২ ডিসেম্বর, ২০১৬

সাইমুম (উপন্যাস: পর্ব ১৫)

লিখেছেন উজান কৌরাগ


তিনি কথা বলছেন না, হালকা জ্যোৎস্নায় আমরা একে-অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি; মনে হচ্ছে, চাঁদের আলো যদি আরেকটু বৃদ্ধি পেতো, যদি আরেকটু স্পষ্ট দেখতে পেতাম তার চোখ-মুখের অভিব্যক্তি! তিনি আমার মাথায় হাত রাখলেন, অল্প জ্যোৎস্নাতেও আমি দেখতে পেলাম, তিনি চোখ বুজে আছেন। আমি তার স্পর্শের আনন্দে অভিভূত হয়ে তাকিয়ে আছি। মনে হচ্ছে তাকে আমি বহুকাল আগে থেকেই চিনি, তাঁর এই স্পর্শ নতুন নয়; আমার মা যখন ছেলেবেলায় আমাকে খাইয়ে-পরিয়ে যত্ন করতেন, আদর করতেন, তখন সেই যত্নে-আদরে এই হাত দু'টিরও অদৃশ্য উপস্থিতি থাকতো; তাঁর গায়ের গন্ধ ঠিক আমার মায়ের গায়ের গন্ধের মতো! বেশ কিছুক্ষণ পর তিনি আমার মাথা থেকে হাত নামিয়ে নিলে আমি জলচৌকিখানা নিয়ে বসতে দিলাম কাঁঠালগাছের ঘন অন্ধকারের বাইরে; তিনি বসলেন, আমি বসলাম তার পায়ের কাছে মাটিতে। জলচৌকির একদিকে সরে তিনি আমাকেও বসতে বললে অনীহা প্রকাশ করলাম, ‘আপনি বসুন, মাটিতে আমার অসুবিধে হবে না।’

নিজের কোলের কাছে আমার ডান হাতখানা ধরে আছেন দু'হাতে, আর তাকিয়ে আছেন আমার দিকে; যেন দেখছেন আর আমার অন্তরাত্মা পাঠ করছেন! অদম্য কৌতূহল নিবারণে আমি তার পাঠে বিঘ্ন ঘটিয়ে বললাম, ‘আপনি এখানে কতোদিন আছেন?’ 

তিনি উদাসীনভাবে উত্তর দিলেন, ‘গত বর্ষায় যখন মোহাম্মদ বিন কাশিম দেবল দখল করলো, তখন থেকেই।’

‘এখানে আপনার আপনজন কেউ আছেন?’

মুখ থেকে শব্দ নয়, যেন বুকের দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো, ‘না!’

‘পরিবারের আর সবাই কোথায়?’ 

‘কেন জানতে চাও এসব কথা?’

‘শেকড়ের কথা জানা আমার দায়িত্ব। শেকড়ের প্রতি যার আগ্রহ-শ্রদ্ধা নেই, সে তো এক উন্মূল চেতনার মানুষ; সহজেই পতিত কিছু দ্বারা প্রভাবিত হয়; নিজেকে হারিয়ে ফেলে পতিত-পঙ্কিল স্র্রোতে।’ 

বেশ কিছু মুহূর্ত পেরিয়ে গেল নীরবে। তাঁর বাম হাত আমার কাঁধে, ডান হাত মাথায়; দৃষ্টি শূন্যে। তারপর ঝিঁঝির আবহসংগীত ছাপিয়ে ধ্বনিত হলো তার কন্ঠস্বর, ‘আমার স্বামী দেবল বন্দরে কাজ করতেন। বন্দরের কাছেই আমার বাবার দোকান ছিল; সেই সূত্রেই বাবার সঙ্গে তার পরিচয় এবং আমাদের বিয়ে। আমাদের সংসার সুখের হয়েছিল, একসময় কোলজুড়ে এলো মেয়ে, তারপর ছেলে। সন্তানেরা বড় হলো, পাঠশালায় লেখাপড়া শিখতে লাগলো। ততোদিনে শ্বশুর গত হয়েছেন। সংসারে অভাব ছিল না; স্বামী, শাশুড়ি, ভাসুর, বড় জা, তাদের তিন মেয়ে আর আমাদের এক মেয়ে এক ছেলেকে নিয়ে যৌথ সংসারে তখন উপচে পড়া সুখ! ভাসুরের বড় মেয়ের তখন সবে বিয়ে হয়েছে, আমার মেয়ে অমলার বিয়ের দিনক্ষণও ঠিক, ভেবেছিলাম দু'-তিন বছরের মধ্যে ছেলেটাকেও বিয়ে দিয়ে টুকটুকে একটা বউ আনবো ঘরে; তার আগেই আমাদের সব শেষ হয়ে গেল।’ 

আমার হাতটা নিজের গালে চেপে ধরে হু হু ক’রে কেঁদে উঠলেন, যেন সকল যন্ত্রণা উগরে দিতে চাইছেন উত্তর প্রজন্মের হাতে; তার চোখের জলে আমার হাত ভিজে গেল! আমি জানি, এইসব কথা তুললে তার ব্যথা চাগাড় দিয়ে উঠবে, কিন্তু আমাকেও যে জানতে হবে আমার শেকড়ের কথা। তিনি কেঁদেই চলেছেন, আমি তার হাঁটুতে কপাল ঠেকালাম, আমার চোখ থেকে জল গড়িয়ে নাক বেয়ে পড়লো তার হাঁটুর কাছের শাড়িতে। কিছুক্ষণ পর তিনি আমার মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন, চোখের জল মুছে আমি মাথা তুললাম।

