১৪ জানু, ২০১৭

সাইমুম (উপন্যাস: পর্ব ২৫)


আধো ঘুমের মধ্যে গুনগুন সুরের গান কানে আসছিল। মনে হচ্ছিল, আমি কোথায়? রাতে কি কম্পিউটারে গান চালিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছি? আর তারপরই ঘুমের কুয়াশা আরেকটু কাটলো যখন পিঠের নিচের অনভ্যস্ত বিছানা আর মাথার নিচের বালিশটাকে অনুভব করলাম। চোখ বুজে থাকলেও এখন আমি অধোচেতন থেকে পুরোপুরি চেতনে। গানের সুর ছাড়াও কানে ভেসে আসছে পাখপাখালির কিচির-মিচির, মোরগের বাগ, হাতি আর সিংহের ডাক! এখান থেকে চিড়িয়াখানা খুব কাছেই, তাই চোখ বুজে কান পাতলে অরণ্যের অনুভূতি পাওয়া যায়। ভাল ঘুম হয়নি আমার, আসলে নতুন জায়গায় আমি ভাল ঘুমোতে পারি না, ঘুম গভীর হয় না, আর মাঝে মাঝেই ভেঙে যায় ঘুম। চোখ খুলে মাথার কাছের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম, এখন প্রায় সকাল; এখানে ওখানে ঘামটি মেরে থাকা অন্ধকার উবে যাচ্ছে ক্রমশ। দৃষ্টি গুটিয়ে আনলাম বিছানায়, আবির ঘুমোচ্ছে। বাইরে থেকে ভেসে আসছে গুনগুন সুরে গাওয়া আরশাদ ফকিরের গান। আমরা ঘুমিয়েছি মাঝরাতের পর, অথচ এতো সকালে উঠে পড়েছেন উনি! গভীর রাতে ঘুমোলেও বাউল-ফকিরদের দেহঘড়ি কী ভোরবেলায় জাগিয়ে দেয়? কী জানি! 

সেদিন আফজাল ভাই আমাকে যে ভাল খবরটি শোনাতে চেয়েছিল, তা হলো - তার গুরু আরশাদ ফকিরের আসার খবর। তিনি কিশোরগঞ্জ গিয়েছিলেন, শিষ্যের পীড়াপীড়িতে ফেরার সময় তার বাড়িতে চরণধূলি দিতে রাজি হয়েছিলেন। খবরটি শোনার পর থেকেই আমি মুখিয়ে ছিলাম যে, কবে আসবেন তিনি। সরাসরি বাউল-ফকিরদের গান অনেকবার শুনেছি, কিন্তু কখনোই সংসারত্যাগী কোনো বাউল-ফকিরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আলাপ করার সুযোগ হয়নি; সে কারণেই আমার আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। শাশ্বতীদি, পরাগদা আর আবিরকেও বলেছিল আফজাল ভাই। কিন্তু শাশ্বতীদি অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে আর পরাগদার কলেজে পরীক্ষা থাকায় আসতে পারেনি। এসেছি আমি আর আবির। পরশু সন্ধ্যায় হলি আর্টিজানে জিম্মি ঘটনার পর থেকেই মনটা বেশ বিচলিত ছিল, জঙ্গিদের হাতে জিম্মিদের নৃশংস হত্যার খবর জানার পর থেকে কাল সারাটা দিন মন খারাপ ছিল। এমনিতেই আজকাল রাস্তায়-চলতে ফিরতে আতঙ্কে থাকি যে, কখন পেছন থেকে চাপাতি নেমে আসে ঘাড়ে! আর এই ধরনের ঘটনা আশঙ্কা আরো বাড়িয়ে দেয়। নিজের কথা ভেবে যেমনি বিচলিত বোধ করি, তেমনি খারাপ লাগে খুন হওয়া মানুষদের কথা ভেবে, তাদের পরিবারের কথা ভেবে। সেই মন খারাপ নিয়েই কাল সন্ধেয় এসেছিলাম আফজাল ভাইয়ের বাড়িতে। কিন্তু আফজাল ভাইয়ের গুরু আরশাদ ফকিরের সান্নিধ্য পেয়ে মন খারাপের মেঘ কখন যে ভেসে গিয়েছিল, তা নিজেও টের পাইনি, যেন এক অন্য জগতে প্রবেশ করেছিলাম! সন্ধে থেকে গভীর রাত অব্দি দুই ভাগে গান আর তত্ত্ব আলোচনা শুনে দারুণ কেটেছে! প্রথম ভাগ রাত দশটা অব্দি আফজাল ভাইয়ের বাড়িতে; সেখানে আফজাল ভাইয়ের গুরু আরশাদ ফকির আর গুরু মা’কে কেন্দ্র ক’রে আমি, আবির আর আফজাল ভাইয়ের পরিবার ছাড়াও ছিল আশপাশের কয়েকজন সঙ্গীত পিপাসু মানুষ। আর দ্বিতীয় ভাগ খাওয়া-দাওয়ার পর তুরাগের বুকে নৌকায় ভাসতে ভাসতে; আরশাদ ফকিরকে কেন্দ্র ক’রে আফজাল ভাই, আমি আর আবির। 

