১০ জানু, ২০১৭

সাইমুম (উপন্যাস: পর্ব ২৪)

লিখেছেন উজান কৌরাগ


আর কী দেখবো! নিজের রুমে এসে বিছানা গুছিয়ে বাথরুমে গেলাম। ফ্রেশ হয়ে নাস্তা ক’রে চা বানিয়ে নিয়ে এসে কম্পিউটারের সামনে বসলাম। ফেসবুক খুলে দেখি নিন্দার ঝড় বইছে। সবাই স্ট্যাটাস দিচ্ছে জঙ্গিদের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতি তীব্র ঘৃণা জানিয়ে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে মানুষের স্ট্যাটাস দেখতে লাগলাম। মহা ধার্মিক মুসলমানও নিন্দা জানিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছে। এইসব গোবেচারাদের জন্য আমার করুণা হয়, এরা না জানে ইসলামের ইতিহাস, না পড়ে কোরান-হাদিস। নিজের অজান্তেই এরা ইসলামবিরোধী স্ট্যাটাস দিচ্ছে। এই বিপুল সংখ্যক তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষদের প্রতি করুণা প্রদর্শন ছাড়া আর কী করতে পারি! কী স্ট্যাটাস দেব আমি? যদি সত্য কথাটা লিখি যে, মুহাম্মদের আদর্শ ধারণ ক’রে ছয়জন প্রকৃত মুসলমান ইসলামের জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে, ব্যস, তাহলেই আমার মুণ্ডপাত শুরু হবে। আমার গায়ে ইসলামবিদ্বেষী তকমা লাগিয়ে দেবে তথাকথিত মডারেট মুসলিমরা, পূর্বেও লাগিয়েছে। এরা বুঝতে চায় না যে, ইসলাম আর পাঁচটা ধর্মের মতো নয়, ইসলামের এই রক্তপিপাসা জন্মলগ্ন থেকে। অন্যান্য ধর্মে এখন রক্তপাত নেই বললেই চলে; অধিকাংশ ধর্মপ্রবর্তকের মনে মুহাম্মদের মতো ধন-সম্পদ-নারী লুণ্ঠন আর সাম্রাজ্য বিস্তারের লালসা ছিল না, তাঁরা মুহাম্মদের মতো হত্যার উস্কানি দিয়ে কোনো গ্রন্থ নাজিল করেনি, সনাতন সংস্কৃতি ও জীবনাচারের প্রতি বিরক্ত হয়ে তারা প্রচার করেছে তাদের নতুন দর্শন ও চিন্তা, নিজের দর্শন ও চিন্তার প্রসারে তারা মুহাম্মদের মতো সন্ত্রাসের পথ বেছে নেয়নি। যদিও পরবর্তীকালে কোনো কোনো ধর্মপ্রবর্তকের উত্তরসুরীরা অবিশ্বাসীদের ওপর নির্মম নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে; কিন্তু বর্তমানে তা শূন্যের কোঠায় নেমে এসছে। কিন্তু ইসলামের অনুসারীরা জন্মলগ্ন থেকে আজ অব্দি একইভাবে বিশ্বব্যাপী রক্তের হোলি খেলছে কোরান-হাদিস আর মুহাম্মদের জীবন অনুসরণ ক’রে। 

এইসব অমানবিক ঘটনা আমাকে ব্যথিত করে, বিচলিত করে। ভেতরে ক্ষোভ জন্মায়, হাত নিশপিশ করে কিছু লেখার জন্য, শব্দরা জালে জড়িয়ে আমাকে টানে, জলবিম্বের মতো ঠেলে ওঠে ভাবনা। বুকশেল্ফ থেকে কয়েকটি রেফারেন্স বই নিয়ে হাতের কাছে রাখলাম, তারপর ওয়ার্ডে নতুন একটি পেজ খুললাম, ফেসবুকে স্ট্যাটাস নয়, ব্লগের জন্য একটি নিবন্ধ লিখবো। না চাইলেও এখন জোর ক’রে মনের পর্দায় ভেসে উঠছে বিশজন মানুষকে শিরশ্ছেদ করার নির্মম দৃশ্য, গরম রক্ত ছিটকে-গড়িয়ে যাবার বীভৎস দৃশ্য। রক্ত যেন ছিটকে বেরিয়ে শব্দ হয়ে ধাবিত হলো আমার দিকে, আমি কিবোর্ডে আঙুল স্পর্শ করতেই বিক্ষুব্ধ বাতাসের মতো ঝড় তুললো আঙুল:

ইসলাম: ধর্মকে অতিক্রম ক’রে হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক এবং সন্ত্রাসী মতবাদ

সনাতন ধর্ম মানুষের লোকাচার, লোকসংস্কৃতি - এটা বহু বছর ধ’রে একটু একটু ক’রে গ’ড়ে উঠেছে মানুষের চিন্তা, জীবনাচার, খাদ্যাভাস, কর্ম, বিশ্বাস, যৌনাচার প্রভৃতির মধ্য দিয়ে। আদিম মানুষ যখন স্বাদ-গন্ধ নিতে শিখেছে, বনের ফল কুড়িয়ে খেতে শিখেছে, পাথরে আঘাত পেলে ব্যথা অনুভব করেছে, একে অন্যের সাথে ভাব বিনিময় করতে শিখেছে, একে অন্যের শরীরের উত্তাপ অনুভব এবং যৌনসঙ্গম করতে শুরু করেছে, একটি ফল দু’জন বা অধিক লোকে ভাগ ক’রে খেয়েছে, সন্তান ভূমিষ্ট হ’লে তাকে লালন-পালন করেছে, বৃষ্টি পড়লে গুহার ভেতরে কিংবা গাছের আড়ালে আশ্রয় নিতে শিখেছে, শীত লাগলে গাছের বাকল গায়ে জড়াতে শিখেছে, অরণ্যে দাবানল শুরু হ’লে দৌড়ে পালিয়ে বাঁচতে শিখেছে; তখন থেকেই সনাতন ধর্মীয় সংস্কৃতির যাত্রা শুরু। ঐ পর্যায়ের মানুষেরাই হয়তোবা আগুন দেখে ভীত হয়ে আগুনকে পূজা দিতে শুরু করেছে, বরফ পড়ার সময় তীব্র শীতের হাত থেকে বাঁচতে বরফের পূজা দিতে শুরু করেছে, প্রখর দাবদাহ থেকে বাঁচতে সূর্যকে পূজা করেছে। এসব পূজা তারা এই বিশ্বাস থেকে করেছে যে, তাহলে আগুন হয়তো তুষ্ট হয়ে তাদের অরণ্যে দাবানল সৃষ্টি করবে না, সূর্য হয়তো তাদেরকে একটু কম দগ্ধ করবে, বরফ হয়তো শীতে একটু কম কষ্ট দেবে। পর্যায়ক্রমে এই মানুষেরাই একসময় পাথরের অস্ত্র তৈরি ক’রে পশু শিকার করতে শিখেছে, পশুর হাড় দিয়ে অস্ত্র এবং প্রয়োজনীয় দ্রব্য তৈরি করতে শিখেছে, কৃষিকাজ করতে শিখেছে, তামা আবিষ্কার এবং এর ব্যবহার শিখেছে, লোহা আবিষ্কার এবং এর ব্যবহার শিখেছে, সেই মানুষদেরই বংশধর আমরা আজকের এই আধুনিক মানুষেরা। 