বললেন, ‘যবন মুসলমানরা যেদিন হামলা করলো, সেদিনও আমার স্বামী কাজে গিয়েছিলেন বন্দরে, তারপর আর আমাদের দেখা হয়নি কোনোদিন। রাজার সৈন্যরা প্রতিরোধ করেছিল মুসলমানদের, কিন্তু মোহাম্মদ বিন কাশিমের হাজার হাজার দুর্ধর্ষ সৈন্যের অতর্কিত হামলা সামলাতে পারেনি। প্রথম তিনদিন ওরা মহাতাণ্ডব চালালো দেবলের বুকে! সামনে যাকেই পেলো, তাকেই হত্যা করলো, ধড় থেকে মাথা নামিয়ে শরীর ছিন্ন-ভিন্ন ক’রে ফেললো। ধন-সম্পদ লুণ্ঠন ক’রে বাড়ি-ঘরে আগুন দিলো, মন্দির-বিগ্রহ ধ্বংস করলো, অধিকাংশ পুরোহিতের শিরোচ্ছেদ করলো আর কাউকে কাউকে সুন্নত করিয়ে বানালো মুসলমান, সতেরো বছরের বেশি বয়সের অধিকাংশ পুরুষদের ধরে ধরে কচুকাটা করলো, আর সতেরো বছর পর্যন্ত ছেলেদের বানালো ক্রীদদাস; সকল মেয়েকে বানালো যৌনদাসী। এমন সর্বভুক যুদ্ধ দেবলের মানুষ তো বটেই, সারা ভারতের মানুষও কোনোদিন দেখেছে কি না সন্দেহ। ভারতেও তো কখনো কখনো যুদ্ধ হতো রাজ্যে রাজ্যে; কিন্তু সে যুদ্ধ করতো রাজার সৈন্যরা, মেয়েদের সর্বনাশ করা তো দূরের কথা, ইচ্ছাকৃত সাধারণ মানুষের কোনো ক্ষয়ক্ষতিও তারা করতো না। যুদ্ধে যে রাজা জিততো সে-ই লালন-পালন করতো প্রজাদের। রাজা বদলালেও নতুন রাজা বিদ্বেষবশত প্রজা উচ্ছেদ বা দমন-পীড়ন করতো না, রাজ্যশাসনেও বিরাট কোনো পার্থক্য চোখে পড়তো না। তবে এমন সর্বভুক যুদ্ধের কথা আমরা শুনতাম বটে। আমার স্বামী তো বন্দরে চাকরি করতেন, তাই দেশ-বিদেশের খবরা-খবর তিনি জানতে পারতেন। নানান দেশ থেকে বাণিজ্য জাহাজ আসতো দেবল বন্দরে, আবার আমাদের রাজ্যের জাহাজও বিভিন্ন দেশে যেতো বাণিজ্য করতে, কতো রকমের মানুষ আসতো-যেতো, সেসব মানুষের সাথে আমার স্বামীর পরিচয় ছিল, তাদের মুখেই তিনি দেশ-বিদেশের নানান গল্প শুনতেন। তার মুখেই শুনতাম সেইসব সর্বভুক যুদ্ধের কথা। আরবে মুহাম্মদ নামে এক ডাকাত নাকি ইসলাম নামে এক ধর্ম চালু করেছিল, তার শিষ্যদেরকে বলা হয় মুসলমান; তারা সব মূর্তিপূজাবিরোধী। মুহাম্মদ নাকি প্রথমদিকে ডাকাতি করতো, তারপর আস্তে আস্তে যখন তার ধন-সম্পদ আর শিষ্য বেড়ে গেল, তখন সে বিভিন্ন জাতির ওপর হামলা চালাতো। সে এমনই পাষণ্ড ছিল যে, নিজের জাতির ওপরও আক্রমণ চালিয়েছিল, মক্কার কাবা মন্দিরের বিগ্রহ ভেঙেচুরে নিজের আত্মীয়-স্বজনদেরকে মেরে-ধরে ধর্মান্তরিত ক’রে তাদেরকে মুসলমান বানিয়েছিল। বেঁচে থাকতে সে বহু যুদ্ধ ক’রে বহু জনপদ দখল করেছিল, যুদ্ধে জিতলেই নাকি তারা পরাজিত জনপদের সম্পদ লুণ্ঠন করতো, তরবারির মুখে বিভিন্ন ধর্মের মানুষকে ইসলামে ধর্মান্তরিত ক’রে ক্রীতদাস বানাতো, মেয়েদের ভোগ করতো আর বাজারে বেচে দিতো। সে মরার পর তার শিষ্যরাও নানা দেশের সাথে একইরকমভাবে যুদ্ধ ক’রে চলেছে। আমরা এসব কথা শুনতাম আর ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতাম, এমন অমানবিক যবন মুসলমানরা স্পর্শ করার আগে যেন আমাদের মরণ হয়! ভগবান আমাদের প্রার্থনা শোনেনি, এখন যবন মুসলমানের জারজ সন্তান পেটে নিয়ে মরার অপেক্ষায় দিন গুনছি!’

কয়েক মুহূর্ত থামলেন সত্যবতী দেবী, বানের জলের মতো ফুঁসে ওঠা কান্না রোধ ক’রে বললেন, ‘বছর পাঁচেক আগে সিংহল থেকে ইরাকগামী একটি জাহাজ দেবল বন্দরের কাছে জলদস্যুরা লুণ্ঠন করেছিল; ইরাকের শাসক হাজ্জাজ বিন ইউসুুফ এর দায় চাপিয়েছিল আমাদের রাজা দাহিরের ওপর, ক্ষতিপূরণ চেয়েছিল; রাজা দাহির জলদস্যুদের এই হামলার দায় নিতে এবং ক্ষতিপূরণ দিতে অস্বীকার করেছিলেন। সত্যিই এতে রাজার কোনো হাত ছিল না, এটা নিছকই একটি দুর্ঘটনা, জলদস্যুদের কাজ; জলদস্যুরা তো সুযোগ পেলে দেবলের বণিকদের জাহাজও লুণ্ঠন করেছে। জলদস্যু কর্তৃক জাহাজ লুণ্ঠনের দায় চাপানো হাজ্জাজের একটা অজুহাত মাত্র, কেননা অনেক আগে থেকেই ভারতভূমির ওপর তাদের লোভ। ভারতবর্ষের মশলা, রেশম, সোনাদানার প্রতি যেমনি লোভ; তেমনি লোভ ইসলামী সাম্রাজ্য বিস্তারের। আরবভূমির পূর্ব ও পশ্চিমে তাদের লোলুপ দৃষ্টি পড়েছিল। ডাকাত মোহাম্মদ নাকি মদিনা দখলের মধ্য দিয়ে শুরু করেছিল ইসলামী সাম্রাজ্যের বিস্তার, তারপর তার মৃত্যুর পর তার শিষ্যরা প্রায় সমগ্র আরব দখল করেছে, উত্তর আফ্রিকা দখল ক’রে পশ্চিমে স্পেন দখল করেছে। পূর্বে পারস্য দখল করলেও ভারতবর্ষে সুবিধা করতে পারছে না, অতীতে বারবার হামলা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। আমার জন্মেরও বহু আগে, ডাকাত মোহাম্মদ মরার বছর চারেক পরই আরবের খলিফা ওমরের শাসনামলে মুসলমানরা নাকি প্রথম ভারতে হামলা চালিয়েছিল থানা অঞ্চলে, কিন্তু তখন ওরা বেশিদূর এগোতে পারেনি। এর কিছুকাল পর রাজা দাহিরের বাবা চাচের শাসনামলে নাকি সিন্ধুতে নৌ-অভিযান চালিয়েছিল, কিন্তু সেবারও তারা সুবিধা করতে পারেনি, পরাজিত হয়েছিল, নিহত হয়েছিল তাদের নেতা। এরপর আরবের খলিফা ওসমান, আলি আর মুয়াবিয়ার আমলে আরো আটবার হামলা চালিয়েছিল; কিন্তু আটবারই তারা ব্যর্থ হয়। খলিফা আলীর সৈন্যরা নাকি উত্তরের বোলান গিরিপথ দিয়ে কিকান পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল, কিন্তু কিকানের অধিবাসীরাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে তারা ফিরে যেতে বাধ্য হয় কিছু মানুষকে হত্যা ক’রে, কিছু সম্পদ লুণ্ঠন আর কিছু মানুষকে ক্রীতদাস হিসেবে বন্দী করেই। বার বার ব্যর্থ আরবরা এরপর থেকে হাজ্জাজের হামলার আগ পর্যন্ত অনেকদিন উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে ছোটো-খাটো দস্যুবৃত্তি ব্যতিত বড় আর কোনো হামলা করেনি। 