আমি আর আবির যে আধ্যাত্মিকতায় বিশ্বাসী তা নয়, আমরা দু’জনই ভিন্ন চিন্তার জগতের বাসিন্দা হলেও এসেছি গান আর কিছু তত্ত্বকথা শুনতে, একজন বাউলকে কাছ থেকে দেখতে। আমরা বাউল-ফকির দর্শনের খুব যে ভক্ত তাও নয়, বরং অন্যান্য ধর্র্মের মতোই বাউল-ফকিরদের কিছু কুসংস্কার আমরা অপছন্দ করি। বাউল-ফকির দর্শন সম্পর্কে আমি কিছু কিছু পড়াশোনা করেছি, যদিও পুঁথিগত বিদ্যার মাধ্যমে বাউল-ফকির দর্শনের নিগূঢ় তত্ত্ব সম্পর্কে গভীরভাবে জানা প্রায় অসম্ভব। এটা কেবল দিনের পর দিন বাউল-ফকিরদের সঙ্গলাভ, প্রত্যক্ষভাবে তাদের জীবনাচার অবলোকন করার মাধ্যমেই সম্ভব। তা ব’লে ইদানীং কালের অধিকাংশ যুবকের মতো শুধুমাত্র হুজুগে গা ভাসিয়ে গানের তালে উদ্দাম নাচতে বা দেহ দোলাতেও আসিনি। বই পড়ে আর আফজাল ভাইয়ের মাধ্যমে সমুদ্রের বারিবিন্দুর মতো হলেও বাউল-ফকিরি ভাষা কিছু রপ্ত করেছি। আগে তো গানের কথায় অমাবস্যা শব্দটি শুনলে চোখের সামনে ভাসতো আমাদের গ্রামের বাড়ির ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত্রি, বাঁকা নদী বলতে বুঝতাম গড়ান চটবাড়ির কাছে বাঁক নেওয়া তুরাগ। কিন্তু এখন অমাবস্যা মনে বিস্ময় জাগায়, বাঁকা নদী শরীরে জাগায় শিহরণ!

অনেক বাউল গানের অন্তর্গত দর্শন বা চিন্তার সঙ্গে আমি একমত না হলেও কিছু গান ভাল লাগে, হৃদয় স্পর্শ করে। আবার অনেক গান আমি বুঝিও না। কেননা বাউল গানের শরীর দেখে অন্তর বোঝা যায় না। শব্দের আস্তিনে লুকোনো থাকে গুপ্ত অর্থ। আজকাল শহরের তথাকথিত আধুনিক যুবকদের মধ্যে বাউল গানের প্রতি এক কৃত্রিম উন্মাদনা দেখতে পাই; অনেকে যে আগ্রহ নিয়ে ডিজে পার্টিতে যায়, সেই একই আগ্রহ নিয়ে যায় বাউল গানের আসরে, অর্থ না বুঝেই বাউল গানের বহিরঙ্গের সঙ্গে অঙ্গ নাচায় দুদ্দাড়। আমার ধারণা এদের বেশিরভাগই কিছু কিছু বাউলগানের গূঢ় অর্থ যদি জানতে পারে, তাহলে হয়তো নাক সিঁটকাবে, মওলানাদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গালমন্দও করবে বাউলদের! আজকাল শহরে বাউল গানের কৃত্রিম শ্রোতা যেমনি তৈরি হয়েছে, তেমনি তৈরি হয়েছে কৃত্রিম বাউলও। কৃত্রিম শ্রোতা তৈরিতে কৃত্রিম বাউলরা অগ্রণী ভূমিকা পালন ক’রে থাকে। 

