১৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

সাইমুম (উপন্যাস: পর্ব ১৮)

লিখেছেন উজান কৌরাগ


ফেসবুক খুললাম, স্ক্রল ক’রে নিচের দিকে নামতে নামতে দেখি এক বড় ভাই কমেন্ট চেয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছে। মুসলিম মৌলবাদী ছাগুগুলো তার আইডিতে রিপোর্ট করেছে। ইন্টারনেটের বিস্তৃতি এখন আগের চেয়ে অনেক বেড়ে যাওয়ায় মুক্তমনা লেখকদের আইডিতে ছাগুদের ভীষণ উপদ্রব শুরু হয়েছে। মুক্তমনা লেখকরা ধর্ম নিয়ে কিছু লিখলেই ছাগুরা তার পোস্ট শেয়ার দিয়ে রিপোর্ট করার আহব্বান জানায় আর বুঝে বা না-বুঝে সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই ধর্মান্ধরা রিপোর্টের বন্যা বইয়ে দেয়; ঢাকা শহরের স্যুটেড-বুটেড তথাকথিত ভদ্রলোক থেকে শুরু ক’রে বরগুনার সমুদ্র সৈকতে বসে ছেঁড়া জাল মেরামত করার ফাঁকে কোনো মাঝি কিংবা পঞ্চগড়ের সীমান্তে লাইন ক্লিয়ারের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় থাকা কোনো চোরাকারবারি ঈমানি দায়িত্ব ভেবে সকলেই রিপোর্ট ক’রে নেকি হাসিলের চেষ্টা করে। 

আমি মন্তব্য লিখলাম, ‘চাপাতিবাজরা চাপাতি দিয়ে পেছন থেকে মুক্তমনাদের ওপর হামলে পড়ে, আর ডিজিটাল চাপাতিবাজরা মুক্তমনাদের আইডিতে করে রিপোর্ট। আইডিতে রিপোর্ট নয়, কলমে জবাব দাও ছাগু।’ 

এটার কপি-পেস্ট ক’রে অন্তত বিশ-পঁচিশটা মন্তব্য করলাম। তারপর স্ক্রল ক’রে নিচে নামতে নামতে দেখি শাশ্বতীদি জন্মান্তরের তৃতীয় পর্ব শেয়ার দিয়েছে। শাশ্বতীদির লেখার অপেক্ষায় থাকি আমি। লিঙ্কে ক্লিক ক’রে ব্লগে ঢুকে পড়তে শুরু করলাম: 

জন্মান্তর (পর্ব-তিন)

এক নাগাড়ে বৃষ্টি পড়ছে; ঘুমের ঘোরে আমার বর এখন আমাকে আরো আঁকড়ে ধরতে চাইছে। ওর শীত লাগছে, শীত লাগলে ও এমন করে। ঘুম যাতে না ভাঙে তাই আমি খুব সতর্কতার সাথে এক হাত দিয়ে গায়ে দেওয়া চাদরটায় ওর শরীর ঢেকে দিলাম। থেকে থেকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, মাখন-সাদা পর্দা ভেদ ক’রে আসা বিদ্যুৎ চমকের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠছে সারা ঘর, ফুল দিয়ে সাজানো খাট, আমাদের দুটো শরীর। খাটটা ফুল দিয়ে সাজিয়েছে আমাদের দু’জনেরই ঘনিষ্ট কয়েকজন পাগলাটে ছোটো ভাই-বোন। ওদেরকে নিমন্ত্রণ করেছিলাম আজকে, ওরা জানতো কেন এই নিমন্ত্রণ। তাই নিজেরাই ফুল কিনে নিয়ে এসে ঘর-খাট সাজিয়েছে বাসর ঘরের মতো ক’রে! নিজেরাই কেউ তরকারি কেটেছে, কেউ মসলা বেঁটেছে, কেউ করেছে রান্না। ওরা বিয়েবাড়ির মতো হইহুল্লোড়, গান-বাজনা করেছে। আমাকে আর অরিত্রকে কিছুই করতে দেয়নি। আমরা কোনো কাজে হাত দিতে গেলেই বলেছে, "তোমরা না জামাই-বউ, জামাই-বউকে কাজ করতে হয় না!" অপমান আর অবহেলা পেয়ে পেয়ে অভ্যস্ত আমি কি কোনোদিন এমন ভালবাসার কথা ভাবতেও পেরেছিলাম! কী যে রহস্যময় জীবন, কখনো মাথা কুটে চাইলেও ভালবাসা পাওয়া যায় না, আবার কখনো না চাইলেও এমনিতেই পাওয়া যায়! 