মোহাম্মদ বিন কাশিমের আক্রমণের আগেও হাজ্জাজের নির্দেশে দু’জন সেনাপতির নেতৃত্বে মুসলমানবাহিনী দু'বার আক্রমণ করেছিলো, দু’বারই আমাদের সৈন্যরা তাদের আক্রমণ প্রতিহত করেছিল, হাজ্জাজের সেনাপতি ওবায়দুল্লাহ আর বুদাইল নিহত হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত খলিফা আল ওয়ালিদের সহযোগিতায় তার দেওয়া ছয় হাজার শক্তিশালী সিরীয় সৈন্যসহ হাজ্জাজ নিজের জামাতা সতেরো বছরের মোহাম্মদ বিন কাশিমকে পাঠায় দেবল আক্রমণে। এবার আর তাদের আক্রমণ প্রতিহত করতে পারেনি আমাদের সৈন্যরা। পার্শ্ববর্তী কোনো রাজ্যও সাহায্য করেনি, রাজা দাহিরের ওপর প্রতিবেশী রাজাদের ক্ষোভ ছিল। দাহিরের বাবা চাচ ছিলেন গরীব ব্রা‏হ্মণ, কিন্তু আস্তে আস্তে তিনি ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছিলেন। রাজা দ্বিতীয় সাহসি রাইয়ের মৃত্যুর পর তিনি সিন্ধুর ক্ষমতা দখল করেন। ব্রা‏হ্মণ রাজার ক্ষমতা দখল রাজ্যের বাইরের এবং ভেতরের অনেকেরই ভাল লাগেনি; তাকে মন থেকে মেনে নিতে পারেনি। চাচের মৃত্যুর পর রাজা হন তার কনিষ্ঠপুত্র দাহির। এ কথা সত্য যে, ব্রা‏হ্মণ রাজারা সুশাসক ছিলেন না, নিম্নবর্ণের মানুষ আর বৌদ্ধদেরকে নির্যাতন করতেন। রাজ্যের গণ্যমান্য মানুষরাও রাজার বিরোধিতা করতেন। তাই মুসলমান বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধের সময় রাজা দাহির ভেতর-বাহির থেকে কোনো সহযোগিতা পাননি। ফলে খুব সহজেই তিনি পরাজিত হন। সব দেশে সব কালেই আমরা সাধারণ প্রজারা বলদের মতো আর রাজারা সবসময়ই ষাঁড়; তাদের একটু-আধটু ঢুঁসঢাস খেয়েই চলতে হয়; কিন্তু ষাঁড়ের মুখ থেকে আমরা যেন পড়লাম দৈত্যের মখে, এর ঢুঁস দেবার বালাই নেই, খেয়ে সাবার ক’রে দেয়; বলদ-ষাঁড় সব খায়! দৈত্যের সামনে পড়ে আমাদের বাঁচার আর কোনো উপায় রইলো না। ফলে তারপর যা ঘটার, তা-ই ঘটলো; সে দৃশ্য দেখা যায় না, সহ্য করা যায় না!

স্বামী বাড়িতে না ফেরায় রাতে তাকে খুঁজতে বের হলেন আমার ভাসুর, তিনিও আর ফিরলেন না। ভয়ে দরজা-জানালা বন্ধ ক’রে রাখতাম। মাঝে মাঝে জানালা একটুখানি খুলে রাস্তায় তাকালেই টুকরো টুকরো লাশ চোখে পড়তো, রক্ত-মাংসের পচা গন্ধ এসে লাগতো নাকে! মুসলমানদের নারী-লোলুপতার কথা জানা থাকায় আমরা মেয়েদেরকে নিয়ে ঘরের মধ্যে ভয়ে মরছি তখন; আমার এক মেয়ে; ভাসুরের দুই, ভাসুরের বড় মেয়ে তখন শ্বশুরবাড়িতে। ঘরে চাল ব্যতিত আর কোনো খাবার নেই, তিনবেলা ভাত ফুটিয়ে লবণ দিয়ে খাচ্ছি; তখন প্রতিটা মুহূর্ত যেন সহস্র বছর! একদিন দুপুরে দরজায় দড়াম-দড়াম শব্দ; মেয়েদেরকে আর আমার চৌদ্দ বছরের ছেলে যাদবকে নিয়ে আমি পালঙ্কের নিচে লুকোলাম। দরজা প্রায় ভেঙে ফেলে দেখে আমার জা দরজা খুলে দিলো, আমি পালঙ্কের নিচ থেকে একটুখানি উঁকি দিয়ে দেখলাম যে ,একজন মুসলমান সৈন্য জা’য়ের চুলের মুঠি ধরে তাকে বাইরে নিয়ে গেল। অন্যরা ঘর সন্ধান করতে লাগলো, আমার বৃদ্ধ শাশুড়ি তাদেরকে বাধা দিতে গেলে সৈনারা তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিলো। তারপর একে একে তারা পালঙ্কের নিচ থেকে বের ক’রে আমাদের চুলের মুঠি ধরে নিয়ে গেল আঙিনায়। পিছমোড়া ক’রে সবার হাত বেঁধে হাঁটিয়ে নিয়ে গেল রাজবাড়ীতে, সেখানে তখন পশুবলির মতো নরবলি চলছে! মুসলমানরা আল্লাহু আকবর ব’লে চিৎকার করছে আর সঙ্গে সঙ্গে কোনো পুরুষ বন্দীর মাথা ধড় থেকে ছিন্ন হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ছে রক্তের মধ্যে, আছাড়ি-পিছাড়ি করতে করতে একটু পরই নিথর হয়ে যাচ্ছে ধরটা! তাজা রক্তের গন্ধে পেটে পাক দিচ্ছে, কেউ কেউ বমি ক’রে ভাসাচ্ছে। 

