২৪ ডিসেম্বর, ২০১৬

সাইমুম (উপন্যাস: পর্ব ২০)

লিখেছেন উজান কৌরাগ


ক্লাস নেই, ঈদের ছুটি শুরু হয়েছে। সকালে উঠার তাড়া না থাকলেও খুব সকালেই উঠলাম, সকালটা না ঘুমিয়ে প্রাতঃভ্রমণ আর প্রকৃতির সান্নিধ্যে কাটাতে চাই। এমনিতেও বেশিরভাগ ছুটির দিনে প্রাতঃভ্রমণে যাই বোর্টানিক্যাল গার্ডেনে, বাসা থেকে রূপনগরের ভেতর দিয়ে হেঁটে গেলে একুশ-বাইশ মিনিট লাগে। 

ছয়টা দশ বাজে। বাবা বাদে বাকিরা সেহেরী খাওয়ার পর নামাজ পড়ে আবার ঘুমিয়েছে, বাবা নামাজ পড়ার পর আর ঘুমান না। আমি ট্রাউজার্স প’রে, সাদা টি-শার্টটা গায়ে চড়িয়ে মানিব্যাগ থেকে শ’খানেক টাকা নিয়ে পকেটে ওকালাম; ব্যাগে এক বোতল ঠাণ্ডা পানি নিলাম, তারপর কেডস্-এ পা গলিয়ে ব্যাগটা পিঠে চড়িয়ে বাবাকে দরজা লাগাতে ব’লে নিচে নামলাম। 

জনশূন্য গলি। একটুও বাতাস নেই, ওপর থেকে নিচে নামতেই ঘেমে গেছি। সেই রোজার প্রথমদিন বিকেলে একটু বৃষ্টি হয়েছিল, তারপর থেকে আবার টানা খরা চলছে। রোজার প্রথমদিন বৃষ্টি হওয়ায় আমার মা আর ফুফু আলাপ করছিলেন আল্লাহর কুদরতের কথা নিয়ে। মা বলেছিলেন, ‘আল্লাহ মহান, আল্লাহ্ দরদী; নইলে এতোদিন বৃষ্টির দেখা নেই, আর রোজার প্রথম দিনেই রোজদারদের কষ্টের কথা চিন্তা ক’রে তিনি উদার হস্তে পানিবর্ষণ করলেন। গরমে কষ্ট দিয়ে তিনি তার বান্দাদের পরীক্ষা নেন।’

ফুফু মায়ের কথায় সায় দিয়ে বলেছিলেন, ‘আল্লার ঠিকই দয়া আছে, মানুষই তারে ডাকার মতো ডাকতে পারে না।’

মা আবার বলেছিলেন, ‘আর বেশি গরম পড়বে না, দেখো। আল্লা তার বান্দাদের আর কষ্ট দেবে না। বৃষ্টিও হবে।’ 

দ্বিতীয় রোজার দিন সকাল থেকেই আবার সেই আগের মতো গরম পড়তে শুরু করেছে। ফ্যানের নিচে বসে থাকলেও গা থেকে দরদর ক’রে ঘাম ঝরে। দয়াবান আল্লাহ্’র কুদরত বটে! 

রোজার মাসের সকালবেলার রাস্তার চিত্র অন্য সময়ের চেয়ে ব্যতিক্রম। স্কুল-কলেজ বন্ধ। রান্নার ঝামেলা নেই ব’লে মানুষও একটু দেরি ক’রে ঘুম থেকে ওঠে, রাস্তায়ও এর প্রভাব পড়ে। অন্য সময়ে গলিগুলোতে যারা প্রাতঃভ্রমণ করে, এ মাসে তাদেরও দেখা যায় না। রাস্তার পাশের ছোট ছোট হোটেলগুলো এতোক্ষণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, বাতাসে ভেসে আসে পরোটা, ডিমভাজা আর পোড়া তেলের মিশ্রিত গন্ধ; কিন্তু রমজান মাস হওয়ায় এখনো হোটেলগুলো খোলাই হয়নি। 

