২৩ জানু, ২০১৭

সাইমুম (উপন্যাস: পর্ব ২৭)

লিখেছেন উজান কৌরাগ


আমাদের মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হলো, রেজাল্টও হলো, অরিত্র ফার্স্ট ক্লাস আর আমি পেলাম সেকেন্ড ক্লাস। মাস্টার্স রেজান্টের কিছুদিন পর অরিত্র ভাল একটি কলেজে জয়েন করলো, আমিও অন্য একটি এনজিও'তে ঢুকলাম। দু'জনের রোজগার আরো বাড়লো, আমরা বাসা বদল ক'রে আরো ভালো একটি বাসা নিলাম লালমাটিয়ায়। আমার তো বাড়ির সঙ্গে সকল সম্পর্ক ছিন্ন, তবু আমি একবার আব্বার নামে কিছু টাকা পাঠিয়েছিলাম, টাকা ফেরত এসেছিল। অরিত্র প্রতিমাসে তিন হাজার ওর বাবা-মাকে আর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আমার দেবর অলককে পাঁচ হাজার টাকা পাঠাতো। এসব খরচ বাদেও আমাদের দু'জনের বেতনের প্রায় অর্ধেক টাকা বেঁচে যেতো, ব্যাংকে দু'জন একটা জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট খুললাম, টাকা জমতে লাগলো। অরিত্র আমাকে প্রায়ই বলতো, 'আমাদের অনেক টাকা দরকার।'

আমি বলতাম, 'আমরা যা বেতন পাই তাতে তো আমাদের দিব্যি চ'লে যাচ্ছে, ব্যাংকেও জমছে, অতো চিন্তার কী আছে!'

ও শুধু বলতো, 'দরকার দরকার।'

এর বেশি কিছু ভেঙে বলতো না। 

আমাদের গভীর প্রণয়ের কথা ওর বাড়ির কেউ জানতো না, জানতো যে, আমি ওর বন্ধু, একসঙ্গে থাকি। অলক কিংবা আমার শ্বশুর যখন ঢাকায় আসতো, তখন আমি আমার এক বান্ধবীর বাসায় চ'লে যেতাম। আমার কথা জিজ্ঞেস করলে ও জানাতো যে. এনজিও'র কাজে আমি ঢাকার বাইরে। এই লুকোচুরি খেলতে খেলতে অনেকদিন কাটলো। ওর আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে আমাদের সম্পর্কের কথা জানতো কেবল ওর পিসতুতো ভাই তনয়। তনয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, থাকতো তাঁতীবাজার। ও অনেক উদার, আমাদের সম্পর্কটাকে সহজভাবেই নিয়েছিল। মাসে দু'-তিনদিন আমাদের বাসায় আসতো, এখানো আসে। 

এরপর একসময় অরিত্রর বাড়ি থেকে ওকেও বিয়ের জন্য জোরাজুরি করতে শুরু করলো। ও 'এখন নয় এখন নয়' ব'লে কালক্ষেপণ করতো, কিন্তু এক পর্যায়ে আমার শ্বশুর-শাশুড়ি রীতিমতো উঠে-পড়ে লাগলেন ওর বিয়ের জন্য; পাত্রীদের বায়োডাটাও সংগ্রহ করতে শুরু করলেন তারা। আমাদের দু'জনের সামনেই তখন কঠিন বাস্তবতা। আমার বাবা-মা আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন, আমি চাইতাম না অরিত্রর ক্ষেত্রেও তাই হোক। আমরা দু'জন পরামর্শ ক'রে অলককে ঢাকায় আসতে বললাম, অলক এলো; তনয় আগে থেকেই বাসায় ছিল। তনয়কে সামনে রেখে অলককে সব খুলে বললাম আমরা। অরিত্র ওদেরকে বললো, 'আমরা টাকা জমাচ্ছি, যদি বাবা কিছু সাহায্য করতে পারে তাহলে তাড়াতারিই হয়তো সেক্স চেঞ্জ ক'রে ও দৈহিকভাবেও নারী হবে। বাবা-মা চাইলে তখন না হয় আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করবো।'