পুঁথিগত বিদ্যা আর আফজাল ভাইয়ের মাধ্যমে বাউল দর্শন সম্পর্কে যতোটুকু জেনেছি, তাতে অপছন্দের অনেক কিছুই আছে, আবার পছন্দের বিষয়ও আছে, আছে বিস্ময়ের। 

আবির পাশ ফিরে শুলো। ওকে আমার ঈর্ষা হয়, ওর মতো যদি ঘুমোতে পারতাম! আরশাদ ফকির গান থামিয়ে কথা বলছেন। আফজাল ভাইও এতো সকালে উঠে পড়েছে? নাকি আরশাদ ফকির একা একাই কথা বলছেন! সম্ভবত তিনি ফোনে কথা বলছেন, আর একটু পরই তিনি আফজাল ভাইয়ের নাম ধ’রে ডাকতে লাগলেন। কিছুক্ষণ নীরবতা, তারপর আবার আরশাদ ফকিরের কণ্ঠ, ‘সর্বনাশ হয়ে গেছে, বাবা। তোমার মারে ডাকো। আমাদের একনি রওনা হতি হবি।’ 

তার কথা আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি, অনুভব করতে পারছি তার কণ্ঠের বেদনা। আফজাল ভাই বললো, ‘কী অয়ছে বাবা?’

‘রাততিরি কারা যেন আখড়ায় আগুন দিয়েছে, ছেলেপেলেগুলোকে মেরেছে!’ 

‘হায় কপাল!’ বলেই আফজাল ভাই নীরব, নীরব আরশাদ ফকিরও। 

‘তোমার মা’রে ডাকো বাবা, এক্ষুনি রওনা হই।’ 

আফজাল ভাই তার গুরু মা আর ভাবীকে ডাকলো। আমি চিৎ হয়ে শুয়ে থ মেরে তাকিয়ে আছি টিনের চালের দিকে, কিন্তু অন্তরচক্ষুতে আমি দেখতে পাচ্ছি দাউ দাউ ক’রে জ্বলতে থাকা আখড়া, আরশাদ ফকিরের শিষ্যদের মার খাওয়া, তাদের আহাজারি-আর্তনাদ। অদ্ভুত সুন্দর একটি রাত পার করার পরই যে সকালটা এমন বিষন্নতায় ভ’রে উঠবে, তা কে ভেবেছিল! সুস্বাদু মিষ্টি খাবার পরই মুখে ভীষণ তেতো স্বাদ পেলে যে অনুভূতি হয়, হৃদয় আপ্লুত করা রাতের পর আমার হৃদয়েও তেমনি বিপরীত অনুভূতি হচ্ছে এখন। 

আর শুয়ে থাকা চলে না। উঠলাম, একবার ভাবলাম আবিরকে ডাকবো কি না, তারপর মনে হলো, থাক বেচারা আরেকটু ঘুমোক। আমি দরজা খুলে বারান্দায় এলাম, আরশাদ ফকির ব’সে আছেন খুঁটিতে হেলান দিয়ে, তার পাশেই আফজাল ভাই। ঘুম থেকেই উঠেই দুঃসংবাদ শুনে হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আফজাল ভাইয়ের গুরু মা আর ভাবী। 

আফজাল ভাই ভাবীকে তাড়া দিলো, ‘জলদি দুডে ফ্যানাভাত চড়িয়ে দাও।’

‘এখন আর মুখে কিছু যাবে না রে, বাবা, খাতি গিলি দেরি হয়ে যাবিনি।’ 

‘হাত মুখ ধুতি ধুতি হয়ে যাবিনি। তুমি যাও।’ ভাবীকে আবার তাড়া দিলো আফজাল ভাই। ভাবী রান্নাঘরের দিকে ছুটলো। 

আফজাল ভাই আমার উদ্দেশে বললো, ‘সর্বনাশ অয়ে গেছে, ভাইডি। বাবার আখড়া আগুন দিয়ে পুড়ায়ে দিছে। গুরু ভাইদের মারধর করিছে।’

আমি আরশাদ ফকিরের কাছে গিয়ে বসলাম। তিনি চোখ তুলে আমার দিকে তাকালেন, দু’চোখ তার সংযত জলের কুয়ো! 

