলা ক’রে আসি, তাই বোধহয় আপনারে দেকিনি। একানে যারা হাঁটতি আসে, তারা প্রায় সকলেই আমার চেনা।’ 

বললাম, ‘আপনি কী করেন?’

‘এই যে ভাবের ঘাটের মাঝি।’ 

নাম জিজ্ঞাসা করলে মোহাম্মদ আফজাল না ব’লে শুধু আফজাল বললো, পেশা জিজ্ঞাসা করলে জানালো ভাবের ঘাটের মাঝি! কোনোটাই সহি ইসলামী উত্তর হলো না! 

বললাম, ‘আপনি আমাকে দেখে ভড়কে গেলেন কেন?’

‘ভাবলাম, গান শুনে আপনি যদি রাগ করেন। কিছু মনে না করলি এট্টা কতা জিজ্ঞেস করি?’

‘হ্যাঁ, করেন।’

‘আপনি হিন্দু না মোছলমান?’

‘আমি মানুষ।’

এবার সে উৎফুল্ল, ‘জয়গুরু, এতোদিনে একজন মানুষির দেখা পালাম এই ঘাটে। খালি হিন্দু-মোছনমান দেকতি দেকতি চোখ বড় কিলান্ত!’

আরে, এ যে অন্য মানুষ! রাস্তা-ঘাটে প্রতিনিয়ত যেসব আফজাল-তোফাজ্জল-মোফাজ্জল দেখি, এ তো তেমন নয়; ভিড়ের ভেতরে থাকলেও এ ভিড়ের লোকজন নয়, মানুষ। 

বললাম, ‘আফজাল ভাই, আপনি যে গানটি গাইছিলেন, এটা কার লেখা?’ 

‘মাতাল রাজ্জাক দেওয়ানের লেখা।’ 

মাতাল রাজ্জাক দেওয়ানের গান আমি শুনেছি। বাংলাদেশে খুব কম মানুষই আছে, যারা তার লেখা গান শোনেনি! রেডিও, টেলিভিশনে, মাইকে, হাট-বাজারের দোকানে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে; ঢাকা শহর থেকে শুরু ক’রে অজো পাড়াগাঁয়েও শুনতে পাওয়া যায় তার লেখা ‘আমার ঘুম ভাঙাইয়া দিল গো মরার কোকিলে’ গানটি। অধিকাংশ মানুষই হয়তো জানে না এই গানের গীতিকার কে, মাতাল রাজ্জাক দেওয়ান নামটি মানুষের কাছে না পৌঁছালেও তার গান ঠিকই পৌঁছে গেছে। গানের এই এক দারুণ শক্তি! এ সময়ের শিল্পীরা রেডিও-টেলিভিশনে কিংবা মঞ্চে এই গানটি গাইতে গাইতে মুখে ফেনা তুলে ফেলে! কিন্তু এরা কখনোই গায় না ‘শোনো মওলানা, মসজিদ ঘরে আল্লাহ্ থাকে না’ গানটি! গাইলে শিল্পী যেমনি অসুবিধায় পড়বে, তেমনি টিকে থাকার সংকটে পড়বে ওই রেডিও বা টেলিভিশনও। ফলে রেডিও-টেলিভিশনে খণ্ডিত মাতাল রাজ্জাকের চর্চা হয়, যেমন হয় খণ্ডিত নজরুল কিংবা বেগম রোকেয়ার চর্চা। ভবিষ্যতে হয়তোবা তসলিমা নাসরিনের গায়েও মুসলমান ট্যাগ লাগিয়ে তার সাহিত্যের খণ্ডাংশের চর্চা করা হবে! তথাকথিত মডারেট বাঙালি মুসলমান সমাজে ইসলামের প্রকৃত সত্যের ওপর সমকালীন সমাজ-সভ্যতায় প্রতিষ্ঠিত ন্যায় ও সততার একটা আবরণ দিয়ে উপস্থাপন করা হয়; একটা মিথ্যা বা ভুল ইতিহাসকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত কারার চেষ্টা, চর্চা, প্রচার করা হয়; এর অসংখ্য প্রমাণ আছে। আমার বড় আপু কমার্সের ছাত্রী ছিল। ক্লাস নাইনের ‘ব্যবসায় শিক্ষা’ বইয়ে টাঙ্গাইলের দানবীর রণদাপ্রসাদ সাহার সংক্ষিপ্ত জীবনী ছিল। বড় আপু যখন জোরে জোরে রণদাপ্রসাদ সাহার জীবনী পড়তো, তখন আমরাও শুনতে পেতাম। আমার ছোট মনেও দারুণ প্রভাব ফেলেছিল সেই গল্প; কয়লা বিক্রি ক’রে জীবন শুরু করা ছেলেটির একদিন ধনপতি হয়ে ওঠা, তারপর সমাজসেবা করা, বিভিন্ন দাতব্য এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা আর একাত্তরে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে তার মৃত্যু। রণদাপ্রসাদ নামক অদেখা মানুষটির প্রতি ভীষণ শ্রদ্ধা জন্মেছিল, মনে হয়েছিল বড় হয়ে যদি আমিও এমন হতে পারতাম! বড় আপুর পড়া শুনে বালকসুলভ কৌতূহল থেকেই চাচাকে রণদাপ্রসাদ সাহা সম্পর্কে এটা-ওটা প্রশ্ন করেছিলাম। চাচা বলেছিলেন, ‘রণদাপ্রসাদ তো হিন্দু, রণদাপ্রসাদের চেয়েও বড় একজন মুসলমান দানবীর ছিলেন; তার নাম হাতেম তাই, দানবীর হাতেম তাই।’ তারপর চাচা দানবীর হাতেম তাইয়ের গল্প বলেছিলেন, পরে বইয়ে আমিও হাতেম তাইয়ের গল্প পড়েছি। আমি আরো বেশ কয়েকজনকে গদগদ হয়ে হাতেম তাইয়ের কথা বলতে শুনেছি। হাতেম তাই আজ মুসলমানদের গর্ব, বাংলাদেশের মুসলমান আজ বুক ফুলিয়ে একজন মুসলমান হাতেম তাইয়ের গল্প বলে; কিন্তু তারা এই সত্যটা বলে না যে, স্বয়ং মুহাম্মদ হাতেম তাইয়ের গোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ ক’রে তাদের ধন-সম্পদ লুটপাট করেছিলেন আর জোরপূর্বক হাতেমের সন্তানদেরকে ধর্মান্তরিত ক’রে মুসলমান বানিয়েছিলেন। 