কালের আবর্তে সেই আদিম মানুষেরা যতো সামনে এগিয়েছে, তাদের সনাতন ধর্মীয় সংস্কৃতির রীতি-পদ্ধতিও একটু একটু ক’রে পরিবর্তিত হয়েছে; ভিন্ন ভিন্ন যুগের মানুষেরা পুরাতন রীতি-পদ্ধতির কিছু বাদ দিয়ে যোগ করেছে নতুন কিছু রীতি-পদ্ধতি, নতুন-পুরাতনের সংমিশ্রণে সনাতন ধর্ম সামনে এগিয়েছে। মানুষ যতো সামনে এগিয়েছে, ততো তার চিন্তা-ভাবনার প্রসার ঘটেছে, বিচরণ ক্ষেত্র বিস্তৃত হয়েছে, একদিকে যেমনি হয়ে উঠেছে পূর্বের চেয়ে অধিকতর সভ্য, অন্যদিকে তেমনি হয়ে উঠেছে পূর্বের চেয়ে অধিকতর ধূর্ত এবং স্বার্থান্বেষী। কালক্রমে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে পুরোহিততন্ত্র, নিজেদের স্বার্থ কায়েম করতে সনাতন ধর্মে সৃষ্টি করেছে নতুন নতুন উদ্ভট সব রীতি-পদ্ধতি, করেছে গোষ্ঠীভেদ-বর্ণভেদ। নতুন নতুন সব আচার-অনুষ্ঠান, রীতি-পদ্ধতি আর জটিল সব তত্ত্বের ভারে সহজ-সরল আদিম মানুষের সহজ-সরল সনাতন ধর্ম যেমনি জর্জরিত হয়েছে, তেমনি জর্জরিত হয়েছে সাধারণ মানুষের জীবন। লোহা আবিষ্কারের পর কৃষিক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হলেও মুষ্টিমেয় মানুষের ধর্মীয় শোষণ-শাসনে সমাজে বাড়তে থাকে বৈষম্য। ধর্মীয় অনুশাসনে শাসকশ্রেণী সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক কাঠামো এমনভাবে তৈরি করে, যাতে সম্পদ তাদের হাতে কুক্ষিগত হয় আর তারা যুগ যুগ ধ’রে শোষণ করতে পারে সাধারণ মানুষকে। এর ফলে শোষিত-বঞ্চিত মানুষের মধ্যে ক্রমান্বয়ে ক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে, প্রচলিত রীতি-পদ্ধতির প্রতি তারা বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই শক্ত কাঠামোর ওপর দাঁড়ানো পুরনো রীতি-পদ্ধতি ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারে না। আবার বংশ পরম্পরায় প্রচলিত বিশ্বাসও তাকে পিছু টানে, ফলে তারা শোষিত হয়েও প্রচলিত বিশ্বাসের পথেই হাঁটে। কিন্তু পুরনো বিশ্বাস ঝেড়ে ফেলে কেউ না কেউ পুরনো সমাজ সংস্কারের জন্য জেগে ওঠেই, অধিকাংশই হয়তো ব্যর্থ হয়, কিন্তু কেউ কেউ কম-বেশি সফলও হয়। 