আরশাদ ফকির, তার সাধনসঙ্গিনী আর আফজাল ভাইকে গাবতলী থেকে মেহেরপুরের বাসে তুলে দিয়ে রাস্তা পার হয়ে আমরাও ফেরার বাসে উঠে বসলাম। আমার চোখে ভাসছে আরশাদ ফকিরের জল ছলছল দু’টি চোখ, কানে বাজছে তাদেরকে সিটে বসিয়ে বাস থেকে নামার সময় আমাদের উদ্দেশে বলা তার কথা, ‘বাবা, ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে, তাতে কী হয়েছে, গাছতলা তো আছে; একবার যেও তোমরা দু’জন ওই গাছতলাতেই!’ 

বাউুল-ফকিরদের ওপর এই হামলা, তাদেরকে উৎখাত কিংবা চুল-দাড়ি কেটে তাদেরকে সমাজের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ে ফিরিয়ে নেবার অপচেষ্টা নতুন নয়; বহুকাল ধরেই এই অপচেষ্টা চলছে। কেবল বাউল-ফকির নয়, ভারতবর্ষে হিন্দু এবং মুসলমান ধর্মের শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে যখনই যে নতুন ধর্ম বা উপধর্মের জন্ম হয়েছে কিংবা যে বা যারা ধর্মগুলির হাল ধরতে চেয়েছে তাদের পথ অনেককেই কম-বেশি নিপীড়ন সইতে হয়েছে। চতুর্দশ শতকে গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রচার-প্রসারকালে শ্রী চৈতন্যকে কেবল মুসলমানদেরই নয়, ব্রাহ্মণ এবং হিন্দু সমাজপতিদেরও প্রবল বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। ব্যঙ্গ ক’রে তাকে বলেছে, ‘ন্যাকা চৈতন্য’; তার মাথার টিকির নাম দিয়েছে ‘চৈতনটিকি’। এতেও ক্ষান্ত হয়নি বিরোধীরা, নিরামিষাশী চৈতন্যের দুর্নাম রটাতে লিখেছে ব্যঙ্গাত্মক গান -

‘নবদ্বীপের বাঁধাঘাটে
নিত্যানন্দ পাঁঠা কাটে
নিমাই চাপিয়া ধরে ঠ্যাং।’

সমকালীন চৈতন্যবিরোধিতার আরো নমুনা পাওয়া যায় বৃন্দাবন দাসের লেখায় -

‘কেহো বোলে, “এগুলা সকল নাকি খায়।
চিনিলে পাইবে লাজ - দ্বার না ঘুচায় ॥”
কেহ বোলে - “সত্য সত্য এই সে উত্তর।
নহিলে কেমতে ডাকে এ অষ্টপ্রহর ॥”
কেহ বোলে - “আরে ভাই মদিরা আনিয়া।
সভে রাত্রি করি খায় লোক লুকাইয়া ॥”

অভিমানে হোক কিংবা প্রাণ বাঁচাতেই, জীবনের শেষ আঠারো বছর চৈতন্য গৌড়বঙ্গে পা রাখেননি। লোকগীতিকার লিখেছেন -

‘মহাপ্রভুর বিজয়ের কালে
যতো দেশের বিটলে বামুন
তারে পাগল আখ্যা দিলে।
মানুষ অবতার গোঁসাই
সাত্ত্বিক শরীরে উদয়
দেখে তাই পামর সবাই 
ভির্মি রোগী বলে ॥
যখন দেখে মিথ্যা কিছু নয়
বৈষ্ণব এক গোত্রসৃষ্টি পায়
দেশের বামুন মিলে সবাই 
শাস্তর লিখে নিলে॥’