অরিত্র আমায় ছেড়ে এখন পাশ ফিরে শুলো আমার সতীনকে জড়িয়ে ধরে! আমার সতীন, কোলবালিশ! আমি উঠলাম, আমার ঘুম আসছে না, শুধুই ভাল লাগছে! উঠে বারান্দার চেয়ারে এসে বসলাম। বৃষ্টিছোঁয়া শীতল বাতাস এসে লাগছে গায়ে। গ্রিলের ফাঁক দিয়ে হাত বাড়িয়ে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি নিলাম হাতে। যখন ভাল সময় আসে তখন সবকিছুই ভাল লাগে, আর যখন খারাপ সময় আসে, তখন পৃথিবীর সবচেয়ে ভাল কিছুও ভাল লাগে না। বৃষ্টি আমার বরাবরই ভাল লাগে, বৃষ্টি আমার সই! মনে হয় বৃষ্টিতে ভেজার মতো স্নিগ্ধ ব্যাপার আর কিছু নেই। তারপরও আমি বৃষ্টির ওপর একবার অভিমান করেছিলাম, অভিমানে প্রায় পুরো একটা বর্ষা আমি বৃষ্টিতে ভিজিনি, বৃষ্টিকে স্পর্শ করতে চাইনি! তখন আমার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শেষ, রেজাল্টের অপেক্ষায় আছি; কোচিং করছি, ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি। তখন আমি আমাদের পাড়ার রায়হান ভাইয়ের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি, সে বড় একতরফা প্রেম। রায়হান ভাই কোনোদিনও জানতে পারেনি। সে তখন রাজেন্দ্র কলেজে অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্র। তার সাথে রাস্তাঘাটে দেখা হলে আগ বাড়িয়ে কথা বলতাম, পাড়ার গলিতে ক্রিকেট খেললে আমি তাকে দেখার জন্য গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম, মাঝে মাঝে খেলতামও। প্রেমিকার মতো আমি তাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতাম আর মনে মনে ভাবতাম, আমি কি তাকে আমার মনের কথাটি খুলে বলবো? কিন্তু শুনে যদি কষে গালে একটা চড় মারে! ভয় হতো, লজ্জাও করতো। আমার আর তাকে কিছুই বলতাম না। বলতাম কেবল তুলি ভাবীকে; তুলি ভাবী তখন আমার সই, আমার সুখ-দুঃখের সারথি, আমিও তার। কিন্তু তুলি ভাবী আমাকে কোনো সমাধান দিতে পারতো না; শুধু সে কেন, কারো পক্ষেই এই সমাধান দেওয়া সম্ভব নয়। আমি যদি দৈহিকভাবেও মেয়ে হতাম তাহলে না হয় কথা ছিল, তুলি ভাবী আমাদের পত্রদূত হতে পারতো। কিন্তু আমি তো তা নই।

একদিন দুপুরে কোচিং থেকে বেরিয়ে রিক্সায় উঠেছি। রিক্সা চলছে, হঠাৎ-ই পাশের রিক্সায় চোখ পড়তেই দেখি রায়হান ভাই আর তার সঙ্গে একটি মেয়ে। মুহূর্তের মধ্যে আমার যে কী হয়ে গেল, চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসতে চাইলো! মেয়েটির সঙ্গে রায়হান ভাইয়ের কী সম্পর্ক, তা আমি তখনো জানি না, কিন্তু মেয়েটিকে দেখে ভীষণ ঈর্ষা হলো। জীবনে কখনো কাউকে ঈর্ষা করিনি আমি, সেই প্রথম ঈর্ষাতুর হয়ে কাউকে দেখলাম। ঈর্ষার আগুনে পোড়াতে লাগলাম মেয়েটিকে! আমার চোখে চোখ পড়তেই রায়হান ভাই জিজ্ঞাসা করলো, ‘কোথায় গিয়েছিলি?’ 