অরিত্র যে আমাকে নিয়ে এতোকিছু ভেবে রেখেছে, এর আগে পর্যন্ত সত্যিই আমি তা জানতাম না। এজন্যই ও বলতো যে, আমাদের অনেক টাকার দরকার। আমার ইচ্ছে থাকলেও কখনো ওকে বলিনি যে, আমি সেক্স চেঞ্জ করতে চাই, কেননা আমি জানি যে, সেই সামর্থ্য আমাদের এখনো হয়নি। কিন্তু আমি যে আমার বাড়ির সবাইকে বলেছিলাম "তোমরা যদি চিকিৎসা ক'রে আমার পিছনে টাকা ব্যয় করতেই চাও, তাহলে লিঙ্গ রূপান্তর ক'রে আমি শারীরিকভাবেও মেয়ে হয়ে যাই।" সে-কথা অরিত্রকে বলেছিলাম, ও যে সে-কথা মনে রেখে টাকা জমানোয় মন দিয়েছিল, তা আর আমি জানতাম না। 

ওর মুখ থেকে সেক্স চেঞ্জের কথা শুনে আনন্দে আমার চোখে পানি এসে গিয়েছিল, ইচ্ছে করছিল তখনই ওকে জড়িয়ে ধ'রে আদর করি, পাগলের মতো ওকে চুমু খাই, কামড়ে ওর গাল লাল ক'রে দিই! কিন্তু তনয় আর অলক সামনে থাকায় তখনকার মতো আর তা সম্ভব হয়নি, জমিয়ে রেখেছিলাম রাতের জন্য! 

যাইহোক, তারপর আমার শ্বশুর-শাশুড়িকে বুঝিয়ে বলার জন্য তনয় আর অলককে পাঠালাম যশোর। অলকের মুখ দেখেই আমি ওর মনের অসন্তুষ্টি সম্পর্কে আঁচ করতে পারলেও অরিত্রকে কিছু বললাম না। ওরা যেদিন যশোর গেল, সেদিন রাতেই আমার শাশুড়ি অরিত্রকে ফোন করলেন শীঘ্র বাড়িতে যাবার জন্য, এর বেশি কিছু তারা অরিত্রকে বলেনি, অথবা বললেও ও আমাকে বলেনি। বুঝলাম যে, অলকের মতো তারাও অসন্তুষ্ট, তবু বিশ্বাস করতে চাইলাম যে, তাঁরা আমাদের সম্পর্ক মেনে নেবেন। অরিত্র দু'দিন পরই বাড়িতে গেল, ওর যাবার সময় আমার খুব কান্না পাচ্ছিল, ওকে জড়িয়ে ধ'রে আমি কাঁদছিলাম এই আশঙ্কায় যে, ওকে যদি আমি হারিয়ে ফেলি। ও আমার কপালে চুমু খেয়ে আদর ক'রে বলেছিল, 'তুমি ভয় পেয়ো না। যে করেই হোক, আমি বাবা-মাকে রাজি করাবো।' 

আমিও এই আশায় বুক বাঁধলাম যে, আমার শ্বশুর-শাশুড়ি সমাজের কথা ভেবে প্রথমে অরাজি থাকলেও শেষ পর্যন্ত নিশ্চয় রাজি হবেন। আমার পরিবার আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে সামাজিক এবং ধর্মীয় কারণে। ইসলাম ধর্মে সমপ্রেমী বা রূপান্তরকামীর কোনো স্থান নেই। ইসলামে সমপ্রেমীদের হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যুগে যুগে ইসলামী দেশগুলোতে অসংখ্য সমপ্রেমীকে পাথর নিক্ষেপ, শিরশ্ছেদ, ফাঁসিতে ঝুলিয়ে, কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। হাদিসে বৃহন্নলাদের তো বটেই, এমনকি মেয়েদের মতো আচরণ করা ছেলে কিংবা ছেলেদের মতো আচরণ করা মেয়েদেরকেও নির্বাসিত করার কথা বলা হয়েছে। ফলে মসজিদের ইমাম-প্রভাবিত আমার আব্বা ধর্মীয় কারণে এবং সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে আমাকে নির্বাসিত করেছেন। দেশে ইসলামী শাসন চালু থাকলে ইমাম হয়তো আমাকে হত্যার নির্দেশই দিতেন!