রাজবাড়ীতে যাওয়ার পর আমার বুকের ধন যাদবকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিলো, ছেলে আমার চিৎকার ক’রে কাঁদতে কাঁদতে মা মা ব’লে আমার দিকে ছুটে আসতে চাইলে এক সৈন্য ওকে চাপড়ে-চুলের মুঠি ধরে নিয়ে গেল আমার চোখের সামনে থেকে।’

কান্নায় গলা ধরে আসছে সত্যবতী দেবীর, নিঃশব্দে কাঁদছেন তিনি; বুকভরা তার শূন্যতা আর হাহাকার পুত্র যাদবের জন্য। সত্যবতী দেবী আবার শুরু করলেন, ‘হাতের বাঁধন খুলে আমাদের রাখা হলো রাজপ্রাসাদের বিশাল একটি কক্ষে, যেখানে আগে থেকেই আরো অনেক মহিলা, যুবতী ও বালিকাকে বন্দী ক’রে রাখা হয়েছিল। তার মধ্যে রাজবাড়ীর দু'-একজন মহিলাও ছিল, ছিল রাজা দাহিরের কয়েকজন ভাগ্নি, সেনাধ্যক্ষদের কন্যা। তখন কে রাজরাণি, কে রাজকন্যা আর মেথরানি, এই হিসেব ছিল না; সকলেই বন্দী। কিছুক্ষণ পর পরই আনা হচ্ছিল আরো অনেককে, দেবল নগরীর নানা প্রান্ত থেকে তাদেরকে তুলে আনা হচ্ছিল। আমাদের যা হবার হবে, দুশ্চিন্তা তখন মেয়েদের নিয়ে; তখন মনে হচ্ছিল, যদি হাতের কাছে বিষ পেতাম, তাহলে আগে মেয়েদের খাইয়ে তারপর নিজেরা খেতাম। আমরা কক্ষে বন্দী হয়ে আছি আর থেকে থেকে কেঁপে উঠছি আল্লাহু আকবর ধ্বনিতে!

কয়েকটা দিন আমাদের কাটলো শুধু রুটি আর জল খেয়ে; স্নান নেই, ঘুম নেই, চোখের জলও যেন তখন আর অবশিষ্ট নেই! আমাদের নিয়তি আমরা জেনে ফেলেছি, তাই একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে ঠায় বসে আছি। এরই মধ্যে নতুন নতুন মহিলা, যুবতী ও নাবালিকাকে আনা হচ্ছে, তারা এসেই খুব কান্নাকাটি করতো, কার স্বজনকে কেমন ক’রে খুন করা হয়েছে, সেসব বলতো আর বিলাপ করতো; তারপর একসময় ক্লান্তিতে তাদের মুখে নেমে আসতো শ্মশানের নীরবতা। নতুন আসা কয়েকজনের মুখে শুনলাম যে, আমাদের রাজ্যের সেনাধ্যক্ষদের পর রাজা দাহিরেরও শিরোচ্ছেদ করা হয়েছে। এরপর একদিন আমাদেরকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো, আমাদেরই মতো আরো কিছু কক্ষে বন্দী থাকা মহিলা, যুবতী ও নাবালিকাকে এনে সারিসারি দাঁড় করানো হলো। বাজারের পশুর মতো আমাদের গোনা হলো, তারপর মোট সংখ্যার পাঁচভাগের একভাগ হিসেবে আমাদের ভেতর থেকে বেছে বেছে কুমারীদের আলাদা করা হলো। আমার বুকের ধন অমলা আর ভাসুরের মেজো মেয়ে ইন্দুমতীকেও ফেলা হলো ওই এক ভাগে। আমরা মেয়েদেরকে জোর ক’রে ধরে রাখতে চাইলে আমাদেরকে মেরে মেয়েদেরকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ওই একভাগকে আমাদের সামনে থেকে নিয়ে যাওয়ার পর অবশিষ্ট চারভাগের কিছু সংখ্যক রাখা হলো রাজপ্রাসাদে আর বাকিদের বণ্টন ক’রে দেওয়া হলো বিভিন্ন পর্যায়ের যোদ্ধা, কবি এবং অন্যসব আরবীয়দের মধ্যে। আমি পড়লাম একজন কবির ভাগে। আরব মুসলমানরা যুদ্ধে জিতলে নারীভোগ করে, তা আগেই শুনেছিলাম, কিন্তু তার ব্যাপকতা এতোটা, তা আমাদের কল্পনাতেও ছিল না। জানলাম যে, আমরা যুদ্ধে বিজয়ী মুসলমানদের গণিমতের মাল, দেবল নগরীর সম্পদের মতো আমাদেরও ভোগ কারার অধিকার তাদের ধর্মসম্মত। আর যে একভাগ কুমারীকে আলাদা করেছিল খলিফা আল ওয়ালিদের হিস্যা হিসেবে লুণ্ঠিত মালামাল এবং ক্রীতদাসদের সঙ্গে তাদেরকে পাঠানো হয় দামেস্কে; সঙ্গে রাজা দাহিরের কাটা মস্তকটিও পাঠানো হয়েছিল। এটাই নাকি ইসলামের নিয়ম; লুণ্ঠিত মালামাল, পুরুষ ক্রীতদাস এবং নারীদের পাঁচভাগের একভাগ পাবে খলিফা, বাকি চারভাগ পাবে যোদ্ধা এবং অন্যান্যরা। ডাকাত মোহাম্মদও নাকি তাই-ই করতেন, আল্লাহ নাকি তাকে তেমন নির্দেশই দিয়েছিলেন।’

বলতে বলতে যেন পাথর হয়ে গেছেন সত্যবতী দেবী! এখন আর কোনো কান্না নেই, কোনো শোক নেই; যেন একটি নিশ্চল পাথরের মুখ থেকে কালের কথন শুনছি আমি। সত্যবতী দেবী বলেই চলেছেন, ‘নিজের জীবনের অভিজ্ঞতায়-ই বুঝতে পারি যে, মেয়ে দুটো সেই দূর দেশে কি নরকযন্ত্রণা ভোগ করছে! ওদের মরার খবরও যদি পেতাম, তাহলে আমার চেয়ে বেশি খুশি আর কেউ হতো না! জা আর তার ছোট মেয়ের কোনো খবর জানি না, আছে হয়তো এই নগরে আমারই মতো।’

‘আর যাদব, তার কোনো খবর পেয়েছেন?’ 