আমি আফজাল ভাইকে অনুরোধ করলাম, ‘আপনি পুরো গানটা গেয়ে শোনাবেন?’

‘শোনাবো না ক্যান! আসেন, নৌকায় উঠে আসেন।’

আমি কেড্স খুলতে গেলে সে বললো, ‘জুতো খুলতি হবিনানে, অমনেই আসেন।’

নৌকায় উঠতে উঠতে বললাম, ‘আপনার গ্রামের বাড়ি কোথায়?’

‘কুষ্টিয়া।’

‘আপনি তো লালনের পড়শি!’

খুশি যেন ঝিলিক দিয়ে উঠলো তার চোখে-মুখে, ‘আমার পরম সৌভাগ্য যে, সাঁইজির পূণ্যভূমিতে জন্ম নিতি পারিছি।’ বলেই দু'হাত এক ক’রে বুঝিবা লালনের উদ্দেশে প্রণাম করলো, ‘সব সাঁইয়ের কৃপা, জয়গুরু।’

লালনের, ‘আখড়ায় গেছেন?’

‘কতো! দিন-রাত প’ড়ে থাকিছি, এখনো যাই!’

‘শোনান দেখি গানটা।’

আফজাল ভাই মসজিদ-মাদ্রাসার দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবলো, তারপর জানতে চাইলো, ‘ভাইডির হাতে কি সময় আছে?’

‘হ্যাঁ, অফুরন্ত। কেন?’

‘তালি চলেন, নৌকা নিয়ে দূরি যাই। আমি তো একা একা গুনগুন ক’রে গাচ্ছিলাম, গলা খুলে না গালি কি গানের মর্ম বুঝা যায়! কিন্তু গলা খুলে যে গাব, ওই দ্যাহেন না... শুনলি ঘাড়ের ওপর এট্টা কোপ মারবিনি, দ্যাশগাঁয়ে যা শুরু অয়চে।’ 

চোখের ইশারায় মসজিদ-মাদ্রাসা দেখালো সে। বললাম, ‘আপনার তো ক্ষতি হবে, এর মধ্যে যদি খ্যাপ মিস হয়ে যায়!’

বাতাসের মুখের বকফুলের শুকনো পাতার মতো সে উড়িয়ে দিলো আমার কথা, ‘ধুর! আফজাল ভাবের ঘাটের মাঝি ভাইডি, ওই খ্যাপখুপ নিয়া ভাবিত নয়! জীবনের সবচেয়ে বড় খ্যাপই তো মানুষসঙ্গ; কিন্তু জানেন ভাইডি, আমরা নিত্যদিন লোভ-লালসার এতো ক্ষ্যাপ মারি যে, জীবনের আসল খ্যাপ মারতি-ই ভুলে যাই! সাঁইজি বলেছেন - মানুষ ছেড়ে খ্যাপা রে তুই মূল হারবি, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।’ 

মানুষসঙ্গ, মন্দ বলেনি তো! আমাদের নাগরিক জীবনে মানুষসঙ্গের বিলুপ্তি ঘটতে চলেছে, নাগরিক জীবনে এখন রমরমা চলছে অঙ্গসঙ্গ আর মেকি সৌজন্য! বুঝলাম যে, আফজাল আবেগ-ভাবাবেগে ভরপুর অন্য এক মানুষ। নৌকার শিকল খুলে সে বৈঠা বাইতে শুরু করলো। 

একটা খালি কার্গো লঞ্চ পেট ভরার উদ্দেশে আমাদের সামনে দিয়ে গাবতলীর দিকে চ’লে গেল। বললাম, ‘এখন তো এদিকটায় মানুষ আসা কমে গেছে, আয়-রোজগারও নিশ্চয় কমে গেছে, অসুবিধা হয় না?’