রাস্তায় দাঁড়ানো একটা পুলিশভ্যান চোখে পড়লো। পেছনে বসা চারজন পুলিশ বেঘোরে ঘুমোচ্ছে, চালকও ডানদিকে মাথা এলিয়ে দিয়ে অচেতন। জনগণকে রক্ষা করবে কী, এরা এখন নিজেদের রক্ষা করার অবস্থায়ও নেই। এখন যদি জঙ্গিরা এসে অতর্কিত হামলা চালায়, তো জেগে উঠার পরিবর্তে মহাঘুমের দেশে পাড়ি দেবে এরা। আজকাল পুলিশ-সেনাবাহনীর সদস্যদের ওপর অতর্কিত হামলা করছে জঙ্গিরা। কিছুদিন আগে মিরপুর বেড়িবাঁধে পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে, একজনকে কুপিয়ে হত্যা করেছে আর বাকিরা তাকে ফেলে যার যার জীবন নিয়ে পালিয়েছে। কচুক্ষেতে একজন সেনাসদস্যকে কুপিয়ে আহত করেছে। এরকম ঘটনা এখন হরহামেশাই ঘটছে। সেনাসদস্যদের চেয়ে বেশি বিপদে আছে পুলিশ কনস্টেবলরা। কারণ তাদেরকে বিভিন্ন এলাকার রাস্তায় রাস্তায় ডিউটি করতে হয়, কিছু বুঝে ওঠার আগেই মোটরবাইকে এসে হামলা ক’রে পালিয়ে যায় জঙ্গিরা। কিন্তু এই ঘুমন্ত পুলিশদের দেখে কে বলবে যে, দেশ এখন এক ক্রান্তিকাল পার করছে আর তারা নিজেরাও অবস্থান করছে বিপদসীমায়!

পরশুদিন সন্ধ্যায় দেখলাম ১৩ নম্বর সেকশনের রাস্তার মোড়ের একটা বেঞ্চে পাঁচজন পুলিশ ব’সে আছে আর একজন দাঁড়িয়ে। মেহগনি গাছের সঙ্গে অস্ত্র ঠেকিয়ে রেখে এই ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনই মোবাইল ঘাটছে। উঁকি দিয়ে দু’জনের মোবাইল স্ক্রীনে তাকিয়ে দেখলাম তারা ফেসবুকিং করছে। এভাবেই তারা জঙ্গিদের আক্রমণের কাজটি সহজ ক’রে দিচ্ছে আর বিপন্ন করছে নিজের জীবন। 

এদেরকে জাগিয়ে সতর্ক করাও বিপদ। নানা প্রশ্নে জর্জরিত ক’রে কী প্যাঁচ লাগাবে, কে জানে! আমি কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকলাম তাদের দিকে; একজন তো রীতিমতো নাক ডাকছে, অন্য একজন তার পাশের জনের কাঁধে প্রেমিকের মাথা এলিয়ে দিয়ে ঘুমোচ্ছে। পুলিশভ্যান পাশ কাটিয়ে আমি এগোলাম আমার পথে। 

রাস্তার পাশের চায়ের দোকানগুলোতে যে ছোট ছোট জটলা চোখে পড়তো, তা এখন নেই। মুদিদোকান, ফ্লেক্সিলোডের দোকানসহ কিছু দোকান খুলেছে। সাতসকালে যেসব দোকানে ক’দিন আগেও বাজতো হিন্দি কিংবা অন্য বাংলা গান, সেসব দোকান থেকেই এখন ভেসে আসছে ওয়াজ কিংবা ইসলামী গানের সুর; অধিকাংশ দোকানদারের মাথায়-ই টুপি, দোকানে একটা সহি আবহ সৃষ্টির প্রচেষ্টা! 