এবার পাথরের মূর্তি থেকে ছিটকে বের হলো কান্না! আমি চুপ ক’রে তাকিয়ে আছি তার মুখের দিকে। বললেন, ‘ওর জন্যই তো বেঁচে আছি, নইলে কবে গলায় দড়ি দিয়ে মরতাম; ভ্রষ্ট কবির পাপ পেটে নিয়ে বেঁচে থাকতাম না। সেই যে আমার বুক থেকে যাদবকে কেড়ে নেওয়া হলো, তারপর রাজবাড়ীতে ওর সাথে আমার আর দেখা হয়নি। আমি দাসী হয়ে এলাম কবির বাড়িতে। প্রতিদিনই ভাবতাম আত্মহত্যা করবো, কিন্তু যাদবের কথা মনে হলেই আত্মহত্যার ইচ্ছেটা দমন করতাম। মনে হতো, আরো কিছুদিন দেখি, যদি যাদবের কোনো খবর পাই। বয়স চোদ্দ হওয়ায় ওকে নিশ্চয় হত্যা করা হয়নি, হয় ও এই নগরীতেই আছে, নয়তো ক্রীতদাস হিসেবে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে দামেস্কে। সুযোগ পেলেই আমি রাস্তায় তাকিয়ে থাকতাম। এই বাড়ির দু'জন ক্রীতদাস দারোয়ানের মধ্যে একজন আমার পূর্ব পরিচিত। গোপনে ওর সাথে দেখা ক’রে ব’লে রেখেছিলাম যাদবকে কোথাও দেখলে আমাকে যেন জানায়। ও একদিন রাজবাড়ীর সামনের রাস্তায় দেখেছিল যাদবকে, বলেছিল আমার কথা। তারপর কবির অনুমতি নিয়ে কয়েকদিন পরই যাদব আমার সঙ্গে দেখা করতে এলো, ছেলে আমার আর ছেলে নেই! আরো অনেক ছেলের মতো যাদবকেও খোজা ক’রে দিয়েছে পাষণ্ডরা!’

ক্রোধে-কান্নায় নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরলেন সত্যবতী দেবী। আমি আঁতকে উঠলাম, ‘খোজা ক’রে দিয়েছে!’

‘রাজ্যের কমবয়সী দাড়ি-গোঁফবিহীন কিছু ছেলেকে পাষণ্ডরা খোজা ক’রে দিয়েছে ওদের সঙ্গে ফুর্তি করা আর রাজপ্রাসাদের হেরেমের মহিলাদের ওপর নজরদারি করার জন্য। ওকে পেয়েই আর মরতে পারিনি, পেটের পাপ নিয়েও বেঁচে আছি এজন্য যে, আমি বেঁচে থাকলে ও তো তবু মা ব’লে ডাকতে পারবে, মরে গেলে তো তাও পারবে না। কবির কাছ থেকে অনুমতি আদায় ক’রে নিয়েছি যাতে মাসে অন্তত দু'-তিনদিন ও আমার সঙ্গে দেখা করতে পারে। ও তো আমায় কিছুই বলে না লজ্জায়, শুনেছি ও মোহাম্মদ বিন কাশিমের খুব কাছের, তাই রাজপ্রসাদের বাইরে বেরোতে ওকে কেউ বাধা দেয় না।’ 

রাত বয়ে যায়, আমি ব্যথায়-বিস্ময়ে সত্যবতী দেবীর কথা শুনতে থাকি। শুনতে শুনতে শুকতারা ডুবে যায়, সত্যবতী দেবী অশ্রুসিক্ত চোখে বিদায় নিয়ে চলে যান, আমিও অশ্রুসিক্ত চোখে দাঁড়িয়ে থাকি কাঁঠালতলায়। আবার যেদিন যাদব আসবে সত্যবতী দেবীর সঙ্গে দেখা করতে, আমি যাদবের সঙ্গে রাজপ্রাসাদে যাব। দু'দিন পরই যাদব এলো মায়ের সাথে দেখা করতে, চোদ্দ বছরের কিশোর, কিন্তু মুখ দেখে মনে হয়, এখনো বাল্যের ঘুম ভাঙেনি। মিষ্টি চেহারা, একমাথা কালো রেশমি চুল। গায়ে মেয়েদের পোশাক, বুকে উত্তরীয়, ঠোঁটে রঙ। আরব মুসলমানরা ওকে শারীরিকভাবে হত্যা না করলেও প্রস্ফুটিত হবার আগেই হত্যা করেছে ওর ভেতরেরর পৌরুষ! ওর ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন সব হত্যা করেছে নিজেদের প্রয়োজনে। ফেরার পথে আমি ওর সঙ্গ নিলাম খোজার বেশে বন্ধু হয়ে! রাজপ্রাসাদের রক্ষীরা আমার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে জানালো, আমি ওর বন্ধু। বিনা বাধায় প্রবেশ করলাম অন্তঃপুরের হেরেমে; যেখানে রয়েছে আঠারো বছরের যুবক মোহাম্মদ বিন কাশিমের অসংখ্য যৌনদাসী; তাদের প্রহরায় রয়েছে আরো কিছু খোজা। অন্তঃপুরে পুরুষ প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষেধ। আমি যাদবের সঙ্গে যৌনদাসীদের কক্ষ ঘুরে ঘুরে দেখি আর বিস্মিত বনে যাই - নয়-দশ বছরের বালিকা থেকে চল্লিশ বছরের অসংখ্য নারী; এদের মধ্যে বেশিরভাগই গর্ভবতী, একজন পুরুষের জন্য এতো যৌনদাসী, একজন পুরুষ এতোটা কামলিপ্সু! ছোট্ট মেয়েদের কেউ হয়তো টোলে পড়তো, কিশোরী-যুবতীদের কারো কারো হয়তো বিয়ের সম্বন্ধ পাকাপাকি হয়েছিল, আরেকটু বেশি বয়সের নারীদের হয়তো স্বামী-সন্তান-সংসার ছিল; সেসব ভেসে গেছে এই একজন পুরুষের কামলিপ্সায়! এরা আর কোনোদিন স্বামী পাবে না, সংসার পাবে না, প্রিয়তমের আদর-সোহাগ পাবে না, হয়তো আর কাউকে ভালবাসতেও পারবে না। 