আমি ঈষৎ বাষ্পাকুল চোখে তার দিকে তাকিয়ে কোনো রকমে বললাম, ‘কোচিংয়ে।’ 

আর এমন সময় ঝমঝমিয়ে শুরু হলো বৃষ্টি, রায়হান ভাই রিক্সায় হুড তুলে দিলো আর এদিকে আমার বুকে যেন আঘাত হানলো বজ্রপাত! আমি হুড তোলার কথা ভুলে গেলাম, যখন মনে হলো তখন ভিজে গেছি। সারাপথ চোখের জলে আর বৃষ্টির জলে ভিজে একাকার হয়ে বাসায় ফিরলাম। কেন এলো বৃষ্টি? বৃষ্টির ওপর আমার ভীষণ অভিমান হলো, বৃষ্টি এলো বলেই তো আমাকে দেখতে হলো যে আমারই পছন্দের রায়হান ভাই ওই মেয়েটির সঙ্গে রিক্সার হুড তুলে দিলো! অভিমানে সেই বর্ষায় আর বৃষ্টিতেই ভিজিনি আমি! রায়হান ভাইয়ের হুড তুলে দেবার দৃশ্যটা বেশ কয়েক মাস বুকে বল্লমের মতো বিঁধে ছিল!

সেসব অল্প বয়সের অতুল আবেগের বহিঃপ্রকাশ, আজ মনে পড়লে কেবলই হাসি পায়। রায়হান ভাই আজ দুই সন্তানের পিতা, বিয়ে করেছে সেই মেয়েটিকেই। ঢাকাতেই থাকে, একদিন দেখা হয়েছিল নিউ মার্কেটে; ভাবী আর বাচ্চাদের নিয়ে শপিংয়ে এসেছিল। 

আমি স্বপ্ন দেখেছি, স্বপ্নভঙ্গের যাতনায় পুড়েছিও। ঢাকা কলেজে অনার্সে ভর্তি হওয়ার বছর খানেক পর সম্পর্ক হয়েছিল দুই বছরের সিনিয়র একজনের সঙ্গে। আমার মাথার চুলে বিলি কাটতে কাটতে কতো স্বপ্ন সে দেখাতো আমায়; সারাজীবন আমরা একসাথে থাকবো, সমাজ কী ভাবলো না ভাবলো তাতে আমাদের কিছু আসে যায় না, দরকার হলে আমরা বিদেশে চলে যাব। আমি ওর মুখে এসব কথা শুনতাম আর স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকতাম। কেননা তখন তো আমি বুঝতাম না যে ওসব ওর মন-ভোলানো কথা, আমি জানতাম না যে, বাফার এক নাচের ছেলের সঙ্গে ওর সম্পর্ক চলছে, জানতাম না যে, ধানমন্ডিতে এক চাকুরে দম্পতির ইন্টারমিডিয়েট পড়ুয়া ছেলেকে প্রাইভেট পড়ায় আবার খালি বাসায় তাকে বিছানায় নিয়ে আদরও করে, আমার ভাবনায়ও ছিল না যে, ও ইডেন কলেজের এক মেয়েকে নিয়ে কক্সবাজার-সিলেট ঘুরতে যায়! সম্পর্কটা পাঁচমাস স্থায়ী হয়েছিল। তারপর অনেকদিন কোনো সম্পর্কে জড়াইনি, তেমন কারো সাথে পরিচয় হয়নি, বিশ্বাসও করতে পারিনি কাউকে। 