‘দুনিয়াডাই তো এট্টা অসুবিধার জায়গা! তয় যার চালানোর, সেই-ই চালায়।’

ভাবলাম ওপরওয়ালার কথা বলছে, বেশিরভাগ মানুষ যেমন বলে। পরমুহূর্তেই খোলাসা হলো তার কথায়, ‘বউ-ই সংসার চালায়, বাড়িতে দর্জির কাজ করে সে। আমার আয়ে সংসারের কিছুই অয় না।’ 

আফজাল ভাইয়ের কিছু বাক্য এরই মধ্যে আমার কানে গেঁথে গেছে; ‘ভাবের ঘাটের মাঝি’, ‘জীবনের সবচেয়ে বড় খ্যাপই তো মানুষসঙ্গ’, ‘দুনিয়াডাই তো এট্টা অসুবিধার জায়গা’। বাক্যগুলোর মধ্যে একটা বৃহত্তর ব্যাপার আছে। 

আমরা তুরাগ পেরিয়ে পানিভাসা মাঠটাতে পৌঁছে গেছি। মাঠে এখন অথৈ পানি। শুকনো মৌসুমে পানি নেমে গেলে এখানে ধান চাষ করা হয়। আরো কিছুদূর যাবার পর আফজাল ভাই বৈঠা রেখে নৌকার পানি সেচার জন্য রাখা গামলাটা হাতে নিয়ে পাটাতলে এসে বসলো। তারপর গামলায় আঙুল ঠুকে গাইতে শুরু করলো গান: 

আলেম গেছে জালেম হইয়া, কোরআন পড়ে চণ্ডালে,
সতী-সাধুর ভাত জোটে না, সোনার হার বেশ্যার গলে।
মুখে মুখে সব মোছলমান কাজের বেলায় ঠনঠনা
শোনো মাওলানা, মসজিদ ঘরে আল্লাহ থাকে না।
যদি মক্কায় গেলে খোদা মিলতো নবী মিলতো মদিনায়, 
দেশে ফিরে কেউ আইতো না হজ্ব করিতে যারা যায়।
কেউ যায় টাকা গরমেনে, কেউ যায় দেশ ভ্রমণে,
ধনী যায় ধনের টানে আনিতে সোনাদানা
ওরে মাওলানা, মসজিদ ঘরে আল্লাহ থাকে না।
হজ্ব করিতে মক্কায় গিয়া খরচ করলি যে টাকা
বলি, এই টাকা গরীবরে দিলে গরীব আর থাকে কেঠা?
তোর ঘরের ধন খায় পরে, দেশের লোক না খাইয়া মরে,
সত্য কথা বললে পরে দেশে থাকতে পারি না।
ওরে মাওলানা, মসজিদ ঘরে আল্লাহ থাকে না।
দ্বীনহীন রাজ্জাকে বলে, মানুষে মানুষ রতন
বলি, এই মানুষকে ভালোবাসো বেঁচে আছো যতোক্ষণ।
মানুষ চিনতে করিস ভুল তবে হারাবি দুই কূল
ওরে মূল কাটিয়া জল ঢালিলে ঐ গাছে ফুল ফোটে না
শোনো মাওলানা, মসজিদ ঘরে আল্লাহ থাকে না। 

আফজাল ভাইয়ের মুখে গানটির দুটো লাইন শুনে আমার ভেতরে যে আশার ফুল ফুটেছিল, গানটির প্রথম দুটো লাইন শোনার পর ফুলটি মলিন হয়ে গেল! এক কলসি দুধের মধ্যে দুই ফোঁটা চনা পড়লে পুরো কলসির দুধ যেমনি নষ্ট হয়, প্রথম দুটো লাইনও তেমনি পুরো গানটির জোরালো বক্তব্যকে খাটো করেছে। যদিও ‘মানুষ চিনতে করিস ভুল তবে হারাবি দুই কূল’ কিংবা ‘ওরে মূল কাটিয়া জল ঢালিলে ঐ গাছে ফুল ফোটে না’; এই লাইন দুটিতে লোককবি মাতাল রাজ্জাক দেওয়ান যা বোঝাতে চেয়েছেন ব্যক্তিগতভাবে আমি তার সাথে একমত নই। কিন্তু এই লাইনদুটো গানটিকে কলঙ্কিত করেনি, যেটা করেছে প্রথম দুই লাইন। তবে আফজাল ভাই গানটি গেয়েছে ভাল। তার গায়কীর প্রশংসা ক’রে বললাম, ‘আপনি দারুণ গেয়েছেন আফজাল ভাই। কিন্তু গানটির দুটো লাইন আমাকে খুব আশাহত করেছে।’ 

প্রথম বাক্য শোনার পর তার মুখে যে রোদের আবির্ভাব হয়েছিল, দ্বিতীয় বাক্য শোনার পর তা ছায়াময় হয়ে গেল, ‘ক্যান? গানে তো সত্য কতাই কয়ছে।’

হ্যাঁ মসজিদ, মক্কা, হজ্জ্ব, খোদা এসব নিয়ে যা বলেছে, তা সত্য। কিন্তু প্রথম লাইনে বলেছে, ‘আলেম গেছে জালেম হইয়া, কোরআন পড়ে চণ্ডালে। এখানে চণ্ডাল শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে খারাপ অর্থে। তাতে চণ্ডালদেরকে হেয় করা হয়েছে, জাত্যাভিমান ফুটে উঠেছে। যতো মূল্যবান বা যে গ্রন্থই হোক, তা পড়ার অধিকার পৃথিবীর সকল মানুষেরই আছে - হোক সে চণ্ডাল, মুচি, মেথর। আবার দ্বিতীয় লাইনে বলেছে, ‘সতী-সাধুর ভাত জোটে না, সোনার হার বেশ্যার গলে।' এখানেও বেশ্যা শব্দটি খারাপ বা মন্দ অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। ছোট করা হয়েছে দেহপোজীবীনিদেরকে। একজন মানুষ হয়তো পরিস্থিতিরি চাপে পড়ে দেহ বিক্রি করে, দুটো খেয়ে-প’রে বেঁচে থাকার জন্য দেহ বিক্রি করে; তার মানে এই নয় যে, সে মানুষ হিসেবে খারাপ। তার দেহ বিক্রি করার জন্য সে নয়, দায়ী আমাদের এই সমাজ-রাষ্ট্র। আমি কি ভুল বললাম, আফজাল ভাই?’ 