সনাতন ধর্ম ব্যতিত বেশিরভাগ ধর্ম বা দর্শনই একেকটি প্রতিবাদ সমকালীন সনাতন ধর্মীয় নীতি-নির্ধারক এবং সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে; তা ভারতবর্ষে উদ্ভূত বৌদ্ধ, জৈন, বৈষ্ণব, শৈব, শিখ প্রভৃতি ধর্ম এবং ঋষি উদ্দালক, চার্বাক, বাউল দর্শনের ক্ষেত্রে যেমনি সত্য; তেমনি মধ্যপ্রাচ্যে জন্ম নেওয়া ইহুদি, খ্রিষ্ট এবং ইসলাম ধর্মের ক্ষেত্রেও সত্য। মানব সভ্যতার উন্মেষকালের পর থেকে পৃথিবীজুড়ে এরকম আরো অনেক ধর্ম বা দর্শনের জন্ম হয়েছে স্ব-স্ব সমাজ ব্যবস্থার প্রতি অসন্তুষ্টি, অনাস্থা, বিতৃষ্ণা এবং প্রতিবাদের ফল স্বরূপ; আবার বিনাশও হয়েছে অনেক ধর্ম এবং দর্শনের, পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে গেছে চিরতরে, মানুষ এখন সে-সব ধর্ম বা দর্শনের নামও জানে না। এই যে স্ব-স্ব সমাজের প্রতি এইসব ধর্ম-প্রবর্তকদের প্রতিবাদ, একে আমি স্বাগত জানাই। আমি শ্রদ্ধা জানাই তাদের মানসিকতাকে এজন্য যে, বংশপরম্পরায় প্রচলিত পুরনো অন্ধ বিশ্বাস এবং কু-সংস্কারকে তারা অস্বীকার করতে পেরেছিলেন এবং এর প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে তাদের বোধ জাগ্রত হয়েছিল নতুন দর্শনের সন্ধানে। প্রথমত, তারা লড়াইটা করেছিলেন নিজের সঙ্গে; বংশ পরম্পরায় প্রচলিত বিশ্বাসকে অস্বীকার করাটা সহজ কাজ নয়, এর জন্য নিজের সঙ্গে অনবরত লড়াই করতে হয়; বহু সংখ্যক মানুষের মধ্যে এক-দু’জন মানুষই কেবল এই লড়াইয়ে জেতে। এইসব ধর্ম-প্রবর্তকেরা নিজেদের সঙ্গে করা এই লড়াইয়ে জিততে পেরেছিলেন। এর পরের লড়াইটা তাদের করতে হয়েছিল পরিবার এবং সমাজের মানুষের বিরুদ্ধে; যারা পুরোনো প্রথাতেই সন্তুষ্ট ছিল এবং পুরনো পথকেই মুক্তির একমাত্র পথ মনে করতো। নিজের সঙ্গে তাদের লড়াইটা কিন্তু কখনোই শেষ হয়ে যায়নি, অবিরাম চিন্তা করেছেন, নতুন দর্শনের সন্ধান করেছেন; মানুষের অদম্য কৌতূহল আর রাশি রাশি প্রশ্নের চাপ বহন করেছেন; লব্ধ দর্শন দিয়ে নির্বাপিত করেছেন মানুষের কৌতূহল, দিয়েছেন রাশি রাশি প্রশ্নের উত্তর। তাতে হয়তো কেউ কেউ সন্তুষ্ট হয়েছিল, কেউবা হয়নি। হয়নি বলেই নতুনের পাশাপাশি পুরনো সনাতন ধর্ম আজও টিকে আছে।

স্ব-স্ব ধর্ম ও সমাজের প্রতি ধর্মপ্রবর্তকদের এই প্রতিবাদী মানসিকতার প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল। শ্রদ্ধাশীল সমাজের সেইসব মানুষের প্রতিও, যারা এইসব নতুন ধর্ম ও দর্শনকে মুকুলেই বিনষ্ট না ক’রে বেড়ে উঠতে দিয়েছেন, যদিও ধর্ম-প্রবর্তকদের পথ মসৃণ ছিল না। তবুও সেই সমাজের সেইসব মানুষকে ধন্যবাদ জানাতেই হয় এজন্য যে, তারা যদি ধর্ম ও দর্শন প্রচারের শুরুতেই বুদ্ধ, পার্শ্ব কিংবা মহাবীর, উদ্দালক, চার্বাক, যীশু, মুহাম্মদ, গুরু নানককে হত্যা করতো; তবে নতুন ধর্ম ও দর্শনের উদ্ভবই হতো না। নতুন চিন্তা, নতুন দর্শনের পথ উন্মুক্ত রাখতে হবে। নতুন দর্শনের পথ যেমনি রুদ্ধ করা যাবে না, তেমনি বল প্রয়োগে পুরনো দর্শনকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টাও ত্যাগ করতে হবে। পুরনো এবং নতুন উভয় দর্শনই থাকবে, যার যে দর্শন ভাল লাগবে, সে সেটাই গ্রহণ করবে; গ্রহণ করা বা না করা ব্যক্তির স্বাধীনতার ওপর নির্ভরশীল। পৃথিবী বৈচিত্র্যময়; একই সময়ে কোথাও তীব্র দাবদাহে দগ্ধ হচ্ছে জনপদ, আবার কোথাও তুষারপাত হচ্ছে, কোথাওবা হচ্ছে ভারী বর্ষণ ও বজ্রপাত। প্রত্যেক মানুষ দেখতে একই রকম নয়; কেউ কালো, কেউ ফর্সা, কেউ খাটো, কেউবা লম্বা। জাতি বা গোষ্ঠীভেদে খাদ্যাভাস আলাদা; এমনকি একই গোষ্ঠীর মানুষ হলেও কেউ মাংস খেতে ভালবাসে, কেউ ইলিশ মাছ কিংবা কই মাছ, কেউবা নিরামিষাশী। সকলে একই রকম বা একই রঙের পোশাক পরে না; কেউবা পোশাক পরেই না, নগ্ন থাকতে ভালবাসে; যেমন-ভারতবর্ষের নাগা সন্ন্যাসী কিংবা আন্দামান-নিকোবর দীপপুঞ্জের বিভিন্ন আদিবাসী, জৈন ধর্মের মহাবীরের আদর্শে আস্থাশীল ভদ্রবাহুর অনুগামী, যারা দিগম্বর নামে পরিচিত; আফ্রিকা কিংবা ব্রাজিলের আদিবাসী। আমাদের দেশে কতো পাগল নগ্ন হয়ে ঘুরে বেড়ায়, শালীনতার দোহাই দিয়ে আমরা তাদের হত্যা করতে পারি না। প্রত্যেকের ভাললাগা-মন্দলাগা ভিন্ন ভিন্ন।

কোনো একটি দর্শন বা তত্ত্বে বিশ্বাসী মানুষ যদি তাদের দর্শনকে শ্রেষ্ঠজ্ঞান ক’রে পৃথিবীর বাকি সব দর্শন এবং দর্শনের মানুষকে ধ্বংসের প্রয়াস চালায়, তাহলে একদিকে যেমনি পৃথিবী তার বৈচিত্র্য হারাবে, অন্যদিকে লঙ্ঘিত হবে মানবাধিকার; ওই একটি দর্শন তখন আর দর্শন থাকে না, হয়ে ওঠে সন্ত্রাসী মতবাদ, আর সন্ত্রাসী মতবাদের কাছে হেরে যায় মানবতা। কিন্তু কোনো মতবাদ বা দর্শন নয়, মানুষই শ্রেষ্ঠ; দর্শনের জন্য মানুষ নয়, মানুষের জন্যই দর্শন। 