সেই তুলনায় বহু সংস্কৃতি ধারণ করা হিন্দুধর্ম অনেকটাই উদার। ধর্মটির আইনকানুন যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়েছে; ফলে অনেক ক্ষেত্রেই কখনো উদারতার পরিচয় দিয়েছে, আবার কখনো নিষ্ঠুরতার। ব্রাহ্মণের হাতে প'ড়ে ধর্মটির বিপুল ক্ষতি হয়েছে, উদারতার জায়গাগুলো ক্রমশ হয়েছে সংকুচিত। মনুসংহিতায় নারী সমপ্রেমের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে যে, কোনো বয়স্কা নারী যদি অপেক্ষাকৃত কম বয়সী নারীর সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করে, তাহলে বয়স্কা নারীর মস্তক মুণ্ডন ক'রে এবং দু'টি আঙুল কেটে গাধার পিঠে চড়িয়ে ঘোরাতে হবে। আর দুই কুমারীর মধ্যে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপিত হ'লে তাদের শাস্তি হিসেবে দুইশত মুদ্রা জরিমানা এবং দশটি বেত্রাঘাতের কথা বলা হয়েছে। আর পুরুষ সমপ্রেমীদের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে যে, দু'জন পুরুষ অপ্রাকৃত কাজে লিপ্ত হ'লে তাদেরকে জাতিচ্যুত করা হবে এবং জামা প'রে তাদেরকে জলে ডুব দিতে হবে। 

তবে মনুর এই বিধান একপাশে সরিয়ে রেখে রামায়ণ-মহাভারত এবং পুরাণের দিকে তাকালে প্রাচীন ভারতীয় সমাজের দেব-মানব-দানবদের মধ্যে বিষমকামিতা ছাড়াও সমকামিতা, রূপান্তরকামিতার মতো বিচিত্র যৌনাচার লক্ষ্য করা যায়। এমনকি পশুকামিতাও! ভারতের বিভিন্ন প্রাচীন মন্দিরের গায়ের টেরাকোটাতেও যৌনতার বৈচিত্র্যের প্রমাণ পাওয়া যায়, এ ছাড়াও বিভিন্ন প্রাচীন প্রত্নসামগ্রীতে প্রাচীন ভারতীয় সমাজের বিচিত্র যৌনাচারের প্রমাণ মিলেছে। সেই কারণেই আমি ভীষণ আশাবাদী হয়েছিলাম যে, সেক্স চেঞ্জ করলে হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী আমার শ্বশুর-শাশুড়ি নিশ্চয় আমাদের সম্পর্ক মেনে নেবেন। পুরাণ অনুসারে বিষ্ণু নিজেই তো কতোবার নারীতে রূপান্তর হয়েছেন, সন্তানও জন্ম দিয়েছেন! সমুদ্র মন্থন ক'রে অমৃত পাওয়া গেলে সেই অমৃত নিয়ে দেবতা এবং অসুরদের মধ্যে দন্দ্ব বাধে, দন্দ্ব নিরসনে স্বয়ং বিষ্ণু মোহিনী মায়ায় স্ত্রী রূপ ধারণ ক'রে দানবদের কাছে যান, দানবরা বিষ্ণুর মোহিনী রূপ দেখে মোহিত হয়ে তাকে বিশ্বাস ক'রে তাঁর হাতে অমৃত সমর্পণ করে। মোহিনী রূপী বিষ্ণু দেবতা এবং দানবদের শ্রেণীবদ্ধভাবে বসিয়ে উভয়ের মধ্যে অমৃত সমবণ্টন করার নামে ছলনা ক'রে তিনি কেবল দেবতাদেরকেই অমৃত পান করাছিলেন আর অসুরদেরকে পান করাচ্ছিলেন সোমরস। দানব রাহু মোহিনীরূপী বিষ্ণুর এই ছলনা ধরতে পারে, সে চুপিসারে দেবতাদের মধ্যে গিয়ে ব'সে পড়ে আর মোহিনীরূপী বিষ্ণুও রাহুকে দেবতা মনে ক'রে অমৃত দান করেন। চন্দ্র এবং সূর্য রাহুকে চিনতে পেরে মোহিনীরূপী বিষ্ণুকে ব'লে দেন আর সঙ্গে সঙ্গে বিষ্ণু তার সুদর্শন চক্র দিয়ে রাহুর মুণ্ডচ্ছেদ করেন। কিন্তু ইতিমধ্যে অমৃত রাহুর পেটে চ'লে যাওয়ায় মুণ্ডু আর ধর বিচ্ছিন্ন হলেও সে অমরত্ব লাভ করে। আর তখন থেকেই চন্দ্র এবং সূর্যের সঙ্গে তার চিরশত্রুতার শুরু, রাহুর চন্দ্র-সূর্য গ্রহণ। রাহুর মুণ্ডচ্ছেদের পর বিষ্ণু মোহিনীরূপ ত্যাগ ক'রে স্বরূপে আবির্ভূত হয়ে দেবতাদের সঙ্গে দানবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। 