আফজাল ভাই কয়েক মুহূর্ত দম ধ’রে থেকে বললো, ‘কতা সত্যি, আপনি ঠিকই কয়ছেন। এমন ক’রে তো ভাবি নাই।’ 

মাতাল রাজ্জাক দেওয়ান একজন স্বশিক্ষিত লোক কবি-শিল্পী। অনেক গান তিনি রচনা করেছেন। একাত্তরে দেশপ্রেমের গান লিখেছেন, বেহালা বাজিয়ে গ্রামে ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন। তিনি লেখাপড়া বেশি না জানলেনও গভীর নিমগ্নতায় পড়েছেন সমাজ; সমাজের মানুষের ভণ্ডামীপূর্ণ চরিত্র, বৈষম্য, কপট ধর্মপরায়ণতা ইত্যাদি। তার লেখায় এসব বাস্তবচিত্র উঠে এসেছে। কিন্তু সচেতন শিক্ষার অভাবে হোক বা তার অসচেতনতার কারণেই হোক, সমাজের কিছু গোঁড়ামি এবং সংস্কার তার ভেতরেও রয়েই গেছে এবং নিজের অজান্তেই তা তিনি লালন করেছেন। ফলে একজন প্রতিবাদী-মানবতাবাদী লোককবি হয়েও সমাজের আর পাঁচজন আটপৌরে মানুষের মতোই চণ্ডাল এবং দেহপোজীবীনিদের খারাপ ভাবতে এবং তাদেরকে ঘৃণা করতে শিখেছেন। আবার ‘কোরান পড়ে চণ্ডালে’ এই বাক্যটির মাধ্যমে এটাও স্পষ্টত বোঝা যায় যে, আর পাঁচজন ধার্মিক মুসলমানের মতো তিনিও কোরানকে উচ্চমার্গের ধর্মগ্রন্থই মনে করেন, ফলে বাক্যটির মধ্যে তার আক্ষেপও ধরা পড়ে। আমার ধারণা, তিনি কখনোই কোরান পড়েননি, কোরান সম্বন্ধে গভীর উপলব্ধি তাঁর ছিল না। তিনি যদি কোরান পড়তেন এবং বিশ্বাস করতেন তাহলে হয় তিনি ধার্মিক হয়ে যেতেন এবং ওই গানটি তো বটেই, কোনো গানই লিখতেন না; আর না হয় তিনি কোরানকে ঘৃণা করতেন। কেবল তিনি নন, অনেক লোককবি, বাউল-ফকিরদের মধ্যেই এই ধরনের বিভ্রান্তি আছে। 

আফজাল ভাইকে বললাম, ‘আফজাল ভাই, আপনার কথা শুনে বুঝেছি মুসলমান পরিচয়ের চাইতে মানুষ পরিচয়ই আপনার কাছে মূখ্য; তবু আপনার ব্যক্তিগত কিছু বিষয়ে জানতে চাই, যদি কিছু মনে না করেন।’ 

‘না না, কী মনে করবো! আপনি কন, কী জানতি চান।’ 

‘আপনি কি নামাজ পড়েন?’

‘না।’

‘ঈদের নামাজও না?

‘না।’ 

‘বাড়িতে ঈদ পালন করেন না?’

‘আগে করতাম, এখন আর করি না।’ 

‘ভাবী?’

‘সেও তো আমারই মতো। আমরা হলাম গিরিহী বাউল। লতা দুডোর জন্যেই একজাগা পড়ে থাহে সংসার করতিছি।’

‘লতা মানে?’

‘ও আপনি তো আবার এসব কতা বোজবেন না, বাউল-ফকিরি ভাষায় লতা মানে সন্তান। লতা দুডে বড় হলি ওগের বিয়ে দিয়ে সংসারের ভার ওগের হাতে বুজায়ে দিয়ে আমরা বুড়ো-বুড়ি গুরুর আখড়ায় চ’লে যাব, ভজন-সাধনে মন দেব।’

‘আপনার গুরুর আখড়া কোথায়?’

‘মেহেরপুর।’

‘আচ্ছা, আপনি কি কোরান-হাদিস এগুলো বিশ্বাস করেন?’