বন্য প্রাণীর মধ্যে যেমনি শিয়াল চতুর, মানুষের মধ্যে তেমনি ব্রাহ্মণ! ব্রাহ্মণরা যখন চৈতন্যের অগ্রযাত্রা রোধ করতে ব্যর্থ হলো, যখন দেখলো যে, বৈশ্য-শূদ্ররা মেনে নিয়েছে চৈতন্যকে; তখন তারা একটু একটু ক’রে এগোতে লাগলো গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের দিকে, আর চৈতন্যের মৃত্যুর পরই ঝামেলাটা পাকালো। নিত্যানন্দ চৈতন্যের আদর্শ অনুসারে জাতপাতহীন গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের কথা বললেও এই সময় থেকেই ব্রাহ্মণ বৈষ্ণবরা জোটবদ্ধ হতে থাকলো ‘ব্রাহ্মণ বৈষ্ণব’ নামে, আর নিত্যানন্দের মত্যৃর পর হিন্দু ধর্মের জাতিভেদ ফিরে এলো গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মেও। ব্রাহ্মণ বৈষ্ণবরা নতুন আইন করলো যে, কেবলমাত্র তারাই সকল বর্ণের বৈষ্ণবদের দীক্ষা দিতে পারবে; বৈশ্য-শূদ্র বৈষ্ণবরা ব্রাহ্মণদেরকে দীক্ষা দিতে পারবে না, তারা সম বর্ণ বা নিচু বর্ণের বৈষ্ণবদের দীক্ষা দিতে পারবে। ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়লো নিচু বর্ণ থেকে আসা বৈষ্ণবরা; ফলে এই নিচু বর্ণের বৈষ্ণবদের হাতেই জন্ম নিলো সহজিয়া বৈষ্ণব। অর্থাৎ জাতপাতহীন একটি উদার ধর্মকে ধর্ষণ করলো ব্রাহ্মণরা। 

শীতকালে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গেলেই দেখি কোথাও না কোথাও চব্বিশ, বত্রিশ, আটচল্লিশ বা ছাপ্পান্ন প্রহরব্যাপী হরিনাম সংকীর্তন হচ্ছে, আর সেখানে ব্রাহ্মণ বা অন্য উচ্চ বর্ণের মানুষদের উপস্থিতিই শুধু থাকে না, আয়োজক কমিটিতেও এরা থাকে। বামন-বামনীরা সব ঊর্ধ্ববাহু হয়ে হরিনাম সংকীর্তন করতে করতে চোখের জল ফেলে। দেখে আমার ভীষণ হাসি পায়, একদিন এদের পূর্বপুরুষরাই লিখেছিল - ‘নবদ্বীপের বাঁধাঘাটে/ নিত্যানন্দ পাঁঠা কাটে/ নিমাই চাপিয়া ধরে ঠ্যাং!’

আঠারো শতকের শেষদিকে হিন্দু-মুসলমান ধর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ অনেক উপধর্ম জেগে উঠেছিল; যেমন-কর্তাভজা, দরবেশ, সাঁই, গোপ বৈষ্ণব, চামার বৈষ্ণব, টহলিয়া বৈষ্ণব, গুরুদাসী বৈষ্ণব, বৈরাগী, ফকিরদাসী, সাহেবধনী, কবীরপন্থী, কুড়াপন্থী, বলরামী, চরণদাসী প্রভৃতি; এ ধরনের আরো অনেক উপধর্ম। ধর্মগুলির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা হয়ে ওঠে হিন্দু-মুসলমানের মাথা ব্যথার কারণ। ফলে এদের ওপর অত্যাচার-নিপীড়ন বাড়তে থাকে, এটা বহুলাংশে বেড়ে যায় ঊনবিংশ শতাব্দীতে। কোনো কোনো ধর্ম এতোটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল যে, ব্রাহ্মণ-মওলানাদের রুটি-রুজি হুমকির মুখে পড়েছিল। যেমন কর্তাভজা; জাতিভেদহীন সমন্বয়বাদী এই ধর্মটির প্রতি এমন জনজোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল যে, অপেক্ষাকৃত উদার ব্রাহ্মধর্মের অনুসারীরাও এই ধর্মটির বিরুদ্ধে নানা কুৎসা রটাতে শুরু করে। এসময়ে অন্যান্য উপধর্মের মতো বাউল-ফকির দর্শন বা ধর্মের দিকেও শুরু হয়েছিল জনজোয়ার। অসংখ্য নিম্নবর্ণের হিন্দু আর মুসলমান বাউল-ফকির ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করতে থাকে। ফলে এই উপধর্মগুলির বিরুদ্ধে নোংরা ভাষায় কুরুচিপূর্ণ কুৎসা রটাতে থাকে সমাজের হিন্দু-মুসলমান-ব্রাহ্মরা। শ্রী রামকৃষ্ণের মতো বদ্ধ উন্মাদ ধার্মিক মুখে ‘যতো মত ততো পথ’-এর মতো উদার বাণী দিয়ে অনেকের সম্ভ্রম আদায় করলেও উপধর্মসাধনাকে তিনি আখ্যা দিয়েছিলেন বাড়িতে ঢোকার পায়খানার পথ হিসেবে। 