দূর্গা যখন মহিষাসুর বধ করেন, তখন মহিষাসুরের বোন মহিষী বদলা নেবার শপথ ক'রে ব্রহ্মার তপস্যা শুরু করে। তার তপস্যায় সন্তুষ্ট ব্রহ্মা বর দিতে চাইলে সে বললো, 'কেউ যেন আমাকে যুদ্ধে হারাতে এবং বধ করতে না পারে।' 

বিব্রত ব্রহ্মা জানালেন, 'তা কী ক'রে সম্ভব! তুমি অন্য বর চাও।'

কিন্তু মহিষী অটল, সে তার অভীষ্ট বর-ই চায়। 

তখন ব্রহ্মা তাকে এই বর দিলেন, 'দু'জন পুরুষের মিলনে উৎপন্ন সন্তান ব্যতিত অন্য কেউ তোমাকে পরাজিত বা বধ করতে পারবে না।' 

মহিষী মহা খুশি! কেননা সে জানে যে, দু’জন পুরুষের মিলনে সন্তান জন্মানো অসম্ভব, ফলে তাকে বধ করাও কারো পক্ষে সম্ভব নয়। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর মহিষী স্বর্গ আক্রমণ ক'রে দেবতাদের বিতাড়িত করলো। সংকট নিরসনে দেবতারা ছুটে গেল শিবের কাছে। ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব মন্ত্রণায় বসলেন - কী উপায়ে মহিষীকে বধ করা যায়। তখন বিষ্ণু মোহিনীরূপ ধারণ ক'রে মিলিত হলেন শিবের সঙ্গে। মোহিনীরূপী বিষ্ণু আর শিবের মিলনে জন্ম হলো অয়প্পানের। অয়প্পানই মহিষীকে বধ করে। 

বিষ্ণুর অবতার শ্রীকৃষ্ণ, তিনিও মোহিনীরূপ ধারণ ক'রে অর্জুন এবং নাগরাজকন্যা উলুপীর পুত্র ইরাবানকে বিয়ে ক'রে তার সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন। অর্জুনপুত্র হওয়ায় স্বভাবতই ইরাবান কুরুক্ষেত্রযুদ্ধে পাণ্ডবপক্ষের হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। তিনি প্রতিদিন যুদ্ধে যাবার আগে কালীপূজা করতেন এবং কালীও ভক্তকে ভবিষ্যদ্বাণী করতেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সপ্তম দিনে কালী ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, আগামীকাল অর্থাৎ যুদ্ধের অষ্টম দিনে ইরাবানের মুত্যু হবে। মৃত্যু আসন্ন জেনে বিচলিত-ব্যথিত ইরাবান অর্জুনকে সব জানালেন। পুত্রের মৃত্যু আসন্ন জেনে অর্জুন দুঃখ পেলেন, পুত্রকে আলিঙ্গন ক'রে জানতে চাইলেন, 'পুত্র তোমার শেষ ইচ্ছে কী?'

'পিতা, আমি যুবক, এখনো বিবাহ করিনি; কখনো নারী সংস্পর্শ পাইনি। মৃত্যুকালে এই অতৃপ্তি আমার থেকে যাবে।'

অর্জুন তখনই দিকে দিকে দূত পাঠালেন পুত্রের জন্য পাত্রীর সন্ধান করার জন্য। কিন্তু দূতরা ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলো, ইরাবানের মৃত্যু আসন্ন জেনে কোনো পিতাই তার সঙ্গে কন্যার বিবাহ দিতে সম্মত নয়। অর্জুন চিন্তায় পড়লেন, তবে কি পুত্রের অন্তিম ইচ্ছা পূরণ হবে না! তখন শ্রীকৃষ্ণ সব জানতে পেরে এই সংকট থেকে তাঁর সখাকে উত্তরণ করলেন নিজে মোহিনী রূপ ধারণ ক'রে ইরাবানকে বিয়ে এবং তার সঙ্গে মিলিত হয়ে। তৃপ্ত ইরাবান পরদিন অর্থাৎ যুদ্ধের অষ্টম দিন যুদ্ধে গেল, প্রবল বিক্রমে যুদ্ধ করতে লাগলো; এক পর্যায়ে রাক্ষস অলম্বুষের হাতে তার মৃত্যু হয়। ইরাবানের মৃত্যুর পর মোহিনীরূপী কৃষ্ণ শাস্ত্র অনুযায়ী বৈধব্য দশা পালন করেছিলেন। 