আমরা যদি একটু পেছন ফিরে প্রাচ্যের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই যে, বৈদিক যুগের দ্বিতীয় পর্যায়ে অর্থাৎ পরবর্তী বৈদিক (খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০-৬০০ অব্দ) যুগের শেষ দিকে পুরোহিততান্ত্রিক ব্রা‏হ্মণ্য (ব্রা‏হ্মণ্য ধর্মের পূর্ববর্তীরূপ বৈদিক ধর্ম এবং পরবর্তীরূপ হিন্দু ধর্ম) ধর্মের শোষণ-শাসন এবং যজ্ঞকেন্দ্রিক আচার-সর্বস্ব ধর্মানুষ্ঠানের প্রতি মানুষ বিরক্ত এবং বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছিল। এসময় এবং এর কিছু আগে-পরে সনাতন ধর্মের বিপরীতে আত্মপ্রকাশ করে অনেক ধর্মীয় মতবাদ এবং দর্শন; যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো - বৌদ্ধ ধর্ম, জৈন ধর্ম, বৈষ্ণব ধর্ম, শৈব ধর্ম, আজীবিক ধর্ম এবং ঋষি উদ্দালক ও চার্বাক দর্শন। 

ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ মধ্যগাঙ্গেয় উপত্যকায় আত্মপ্রকাশ করেছিল বৌদ্ধ ধর্ম, এর প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধ (আঃ খ্রিঃ পূঃ ৫৬৬-৪৮৬ অব্দ)। তিনি ছিলেন ক্ষত্রিয় সন্তান, পূর্বে তার নাম ছিল সিদ্ধার্থ। তার পিতা শুদ্ধোধন নেপালের তরাই অঞ্চলের কপিলাবস্তুর শাক্য নামে একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর প্রধান ছিলেন। শাক্যরীতি অনুযায়ী সিদ্ধার্থও শৈশবেই অস্ত্রশিক্ষা, অশ্ব ও রথচালা শিখেছিলেন। বিয়ে যশোধরাকে। কিন্তু বৈভবের জীবন তার অন্তরে প্রশান্তি এনে দিতে পারেনি। উনত্রিশ বছর বয়সে, যেদিন তার পুত্র রাহলের জন্ম হয়, সেদিনই স্ত্রী-পুত্র, ঘর-সংসারের মায়া ত্যাগ ক’রে পরিব্রাজকের জীবন বেছে নিয়ে পথে পা বাড়ান। নিজের ভেতরে রাশি রাশি প্রশ্ন নিয়ে ঘুরে বেরিয়েছেন বিভিন্ন জায়গায়, সাধু সন্ন্যাসীর শিষ্যত্বও গ্রহণ করেছেন, কৃচ্ছ্রসাধন করেছেন, কিন্তু মেলেনি তার প্রশ্নের উত্তর। উপলব্ধি করেছিলেন যে, কৃচ্ছ্রসাধনে কেবল দেহ ক্ষয় হয়; দুঃখ লাঘব হয় না, অন্তরের প্রশান্তি মেলে না। এক পর্যায়ে সকল সঙ্গ ত্যাগ ক’রে একা একা ঘুরতে থাকেন আর খুঁজতে থাকেন নিজের প্রশ্নের উত্তর। একসময় তার আত্মোপলব্ধি হয়, নিজেই খুঁজে পান নিজের প্রশ্নের উত্তর। অনুধাবন করতে পারেন মানুষের দুঃখ-কষ্টের কারণ এবং তা থেকে মুক্তি উপায় সম্পর্কে। এরপরই তিনি তার আদর্শ এবং দর্শনের কথা প্রচার করেন। অনেকেই তার নতুন দর্শনে সন্তুষ্ট হয়ে তার ধর্মে দীক্ষিত হন। মধ্য গাঙ্গেয় উপত্যকায় তার ধর্মের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। সনাতন ধর্মবিশ্বাসীদের মাঝে নিশ্চয় তিনি তার ধর্ম প্রচারে কিছু বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন এবং সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি কখনোই উগ্রতার পথ বেছে নেননি, তিনি বেছে নিয়েছিলেন অহিংসার পথ। ব্রাহ্মণ্য ধর্ম যেখানে যজ্ঞের নামে অবাধে গো-হত্যা ক’রে চাষাবাদ তথা কৃষি এবং বাণিজ্যের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করছিল, সেখানে তিনি ব্রাহ্মণদের গো-হত্যার বিরুদ্ধাচারণ ক’রে জীবের প্রতি অহিংসার বাণী প্রচার করেছেন। ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসারের ফলে সুদের বিনিময়ে অর্থলগ্নির প্রয়েজনীয়তা অনুভূত হলেও ব্রাহ্মণ্য ধর্মে সুদের ব্যবসা ছিল ঘৃণিত এবং সুদ গ্রহীতাদের হাতে ব্রাহ্মণদের অন্নভক্ষণ নিষিদ্ধ থাকলেও বাস্তববুদ্ধি সম্পন্ন বুদ্ধ বাণিজ্যের প্রয়োজনে অর্থলগ্নিকে খারাপ চোখে দেখেননি। বাণিজ্যের প্রয়োজনে তখন বণিকদের সমুদ্রযাত্রার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলেও বৈদিক গ্রন্থগুলোতে এ সম্পর্কে বিধিনিষেধ আরোপ থাকায় ব্রাহ্মণ্য ধর্মেও তা বহাল ছিল। কিন্তু বুদ্ধ তার ধর্মে এমন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেননি। বৈদিক ধর্মানুসারে ব্রাহ্মণরা যেখানে নারীদের ওপর নানা রকম বিধিনিষেধ আরোপ করেছিলেন, বুদ্ধ সেখানে নারীদের জন্য পৃথক মঠ স্থাপন ক’রে নারী স্বাধীনতার এক বৈপ্লবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। সংঘ বা বিহার পরিচালনার ক্ষেত্রে বুদ্ধ গণতান্ত্রিক পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন। নির্দিষ্ট অঞ্চলের বিহারগুলোর অন্তর্ভূক্ত ভিক্ষুরা ভোটদানের মাধ্যমে বিহারের সভাপতি নির্বাচন করতেন। এমনকি ভিক্ষুদের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে উপসমিতি গঠন করা হতো। শিক্ষা এবং সংস্কৃতির উন্নতিতে বিহারগুলি অগ্রণী ভুমিকা পালন করেছিল। উত্তরকালে এই বিহারগুলোকে কেন্দ্র ক’রে বিভিন্ন স্থানে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছিল। যার অন্যতম ছিল বিহারের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়, যেটা উত্তরকালে মুসলিম আগ্রাসনে ধ্বংস হয়। 