আমি থাকতাম ইলিয়াস হোস্টেলে, রুমমেটদের কাছে আমি আমার এই গোপন সত্তা লুকিয়ে রেখেছিলাম। কেননা অন্যের গোপন কথা-গোপন ব্যথা শোনা বা বোঝার মতো সংবেদনশীল মনে হয়নি ওদেরকে। আমার কিছুটা মেয়েলি স্বভাবের কারণে এমনিতেই ওরা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করতো, কেউ কেউ আমার চলন-বলন আর কথা বলার ধরন অনুকরণ করতো। বললে এসবের মাত্রা আরো বেড়ে যেতো হয়তোবা, রুম থেকে বের ক’রে দেবার সম্ভাবনাও ছিল; তাতে আমার মানসিক শান্তি নষ্ট হতো। 

তখন আমি থার্ড ইয়ারে, পহেলা বৈশাখের সকালে হলের কয়েকজন বন্ধুর সাথে ঘুরতে বেরিয়েছি। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ সোহরওয়ার্দী উদ্যানে এক প্রেমিকযুগলকে দেখে থমকে দাঁড়ালাম, অনেক জুটির ভেতরে ওই জুটিটা আমার দৃষ্টি কেড়ে নিলো; একটা বকুলগাছের নিচে দাঁড়িয়ে মেয়েটা তার বাঁ-হাতে ধরে রাখা বড় একটি হাওয়াই মিঠাই থেকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে নিজে খাচ্ছে আর ছেলেটির মুখে তুলে দিচ্ছে। ছেলেটি হাওয়াই মিঠাই মুখে নিয়ে মাঝে মাঝে কী যেন বলছে আর মেয়েটি প্রাণ খুলে শব্দ ক’রে হাসছে, হাসছে ছেলেটিও। ছেলেটি আমার মুখচেনা, আমাদের কলেজেই পড়ে, কোন ডিপার্টমেন্টে তা জানি না; বহুবার ওকে দেখেছি কলেজ ক্যাম্পাসে আর হোস্টেলের মাঠে ক্রিকেট খেলতে, থাকে পশ্চিম ছাত্রাবাসে। মেয়েটিকে দেখিনি কখনো। ছেলেটির গায়ে জরির কাজ করা ঘিয়ে রঙের পাঞ্জাবি আর পরনে সাদা পাজামা। মেয়েটির পরনে ঘিয়ে রঙের লালপেড়ে শাড়ি, গায়ে একই রঙের ব্লাউজ, মুখে হালকা মেক-আপ, কপালে লাল টিপ, ঠোঁটে লাল লপস্টিক, পায়ে রক্তরাঙা আলতা, হাতে একগুচ্ছ চুড়ি। খোলা চুলের পিছন দিকে একগুচ্ছ বেলি ফুল, মাথার সামনের দিকে একটা ফুলের মুকুট। দু’জনকে দেখতে যেমনি সুন্দর লাগছে, তেমনি মানিয়েছেও বেশ! আমার দৃষ্টি মেয়েটির দিকে, আগে কখনো না দেখলেও তাকে চিনতে আমার এতোটুকুও ভুল হয়নি; সেও আমারই মতো, অর্ধেক পুরুষ অর্ধেক নারী, দেহটা পুরুষের মনটা নারীর; আমি তাকে নারী-ই বলবো! পহেলা বৈশাখে শাড়ি প’রে, মাথায় পরচুলা প’রে, ইচ্ছেমতো সেজেগুজে প্রেমিকের হাত ধরে উৎসবে শামিল হয়েছে। মেয়েটিকে দেখে আমার একটুও ঈর্ষা হলো না, দেখে কী যে ভাল লাগলো তা বলে বোঝাবার নয়! আমার মনে হলো এই যে ওরা একে অন্যকে ভালবেসেছে, সেজেগুজে উৎসবে বেরিয়েছে, নিজেদের মতো হাসি-আনন্দে উৎসব উদযাপন করছে; তাতে সমাজের কী ক্ষতি হচ্ছে, কী ক্ষতি হচ্ছে ধর্মের! সমাজের অন্ধত্ব, ধর্মের গোঁড়ামি, সব মিথ্যে; সত্য কেবল ওদের এই অকৃত্রিম প্রেম-ভালাবাসা। আনন্দে আমার চোখে জল এসে গেল। শ্রদ্ধায় আপনিই মাথা নত হলো ওদের প্রতি, ওরা বোধিবৈকল্য সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজেদের ইচ্ছে পূরণ করতে সাহস দেখিয়েছে, যা আমি পারিনি। ওদের মতো, ওই মেয়েটির মতো সবাই পারে না। আমারও তো আজ ইচ্ছে হয়েছিল ওর মতো শাড়ি প’রে, সেজেগুজে বের হতে; কিন্তু হোস্টেলে থাকি ব’লে পারিনি, আমাকে পুরুষের খোলসেই আসতে হয়েছে; বড় যন্ত্রণাদায়ক এই খোলস। আমার মতো আরো অনেকেই হয়তো হোস্টেলে থাকে, আর পরিবারের সাথে থাকলেও ওভাবে বের হবার সাহস পায় না। ওকে দেখে আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় আর আমার মধ্যে এই বিশ্বাস দৃঢ় হয় যে, একদিন আমিও পারবো, নিজের ইচ্ছে মতো সেজেগুজে কোনো একদিন এই উৎসবে শামিল হবো। শামিল হবে আমার মতো সকল চৈত্তিক নারীরাও। একসময় ওরা মেলার মানুষের ভিড়ে হারিয়ে গেল, কিন্তু আমার স্মৃতিতে ওরা রয়ে গেল চিরদিনের জন্য। 