শেষ রাস্তাটায় ঢুকে পড়লাম। এমন পাকা রাস্তার চেয়ে মাটির রাস্তাও ভাল; পিচ নেই বললেই চলে, ইটের লাল বুক বেরিয়ে আছে; জায়গা বিশেষে গভীর প্রশস্ত গর্ত, বর্ষায় হাঁটুজল হয় এখানে, সামান্য বৃষ্টিতেও প্যান্ট গোটাতে হয়। পায়ের তলাটা বাদ দিলে এই রাস্তাটা আমার ভাল লাগে, সুনসান, গাছপালা আছে অনেক। গলি ধরে এগোলেই বোর্টানিক্যাল গার্ডেনের আভাস পাওয়া যায়। রাস্তা লাগোয়া আলিশান মসজিদটা থেকে ভেসে আসা সুরে কান পাতলাম হাঁটতে হাঁটতেই, একজন হুজুর কোরান শরীফ পড়ছে। এই রাস্তার শেষ মাথায় রূপনগর খাল, খালের ওপর পুল, পুল পেরোলেই নিচু পথ ধরে মিনিট খানেক এগোলেই বোর্টানিক্যাল গার্ডেনের গেট। খালের এপাশে রাস্তার দু-দিকে দুটো মাদ্রাসা এবং এতিমখানা। বাঁ-দিকে বিল্ডিংয়ের নিচতলায় জামিয়া আশরাফিয়া ঢাকা মাদ্রাসা ও এতিমখানা, আর ডানদিকে রাস্তার ঢালে নিচু জায়গায় ইটের গাঁথুনির ওপর টিনের ছাউনি দেওয়া নূরুল কুরআন মাদ্রাসা ও এতিমখানা। এখানে এসেই আমি কয়েক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াই, আজও দাঁড়ালাম; ডানে-বায়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম দু-পাশের মাদ্রাসার ছেলেগুলোকে। ওরা সামনে-পেছনে মাথা এবং শরীর দুলিয়ে ওদের প্রিয় সহি কিতাব পড়ছে। মাদ্রাসার বইগুলোতে সূক্ষ্মভাবে সাম্প্রদায়িকতা, অন্যধর্মের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ এবং ধ্বংসাত্বক জিহাদী চেতনা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়; ক্লাসে পড়ানোর সময় হুজুররা এই বিষয়গুলো আরো বিশদে এবং খোলামেলাভাবে আলোচনা করে; ছোট থেকেই হুজুররা শিশুদের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয় সাম্প্রদায়িকতার বিষ, অন্য ধর্মের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ ও ভিন্নমত নির্মূলের ফজিলত এবং প্রয়োজনে জিহাদের মাধ্যমে নিজের জীবন উৎসর্গ করার বীজমন্ত্র। মাদ্রাসায় অলিখিতভাবে জাতীয় সঙ্গীত নিষিদ্ধ, শিশুরা জাতীয় সঙ্গীতের একটি লাইনও গাইতে পারে না। মাদ্রাসার বইয়ের বাইরে অন্য কোনো বই পড়তে দেওয়া হয় না, ইসলামী গানের বাইরে অন্য কোনো গান শুনতে দেওয়া হয় না, খবরের কাগজ পড়তে দেওয়া হয় না; সৃজন-মননের সমস্ত দরজা-জানালা বন্ধ ক’রে ইতর প্রাণীর মতো ওদেরকে গড়ে তোলা হয় মানুষরূপী বিশেষ প্রাণী হিসেবে! প্রতি তিনজনে এখন একজন মাদ্রাসা ছাত্র; যা বিপুল সংখ্যক জনশক্তির অপচয়। অথচ আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হ’লে এরা হতো দেশের সম্পদ। 

একেকটি শিশু-কিশোরের দিকে তাকাই আর আমার বুক থেকে ঝ’রে পড়ে দীর্ঘশ্বাস। কী মায়ামাখা নিষ্পাপ ওদের চেহারা, কী সরল ওদের চাউনি, কী নিষ্ঠা ওদের পাঠে; অথচ উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সকল সম্ভাবনাকে গলা টিপে মেরে ওদের জীবনের কী বাজে অপচয়! এমন সাদা পাতার মতো ওদের হৃদয়, এমন সুন্দর কোমল ওদের মুখ, এমন নরম ওদের হাত; অথচ ওই সাদা পাতা একদিন ভরে উঠবে বিদ্বেষ এবং হিংস্রতার কদর্য দাগে, ওই কোমল মুখে ফুটে উঠবে নিষ্ঠুরতার কঠোর-কঠিন রেখা, ওই নরম হাতের আঙুল আজ আদর বুলিয়ে চলেছে ভিনদেশী বর্ণমালার ওপর, কিন্তু একটু পোক্ত হলেই ওই আঙুলগুলো আঁকড়ে ধরবে রক্তলোলুপ চাপাতি! 