‘আমরা তো শরিয়তী জীবন-যাপন করিনে, মওলানাগের মতো দ্যাকনদারি ধর্মকর্মেও আমাগের আস্থা নাই। নামাজ কন আর রোজা কন, গানই আমাগের সব। তয় ছোটবেলার তে কোরান-হাদিসের প্রতি সব মুসলমান সন্তানের যেমন ভক্তিছোদ্ধা থাকে, আমারও তেমন ছিল। আপনারে খুলেই কই ঘটনাডা। বছর দুই আগে, ওই যেদিন শাপলা চত্বরের দখল নিছিল হেফাজতে ইসলাম। তার ভিতরে আমি শনির আখড়ায় ভায়রার বাসায় যায়ে আটকা পড়ে গেলাম। মতিঝিল-পল্টন এলাকা তখন রণক্ষেত্তর। তার ভিতরে শালী আমারে কোনোভাবইে ছাড়লো না, বউও ফোন ক’রে আসতি নিষেধ করলো, তো থাকলাম আর টিভিতি দ্যাকলাম ওগের তাণ্ডব; আট থেকে আশি, সব বয়সের মুছল্লিরা ভাঙচুর করতেছে, আগুন দেচ্ছে, কী না করতেছে! কী যে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়ছে তা নিশ্চয় আপনি দেখিছেন, নতুন ক’রে আর কী কব।’

আমি আফজাল ভাইয়ের চোখের ভেতর দেখতে পাই মতিঝিল, পল্টন, বিজয়নগর, শান্তিনগর, বংশাল, গুলিস্তান, ফুলবাড়িয়াসহ আরো কিছু এলাকায় হেফাজতে ইসলামের উন্মত্ত হাজার হাজার কর্র্মী-সমর্থকদের দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আট ঘন্টাব্যাপী সেই তাণ্ডব; যা ঘটানো হয় নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তি এবং ধর্ম অবমাননাকারীদের মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন পাসসহ ১৩ দফা দাবিতে আল্লামা শফির ডাকে ‘ঢাকা অবরোধ’ কর্মসূচী পালনের নামে। সারা দেশের কওমি মাদ্রাসা থেকে তাদেরকে একত্রিত করা হয়। আল্লাহু আকবর স্লোগানে মুখরিত ক’রে তারা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে এগোয় মতিঝিলের দিকে, ককটেল-হাতবোমা ফোটায়, বৃষ্টির মতো ইট-পাটকেল ছোঁড়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে; মুহাম্মদের দীক্ষায় দীক্ষিত আল্লাহ্’র সৈন্যরা পুলিশের জলকামান, টিয়ার গ্যাসের শেল কিংবা রাবার বুলেটকেও পরোয়া করে না; তারা তো জীবন দিতেও প্রস্তুত; তারা জেনেছে মরলে শহীদ, নিশ্চিত বেহেশ্ত; আর বেহেশ্ত মানেই তো বাহাত্তর হুরি, বালক গেলমান, মদের নহর, চাওয়ামাত্র ফলফলাদি আরো কতো কী! ইসলামের জন্য জিহাদ করতে করতে জীবন দেওয়ার চেয়ে পবিত্র কাজ একজন মুসলমানের জন্য আর কী হতে পারে! জিহাদে মৃত্যু মানেই বেহেশ্ত, এমন সুযোগও তো আর সচরাচর মেলে না। বেহেশ্তের নেশা তাদের রক্তের মধ্যে চলকে ওঠে, মরণের নেশা তাদের মগজের মধ্যে বিদ্যুতের মতো ঝলকায়, ধ্বংসের নেশায় তারা হিংস্র-উন্মত্ত হয়ে ওঠে। হাতের লাঠি এবং বাঁশ দিয়ে তারা শতশত যানবাহন ভাঙচুর করে, বায়তুল মোকাররম মার্কেটসহ বিভিন্ন মার্কেটে হামলা চালিয়ে দোকানপাট ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ করে; বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির অফিস মুক্তিভবন, ট্রাফিক পুলিশের কার্যালয়সহ আরো অনেক প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ করে; গাড়ি-মোটর সাইকেল পোড়ায়, ফুটপাতের রেলিং-ডিভাইডার ভাঙে, ঢিল ছুড়ে বিভিন্ন ভবনের গ্লাস ভাঙে, ফুটপাতের হকারদের শত শত দোকানের মালামাল আর তাদের বেঞ্চ-টুল-টেবিল-চৌকি রাস্তায় এনে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়; সমগ্র এলাকার বিভিন্ন রাস্তা থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে কালো ধোঁয়া উঠতে থাকে, রাতের অন্ধকার পালিয়ে যায় আগুনের লেলিহান শিখায়। নারী সাংবাদিকসহ অনেক সাংবাদিককে বেধড়ক পিটিয়ে তাদের ক্যামেরা ভাঙচুর করে, তাদের হাত থেকে রেহাই পায়না ডিভাইডারের গাছ এবং ল্যাম্পপোস্টও। যেন ইসলাম রক্ষার এক মহাযুদ্ধ! ভীত মানুষ ঘরে অবরুদ্ধ, জনজীবন বিপর্যস্ত; আমরা তো নয়ই, আমাদের আগের প্রজন্মও বোধ হয় ১৯৭১ ব্যতীত ঢাকায় এমন তাণ্ডব দেখেনি। 

আফজাল ভাই বলেই চলে, ‘পরদিন ভোররাতেই তো র‌্যাব-পুলিশের লোকেরা হায়েনাগুলোরে শাপলা চত্বর থেকে তাড়ায়ে দিলো। তারপর বেলা নয়টার দিক আমি ভায়রার বাসার থেকে রওনা দিলাম। মতিঝিল দিয়ে বাস তখনও ঢুকতি পারতিছে না। আমি রাজধানী সুপার মার্কেটের কাছে নেমে হাঁটা শুরু করলাম। মনে হলো, রাস্তা তো না যেন যুদ্ধ শ্যাষের কারবালা! রাস্তাভরা খালি ইটের টুকরো, আগুনে পোড়ানো-ভাঙচুর করা ফুটপাতের দুকানপাট, পোড়া ছাই-বাঁশ-কাঠ, আধপোড়া বেঞ্চ-চকি, আগুনে পোড়া মোটর সাইকেল, বিল্ডিং আর গাড়ির ভাঙা কাঁচ, কী নাই সেখানে! অবলা গাছও ওগের হাত থকে রেহাই পায়নি, কিছু গাছ কাটেছে কিছু উপড়ায়ে ফ্যালেছে।’