এরপর কলেজে কিংবা হোস্টেলের মাঠে-পথে ছেলেটিকে দেখলে তাকিয়ে থাকতাম; ভদ্র-মার্জিত। কিন্তু ওর প্রেমিকাকে আর কখনোই ওর সঙ্গে দেখিনি। মাস ছয়েক পরে এক বিকেলে ছেলেটির সঙ্গে আমার দেখা, ও হোস্টেলের পুকুরঘাটের সিঁড়িতে বসে ছিল। আমিও পুকুরঘাটে বসার উদ্দেশেই গিয়েছিলাম। বিকেলবেলা প্রায়ই আমি পুকুরঘাটে গিয়ে বসতাম, একা একা সময় কাটাতাম নিজের সঙ্গে। আমার পায়ের শব্দে ও পিছন ফিরে তাকালো, মুখটা কেমন গম্ভীর, সেই হাসিমাখা মুখ নয়। আগ বাড়িয়ে আমি-ই আলাপ করলাম। জানলাম ওর নাম অরিত্র, ম্যানেজমেন্টে পড়ছে, আমারই ইয়ারমেট। আলাপের এক পর্যায়ে মনে হলো মেয়েটা কেমন আছে জিজ্ঞেস করি। প্রথম আলাপেই এই ব্যক্তিগত ব্যাপারে জানতে চাওয়া ঠিক নয়, এটা অভদ্রতা। কিন্তু কেন যেন আমি কৌতুহল সামলাতে পারলাম না। বলেই ফেললাম, ‘কিছু মনে না করলে একটা কথা বলবো?’

‘বলুন।’

‘গত পহেলা বৈশাখে আপনাকে আর আপনার বন্ধুকে সোহরওয়ার্দী উদ্যানে দেখেছিলাম, আপনার বন্ধু কেমন আছে?’ 