কোনো সন্দেহ নেই যে, এই ধর্মগুলিও পুরোনো বোতলে নতুন মদ পরিবেশনেরই নামান্তর! হিন্দু-মুসলমান ধর্মের মতো অন্ধ বিশ্বাস, কুসংস্কার আর কাল্পনিক মিথে ঠাসা এই ধর্মগুলিও। তা হলেও ধর্মপালনের অধিকার সকলেরই আছে, কে কি ধর্ম পালন করবে না করবে, সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার; কাউকে ধর্ম পালনে বাধা দেওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘন। 

হিন্দুরা মুখে মারলেও মুসলমানরা তাদের পরম্পরাগত-সহজাত পথেই বেছে নিয়েছিল - সহিংসতার পথ। আলেমদের নির্দেশে তারা বাউল-ফকির নিধনে নেমেছিল। আখড়া পুড়িয়ে দেওয়া, একতারা-দোতারা ভেঙে মারধর করা, দাড়ি-গোঁফ কেটে মাথা মুণ্ডন করা ছিল নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার। প্রাণভয়ে অনেক বাউল-ফকির নিজে থেকেই চুল-দাড়ি কেটে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়েছিল। আগুনে ঘি ঢেলেছিলেন মীর মোশাররফ হোসেন; যাকে ‘প্রথম সার্থক মুসলমান সাহিত্যিক’ বলতে বলতে এযাবৎ মুসলমানদের মুখে টন-টন গ্যাঁজলা উঠেছে, লিখতে লিখতে মণ মণ কালি আর না জানি কতো সহস্র দিস্তা কাগজ ফুরিয়েছে! তিনি লিখেছিলেন - 

‘ঠ্যাঁটা গুরু ঝুটা পীর
বালা হাতে নেড়ার ফকির
এরা আসল শয়তান কাফের বেঈমান।’

সত্যিই তিনি সার্থক মুসলমান, সার্থক মুসলমান সাহিত্যিক; অন্ধ আলেম আর সাহিত্যিকের ভেদ ঘুচিয়ে দিয়েছিলেন! না জানি তার এই উস্কানিতে কতো বাউল-ফকিরের আখড়ায় আগুন জ্বলেছিল, কতো বাউল-ফকিরের মাথায় একতারা-দোতারা আর লাঠির বাড়ি পড়েছিল, কতো বাউল-ফকিরের চুল-দাড়ি কেটে তাদের হৃদয় রক্তাক্ত করা হয়েছিল! 

মুসলমানদের এই বাউল-ফকির বিরোধী অভিযান চলতে চলতে ঊনবিংশ শতাব্দী অতিক্রম ক’রে পৌঁছোয় বিশ শতাব্দীতে। বাউল-ফকির নির্মূলে রংপুরের মওলানা রেয়াউদ্দীন আহমেদ লেখেন ‘বাউল ধ্বংস ফৎওয়া’ নামক বই; যা কট্টরপন্থী মুসলমান সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং বাউল নিধনে মানুষকে বিপুল উৎসাহ যোগায়। পাকিস্তান আমলে ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়েছে পূর্ব-পাকিস্থানের বাউলদের ওপর। তারপর দেশ স্বাধীন হলো, গণতন্ত্র নামক এক গালভরা অভিজাত নাম যুক্ত হলো আমাদের সংবিধানে, ওই গণতন্ত্র্রের সাথে পায়ে পা মিলিয়ে বাউল নিপীড়ন এসে পৌঁছেছে এই একবিংশ শতাব্দীতেও। বাংলাদেশে তো বটেই, পশ্চিমবঙ্গেও অতীতের মতো ব্রাহ্মণদের এখন আর তেমন প্রভাব নেই, শাস্ত্রীয় বিধান দ্বারা তারা মানুষকে অতীতের মতো বেঁধে রাখতে পারছে না। উল্টোদিকে আলেম এবং ধর্মান্ধ মুসলমানের সংখ্যা এবং প্রভাব আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ফলে ভিন্নমতের ওপর নিরন্তর আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে তারা। আজও বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় এবং পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, নদীয়াসহ মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে মুসলমানদের হাতে প্রতিনিয়ত নিগ্রহের শিকার হচ্ছে বাউল-ফকিররা। 