আফজাল ভাইয়ের এই কথায় আমার মনে পড়লো মুহাম্মদ এবং তার শিষ্যদের দ্বারা মদিনার ইহুদি বানু নাদির গোত্রকে অবরোধের কথা। মুহাম্মদ এবং তার শিষ্যরা বানু নাদির গোত্রের বসতি চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেছিল, এরপর তারা পামগাছ কেটে আগুন জ্বালিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল। অন্য কোনো উপায় না থাকায় শেষ পর্যন্ত বানু নাদির গোত্র নির্বাসনে যাবার শর্তে মুহাম্মদের কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং নির্বাসনে চ’লে যায়। মুহাম্মদ তাদের ফেলে যাওয়া ধনসম্পদ নিজে এবং শিষ্যদের মধ্যে ভাগ ক’রে নেন। 

আফজাল ভাই বলতেই থাকে, ‘বাইতুল মোকাররম মসজিদের কাছে এসে সর্বস্ব হারানো ফুটপাতের দুকানদারগের বুক চাপড়ায়ে কান্দা দেখে চোখ ফাটে পানি চ’লে আসলো আমার। হায়রে মোছলমান! মোছলমান-মোছলমান নাকি ভাই ভাই, কোনো ভাই নাকি ভাইয়ের দুকান অমনে পুড়াতি পারে! আমি দেখি আর তাজ্জব ব’নে যাই; দুকানদাররা পুড়া-আধপুড়া কাপড়-চোপড়, বই-পুস্তক, নানারকম জিনিসপত্তর দুই হাতে তুলে মানষিরে দেখাতিছে আর হাউমাউ ক’রে কানতিছে। ভাইডি, আর এরপর আমি যা দ্যাকলাম, তা আমি স্বপ্নেও কোনোদিন ভাবি নাই! দেখি কি, পুড়া-আধপুড়া কুরান, হাদিসসহ নানান রকম ধর্মীয় বইপুস্তক! বুকের মইদ্যে য্যান ঘা লাগলো! এক দুকানদার আগুনে পুড়া কোরান-হাদিসের পাতা নিয়ে আহাজারি করতিছে আর মানুষরে দেখাতিছে। আমার মুখি আর কোনো কতা নেই, আমি তাকায়ে দেখি কোরান-হাদিসের পুড়া পাতার আরবি অক্ষর; দেখি আর ভাবি এরা কেমন মুসলমান যে নিজেগের ধর্মগ্রন্থও আগুনে পুড়ায়ে ছাই ক’রে দেয়! আমি কয়েকটা পুড়া পাতা উল্টায়ে-পাল্টায়ে দ্যাকলাম, তারপর ছাইয়ের গাদার মইদ্যে একখান কোরান পালাম, ওপরের মলাট আর দুই-তিন পাতা মাত্র পুড়িছে। ছাই-টাই ঝাড়ে-ঝুড়ে কোরানখান আর অর্ধেক পুড়া একখান সহি বোখারী শরীফ নিয়ে আলাম। ভাবলাম, জীবনে তো টাকা দিয়ে কিনে কোরান-হাদিস পড়ি নাই, ফাউ পায়ে এট্টু পড়ে দেখি। কোরান-হাদিস দুইখান লালসালুতে মুড়াইয়ে যত্ন ক’রে রাখলাম ঘরে। মাঝে-মইদ্যে পাতা উল্টায়ে-পাল্টায়ে পড়তাম। ভাইডি, বললি বিশ্বেস করবেন না, একদিন রাত্তিরি কিছু আয়াত পড়ার পর আমার কান দিয়ে য্যান ধুমো বাইর হতি লাগলো! নিজেরে বিশ্বাস করাতিই আমার কষ্ট হতিছিল যে, এসব কতা কি কোরানে লেখা! সেই রাত্তিরি আমি ঘুমালাম না, খালি পড়তিই লাগলাম আর পড়তিই লাগলাম। হাদিসে কিছু পাতা প’ড়ে দ্যাকলাম। কী সব ভয়ংকর কতা; আল্লাহ্ ইসলামে অবিশ্বাসীগেরে ঘাড়ের ওপর কোপ মারতি কয়ছে, অবিশ্বাসীগের ধনসম্পদ আর নারী লুঠ করতি কয়ছে! এমন ধারার আরো কতো কতা লেকা! অস্বীকার করবো না যে, কিছু ভাল কতাও লেখা ছিল না, কিন্তু কী করবো আমি অমন ভাল কতা দিয়ে যদি আপনি মানুষ হয়ে নির্দোষী মানুষরে মারতি কন, ধন-সম্পদ লুঠ করতি কন! রাত অর্ধেকের বেশি পার হলি এট্টুখানি চোখ বুজলাম, তারপর ভোরবেলায় উঠে কাউরে কিছু না ক’য়ে লালসালু মুড়ানো কোরান আর হাদিসখান নিয়ে ঘরের থেকে বাইর হলাম। এই ঘাটে আসে নৌকা খুলে মাঝনদীতে আসলাম, তারপর কোরান-হাদিস ছাড়ে দিলাম নদীর পানিতি। য্যান বুক থেকে একটা পাথর নামায়ে হাঁফ ছাড়ে বাঁচলাম, দরকার নাই আমার অমন ধর্মগ্রন্থ, যে ধর্মগ্রন্থ মানুষ খুন করতি কয়! ঘরে কোরান-হাদিস রাখে আমি তো মরেও শান্তি পাতাম না, ছাওয়ালদুডো যদি ওই কোরান-হাদিস প’ড়ে খুনোখুনি শেখে! গান-বাজনা আর আধ্যাত্মিক সাধনা নিয়ে আছি ভাইডি, তাই নিয়েই থাকি। উপরওয়ালা থাকলি আছে, না থাকলি নাই। কারো দুই পয়সা মারে খাই নাই, চুরি-চামারি করি নাই, কারো গলায় ছুরি ধরি নাই; মরার পর যা হয় হবি, আমার মরণ বলে কোনো ভয়-ডরও নাই।’ 