সেই সময়ে যেখানে সমাজের বুকে জগদ্বল পাথরের মতো চেপে ব’সে ছিল ব্রাহ্মণ্য ধর্ম, সেখানে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিপরীতে গৌতমবুদ্ধের এই অহিংস ধর্ম প্রচার এবং সমাজ সংস্কার ভারতবর্ষের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত। বিজ্ঞানের এই অগ্রসর যুগে তার ধর্মতত্ত্ব বা আদর্শ নিয়ে আজকে অনেকের ভিন্নমত থাকতে পারে এবং থাকাটাই স্বাভাবিক; কিন্তু তৎকালীন সময়ে সমাজ সংস্কারে তার ভূমিকা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, স্বীকার করতেই হবে যে, বিজ্ঞানের অনগ্রসর সেই যুগে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ব্রাহ্মণ্য ধর্মের শোষণের বিপরীতে বৌদ্ধধর্ম মানব সভ্যতাকে আলোর পথও দেখিয়েছিল। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের নির্যাতন-নিপীড়নের হাত থেকে মানুষকে মুক্তির পথ দেখিয়েছিল, যদিও সবাই যে পুরোনো প্রথা ঝেড়ে ফেলে বুদ্ধের দেখানো পথে এসেছিল, তেমন নয়; যারা এসেছিল তারা সাহসী। কিন্তু বুদ্ধের মৃত্যুর কিছুকাল পর থেকেই অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে বৌদ্ধধর্মে অবক্ষয় শুরু হয়। কালক্রমে অনেক ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে এবং ফিরে আসে ব্রাহ্মণ্য কুসংস্কার, যা একদা বুদ্ধ বর্জন করেছিলেন। 

বুদ্ধের আদর্শ এবং নতুন দর্শনে মুগ্ধ হয়ে অনেক নৃপতি এবং ধনী বণিক তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন, তিনি তাদেরকে প্ররোচিত ক’রে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম উৎখাত এবং নিজের ধর্ম বিস্তারে সনাতন ধর্মাবলম্বীদেরকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করার প্রয়াস চালাতে পারতেন, ব্রাহ্মণ্য ধর্ম নির্মূলে ব্রাহ্মণদেরকে হত্যার নির্দেশ দিতে পারতেন, নৃপতিদেরকে প্রলুব্ধ করতে পারতেন ব্রাহ্মণ্য ধর্মাশ্রয়ী রাজ্য আক্রমণ করতে; কিন্তু তা তিনি করেননি। তিনি কেবল সত্য, ন্যায় এবং অহিংস পথে তার ধর্ম প্রচার করেছেন।

বৌদ্ধধর্মের মতো জৈন ধর্মও আত্মপ্রকাশ করেছিল মধ্য গাঙ্গেয় উপত্যকায়। পার্শ্বনাথকে জৈনধর্মের তেইশ তম তীর্থঙ্কর বলা হলেও তার পূর্বের বাইশজন ঐতিহাসিক চরিত্র নন। পার্শ্বনাথকেই জৈন ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। পার্শ্বনাথ ছিলেন বেনারসের রাজা অশ্বসেনের পুত্র। তিনি বিবাহিত ছিলেন। ত্রিশ বছর গৃহে থাকার পর তিনি কঠোর তপস্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন। জৈন ধর্মের প্রসারে তিনি তেমন ভূমিকা রাখতে পারেননি। বাংলার সম্মেত পর্বতে তার মৃত্যুর হয়। তার মৃত্যুর আড়াইশো বছর পর জৈন ধর্মের চব্বিশতম এবং শেষ তীর্থঙ্কর হিসেবে আবির্ভাব হয় মহাবীরের। খ্রিষ্টপূর্ব ৫৪০ অব্দে মহাবীর বৈশালীর কুণ্ডগ্রামের এক ক্ষত্রিয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। গৌতম বুদ্ধের পিতার মতো তাঁর পিতা সিদ্ধার্থও ছিলেন কুণ্ডগ্রামের জ্ঞাতৃক নামক একটি গোষ্ঠীর প্রধান আর তার মাতা ত্রিশলা ছিলেন লিচ্ছবী নৃপতি চেতকের বোন। যৌবনে তিনি যুবরাজ হিসেবে শিক্ষা গ্রহণ এবং যশোদা নামে এক নারীকে বিয়ে করেছিলেন; তাদের এক কন্যা সন্তান ছিল। গৌতম বুদ্ধের মতো তিনিও সংসারে প্রশান্তি খুঁজে পাননি। ফলে তার পিতা-মাতার মৃত্যুর পর ত্রিশ বছর বয়েসে তিনি সংসার ত্যাগ ক’রে তপস্যার জীবন বেছে নেন, প্রথম দিকে তিনি বস্ত্র পরিধান করলেও তপস্যা শুরুর তেরো মাস পর থেকে আজীবন নগ্ন অবস্থায় ছিলেন। তিনি কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে জীবন কাটিয়েছেন। বলা হয়ে থাকে যে, তিনি তপস্যার ত্রয়োদশ বছরে বর্ধমান কৈবল্য বা বিশুদ্ধ জ্ঞান নির্বাণ লাভ করেন। কৈবল্যজ্ঞান লাভের মাধ্যমে তিনি সুখ-দুঃখ জয় করেন, এজন্য তাকে বলা হতো জিন এবং তার অনুসারীদের বলা হতো জৈন। দীর্ঘ ত্রিশ বছর তিনি গাঙ্গেয় উপত্যকার বিভিন্ন জনপদে পরিব্রাজন এবং তার ধর্মমত প্রচার করেন। মুক্তিলাভের উপায় হিসেবে মহাবীর তিনটি পথের নির্দেশ দিয়েছিলেন যা ত্রিরত্ন হিসেবে পরিচিত-সৎ জ্ঞান, সৎ বিশ্বাস, সৎ আচরণ। জৈন ধর্মও ছিল অহিংস, বৌদ্ধ ধর্মের মতোই জৈন ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে কোনো কোনো নৃপতি জৈন ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। তথাপি মহাবীর ধর্ম প্রচারে নৃপতিদেরকে ভুলপথে চালিত করেননি; ধর্ম প্রচারে তিনি নিজে যেমনি উগ্রতার পথ অবলম্বন না ক’রে অহিংস ছিলেন, তেমনি তার অনুসারীদেরকেও উগ্রপথে ঠেলে না দিয়ে অহিংস পথ দেখিয়েছেন। 