কৃষ্ণসখা অর্জুনও অপ্সরী উর্বশীর শাপে মৎস্যরাজ্যে অজ্ঞাতবাসের এক বছর নপুংসক হয়ে ছিলেন। নারীবেশ ধারণ ক'রে বৃহন্নলা নাম নিয়েছিলেন তিনি। এই এক বছর তিনি মৎস্যরাজ বিরাটের কন্যা উত্তরা এবং তার সখিদেরকে নৃত্য-গীত-বাদন শিখিয়েছিলেন। 

মৃগয়ায় গিয়ে ইন্দ্রের ছলনায় মোহিত রাজর্ষি ভঙ্গাসন অরণ্যে ঘুরতে ঘুরতে তৃষ্ণার্ত হয়ে এক সরোবরে অবগাহন করামাত্র স্ত্রীরূপ পেয়েছিলেন। এক ঋষির ঔরসে তার গর্ভে শতপুত্রের জন্ম হয়েছিল। 

বাহ্লীকদেশে ইল নামে এক রাজা ছিলেন, তিনি প্রজাপতি কর্দমের পুত্র। একবার অনুচরবর্গ সহ মৃগয়া করতে গিয়ে কার্তিকেয়র জন্মস্থানে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেখানে মহাদেব এবং পর্বতী ক্রীড়া করছিলেন, আর তাদের মনোরঞ্জনের জন্য ভগবান ঋষভরাজ তখন স্ত্রীরূপে ছিলেন, সেই কাননে তখন যতো প্রাণী ছিল সবাই স্ত্রীত্ব পেয়েছিল। রাজা ইল এবং তার অনুচরবর্গও স্ত্রীত্ব পেয়েছিলেন, ইল হয়েছিলেন ইলা। দুঃখিত ইলা মহাদেবের শরণাপন্ন হ'লে মহাদেব তাকে বললেন, 'পুরুষত্ব ব্যতিত তুমি অন্য বর চাও।'

ইলা তখন পার্বতীর শরণাপন্ন হলেন। পার্বতী তাকে বললেন, 'মহাদেব তোমাকে অর্ধ বর দিয়েছেন, অপর অর্ধ আমি দিচ্ছি।'

ইলা তখন বর চাইলেন, 'দেবী আমি যেন একমাস স্ত্রীরূপ এবং একমাস পুরুষরূপ পাই।'

পার্বতী বললেন, 'বেশ, তুমি যখন পুরুষরূপে থাকবে, তখন স্ত্রীভাব তোমার মনে থাকবে না, আবার যখন তুমি স্ত্রীরূপে থাকবে, তখন পুরুষভাব ভুলে যাবে।' 

এভাবেই মহারাজ ইল একমাস পুরুষরূপে ইল এবং একমাস স্ত্রীরূপে ইলা হয়ে বিচরণ করতে লাগলেন। সরোবরে তপস্যারত চন্দ্রপুত্র বুধ ইলার সৌন্ধর্যে মুগ্ধ হন, তিনি ইলার গর্ভে পুরুরবা নামে এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। 

এ তো গেল রূপান্তরকামিতার গল্প, সমকামিতার গল্পও দুর্লভ নয়। রামচন্দ্রের পূর্বপুরুষ মহারাজ সগরের প্রপৌত্র দিলীপ নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে বংশরক্ষার সংকট উপস্থিত হয়। শিব তখন দিলীপের দুই বিধবা স্ত্রীকে দৈহিক মিলনের আদেশ দেন। দুই বিধবা রানির মিলনের ফলে অস্থিহীন এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়, ঋষি অষ্টাবক্রের বরে সেই অপূর্ণাঙ্গ দেহের পুত্র পূর্ণাঙ্গ দেহ লাভ করে। তার নাম রাখা হয় ভগীরথ। ভগীরথের বংশধরই উত্তরকালের বিখ্যাত রামচন্দ্র। 