আমি বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম আফজাল ভাইয়ের দিকে, তার লেখাপড়া বেশি নয়, আধ্যাত্মিক চিন্তুা-ভাবনার মানুষ; কিন্তু কোরান-হাদিসের সহজ কথাটা সে সহজভাবেই বুঝেছে, যা আমাদের তথাকথিত দেশ-বিদেশের ডিগ্রিধারী শিক্ষিতরা বুঝতে চায় না! 

শ্রাবণের আকাশভরা মেঘ, পানির বুকে মেঘের চঞ্চল প্রতিবিম্ব; নৌকায় বসা আমরা স্রোতের বাইরের দু'টি মানুষ, ভেসে চলেছি ভাটির দিকে। যদিও আধ্ত্মিোকতা আমার পথ নয়, আবার নাস্তিকতার পথও আফজাল ভাইয়ের নয়; তবু আমার মনে হলো যে, আমরা কেউ কাউকে শারীরিক এবং মানসিক পীড়ন না ক’রে একই নৌকায় এভাবে পাড়ি দিতে পারবো মহাকালের অনন্ত পথ, চলতে চলতে পানির বুকে একটা শালুক পেলেও দু’জনে ভাগ ক’রে খেতে পারবো। 

শ্রাবণের ওই মেঘলা দিনটি থেকেই আফজাল ভাইয়ের সঙ্গে আমার সখ্যতার শুরু, এরপর বন্ধুত্ব আরো প্রগাঢ় হয়েছে, হয়েছে গভীর নৈকট্য। আপনি'র ব্যবধান ঘুচিয়ে আমরা একে অপরকে তুমি সম্বোধন করি। প্রায় প্রতি শুক্রবারেই আফজাল ভাইয়ের সঙ্গে এখানে কিছুক্ষণ আড্ডা দিই, নাস্তা করি, আবার আড্ডা দিই; তারপর বাসায় ফিরি। আর এখন কেবল আমার সঙ্গেই নয়; শাশ্বতীদি, পরাগদা এবং আবিরের সঙ্গেও আফজাল ভাইয়ের বন্ধত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। 

আমি তিনবার আফজাল ভাইয়ের বেড়িবাঁধের ওপাশের বাড়িতে গিয়েছি; প্রথমবার একা, দ্বিতীয়বার আবিরের সঙ্গে, তৃতীয়বার শাশ্বতীদি-পরাগদা-আবিরের সঙ্গে। 

প্রথমবার বাড়িতে ঢোকার মুহূর্তের স্মৃতিটা দারুণ! আফজাল ভাইয়ের ছয় বছর বয়সী বড় ছেলে স্কুল থেকে ফিরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে প্যান্ট খুলছে, পাশেই ছিল সবে হাঁটতে শেখা এবং আধো আধো কথা বলা ছোট ছেলে, সে বড় ভাইকে ন্যাংটা দেখে দু'পা এগিয়ে টপ ক’রে টাকি মাছ ধরার মতো বড় ভাইয়ের নুন ধ’রে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বলছিল, ‘নুনু...নুনু...বাই নুনু...!’

বেড়িবাঁধের কাছেই আফজাল ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি, বলা যায়, ওটাই এখন তার নিজের বাড়ি। তিনি কাঠা জমির ওপর ইটের গাঁথুনি দেওয়া টিনের দুটো ঘর, আরেকটা ছাপড়া; মাঝখানে এক চিলতে উঠোন। আফজাল ভাইয়ের শ্বশুর নেই, শাশুড়ি আছেন, তাদের সাথেই থাকেন। শ্বশুরের দুই মেয়ে, একজন তার স্ত্রী, আরেকজন বরের সাথে থাকে শনির আখড়ায়; মাসে এক-দু'বার আসে বেড়াতে। 

বিয়ের আগে আফজাল ভাই ছিল কুষ্টিয়ায় তার বাড়িতে, সেখানেও সে নৌকা চালাতো গড়াই নদীতে। আয়-রোজগার মন্দ হতো না। তখন থেকেই তার যাতায়াত ছিল লালনের আখড়ায়, নানান জায়গা থেকে আগত বাউল-ফকিরদের সঙ্গে তখন থেকেই তার সখ্যতা গড়ে ওঠে। প্রায়ই তার রাত ভোর হতো আখড়ায়, সন্ধেয় আগে ঘাটে নৌকা বেঁধে ছুটতো আখড়ায়, কলকেয় টান দিয়ে বাউল-ফকিরদের সঙ্গে গান গাইতো, গভীর রাতে ওখানেই ঘুমে এলিয়ে পড়তো। সকালে দু'হাতে রক্তচক্ষু ডলতে ডলতে ছুটতো ঘাটে। আফজাল ভাইয়ের ভাষায়, ‘সে কী সুখের দিন ছিল, ভাইডি, তা তুমারে ক’য়ে বুঝাতি পারবো না!’ 