সন্ধ্যা নামলে সাধারণ দাসী আর খোজারা প্রদীপ জ্বালিয়ে দিলো যৌনদাসীদের ঘরে ঘরে। আমি এক ফাঁকে যাদবের সহায়তায় পারভীন নামের একজন সন্তানসম্ভবা যুবতী যৌনদাসীর কক্ষে প্রবেশ করলাম। গল্পে গল্পে অনেক কথার পর বললাম, ‘মোহাম্মদ বিন কাশিম আপনাকে ভালবাসে?’

কটাক্ষের হাসি হেসে পারভীন বললো, ‘ভালবাসার সময় কোথায় তার! দু'-তিন মাস পর পর একেজনের পালা আসে তার সঙ্গে থাকার, রাতের এক প্রহর অথবা একরাতের জন্য; তিনমাস আগে আমার পালা গেছে, এখন তো পেটে সন্তান, পেট খালি হলে হয়তোবা আবার ডাক পড়বে পেট ভরানোর জন্য; তখন হয়তো চিনতেই পারবে না আমাকে!’ 

একটু থেমে আবার বললো, ‘ডাক না পড়লে আরো ভাল, অমন একটা নরপশু শরীর ছুঁলে ঘেন্না লাগে!’

বললাম, ‘আমি একটা আশ্চর্য ব্যাপার লক্ষ্য করেছি, আরব মুসলমানদের অন্দরমহলের অধিকাংশ নারীই গর্ভবতী!’

পুনরায় তার শ্লেষোক্তি, ‘উম্মত! ভারতভূমিতে দ্রুত উম্মতের সম্প্রসারণে ওরা বেছে নিয়েছে আমাদের মতো ভারতীয় মেয়েদেরকেই, ধর্মান্তরিত ক’রে আমাদের গর্ভে ঢেলেছে বিষাক্ত আরব ঔরস! আমাদেরই গর্ভে বেড়ে উঠছে আমাদেরই পিতা, স্বামী-স্বজন হন্তারকের সন্তান। আমাদের সন্তানেরাই নাকি একদিন উম্মত রক্ষা করবে।’ 

পারভীনের এই কথা বিদ্যুৎ চমকের মতো ঝলকায় আমার চৈতন্যে, সেই ঝলকানিতে প্রচ্ছন্ন হয়ে ওঠা অতীত আর বর্তমানের ছবিটা মিলিয়ে নিই। বর্তমানের ছবিটাতে আমি দেখতে পাই আমাদের গলিতে ডিশ লাইনের কাজ করা ইমরানকে। ইমরানকে বেশ কয়েক বছর যাবৎ দেখার পর হঠাৎ একদিন আমার মনে হয়, আচ্ছা, এই লোকটি ডিশ লাইনের কাজ করে কেন? লোকটার বয়স তেতাল্লিশ-চুয়াল্লিশ কিন্তু বয়স আরো কম মনে হয় চিকন শারীরিক গড়ন ও সুন্দর মুখাবয়বের কারণে, ছয় ফুটের মতো লম্বা, গায়ের রঙ টকটকে লালচে ফর্সা, মাথাভরা চুল। ডিশ লাইনে কাজ করলেও বেশিরভাগ সময়ই খুব হ্যান্ডসাম থাকার চেষ্টা করে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক প’রে, শার্ট আর জিন্স পরে অধিকাংশ সময়, বিকেল কিংবা সন্ধ্যার দিকে মাঝে মাঝে পাঞ্জাবি পরতেও দেখা যায়। ফরমাল পোশাকে ওকে কোনো বহুজাতিক কোম্পানীর প্রধান নির্বাহীর চেয়ারে বসালে অনায়াসে মানিয়ে যাবে কিংবা সিনেমার পর্দায় কোনো নায়িকার সাথে রোমান্স করতে দেখলেও মোটেই খাপছাড়া লাগবে না; অথচ ও ডিশের লাইন মেরামত করে! গলিতে রোজই ওকে দেখতে পাই; কখনো একগাদা কালো তার হাতে নিয়ে হেঁটে যায় কখনো খালি হাতে, কখনো খুঁটিতে লাগানো মইয়ের মাথায় চড়ে কাজ করে, কখনোবা গলির মাথার সেলুনের খালি চেয়ারটিতে বসে রাজকীয় ভঙ্গিতে সিগারেট টানতে টানতে তামিল ছবির হিন্দি ভার্শন কিংবা ক্রিকেট খেলা দেখে। বাংলাদেশ-ভারত কিংবা ভারত-পাকিস্তানের খেলার সময় ওর হাতের জলন্ত সিগারেটটি যেন মশাল হয়ে যায়, পারলে টিভির পর্দায় ভেসে ওঠা ভারতীয় খেলোয়াদের ও পুড়িয়ে মারে; অকথ্য ভাষায় গালাগলি করে খেলোয়াড়দের মা-বোন-স্ত্রীকে নিয়ে! এমনকি বাংলাদেশ দলে যখন কোনো হিন্দু খেলোয়াড় থাকে, তখন তাকেও একইরকম ভাষায় গালাগালি করে এবং সে যাতে তাড়াতাড়ি আউট হয়, সেজন্য আল্লাহ্’র শরণাপন্ন হয়। অথচ পাকিস্তানী খেলোয়ারদেরকে নিয়ে ওর কী উচ্ছ্বাস, কী বিপুল আনন্দ! আমি আগে ওই সেলুনটাতে চুল কাটাতাম, নিজের কানকে নিস্তার দিতে কয়েক বছর হলো অন্য সেলুনে যাই। প্রথমদিকে ওকে দেখলেই আমার মনে হতো ডিশের লাইনম্যান নয়, ও এর চেয়ে ভাল কোনো কাজের যোগ্য। এখন ওকে দেখলেই আমার কানে বাজে ওরই মুখে শোনা একটি বাক্য, ‘মালাউনের মায়রে বাপ, আউট অয় না ক্যা পুঙ্গির পুত, খানকির পোলার মায়রে চুদি!’ 