ওদের দিকে তাকালে আমি এক অদ্ভুত ঘোরে ঢুকে আমার শৈশবে ফিরে যাই, আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। ওদের প্রত্যেকের ভেতরে আমি নিজেকে খুঁজে পাই। যেন আমার ছেড়ে আসা শৈশবের জরাজীর্ণ খোলসে ঢুকে বসে আছে ওরা, কিন্তু আমার মতো বেরিয়ে আসতে পারছে না। আমার জীবনও তো ওদেরই মতো বাজে খরচের খাতায় লেখা হয়েছিল, সারাটা জীবন হয়তো অপচয় হতো, যেমনি হয়েছে ওদের ওই বয়স্ক হুজুরের। আমাকে মিরপুর ১৩ নম্বর সেকশনের একটা আলিশান মাদ্রাসায় ভর্তি ক’রে রেখে এসেছিলেন আমার চাচা। উহ্, সে কী দুঃসহ জীবন! টিভিতে কার্টুন দেখতে পারি না, ক্রিকেট খেলা দেখতে পারি না, গলির মধ্যে ক্রিকেট খেলতে পারি না। ঘুমে চোখ খুলতে না চাইলেও ভোর চারটেয় জোর ক’রে তুলে দিতো হুজুররা। হাতমুখ ধুয়ে, ওযু ক’রে দল বেঁধে নামাজ পড়তাম। তারপর দল বেঁধেই পড়তে বসতাম। আমি ছোটবেলায় বেশ চুপচাপ ধরনের ছিলাম বিধায় চিৎকার ক’রে সবার সঙ্গে পড়তে আমার খুব কষ্ট হতো, কানে যেন তালা লেগে যেতো। নিজের পড়ার কথা ভুলে আমি অন্যদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম আর সেই অপরাধে হুজুর স্যার আমার দু-হাতের তালুতে বেত দিয়ে বাড়ি দিতো। আর পড়বো কী! প্যাঁচানো আরবি ভাষা সহজে আমার মাথায় ঢুকতো না, বারবার ভুলে যেতাম। একদিন ভোরবেলায় স্বপ্ন দেখেছিলাম যে, আরবি বর্ণগুলো সাপ হয়ে আমাকে পেঁচিয়ে ধরে আমার মুখের কাছে জিভ নাড়ছে আমাকে খাবার জন্য, আর আমি সাপের হাত থেকে বাঁচার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছি কিন্তু কিছুতেই নিজেকে ছাড়াতে পারছি না। শেষে একসময় ‘মা’ বলে চিৎকার ক’রে উঠি। 

বাবা-মা আমাকে দেখতে গেলে আমি তাদের সঙ্গে বাসায় ফেরার জন্য কান্নাকাটি করি, মাকে আঁকড়ে ধরে, মায়ের বোরখা কামড়ে ধরে কাঁদি; কিন্তু কোনো ফল হয় না, আমাকে রেখেই বাবা-মা ফিরে আসেন। আমি কথা একটু কম বলতাম ব’লে কারো সঙ্গে আমার তেমন বন্ধুত্ব হয়নি, আমি কেবলই মুক্তির আশায় ছটফট করতাম কিন্তু মুক্তি মিলতো না।

বিকেলে যখন মাদ্রাসার ছেলেরা মাঠে হইহুল্লোড় করতো তখন আমি মনমরা হয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতাম। আমাকে একলা থাকতে দেখে হাফিজুদ্দিন হুজুর একদিন ডেকে বললেন, ‘তুমি এমন মনমরা হইয়া থাকো কেন? যাও, ওগো সাথে খেলা করো।’

আমি না-সূচক ঘাড় নাড়ি। একদিন হাফিজুদ্দিন হুজুর আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন তার ঘরে। কোলে বসিয়ে আমার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘বাড়ির লাগি পরান দাপায়?’ 