দুপুরের ভাত খেয়ে ঘুমানোর আগে আফজাল ভাইকে ফোন দিলাম, তারা এখনো পৌঁছায়নি আরশাদ ফকিরের গ্রামে। ফোন রেখে শুয়ে পড়লাম; রাতে ঘুম হয়নি, ঘুমে চোখ ভেঙে আসছে কিন্তু মাথার ভেতরে আখড়া পোড়ার অদেখা ছবি। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না, উঠলাম সন্ধ্যার কিছু আগে। ঘুম ভাঙতেই আবারো মাথায় চাগাড় দিয়ে উঠলো আখড়া পোড়ার ছবিটাই। ফোন হাতে নিয়ে দেখলাম আফজাল ভাই আমাকে ফোন দিয়েছিল দু-বার; সাইলেন্স থাকায় বুঝতে পারিনি। আফজাল ভাইকে ফোন ক’রে জানতে পারলাম, আখড়ার একটা ঘর সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, আরেকটার অর্ধেক পুড়েছে। তিনজন বাউলকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে, একজনের অবস্থা বেশি ভাল নয়। 

বিষাদে ছেয়ে গেল মনটা, যার অবস্থা বেশি খারাপ, সে বাঁচবে তো? বাঁচলেই ভাল। এতোদিন লেখক-বাউল-সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর একের পর এক হামলা হলেও সরকার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি, সরকার হেফাজতে ইসলামের মন রক্ষায় ব্যস্ত ছিল। এখন আর এটা কোনো লুকোনো ব্যাপার নয় যে, হেফাজতে ইসলামের প্রধান শফি হুজুরের কওমি মাদ্রাসা জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত, বানের জলের মতো দেশের আনাচে-কানাচে বেড়েছে এই মাদ্রাসা, চালিয়ে যাচ্ছে জঙ্গিবাদ; শফি হুজুর নিজেও জঙ্গিবাদী বক্তব্য দিয়েছে বহুবার, তারপরও সরকার গ্রেফতার করার পরিবর্তে তাকে তুষ্ট রাখতে দান করেছে সরকারী জমি, দিয়েছে নানান সুযোগ-সুবিধা। 

হলি আর্টিজানের হামলার পর পরই সরকার কিছুটা নড়েচড়ে বসেছে, আন্তর্জাতিক চাপ সামলাতে আর দেশি-বিদেশী সংবাদ মাধ্যম এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে দেখাতে জঙ্গি ধরপাকড় শুরু করেছে; এ থেকেই জঙ্গিদের ব্যাপারে সরকারের আপোসকামী মনোভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। 

ফোন ক’রে শাশ্বতীদি আর পরাগদাকে জানালাম আরশাদ ফকিরের আখড়া আক্রান্ত হওয়ার দুঃসংবাদটি। ওরাও আমারই মতো ব্যথিত। আমার ঘরের দরজায় কেউ নক করলো। উঠে দরজা খুলে দেখলাম, মা টেবিলে ইফতার সাজাচ্ছে, আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ইফতার দেব তোরে?’

‘আমি মুখ ধুয়ে পরে খাব।’

বাবা ডাইনিং টেবিলে এসে বসলেন, একবার তাকালেন আমার দিকে। আমি পুনরায় দরজা চৌকাঠের দিকে ঠেলে দিলাম। একটু পরই মসজিদের মাইকে বেজে উঠলো মাগরিবের আযানের সুর, আর চৈতন্যে বেজে উঠলো আফজাল ভাইয়ের কণ্ঠে শোনা একটি গানের সুর - 

মনপাখি চায় মনের আকাশে উড়িতে
মৌলবী চায় তারে শরিয়তের খাঁচায় পুরিতে
শরিয়তের জটিল-কুটিল ফাঁদে
মনপাখি বিষম জ্বালায় কাঁদে 
দিবানিশি মনপাখি মনের মানুষ খোঁজে 
অন্ধ মৌলবী সে কথা নাহি বোঝে।

(চলবে)