ভারতবর্ষের আরো দুটি উল্লেখযোগ্য ধর্ম হলো বৈষ্ণব ধর্ম এবং শৈব ধর্ম। দুটো ধর্মই একেশ্বরবাদী-ভক্তিবাদী। পশ্চিম ভারতের অধিবাসীরা বৈদিক দেবতাদের মধ্য থেকে বিষ্ণুকে বেছে নিয়ে নিয়েছিলেন সর্বশক্তিমান একেশ্বর হিসেবে। বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারীরাও ব্রাহ্মণ্য ধর্ম কিংবা অন্য কোনো ধর্মকে উৎখাতের চেষ্টা করেনি; বৈষ্ণবরা অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়া দূরে থাক, অন্য ধর্মের ধ্বংস কামনা ক’রে কোনো প্রকার উস্কানিমুলক বক্তব্য সম্বলিত পুস্তকও লিপিবদ্ধ করেনি। তারা অহিংসভাবে নিজেদের ধর্ম পালন করেছে।

শৈব ধর্মের অনুসারীরা শিবের উপাসক। সুপ্রাচীন কাল থেকেই ভারতবর্ষে পূজিত হচ্ছে শিব। শৈব ধর্মাবলম্বীরাও তাদের ধর্ম প্রসারের জন্য জোরপূর্ব অন্য কোনো ধর্মের মানুষকে ধর্মান্তরিত বা হত্যার পথ অবলম্বন করেনি।

যে যুগে ব্রাহ্মণদের প্রবল প্রতাপ ছিল, ধূর্ত ব্রাহ্মণরা নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ ও অন্যান্য বর্ণের মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে ‘কর্মফলবাদ’ ও ‘জন্মান্তরবাদ’ নামে নতুন এক আধ্যাত্মিক-দার্শনিক চিন্তার উন্মেষ ঘটিয়েছিল এবং এই আধ্যাত্মিক-দার্শনিক চিন্তার প্রচার ক’রে মানুষের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছিল পরকালের ভয়; সেই যুগে দাঁড়িয়ে ঋষি উদ্দালক উচ্চারণ করেছিলেন বিশ্ব সৃষ্টিতে প্রকৃতির ভূমিকার কথা, তিনি আরো বলেছিলেন মৃত্যুর পর মানুষের কোনো অস্তিত্ব থাকে না। পরবর্তীতে তাঁর দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন চার্বাক। চার্বাক নাস্তিকতার দর্শন প্রচার করেছেন। উদ্দালক কিংবা চার্বাক তাদের দর্শন প্রচারে সহিংসতার পথ অবলম্বন ক’রে হাতে তরবারি তুলে নেননি, ব্রাহ্মণ নিধন করেননি। 

উপরোক্ত ধর্ম ও দর্শনসমূহ ছিল প্রচলিত ধর্ম এবং প্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ, কিন্তু এর প্রচার ও প্রসারে ধর্ম-প্রবর্তক একং দার্শনিকগণ ছিলেন অহিংস। নিজের ধর্ম এবং দর্শন প্রচারে ধর্ম তাঁরা হাতে অস্ত্র তুলে নেননি। আবার তাদের ধর্মগ্রন্থ বা দর্শনে কোথাও বলা নেই যে, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বা ভিন্ন মতাবলস্বীদের ধর্মান্তরিত বা মতান্তরিত করতে হবে; অন্যথায় তাদেরকে হত্যা করতে হবে। প্রাচ্যের কোনো ধর্মগ্রন্থে বলা হয়নি যে, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদেরকে তুমি মারছো না, মারছে তো ঈশ্বর; তুমি উপলক্ষ মাত্র। কোনো ধর্মগ্রন্থে তার অনুসারীদের উদ্দেশে লেখা নেই যে, ভিন্নধর্মাবলম্বীদেরকে পরাজিত ক’রে তাদের নারী, শিশু ও ধন-সম্পদ ভোগ করবে, এগুলো ঈশ্বর তাদেরকে দান করেছেন উপহারস্বরূপ; বরং নারীদের সম্মান করার কথা, নারীসঙ্গ ও সম্পদ বর্জনের কথা বলা হয়েছে কোনো কোনো ধর্মে। 

মধ্যপ্রাচ্যেও ইসরাইলের মানুষের সনাতন আচার অনুষ্ঠান আর রীতি-পদ্ধতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে সমাজ সংস্কারে উদ্যোগী হয়েছিলেন মুসা; আবার ইহুদিদের সমাজব্যবস্থা ও জীবনাচারে সত্য এবং নৈতিকতার ঘাটতি দেখে, তাদের ধর্মাচারে সন্তুষ্ট হতে না পেরে যিশু নিজেকে ঈশ্বরের পুত্র ব’লে সমাজ এবং ধর্ম সংস্কারে উদ্যোগী হয়েছিলেন। 