যে ধর্মের দেব-দেবতা সমকামিতা-রূপান্তরকামিতায় বিশ্বাসী, যে ধর্মের দেব-দেবতারা সমকামিতা-রূপান্তরকামিতার সম্পর্কে জড়িয়েছেন, সন্তান উৎপাদন করেছেন, সেই ধর্মের মানুষ কি আমাদের সম্পর্ককে অস্বীকার করতে পারেন? নিশ্চয় নয়! আমাদের সম্পর্ককে অস্বীকার করলে তো স্বয়ং দেবতাদের সম্পর্ককেই অস্বীকার করা হয়। আর ধর্মপ্রাণ মানুষ কি কখনো দেবতাদের সম্পর্ক অস্বীকার করতে পারেন? নিশ্চয় না। 

অরিত্র বাড়িতে যাবার পর কতোভাবেই না নিজেকে প্রবোধ দিয়েছি, মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতে চেয়েছি যে, আমার শ্বশুর-শাশুড়ি নিশ্চয় আমাদের সম্পর্ক মেনে নেবেন; আশায় বুক বেঁধে স্বপ্ন দেখেছি যে, আমি বধূবেশে তাদের বাড়িতে পা রেখেছি, তারা আমায় বরণ ক'রে নিচ্ছেন। কেনইবা আশায় বুক বাঁধবো না! অরিত্রর কাছে শুনেছি ওদের বাড়ির ঠাকুরঘরে রাধাকৃষ্ণের পিতলের বিগ্রহ আছে, আমার শাশুড়ি প্রতিদিন সেই বিগ্রহ স্নান করিয়ে পূজা করেন; যে কৃষ্ণ মোহিনীরূপ ধারণ ক'রে ইরাবানের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন, তাঁর অবিবাহিত সঙ্গিনীসহ তাঁকে পূজা করেন আমার শাশুড়ি; এরপরও আশাবাদী না হওয়াটা তো আমার অন্যায়! শ্বশুর-শাশুড়ির ঘরের দেয়ালে মহাদেবের ছবি আছে, যে মহাদেব মোহিনীরূপী বিষ্ণুর সঙ্গে মিলিত হয়ে পুত্রের জন্ম দিয়েছিলেন; আমার শাশুড়ি রোজ সেই মহাদেবকে প্রণাম করেন, ধূপ-সন্ধ্যা দেন। এরপরও আমি কি ক'রে অবিশ্বাস করবো যে, আমার শ্বশুর-শাশুড়ি আমাদের সম্পর্ক মেনে নেবেন না? অবিশ্বাস করা মানে তো ধার্মিক গুরুজনকে অশ্রদ্ধা করা!

তাই আমি বিশ্বাস ক'রে, স্বপ্ন দেখে, আশায় বুক বেঁধে সুসংবাদ শোনার অপেক্ষায় ছিলাম। বিশ্বাস করেছিলাম যে, অরিত্র ওর বাবা-মা'র কাছ থেকে আমার জন্য এক নতুন পৃথিবী নিয়ে আসবে, যে পৃথিবীতে আমি নতুন ক'রে বাঁচতে পারবো। কিন্তু আমার সকল বিশ্বাস-স্বপ্ন-আশা মিথ্যে প্রমাণ ক'রে, দেবতা এবং দেবতার অবতারের সম্পর্ক অস্বীকার ক'রে আমার শ্বশুর-শাশুড়ি অরিত্রকে ফেরালেন শূন্য হাতে! তারা অরিত্রকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে, এই সম্পর্ক কোনো সম্পর্ক নয়, এটা পাপ; নারী-পুরুষের সম্পর্কই চিরন্তন! হায়, যারা দেবতায় বিশ্বাস করেন, দেবতার পূজা করেন; অথচ সেই দেবতার সম্পর্ক তাদের কাছে পাপ! 

সমাজ-সম্মানের কথা ভেবেই আমার শ্বশুর-শাশুড়ি আমাদের সম্পর্কটি মেনে নিলেন না। সেই যে ম্লান মুখে বাড়ি থেকে এলো অরিত্র, আর কখনো বাড়ি যায়নি। আমারই মতো ওর জন্যও বাড়ির দরজা বন্ধ হয়ে গেল। আমাদের দু'জনেরই রক্তের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেল, আমরা দু'জন দু'জনার হয়েই রইলাম। 

বৃষ্টিটা আবার বেড়েছে। এখন কতো রাত, কে জানে, ভোর হতে, বোধহয়, বেশি দেরি নেই। অথচ ঘুম আসছেই না চোখে। ক্ষুধা অনুভূত হচ্ছে। উঠে ডাইনিংয়ে গিয়ে ফ্রিজ থেকে একটা চমচম প্লেটে নিয়ে আবার এসে চেয়ারে বসলাম, আসবার সময় দেখলাম অরিত্র যেভাবে পাশ ফিরে শুয়েছিল, এখনো সেভাবেই আছে। 