আমি হ্যাঁ-সূচক ঘাড় নাড়ি। 

‘আল্লার পথে থাকতে হলে এট্টু কষ্ট তো অইবোই। তয় যহন বেহেশতে যাইবা, তহন আর কোনো কষ্ট থাকবো না। খালি সুখ আর সুখ। পরকালের সেই সুখ পাইতে অইলে ইহজগতে এই কষ্ট করন লাগবো। শোনো, তোমারে যদি কেউ কিচ্ছু কয়, কেউ যদি তোমারে মারে, আমারে কইবা। আমি তারে চরম শাস্তি দিমু।’ 

আমি ঘাড় নাড়ি। হুজুর কেমন ক’রে যেন আমার গায়ে হাত বুলায়, চুলে হাত বুলায়, মুখে আঙুল বুলায়। আমার পেটের কাছে হাত দিয়ে তার কোলের আরো কাছে টেনে নেয়। 

‘বড় বালা পোলা তুমি। আরেকটু বড় অইলে তুমি অইবা আমার প্রিয় গেলমান। তোমার কিছু দরকার অইলে আমার কাছে চাইবা।’ 

আমি প্রশ্ন করি, ‘গেলমান কী, হুজুর?’

‘গেলমান অইলো হুজুরের প্রিয় বালক। হুজুর যা কইবে, গেলমানরে তাই শুনতে অইবে। হুজুরের সব কতা মাইন্য করলে গেলমান বেহেশতে যাইতে পারবে। তুমি আমার গেলমান অইলে বেহেশতে যাইতে পারবা। তারপর বেহেশতে যাইয়া তুমিও গেলমান পাইবা, যাহারা তোমার সেবা করিবে।’ 

বলে আর আমার মাথায় মুখ ঘষে হুজুর। আমি মনে করতাম হুজুর স্যার আমাকে আদর করছে, আমার বাবা-মাও তো কোলে বসিয়ে আমাকে আদর করেন। হুজুরের গরম নিশ্বাস পড়ে আমার মাথায়, ঘাড়ে, গালে; তার বুক ঘনঘন ওঠা-নামা আর দুই ঊরু অস্বাভাবিক নড়াচড়া করে। হুজুর আমার পিঠের সাথে তার বুক চেপে ধরে, কোলের সাথে আমার পাছা চেপে ধরে। একহাত দিয়ে আমার মাথায় আদর বুলায় আরেক হাত আমার পাঞ্জাবির নিচে ঢুকিয়ে পেটে আদর করতে করতে গালে চুমু খেয়ে বলে, ‘বড় বালা পোলা তুমি, বড় সুন্দর পোলা। তোমারে বালা কইরা পড়া শিহামু, তুমি যা চাইবা আমি তোমারে তাই দিমু।’ 

একসময় হুজুর আরো জোরে তার শরীরের সঙ্গে আমাকে চেপে ধরে, তারপরই তার দুই ঊরু শান্তু হয়, তার বুকের ঘনঘন ওঠানামা ক্রমশ থিতিয়ে আসে, কিছুক্ষণ পর আমাকে তার কোল থেকে নামিয়ে শেষবারের মতো আমার কপালে চুমু খেয়ে বলে, ‘যাও, অহন খেলা করো গিয়া। বড় বালা পোলা। কুনো দরকার পড়লে আমার কাছে চ’লে আইবা। আর তুমি যে আমার গেলমান অইবা এই কতা কাউরে কইবা না, গেলমান হওনের খবর কাউরে জানাইলে সে আর বেহেশতে যাইতে পারে না।’

ব’লে আমার গাল টিপে দেয় হুজুর। আমি হ্যাঁ-সূচক ঘাড় নেড়ে চ’লে আসি। এরপর আরো কয়েকবার আমাকে এভাবে আদর করেছে হুজুর। আমি তখন তার সেই আদরের মানে বুঝিনি, তবে এ ধরনের আদর আমার ভাল লাগতো না। বিশেষ ক’রে হুজুর যখন আমার পাঞ্জাবির নিচে হাত ঢুকিয়ে বুকে এবং পেটে তার হাত ঘষতো আর আমার গালে চুমু খাওয়ার সময় হুজুরের তারের মতো শক্ত দাড়ির খোঁচা লাগতো আমার মুখে, তখন আমার খুব খারাপ লাগতো। 