মুহাম্মদও কোরাইশদের পৌত্তলিকতায় বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন এবং তিনি উপলব্ধি করেছিলেন মূর্তিপূজার অসারতা সম্পর্কে। মুহাম্মদের মতো পিতৃ-মাতৃহীন এক অনাথ বালক, দরিদ্র চাচার আশ্রয়ে অনেকগুলো চাচাতো ভাই-বোনদের মধ্যে অনাদরে-অবহেলায় যার বাল্যকাল কেটেছে; বাল্যকালে যিনি ছিলেন এক নিরক্ষর অন্তর্মুখী উটের রাখাল আর সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যার একাকী সময় কেটেছে অবলা উটের সঙ্গে রুক্ষ মরুভূমিতে; যিনি বাল্যকাল থেকেই কোরাইশদেরকে দেখেছেন পাম বাগানে পাথরের দেবী উজ্জাকে কেন্দ্র ক’রে বৃত্তাকারে ঘুরে পূজা দিতে; যিনি আরবের বিভিন্ন গোত্রের মানুষকে দেখেছেন সুখ, সমৃদ্ধি ও মুক্তির আশায় কাবাঘরের বিভিন্ন মূর্তি এবং কৃষ্ণপাথরকে কেন্দ্র ক’রে বৃত্তাকারে ঘুরতে; নিশ্চয় শৈশবে তিনি নিজেও দেবী উজ্জাকে পূজা করেছেন, দেব-দেবী সমৃদ্ধ কাবাঘর প্রদক্ষিণ করেছেন; সেই বালক বড় হয়ে সনাতন চিন্তাধারার পাথরের দেব-দেবীর পূজারী না হয়ে একটা সময়ে উপলব্ধি করেছেন যে পাথরের দেব-দেবীকে পূজা করা এবং কাবাঘরের দেবদেবী কিংবা কৃষ্ণপাথর প্রদক্ষিণ করা অসারতামাত্র; নিঃসন্দেহে এটা ছিল তার চেতনার উত্তরণ এবং প্রগতিশীল মনস্কতার পরিচয়, যা প্রশংসনীয়। 

এমন নয় যে, আরবে সমাজে পৌত্তলিকতা বিরোধী বা শুধুমাত্র একেশ্বরবাদের ধারণা পোষণকারী কেউ ছিল না; ইহুদি-খ্রিষ্টানরা তো ছিলই, এছাড়াও আদ গোত্রের হুদ নবী, মিদিয়ান গোত্রের শুয়েব নবীও পৌত্তলিকতার বিরোধী ছিলেন। আরবের অনেক কবি ছিলেন; যেমন-কবি কাসা বিন সায়িদা আল ইয়াদি, কবি আমর বিন ফজল, কবি লবীদ; এরা সকলেই পৌত্তলিকতার বিরোধী ছিলেন, মূর্তিপূজার কুসংস্কার থেকে মানুষকে বের ক’রে আনার জন্য পৌত্তলিকতা বিরোধী কবিতা লিখতেন এবং সেসব কবিতা ওকাজের মেলার কবিতা সম্মেলনে আবৃত্তিও করতেন। কিন্তু এজন্য পৌত্তলিকরা তাদেরকে হত্যা করেনি।

মুহাম্মদ মূর্তিপূজার মতো সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস এবং কুসংস্কার জীর্ণ পোশাকের মতো পরিত্যাগ ক’রে নতুন পথের অনুসন্ধানে নেমেছিলেন। বাল্যকালে তিনি একবার তার চাচার সঙ্গে সিরিয়া গিয়েছিলেন, মক্কা থেকে অপেক্ষাকৃত অগ্রসর এবং আলোকিত সিরিয়ার মানুষ এবং তাদের জীবনযাত্রা বালক মুহাম্মদের ভেতরে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। যৌবনে তিনি আবারো সিরিয়া ভ্রমণ করেছিলেন, এসময় তিনি ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের এবং মতের মানুষের সংস্পর্শে আসেন। মক্কাতেও তিনি দূর-দূরান্ত থেকে আগত সন্ন্যাসীদের সান্নিধ্যলাভ করেছেন। ইহুদিদের সিনাগগ এবং খ্রিষ্টানদের গির্জায় গিয়ে যাজকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। হয়তো এসময়েই তার মধ্যে পৌত্তলিকতার বিরোধীতা এবং একেশ্বরবাদের ধারণা দৃঢ় হয় ইহুদি, খ্রিষ্টান এবং আরবের অন্যান্য একেশ্বরবাদী ধর্ম ও ব্যক্তির প্রভাবে। 

তিনি মক্কা থেকে রুক্ষ-শিলাময় তিন মাইল পথ পাড়ি দিয়ে হেরা পর্বতের নির্জন গুহায় যেতেন একাকী ধ্যান করার জন্য, অনেক হানিফ মতাদর্শীও তখন হেরা পর্বতে ধ্যান করতে যেতো। তিনি খাদ্য এবং পানি নিয়ে যেতেন, আর তা না ফুরোনো পর্যন্ত বাড়ি ফিরতেন না, তারপর খাদ্য এবং পানি নিয়ে আবার যেতেন। কখনো কখনো সকালে যেতেন আবার সন্ধ্যায় ফিরে আসতেন। এক সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে তিনি তার প্রথম স্ত্রী খাদিজাকে জানালেন যে তিনি ফেরেশতার দেখা পেয়েছেন, ফেরেশতা তার হৃদয়ে এক কিতাব স্থাপন করেছেন। আর এর পর থেকেই নিজের বক্তব্যকে আল্লাহ্’র বাণী আর নিজেকে আল্লাহ্’র নবী ব’লে প্রচার করেছেন, মক্কার কোরাইশদেরকে মূর্তিপূজা বর্জন ক’রে তার প্রতিষ্ঠিত নতুন ধর্ম ইসলামে দীক্ষিত হবার আহব্বান জানিয়েছেন। 

ফেরেশতার দেখা পাওয়া এবং হৃদয়ে কিতাব স্থাপন করার বিষয়টি নিঃসন্দেহে তার মানসিক বিভ্রান্তি। দীর্ঘদিন গভীর চিন্তমগ্ন হয়ে কল্পনার জগতে বাস করার ফলে মানুষের এ ধরনের সাময়িক মানসিক বিভ্রান্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়া অস্বাভাবিক নয়। এ পর্যন্ত কোনো অসুবিধা ছিল না। কিন্তু তারপর মুহাম্মদ কোরাইশদের ওপর জোর করতে থাকেন তার প্রবর্তিত ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার জন্য। অনর্গল নিজের বক্তব্যকে আল্লাহ্’র বাণী হিসেবে মিথ্যা প্রচার করেছেন আর মক্কায় তার নতুন ধর্ম ইসলাম প্রচারে ব্যর্থ হয়ে মদিনায় গিয়ে বেছে নিয়েছিলেন সন্ত্রাসের পথ। আর এখানেই তিনি অন্যান্য ধর্ম-প্রবর্তকদের থেকে ব্যতিক্রম; তার ধর্মীয় চেতনার চূড়ান্ত মৃত্যু ঘটেছিল সেদিন, যেদিন তিনি হামজার নেতৃত্বে ত্রিশজন মুহাজিরকে পাঠিয়েছিলেন কোরাইশদের বাণিজ্য কাফেলা আক্রমণ করতে। 