আমার সিএনএন ফুফুর মুখে যেদিন শুনেছি যে, ইমরান একাত্তরের যুদ্ধশিশু, সেদিন থেকে ওর জন্য আমার ভীষণ করুণা হয়; পৃথিবীর আর কোনো দেশে ওর মতো দুর্ভাগা সন্তান আছে, যে নিজের মায়ের ধর্ষকের জাতিকে পাগলের মতো ভালবাসে? একাত্তরে পাকিস্তানীরা বাঙালি হিন্দু-মুসলমান নিধনে নেমেছিল, কাফের হিন্দু আর কাফেরদের দালাল মুসলমান পুরুষদের মেরে নারীদেরকে গর্ভবতী ক’রে আধাপাকিস্তানী জাতি উৎপন্ন করতে চেয়েছিল যারা ওদের অপশাসনের বিরোধিতা করবে না, ওরা যা বলবে, মাথা নত ক’রে তা-ই মেনে নেবে। ইমরানকে দেখে মনে হয় পাকিস্তানীদের সেই কৌশল একেবারে বৃথা যায়নি! উম্মত সম্প্রসারণে পাকিস্তানীদের এই দর্শনের বীজ ইসলামের একেবারে শেকড়ে প্রোথিত; মদিনার বানু কোরাইজা গোত্রের নারীদের ওপর মোহাম্মদ তার এই দর্শন প্রয়োগ করেছিল। এরপর মোহাম্মদ এবং তার শিষ্যরা আরো অনেক জাতি-গোত্রের ওপর এই দর্শন প্রয়োগ করেছে। ভারতে সিন্ধু দখলের পর মোহাম্মদ বিন কাশিম এবং তার যোদ্ধারাও মোহাম্মদের এই দর্শন প্রয়োগ করেছিল দ্রুত মুসলমান বৃদ্ধির লক্ষ্যে। সময়-কালের স্রোতে অনেক কিছুর উত্থান-পতন হলেও মুহাম্মদের সেই দর্শন এখনো ভেসে চলেছে উম্মতের জনস্রোতে! 

পারভীনের কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলাম। এখন অনেক রাত, হেরেমের সদর দরজা বন্ধ, একজন খোজা-প্রহরী সদর দরজার কাছে দেয়ালে মাথা এলিয়ে ঘুমোচ্ছে। আমি মৃদু পায়ে হেরেমের ভেতরের গলি দিয়ে হাঁটছি, যৌনদাসীদের কক্ষের দরজা বন্ধ। চলতে চলতে পেছনের বারান্দার দিকের একটা কক্ষের জানালার পর্দার সামান্য ফাঁকা দিয়ে ভেতরে দৃষ্টি পড়তেই আচমকা আমার পা থমকে গেল, প্রদীপের অল্প আলোয় বিছানায় দুটো নগ্ন শরীর; শায়িত শরীরটির ওপর ঝুঁকে অপর শরীরটি তাকে চুম্বন করছে আর ডান হাতে মন্থন করছে স্তন। শায়িতের হাতদুটো আদর করছে তাকে চুম্বন ও মন্থনরত শরীরটির পিঠে ও চুলে। দু’জনেরই মাথায় দীর্ঘ চুল, দু’জনের বুকেই স্ফীত স্তন, দু’জনকেই নিবিড়ভাবে অবলোকন ক’রে আমি নিশ্চিত হলাম যে, দু’জনেই নারী! 

জানালা থেকে সরে এলাম আমি, কিন্তু মাথার মধ্যে ভাবনার ঘুর্ণিপাক। দু'-তিন মাস পর পর ওরা পুরুষ সঙ্গ পায় কিছু সময়ের জন্য, বাকি সময় পুরুষসঙ্গ বঞ্চিত হয়ে হেরেমে বন্দী থাকে, বন্দী জীবন থেকে মুক্তির কোনো আশা নেই, পছন্দের পুরুষের সঙ্গ পাওয়া বা মনো-দৈহিক চাহিদা মেটানোর কোনো উপায় নেই। হতে পারে ওরা দু’জন সহজাত সমকামী, আবার এমনও হতে পারে অতীতে ওদের দু’জনেরই স্বামী-সংসার ছিল; হয়তো দিনের পর দিন পুরুষ-শূন্যতায় জৈবিক প্রয়োজনে একে অন্যকে কাছে টেনেছে, হয়তো ভালও বেসেছে। এই বন্দী জীবনে সীমাহীন দঃখ-যন্ত্রণার মাঝেও সমপ্রেমে-সমকামে ডুবে ওরা হয়তো খুঁজে পেয়েছে কিছুটা মুক্তির স্বাদ আর হৃদয়ে জেগেছে বেঁচে থাকার নতুন আকাঙ্ক্ষা। 