নীরবে আমার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলো, ওর চোখের ভেতর চিকচিক ক’রে উঠলো জল। তারপর পুকুরের দিকে শূন্যে দৃষ্টি রেখে বললো, ‘ও নেই।’

একটু বিরতি দিয়ে আবার বললো, ‘তিনদিন আগে ও না ফেরার দেশে চলে গেছে।’

আমি স্তম্ভিত! ‘ও নেই’ শোনার পর ভেবেছিলাম, সম্পর্কটা টেকেনি; এরকম তো অনেকের ক্ষেত্রেই হয়, আমার ক্ষেত্রেও হয়েছে। কিন্তু এ কী শুনছি আমি, অমন হাসি-খুশি প্রাণোচ্ছল মানুষটি আর পৃথিবীতে নেই! আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো মেয়েটির হাস্যোজ্জ্বল মুখ, প্রিয়জনের মুখে হাওয়াই মিঠাই তুলে দেবার সেই নয়ন-জুড়োনো দৃশ্য, যেটি এখন অব্দি আমার চোখে দেখা সেরা দৃশ্য; আর সেই দৃশ্যের একটি চরিত্র পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে! 

আর এজন্যই ছেলেটি গম্ভীরমুখে মুখে একা বসে আছে পুকুরঘাটে। আমি ওর কাছে গিয়ে বসে পিঠে হাত রাখলাম, ‘স্যরি, আমি না জেনে আপনার ব্যথাটা উস্কে দিলাম।’ 

ও নীরবে মাথা নাড়লো, টপ ক’রে একফোঁট জল ঝ’রে পড়লো ওর বাঁ-চোখ থেকে। দু’জনেই অনেকক্ষণ চুপ ক’রে থাকার পর বললাম, ‘কীভাবে হলো?’

‘ক্যান্সার।’ 

হায় জীবন! পৃথিবীটাকে বড় নিষ্ঠুর মনে হলো, পৃথিবী কতো অযাচিত ভার বহন ক’রে চলেছে, কতো অশিষ্ট মানুষের ভার বহন ক’রে চলেছে যারা ক্রমাগত পৃথিবীর বুক ক্ষত-বিক্ষত করছে, আর একজন সহজ-সুন্দর মানুষের ভার সইতে পারলো না! হাজারো বঞ্চনার মাঝে দুটো মানুষের একসাথে বেঁচে থাকার এই সুখটুকু কেড়ে নিতে হলো! 

এরপর থেকে প্রায়ই অরিত্র’র সঙ্গে আমার দেখা হতো, কথা হতো; পুকুরপাড়ে বসে আড্ডা হতো। অল্পদিনেই দারুণ বন্ধুত্ব হয়ে গেল তার সাথে আমার। পুকুরপাড়ে আড্ডা দেবার জন্য কখনো আমি তার রুমে যেতাম তাকে ডাকতে, কখনো সেও আমার রুমে আসতো আমায় খুঁজতে। ক্যাম্পাসের বাইরে কোথাও যাবার প্রয়োজন হলে কখনো কখনো ও আমাকে সঙ্গে যেতে বলতো, একইভাবে আমিও। এক সময় মনে হলো নানা বিষয়ে আমরা একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি, একে অন্যের কাছে বন্ধুর চেয়েও বেশি কিছু হয়ে উঠেছি, একে অন্যকে নিবিড়ভাবে অনুভব করতে শুরু করেছি। আমার বিষয় সমাজবিজ্ঞান, সেকেন্ড ইয়ার থেকেই আমি বিভিন্ন এনজিও’র প্রজেক্টে কাজ করতে শুরু করেছিলাম, ফিল্ডে যাবার আগে আমি ওর মুখে মন খারাপের ছায়া দেখতে পেতাম। ও জানতো আমি কবে ফিরে আসবো, তারপরও আমার রুমে গিয়ে রুমমেটদের কাছে খোঁজ নিতো, আমি এসেছি কি না। ফিরে আসার পর আমি ওর মুখে ছায়ার পরিবর্তে দেখতে পেতাম ঝলমলে রোদ্দুর। ওর অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা শেষ, আমার তখনো একটা বাকি। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরও বাড়িতে না গিয়ে ও হলেই রয়ে গেল, আমার পরীক্ষা শেষের সন্ধ্যায় বললো, ‘আমি বাড়ি যাব। চলো, আমাদের বাড়িতে বেড়াতে যাই।’