আফজাল ভাইয়ের এই সুখে ছেদ পড়লো, যখন গড়াই নদীতে ব্রিজ হলো। ব্রিজ হওয়ার পর খেয়া নৌকার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল আর আফজাল ভাইয়ের প্রয়োজন পড়লো অন্য কোনো কাজ জুটিয়ে দুটো খেয়ে-প’রে বেঁচে থাকার। এলাকার পরিচিত একজন আফজাল ভাইকে ঢাকায় এনে ঢুকিয়ে দিলো মিরপুরের মাজার রোডের একটা স’মিলে কাঠ চেড়াইয়ের কাজে। খোলা হাওয়া গায়ে মেখে গড়াই নদীতে স্বাধীনভাবে নৌকা চালানো আফজাল ভাই হঠাৎ যেন বদ্ধ কুঠুরিতে ঢুকে পড়লো! খেয়াঘাটে রোজ কতো মানুষ দেখতে পেতো সে, কতো মানুষের সাথে পরিচয় হতো, বৈঠা বাইতে বাইতে সে মানুষের কথায় কান পাততো, বিচিত্র মানুষের বিচিত্র কথা, দূর-দূরান্তের কতো অদেখা মানুষের খবরও জানতে পারতো মানুষের মাধ্যমে, প্রতিদিন নতুন নতুন অভিজ্ঞতায় ভরপুর হতো তার জীবন! সেই মানুষ এসে পড়লো ঢাকা শহরের এক স’মিলে, কাঠ চেড়াইয়ের মতো ভীষণ শ্রমসাধ্য কাজে। রাস্তা দিয়ে কতো মানুষ আসতো-যেতো, কিন্তু তাদের দিকে তাকানোর ফুসরত তার কোথায়! খেয়াঘাটের মতো না সে তাদের কথা শুনতে পেতো, না পারতো বলতে। ভেতরটা ছটফটিয়ে মরতো। সন্ধ্যার দিকে কখনো-সখনো সময় পেলেই সে শাহ আলির মাজারে যেতো, মাজারে ব’সে ব’সে মানুষ দেখতো, আগ বাড়িয়ে কথা বলতো তাদের সঙ্গে, মনে পড়তো লালনের মাজারের কথা, এ মাজার লালনের মাজারের মতো তার প্রাণের ক্ষুধা মেটাতে না পারলেও এসে ব’সে থাকতো মানুষের সঙ্গ পাবার লোভে; আবার সময় পেলেই চ’লে যেতো তুরাগের দিকে, তুরাগকে দেখে গড়াইয়ের কথা মনে প’ড়ে জল আসতো চোখে। 

শিলা ভাবী বিয়ের আগে বেড়িবাঁধ থেকে লেগুনায় উঠে স’মিলের সামনে নেমে গার্মেন্টেসে কাজ করতে যেতো। হঠাৎ বাবা মারা যাবার পর তাকে গার্মেন্টস এ কাজ নিতে হয়েছিল। শিলা ভাবীকে রোজ দেখতে দেখতেই ভাল লেগে যায় আফজাল ভাইয়ের; প্রথমে প্রস্তাব, তারপর প্রত্যাখান এবং শেষ পর্যন্ত প্রণয়; চিরায়ত পন্থাতেই তাদের প্রেম এবং পরিণয়। বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই আফজাল ভাই স’মিলের কাজ ছেড়ে নৌকা চালানো শুরু করেছে, তখন নৌকা চালিয়ে ভাল রোজগার হতো তার। আর প্রথম সন্তান পেটে আসার পর শিলা ভাবীও গার্মেন্টস এর চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে নিজে কাজ করতে শুরু করেছে। দু’জন থেকে চারজন হয়েছে, সংসারের খরচ বেড়েছে; সংসারে বিলাসিতা না থাক, সুখের অভাব নেই। আফজাল ভাইয়ের সকল উদাসীনতা-উন্নাসিকতা শিলা ভাবী ভালবেসে মেনে নিয়েছে! 

আফজাল ভাইকে ফোন দিলাম, ‘আফজাল ভাই, কোথায় তুমি?’ 

‘ভাইডি, তুমি আসে পড়িছ?’

‘হ্যাঁ।’ 

‘এই তো আমি এখনই বাইর হচ্ছি। ঘুম থেকে উঠতি দেরি ক’রে ফেলিছি। এট্টা ভাল খবর আছে।

‘কী খবর।’

‘বসো, আসে কচ্ছি।’

‘ঠিক আছে, আসো।’ ফোন কেটে দিলাম। 

কী খবর দেবে আফজাল ভাই? আমি মানুষ, প্রকৃতি আর তুরাগের বুকে ভেসে চলা কার্গো লঞ্চ-নৌকা দেখতে দেখতে তার এবং ভাল খবরের অপেক্ষায় থাকি।

(চলবে)