আমাদের সম্পর্কের বয়স বারো বছর, দশ বছর হলো আমরা একসঙ্গে থাকছি। দশ বছর পর হঠাৎ মনে হচ্ছে যে, আজ আমাদের বাসর রাত। এই দশ বছরে যতো রাত আমরা একসঙ্গে কাটিয়েছি, প্রত্যেকটা রাতই সুখের ছিল, কিন্তু আজকে উপচে পড়া সুখের কারণ - আমি লিঙ্গ রূপান্তর করার পর আজই প্রথম আমাদের শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে। আমার এতোদিনের সাধ পূরণ হয়েছে। এখন আমি কেবল চৈত্তিকভাবে নয়, দৈহিকভাবেও নারী। আজ পুরোপুরি সার্থক হয়েছে আমার জীবন; আহা, সুখের নারীজীবন! 

চমচমটা খেয়ে প্লেটটা ডাইনিংয়ে রেখে জল পান ক'রে আবার এসে বসেছি। কয়েক মুহূর্ত পর হামাগুড়ি দিয়ে ঘর থেকে বারান্দায় এসে একবার আমার দিকে তাকালো, তারপর আমাকে অতিক্রম ক'রে রেলিংয়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে বেশ কায়দা ক'রে রেলিং ধ'রে দাঁড়ালো নক্ষত্র! এরপর ধরলো বারান্দার শিক, হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ছুঁয়ে ঠোঁটে ছোঁয়ালো। বৃষ্টির ছাটে ওর গা ভিজে যাচ্ছে দেখে আমি ওকে জোর ক'রে আমার কোলে নিলাম। আবার নেমে যেতে চাইলে বুকে জড়িয়ে ধ'রে কপালে-গালে চুমু খেয়ে আদর করাতে এখন আর নামতে চাইছে না, আমার কানের কাছের একগোছা চুল নিয়ে খেলছে। খেলতে খেলতে নিজে নিজেই কোলে ব'সে পড়েছে আর চঞ্চল হয়ে দু'হাত আমার স্তন উন্মক্ত করার চেষ্টা করছে। ক্ষিধে পেয়েছে ওর, ক্ষিধে পেলে এমন করে! মুখে স্তনবৃন্ত পুরে দিতেই শান্ত হলো, দু'হাতে স্তন ধ'রে চু চু শব্দে স্তন পান করছে, আর আমি মাতৃস্নেহে ওকে বুকে আঁকড়ে ধ'রে বিপুল সুখে তাকিয়ে আছি বৃষ্টির দিকে!

নক্ষত্র, আমাদের একমাত্র সন্তান! আমার গর্ভজাত নয়, অরিত্রর ঔরসজাতও নয়; নক্ষত্র আমাদের দু'জনের মনোজাত সন্তান! আমরা দু'জন ছাড়া ওকে কেউ দেখতে পায় না। আমরা ওকে খাওয়াই, পরাই, ঘুম পাড়াই, ওর সঙ্গে খেলা করি, দুষ্টুমি করি! সেই কবে আমাদের মনে ওর জন্ম হয়েছে, বছর সাতেক তো হবেই, কিন্তু এখনো ও হামগুড়ি দিয়ে হাঁটে আমাদের মনের অন্দরে। বোধহয়, আমরা যতোদিন বেঁচে থাকবো, আমাদের মনোজাত সন্তান নক্ষত্র ততোদিন হামাগুড়ি দিয়েই হাঁটবে। তারপর আমাদের দু'জনের প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হবে নক্ষত্রের গল্প। নক্ষত্রকে নিয়ে আমরা দারুণ সুখে আছি। আমরা যেভাবে নক্ষত্রকে আদর করি, একজন আরেকজনের কোল থেকে ওকে কেড়ে নিই, ঘুম পাড়াই; এসব বাইরের কেউ দেখলে নির্ঘাত আমাদেরকে পাগল বলবে! কিন্তু এই পাগলামিটুকু নিয়ে সত্যিই আমরা সুখে আছি; আমাদের দুঃখ কেবল একটাই, আমরা শিকড়চ্যুত। এছাড়া আমাদের আর কোনো দুঃখ নেই।

অরিত্র এসে আমার পিছনে দাঁড়িয়েছে, 'তুমি না ঘুমিয়ে এখানে বসে আছো?'