প্রথমে আমি এককথায় রাজি। কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হলো আমরা যতোই ধর্ম না মানি, আমি মুসলমানের আর ও হিন্দুর সন্তান, অনেক হিন্দু পরিবার-ই খুব আচারনিষ্ট আর ভীষণ গোঁড়া হয়, মুসলমানদের ঘরে ঢুকতে দেয় না, মুসলমানের ছোঁয়া খায় না, ওদের পরিবারও যদি তেমন হয় তো একটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে নিজেও পরবো, ওর পরিবারকেও ফেলবো। বললাম, ‘কিন্তু...।’

‘কিন্তু কী?’

‘তোমাদের বাড়িতে নিশ্চয় ঠাকুর-ঘর আছে...।’

শেষ করার আগেই ও এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিলো আমার কথা, ‘ধুর!’

‘ঠাকুর ঘরের জায়গায় ঠাকুর ঘর আছে, তুমি কি ঠাকুর ঘরে পুজো দিতে বসবে নাকি। আমাদের বাড়িতে এখন আর ওসব সংস্কার নেই, যতোদিন আমার ঠাকুমা বেঁচে ছিলেন, ততোদিন ছিল। ইন্টারমিডিয়েটে থাকতে একবার ক’জন মুসলমান বন্ধুকে বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলাম, বন্ধুরা চলে যাবার পর ঠাকুমা বাড়িতে লঙ্কাকাণ্ড বাঁধিয়েছিল। বছর তিনেক আগে বুড়ি মরে আমায় বাঁচিয়ে দিয়ে গেছে। এরপর তো ঢাকা থেকেই আমি আমার কতো বন্ধু-বান্ধব নিয়ে গেছি বাড়িতে। ওসব নিয়ে তুমি ভেবো না।’ 

পরদিন রাতেই দু’জনে রওনা হলাম যশোরের উদ্দেশে, ওর বাড়িতে পৌঁছলাম তার পরদিন ভোরবেলায়। কী যে দারুণ কাটলো চারটে দিন ওর মা-বাবা, বড়বোন আর ছোটভাইয়ের অকৃত্রিম আতিথেয়তায়! মাসিমার কী অমায়িক ব্যবহার, আমার মনেই হলো না যে, আমি ওদের বাড়িতে প্রথম গিয়েছি। টেবিলে খেতে বসলে নিজে এটা-ওটা পাতে তুলে দেন, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমার বাবা-মা আর বুবুদের সম্পর্কে শোনেন। সুব্যবহারে মনে হলো আমি তার ছেলের বন্ধু শাহিন নই, কোনো নিকট আত্মীয়য়ের ছেলে শ্যামল কিংবা অমল! 

আমরা একদিন গেলাম সাগরদাঁড়িতে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মস্থানে, আরেকদিন নড়াইলে চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের বাড়িতে। শিল্পী এবং কবির বাড়িতে দারুণ সময় কাটলো আমাদের। কবি এবং শিল্পী দু’জনের কেউই স্ব-শরীরে পৃথিবীতে নেই, তবু মনে হলো তাঁরা আছেন, সর্বত্র আছেন! মাইকেল নয় বছর বয়সে সাগরদাঁড়ি থেকে কোলকাতায় পাড়ি দিয়েছিলেন; তবু আমি বাড়ির খাট, চেয়ার, সিন্দুকসহ নানান ব্যবহার্য জিনিস হাত দিয়ে স্পর্শ করলাম নিষেধ থাকা সত্তেও, কোথাও না কোথাও মধুর হাত নিশ্চয় পড়েছিল, সিন্দুকে কি চেয়ারে রাগত মধুর পায়ের দু-চারটা লাথি পড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয় যায় না; তা পড়ুক, যে জিনিসে মধুর স্পর্শ লেগেছে, তা আমি স্পর্শ করবো না, তা কি হয়! আমার মনে হলো, সাগড়দাঁড়ির সকাল-দুপুরটায় জড়িয়ে আছে মধু; ওই তো কৃষ্ণবর্ণের বালক মধু মায়ের কোলে শুয়ে রামায়ণ-মহাভারতের গল্প শুনছে, জেঠিমাদের জ্বালাতন করছে, পাশের গ্রামের মৌলবীর কাছ থেকে ফারসি শিখে বই হাতে রাস্তা দিয়ে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছে নিচু স্বরে গজল গাইতে গাইতে; ওই তো ডানপিটে মধু কপোতাক্ষের পাড়ে বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ, হই-চই আর দুষ্টুমিতে মত্ত! মুমূর্ষু কপোতাক্ষ দেখে হতাশ হলেও ওই কপোতাক্ষকেই প্রমত্ত পদ্মার মতো মনে হয়েছিল যখন কপোতাক্ষের জলে পা ভিজিয়ে ওঠার সময় অরিত্র আমার দিকে ওর হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল! 