যাদবকে কোথাও না দেখে আমি হলদে পাখি হয়ে গরাদের ফাঁক গলে উড়ে বাইরে এসে বসলাম একটা গাছের ডালে। তারপর সিন্ধুর বিয়োগান্ত অধ্যায় অতিক্রম ক’রে আমি আবার উড়াল দিলাম অতীতের দিকে। আমার অসংখ্য পূর্বপুরুষের দেখা পেলাম; কোথাও আমার পূর্বপুরুষ খেয়াঘাটের মাঝি, কোথাও রাজকর্মচারী, কোথাও নট, কোথাও যাযাবর, কোথাওবা ঋষি। তাদেরকে অতিক্রম ক’রে আমি উড়ে চলেছি আরো অতীতের দিকে। উড়ছি তো উড়ছিই, আমার উড়ালযাত্রা আর থামে না; আমি উড়ে বেড়াই এশিরিয়া, ব্যাবিলন, সুমেরীয়, মিশরীয়, হিব্রু, গ্রীক, রোমান সভ্যতার ওপর দিয়ে! উড়তে উড়তে একসময় পৌঁছে যাই দক্ষিণ আফ্রিকায়; ক্লান্ত, তৃষ্ণার্ত আমি। তৃষ্ণা নিবারণের জন্য গহীন অরণ্যের মাঝখানের এক পাহাড়ী ছড়ার পাড়ের পাথরে বসতেই আমি মানুষ হয়ে গেলাম; ছড়াটা বেশ গভীর, আমি হাঁটুজল অব্দি নেমে হাত-মুখ ধুয়ে আঁজলা ভরে পান করলাম শীতল জল! হঠাৎ-ই আমার কানে ভেসে এলো মানুষের কাশির শব্দ। আমি চারিদিকে চোখ বুলালাম। আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো অদূরে পাথরের বসা একজন নগ্ন মানুষের ওপর। আমি তার মুখ এবং শরীরের ডানপাশ দেখতে পাচ্ছি। পাথরের ওপর বসে তিনি কী যেন খাচ্ছেন। আমি ছড়া থেকে উঠে কিছুটা বাঁয়ে সরে ধীর পায়ে তার পেছনদিকের একটা বড় পাথরের আড়ালে গিয়ে দাঁড়ালাম। তিনি মিষ্টি আলু খাচ্ছেন, পাথরের ওপর রাখা আরো একটি মিষ্টি আলু এবং একটি পাকা পেঁপে। আমি নীরবে দাঁড়িয়েই থাকি। মানুষ নাকি মানুষের মতো দেখতে অন্য কোনো প্রাণী! রোমশ শরীর দীর্ঘ, সুঠাম আর কালো। হাতে-পায়ে বড় বড় নখ, মাথায় কাঁচা-পাকা দীর্ঘ কোঁকড়া চুল। মিষ্টি আলু খাওয়া হলে তিনি যখন পেঁপেটা তুলে নিলেন, তখন তার মুখের ডানদিকের কিছু অংশ আমি দেখতে পেলাম, মুখে কিঞ্চিত বানরের আদল; মুখের দাড়ি-গোঁফও কাঁচা-পাকা। পেঁপে খাওয়া শেষ হলে তিনি যখন ছড়ার দিকে এগিয়ে গেলেন, তখন আমি তার মুখের ডান পাশটি আরো ভালভাবে দেখতে পেলাম, দাড়ি-গোঁফে লেগে আছে পাকা পেঁপে। তিনি ছড়ার কোমরজলে নেমে হাত-মুখ ধুয়ে পর পর কয়েকটি ডুব দিলেন। হাত দিয়ে চুল, দাড়ি এবং শরীর মার্জন করলেন; তারপর দিলেন আরো দু'টি ডুব। এরপর আঁজলা ভরে জলপান করার পর ঘাড় উঁচিয়ে আকাশ অথবা গাছের দিকে তাকিয়ে নিজে নিজেই এমনভাবে নিঃশব্দে হাসতে লাগলেন, যেন তিনি অমৃত পান করেছেন এবং পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ তিনি! 

স্নান শেষ হলে ছড়া থেকে উঠে এসে রৌদ্রজ্জ্বল একটা বড় পাথরের ওপর বসে উদাস হয়ে তাকিয়ে রইলেন আকাশের দিকে। তাঁর চুল-দাড়ি বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো শরীরের নিচের দিকে, পাথর বেয়ে মাটিতে। এবার আমি তাকে খুব ভালভাবে দেখতে পাচ্ছি, আড়াল থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে তাকে চিনতে চেষ্টা করি। ইনি কি হোমো ইরেকটাস, হোমো হাইডেলবারজেনসিস নাকি হোমো স্যাপিয়েন্স গোত্রের? মুখের বানরের আদলটা খুব একটা প্রকট নয়। আবার ফল খাওয়া, শরীর মার্জন ক’রে স্নান করা, নিঃশব্দ হাসি, স্নান শেষে পাথরের ওপর বসে শরীর শুকোতে শুকোতে তার উদাসীন অথচ বেশ বুদ্ধিদীপ্ত চাহনি; এসব দেখে আমার মনে হয় যে, তিনি হোমো ইরেকটাস বা হোমো হাইডেলবারজেনসিস গোত্রের নন; হোমো ইরেকটাস এবং হাইডেলবারজেনসিসের বিবর্তিত উত্তরপুরুষ হোমো স্যাপিয়েন্স। আমি মৃদু পায়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। তিনি এখন আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখ বুজে আছেন। তিনি মৃদু শব্দে দু'বার নাক টানলেন, বোধহয় গন্ধ শুঁকে আমার অস্তিত্ব টের পেয়েছেন। এবার তিনি চোখ খুলে মাথা নামিয়ে দৃষ্টি ছুঁড়ে দিলেন আমার দিকে। আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত দ্রুত একবার দৃষ্টি বোলালেন, তারপর দৃষ্টি স্থির করলেন আমার মুখে। আমি দৃষ্টি রাখলাম তার দৃষ্টিতে। বেশ কয়েক মুহূর্ত পেরিয়ে গেল, তিনি দৃষ্টি নামাচ্ছেন না, আমিও না। তার দৃষ্টির ভেতরে আমি আমার অসংখ্য পূর্বপুরুষদের দেখতে পেলাম! তাদের একেজনকে অতিক্রম ক’রে এগোতে লাগলো আমার দৃষ্টি, দৃষ্টি যতো এগোয়, আমার সঙ্গে তাদের শারীরিক পরিবর্তন ততো প্রকট হয়ে ওঠে, তাদের মুখ অবিকল বানরের মতো! আমার ভেতরটা আনন্দে নেচে উঠলো, ইনি আমার বহু প্রজন্ম আগের পূর্বপুরুষ-সেই হোমো স্যাপিয়েন্স গোত্রের! আনন্দে আমার ভেতরটা উদ্বেলিত, আমার চোখের পলক পড়লো। এখন তিনি আমাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন, আমার মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত। একবার নিজের শরীরের দিকে তাকাচ্ছেন, পুনরায় আমার দিকে। আমি তার আরো কাছে গিয়ে বললাম, ‘আমাকে চিনতে পেরেছেন?’

তিনি কোনো কথা বললেন না। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের ঠোঁট দুটো নেড়ে কথা বলার ভঙ্গি করলেন, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না মুখ থেকে।

আমি আবার বললাম, ‘আমি আপনার উত্তরপুরুষ, কেমন আছেন আপনি?’

তিনি নিঃশব্দে আমার দিকে তাকিয়ে নিজের দাড়িতে আঙুল বোলাতে লাগলেন। বোধহয় আমার শ্মশ্রুমুণ্ডিত মুখমণ্ডল দেখে তিনি অবাক হচ্ছেন।

(চলবে)