আমি ঠোঁটে আঙুল দিয়ে আস্তে ক'রে বললাম, 'চুপ, নক্ষত্র ঘুমোচ্ছে!'

'তুমি ওকেও জাগিয়ে রেখেছো?'

'ঘুমোচ্ছিল না যে!'

'দাও আমার কোলে দাও।'

আমি অরিত্রর দিকে এগিয়ে দিলাম নক্ষত্রকে, কোলে নেবার পর বললো, 'চলো, তুমিও শুতে যাবে।' 

'আমার না ঘুম আসছে না।'

'দুশ্চিন্তা করছো?'

'না, এমনদিনে কেউ দুশ্চিন্তা করে!'

'তাহলে?'

'আমার ভাল লাগছে, ভীষণ ভাল লাগছে; ভাললাগার আতিশয্যে ঘুমই আসছে না!'

অরিত্র মৃদু হেসে আমার কাঁধে হাত রেখে বললো, 'চলো, নক্ষত্রকে ঘুম পড়িয়ে আমরা একসঙ্গে ভাললাগা উপভোগ করি।'

আমরা ঘরে এলাম। অরিত্র আলতোভাবে বিছানার এক কোণে বালিশ রেখে নক্ষত্রকে শুইয়ে দিয়ে ওর গায়ে মাথায় হাত বোলাতে লাগলো। আমিও শুয়ে পড়লাম, কয়েক মুহূর্ত পর নক্ষত্রকে ছেড়ে অরিত্র'র হাত স্পর্শ করলো আমার তলপেট। 

বললাম, 'নক্ষত্র এখনো ভালমতো ঘুমোয়নি!'

অরিত্র আদুরে গলায় বললো, 'ঘুমিয়েছে!' 

'না, ঘুমোয়নি।'

অরিত্র আমার ওষ্ঠ চুম্বন ক'রে বললো, 'আমাদের সন্তান বড় বুদ্ধিমান, বাবা-মা এখন জেগে থাকবে বলেই ও ঘুমিয়েছে!' 

নক্ষত্র আমাদের মনোজগতে ঘুমিয়েছে, জেগে আছি আমরা, জেগেছে আমাদের দুটো শরীর। বাইরে বৃষ্টি, থেকে থেকে বিদ্যুৎ চমকের আলো ঝলকাচ্ছে জানালার পর্দায়। ভিজছে প্রকৃতি; আর আমরাও ভিজছি একে অন্যের ভালবাসায়, প্রেমে-কামে!

(সমাপ্ত)

আখ্যান শেষ। কিন্তু আমি জানি, এই আখ্যান এখানেই শেষ নয়। এই আখ্যান, শাশ্বতীদির আত্মজৈবনিক আখ্যান। তার জীবনের সুখ-দুঃখ, চাওয়া-পাওয়া, যন্ত্রণা-বঞ্চনার আখ্যান। শাশ্বতীদি গত বছর ভারতে গিয়ে সেক্স চেঞ্জ করিয়েছে; এখন সে কেবল চৈত্তিকভাবেই নয়, দৈহিকভাবেও নারী। আমার দেখা বহু দম্পতির মধ্যে সবচেয়ে সুখী দম্পতি শাশ্বতীদি আর পরাগদা। তারপরও আমাদের চারপাশের অনেক মানুষ শাশ্বতীদি আর পরাগদার সম্পর্কের স্বীকৃতি দিতে চায় না, রাষ্ট্রীয়ভাবেও তাদের সম্পর্ক স্বীকৃত নয়; এই অশিক্ষা মানুষের, এই দৈন্য রাষ্ট্রের। কারো স্বীকৃতির অপেক্ষায় থেমে নেই তাদের জীবন, জীবন চলছে জীবনের নিয়মে। মহাকালের নিরিখে এই জীবন খুবই ছোট, ছোট এই জীবনে দুটো মানুষ একে অন্যকে ভালবেসেছে, কাছে এসেছে, নিজেদের মতো ক'রে উপভোগ করতে চাইছে জীবনটা; এর মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা বা প্রকৃতিবিরুদ্ধতা নেই। তাদের প্রেম-ভালবাসা, কামনা-বাসনা; প্রকৃতির মতোই চিরন্তন সত্য।

(চলবে)