নড়াইলে চিত্রশিল্পী এসএস সুলতানের বাড়িতে গিয়েও মনে হয়েছিল ওই তো সুলতান চিত্রা নদীর পারে বসে ছবি আঁকছেন, বজরায় ভাসছেন চিত্রায়, ঝোপ-ঝাড়ের মধ্য দিয়ে একা একা হাঁটছেন, পোষা প্রাণীগুলোর সাথে কথা বলছেন আর ওদেরকে খাওয়াচ্ছেন! 

আসার আগের দিন বিকেলে দু’জনে আড্ডা দিচ্ছি ওদের এলাকার শ্মশানঘাটের একটা গাছের গোড়ার বাঁধানো বেদিতে। কিছু আগেও বাচ্চারা খেলাধূলা করছিল, দিনের আলো কমে আসায় ঘরে ফিরেছে ওরা। সুনসান শ্মশানে কেবল আমরা দু’জন। আমার ভেতরে বিদায়ের সুর বাজতে শুরু করেছে। রাত পোহালেই আমি চ’লে যাব ফরিদপুরের নিজের বাড়িতে, কিন্তু ওকে ছেড়ে আমার যেতে ইচ্ছে করছে না। ওকে ছেড়ে কাল চ’লে যাব ভাবতেই ভেতরটা যেন ভেঙেচুরে মুচড়ে যাচ্ছে! বিকেল মাথা এলিয়ে দিলো সন্ধ্যার কোলে কিন্তু আমাদের ওঠবার নাম নেই; ঘনানো অন্ধকারে নীরব শ্মশানঘাটে ভয়ও নেই। শ্মশানের গাছগুলো মাথার ওপরে নীরব, যেন চুপিসারে শুনছে আমাদের কথা! আমি বললাম, ‘ফেরার পথে তুমি ফরিদপুরে নামবে, আমাদের বাড়িতে কয়েকদিন থাকবে, তারপর দু’জন একসঙ্গে ঢাকা যাব।’ ও আমার কথায় রাজি। একথা-সেকথা আরো কতো কথা দু’জনে বলি, তবু যেন কী কথা থেকে যায় বাকি। ওর ভেতরেও যে বিদায়ের সুর বাজছে, তা আমি বুঝতে পারি থেকে থেকে ওর উদাসীন হওয়া দেখে। একসময় ও বললো, ‘চলো, উঠি।’

বললাম, ‘বসি আরো কিছুক্ষণ।’

‘শ্মশানে তোমার ভয় লাগে না?’

‘তুমি তো আছো, তুমি থাকলে কীসের ভয়!’

ও আবছা অন্ধকারে তাকালো আমার মুখের দিকে। মনে হলো যে কথাটার জন্ম হয়েছে আমার ভেতরে তা আর একা একা বয়ে নিয়ে যাবার দরকার কী, এখনই সময় ওকে বলবার। ওর চোখে চোখ রেখে বললাম, ‘অরিত্র, এই শ্মশানে কতো জীবন নিঃশেষ হয়, এখান থেকেই যদি আমরা নতুন জীবন শুরু করি!’ 

(চলবে)