আসলে তার নতুন পথের অনুসন্ধান শেষ হয়েছিল হেরা পর্বতের গুহাতেই, সনাতন প্রথা আর কু-সংস্কার ঝেড়ে ফেলে তার ভেতরে যে উন্নত চেতনার সম্ভাবনা উঁকি দিয়েছিল, তার মৃত্যু হয়েছিল হেরা পর্বতের গুহার ভেতরেই, কুসংস্কারের একটি বদ্ধ ডোবা থেকে মুক্তি পেতে তার চিত্ত লুপ্ত হয়েছিল আরেকটি কুসংস্কারাচ্ছন্ন বদ্ধ ডোবায়। হেরা পর্বতের গুহা তাকে সামনে এগোবার নতুন রাস্তা না দেখিয়ে, দেখিয়েছিল পিছনে ফিরে যাবার ভিন্ন রাস্তা। প্রথা ভাঙতে চেয়ে তিনি বাঁধা পড়েছেন পুরনো প্রথার নাগপাশে; ইহুদি, খ্রিষ্টান, হানিফি, জরথুষ্ট্র এবং আরবের বিভিন্ন পৌত্তলিক গোত্রের প্রচলিত বিশ্বাস আর আচার-অনুষ্ঠান তিনি ইসলামে গ্রহণ করেছেন। প্রাক-ইসলাম যুগে আরবের পৌত্তলিকরা কাবাঘরে আসতো হজ্জ্ব ও ওমরাহ পালন করতে, ইসলাম যুগের মুসলমানরাও কাবাঘরে যায় হজ্জ্ব ও ওমরাহ পালন করতে; প্রাক-ইসলাম যুগের পৌত্তলিকরা একটি কৃষ্ণপাথরকে প্রদক্ষিণ করতো সুখ, সমৃদ্ধি ও মুক্তির আশায়, ইসলাম যুগের মুসলমানরাও কাবাঘরের পাথর প্রদক্ষিণ করে একই আশায়। এরকম আরো অনেক পুরোনো প্রথার মসলা দিয়েই তিনি তৈরি করেছেন ইসলাম নামক নতুন পথ। আর প্রথা ভাঙার দোহাই দিয়ে কখনো কখনো তিনি নীতিবহির্ভূত কাজ করেছেন, আরব সমাজে যার প্রচলন ছিল না, তিনি নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহের প্রচলন করেছেন। তিনি নিজে পালক পুত্রের স্ত্রী জয়নাবকে বিয়ে করেছেন, বিয়ে করেছেন আপন চাচীর বোনকে। পুরোনো সব প্রথাই যেমনি খারাপ বা বর্জনীয় নয়, তেমনি পুরোনো প্রথা ভাঙার নামে নৈতিকতাহীন প্রথা প্রচলন করাও কাম্য নয়। 

জীবনের শেষ দশ বছরে তার নির্দেশে বা পরিচালনায় ৭০ থেকে ১০০ টি হামলা এবং যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, যার মধ্যে ১৭ থেকে ২৯ টি তিনি নিজে যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে পরিচালনা করেছেন। এইসব যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ নিরীহ পুরুষ, নারী ও শিশু খুন করেছে তার অনুসারীরা; তিনি নিজেও তরবারি হাতে শিরশ্ছেদ করেছেন। লক্ষ লক্ষ মানুষকে তিনি ক্রীতদাস বানিয়েছেন, অসংখ্য নারীকে করেছেন যৌনদাসী। কোরানের শত শত আয়াতে তিনি ভিন্ন মতাবলম্বী ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের বাসভূমি থেকে উৎখাত, শাস্তি, হত্যা এবং ধ্বংস করার কথা বলেছেন; বিধর্মীদের পরাজিত ক’রে তাদের ধন-সম্পদ লুণ্ঠন করা, নারীদের যৌনদাসী ও শিশুদের ক্রীতদাস বানানোর কথা বলেছেন; যা তার অনুসারীরা আজ এতো বছর পরও পালন ক’রে চলেছে।

ধর্মকে অতিক্রম ক’রে তিনি বেছে নিয়েছিলেন সন্ত্রাসবাদের পথ। ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার ক’রে সমগ্র আরবকে ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করাই ছিল তার উদ্দেশ্য এবং তাতে তিনি ও তার উত্তরসুরীরা সফলও হয়েছেন; একের পর এক যুদ্ধাভিযান চালিয়ে নতুন নতুন রাষ্ট্র দখল করেছেন, সেইসব রাষ্ট্রের মানুষের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন ইসলাম ধর্ম, পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে বিলুপ্ত করেছেন অসংখ্য ধর্ম ও মতবাদ। মৃত্যুশয্যায়ও তার ক্রোধোন্মত্ত কণ্ঠস্বর থেকে উচ্চারিত হয়েছে রাজনৈতিক আকাঙ্খা ও বিদ্বেষপূর্ণ বাক্য, ‘হে প্রভু, ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের ধ্বংস করো। প্রভুর ক্রোধ তাদের ওপর প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠুক। সমগ্র আরব ভূখণ্ডে ইসলাম ব্যতিত অন্য কোনো ধর্ম না থাকুক।’ 

ফলে তার প্রতিষ্ঠিত ইসলাম নামক ধর্মটি আর পাঁচটা ধর্মের মতো ধর্ম থাকেনি, বরং ধর্মকে অতিক্রম ক’রে তা হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক এবং সন্ত্রাসী মতবাদ।

(চলবে)