এরপর একদিন রাতে আমি প্রস্রাব করতে বেরিয়ে দেখি সপ্তম শ্রেণীর এক বড় ভাই ছাদের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সে সিঁড়ির রেলিংয়ের আড়ালে চ’লে গেল। আমার মনে প্রশ্ন জাগলো, এতো রাতে কোথায় গেল সে? ছাদে? কিন্তু ছাদের গেটে তো তালা দেওয়া? নাকি ছাদের গেট খুলে দিয়েছে কিন্তু আমি জানি না? ভাবতে ভাবতে আমি প্রস্রাবখানায় ঢুকে প্রস্রাব করলাম। বের হয়ে আবার তাকালাম সিঁড়ির দিকে, তাকে দেখা যাচ্ছে না। নাকি আমি ভুল দেখলাম, কোনো জিন না তো? হুজুররা তো ব’লে যে, আমাদের চারপাশে গায়েবী জিন ঘুরে বেড়ায়! এমনটা হওয়া কি সম্ভব যে, জিন বড় ভাইয়ের রূপ ধারণ করেছে? কী জানি! ভয়ে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে, আমি দ্রুত ঘরে এসে আমার বিছানায় শুয়ে পড়ি। অন্ধকারে অন্যদের দিকে তাকাই, সবাই ঘুমোচ্ছে। আমি জিনকে ভুলে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করি, তবু মনের আয়নায় ভেসে ওঠে যে, জিন বড় ভাইয়ের রূপ ধরে ছাদের সিঁড়ি বেয়ে উঠছে! 

সেই ঘটনার পর থেকে মাঝরাতে প্রস্রাব চাপলে আমি চেপে রাখার চেষ্টা করতাম। কিন্তু কতোক্ষণ আর চেপে রাখা যায়, আমাকে বের হতেই হতো। ভয়ে ভয়ে আমি বের হয়ে কোনো রকমে প্রস্রাব করেই প্রায় দৌড়ে এসে বিছানায় শুয়ে পড়তাম। কিছুদিন পর একরাত্রে আমি প্রস্রাব করতে উঠেছি, বারান্দায় পা রাখতেই দেখি, বড়ভাই তাদের ঘর থেকে বের হয়ে ছাদের সিঁড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছে। আমি আমার শরীরটা ঘরের ভেতরে নিয়ে এসে কেবল মুখটা বের ক’রে উঁকি দিয়ে তাকে দেখতে থাকি। জিন হলে ঘর থেকে বের হবে কেন? ভয়ও লাগে আবার কৌতূহলও জাগে। বড়ভাই সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে মিলিয়ে গেলে আমি বারান্দায় বের হয় আস্তে আস্তে পা ফেলে প্রস্রাবখানায় গেলাম। প্রস্রাবখানা থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির গোড়ায় গিয়ে দাঁড়ালাম। ওপরে উঠে দেখবো কি দেখবো না ভাবছি। বুকের মধ্যে ধুকপুক করছে, তবু সাহস ক’রে ধীর পায়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগলাম। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম কেউ আবার দেখছে কি না; না, কেউ নেই। অর্ধেক সিঁড়ি ওঠার পর ছাদের কলাপসিবল গেটের দিকে তাকিয়ে আমি তো অবাক, গেট খোলা! অথচ গেট লাগানো থাকে যাতে ছাত্ররা ছাদে উঠতে না পরে। আমি আবার ধীর পায়ে সিঁড়ি ভেঙে গেটের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম, আর তখন নিচু গলার স্বর আমার কানে এলো, কথা অস্পষ্ট। আমি আমার শরীরটা ভেতরে রেখে মুখ বাড়ালাম ছাদের দক্ষিণদিকে, হালকা চাঁদের আলোয় আমি প্রায় স্পষ্ট দেখতে পেলাম ছাদের ওপর পাতা লুঙ্গির ওপর দু’জন মানুষের সম্পূর্ণ নগ্ন শরীর, একজনের শরীর বড় আর আরেকজনের ছোট; ছোট মানুষটা দুই হাঁটু আর দুই হাত ছাদে ঠেকিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে ঘাড় সামান্য উঁচু ক’রে আছে আর হাঁটু মুড়ে বসার ভঙ্গিতে বড় মানুষটা দুই হাতে ছোট মানুষটার কোমর ধরে পাছার কাছে নিজের কোমর প্রবলভাবে নড়াচড়া করছে। হামাগুড়ি দেওয়া মানুষটা মুখ দিয়ে আস্তে আস্তে কেমন যেন শব্দ করছে, মানুষ ব্যথা পেলে যেমন শব্দ করে অনেকটা সে-রকম; আর বসার ভঙ্গিতে থাকা মানুষটা শব্দ করছে বেশি ঝাল খাওয়ার পর মানুষ যেমনি শোষায়, ঠিক তেমনি। একটু পরই হামাগুড়ি দেওয়া মানুষটা চিৎ হতেই আমি তাকে চিনতে পারলাম, বড় ভাই! বড় ভাইকে তো চিনতে পারলাম কিন্তু অন্যজন কে? অন্য মানুষটা এবার বড় ভাইয়ের শরীরের ওপর উপুড় হয়ে প্রায় শুয়ে কোমর নাচাতে লাগলো! বড় ভাইয়ের ছোট শরীর, অমন বড় একটি শরীরের চাপে সে ‘উহ্...উহ্’ ব’লে নিচুস্বরে আর্তনাদ ক’রে উঠতেই বড় মানুষটা তার মুখ চেপে ধরে বলো, ‘আস্তে, দাঁতে দাঁত চাইপ্পা ধইরা রাখো, সোনার চান।’

মানুষটির কন্ঠস্বর শুনে চমকে উঠলাম! আদুরে গলায় আবার বললো, ‘বড় বালা পোলা তুমি, আমার প্রিয় গেলমান; নিশ্চয় তুমি বেহেশতে যাইবা, বেহেশতে গেলে তুমিও কচি কচি গেলমানের সেবা পাইবা!’ 

কন্ঠস্বর একটু অন্যরকম শোনালেও আমি ঠিকই চিনতে পারলাম। হাফিজুদ্দিন হুজুর! বড় ভাই তবে হুজুরের গেলমান! গেলমান শব্দের মানে বুঝতে পেরে আমি শিউরে উঠলাম। হুজুর তো আমাকেও বলেছে যে আরেকটু বড় হলে সে আমাকে তার গেলমান বানাবে। ঘেন্নায় আমার পেট গুলিয়ে উঠলো। আমি প্রায় নিঃশব্দে যেমনি উঠেছিলাম, তেমনি বারান্দায় নেমে এলাম। তারপর দ্রুত ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লাম, তাড়াতাড়ি আবার ঘুমিয়ে পড়তে চাইলেও ঘুম আর এলো না। চোখের সামনে কেবলই ভাসতে লাগলো হুজুর আর বড় ভাইয়ের ওই দৃশ্যটি। দৃশ্যটা সারাক্ষণ আমাকে তাড়িয়ে বেড়াতে লাগলো। আমি মাদ্রাসা থেকে মুক্তি পাবার জন্য ছটফট করতে লাগলাম। 

এরপর ঈদের ছুটিতে আমাকে বাড়িতে নিয়ে এলে আমি রীতিমতো চিৎকার আর কান্নাকাটি শুরু করলাম মাদ্রাসায় না যাবার জন্য। আমার কান্না দেখে মায়ের মন গললো, দাদারও। দাদা বাবাকে নির্দেশ দিলেন আমাকে স্কুলে ভর্তি ক’রে দেবার জন্য। চাচা আপত্তি তুলেছিলেন এই বলে যে, বংশের বড় ছেলে আল্লাহ্’র পথে থাক। কিন্তু দাদা চাচার কথা কানে তোলেননি। এরপর আমাকে বিসিআইসি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি করা হয়। মাদ্রাসা ছেড়েছি অনেক বছর, কিন্তু বড় ভাই আর হুজুরের সেই দৃশ্যটি আমি আজও ভুলতে পারিনি। এখনো মাদ্রাসা দেখলেই সেই দৃশ্যটি আমার মনের ভেতরে চাগাড় দিয়ে ওঠে। বারো-তেরো বছরের কোনো মাদ্রাসা ছাত্রকে দেখলেই তার ভেতরে আমি সেই বড় ভাইকে দেখতে পাই, ছয়-সাত বছরের ছাত্রকে দেখলে তার ভেতরে খুঁজে পাই নিজেকে। এখন সেই বড় ভাইও হয়তো হুজুর হয়েছে, হাফিজুদ্দিন হুজুরের মতো বেহেশতের লোভ দেখিয়ে সে-ও কি কোনো বালককে গেলমান রেখেছে? কী জানি!

(চলবে)