৯ নভেম্বর, ২০১৬

সাইমুম (উপন্যাস: পর্ব ১১)


বাসায় ফিরে কম্পিউটারে বসতেই শাশ্বতিদির লেখাটার কথা মনে পড়লো। ইউটিউবে পণ্ডিত রবিশংকরের সেতার ছেড়ে ব্লগে ঢুকে পড়তে শুরু করলাম শাশ্বতিদির লেখা -

জন্মান্তর (পর্ব-দুই)

ভাবীর ব্লাউজের ওপরের বোতামটা আগে থেকেই খোলা ছিল, তরিৎবেগে সে অন্য বোতামগুলোও খুলে ফেললো আর আমার হাতদুটো নিয়ে তার অনাবৃত ফর্সা নরম বুকে ঘষতে লাগলো। আমি তার বুকের দিকে তাকাতে পারছি না, তাকিয়ে আছি মেঝেয় লুটিয়ে থাকা তার শাড়ির আঁচলের দিকে। সে বিছানা থেকে নেমে মেঝেতে হাঁটুমুড়ে আমার ঊরুর কাছে মুখ নিয়ে লুঙ্গির গিঁট ধরে টান দিতেই আমি উঠে দাঁড়ালাম লুঙ্গির ঢিলা গিঁট বাম হাতে ধরে। 

আমি অনুভব করলাম আমার পা কাঁপছে, গা কাঁপছে। অনুনয়ের সুরে বললাম, ‘আমাকে ছেড়ে দাও, ভাবী, আমি বাড়ি যাব।’

ভাবীও উঠে দাঁড়ালো, ‘আমি যেতে দিলে তো তুমি যাবে!’ বলেই ডান হাত দিয়ে আমাকে জাপটে ধরলো আর বাম হাত আলতোভাবে রাখলো আমার ডান গালে। 

আমি জোর ক’রে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে গেলে সে চাপাস্বরে গর্জে উঠলো, ‘কোথায় যাবে তুমি, এখন আমার কথা না শুনলে আমি চিৎকার ক’রে পাড়ার মানুষ জড়ো ক’রে বলবো যে তুমি আমাকে ধর্ষণ করতে এসেছো!’

ভাবীর এই কন্ঠস্বর, এই রূপ আমার অচেনা; ভাবী যেন ক্ষুধার্ত বাঘিনী! 

ভাবীর কথা শুনে আমি ভয়ে-বিস্ময়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সে তার বুকখোলা ব্লাউজটা শরীর থেকে খুলে ছুড়ে ফেললো মেঝেতে, মুহূর্তেই খুলে ফেললো শাড়ি-ছায়াও। ভাবী এখন সম্পূর্ণ নগ্ন, কোমরে সুতোটিও নেই। জানালার পর্দা ভেদ ক’রে আসা আদুরে আলোয় আমি অবাক হ’য়ে দৃষ্টি বোলাতে লাগলাম তার সারা শরীরে, এর আগে আমি এমনিভাবে কোনো নগ্ন নারীকে দেখিনি। একবার মাত্র সুবলের ঠাকুমাকে দেখেছিলাম অর্ধনগ্ন; ভাঙা মাজার বুড়ি পরনের কাপড় কোমরে তুলে বাঁশতলায় দাঁড়িয়ে ঘোড়ার মতো প্রসাব করছিল! কিন্তু এভাবে সম্পূর্ণ নগ্ন নারীকে কখনো দেখিনি, তাও আবার যুবতী। ভাবীর শরীর দেখে আমার ভীষণ লোভ হলো, সম্ভোগ করার জন্য নয়; মনে হলো, আহারে, আমার তো নারীর মন আছেই, এমন একটা শরীরও যদি থাকতো! থাকতো যদি অমন দু'টি সুডৌল স্তন, আমি যত্নে আগলে রাখতাম আমার বর আর সন্তানের জন্য; থাকতো যদি অমন ঝিনুকের মতো যোনি, আমিও ওই ঝিনুকে মানব-মুক্তো ফলাতাম; সার্থক হতো আমার জীবন, নারীজীবন! কতো রাতে বিছানায় শুয়ে কল্পনায় নিজের বুকে অমন দুটি কোমল স্তন ধারণ করেছি, শিশ্নের জায়গায় ভেবেছি যোনি; তারপর... তারপর সেই কল্পিত দেহের ওপর টেনে নিয়েছি আমাদেরই পাড়ার রায়হান ভাইকে!

ভাবী আমার জামার বোতাম খুলতে লাগলো একটা একটা ক’রে, আমার দৃষ্টি ঘুরছে তার মুখে আর বুকে। আমার গা থেকে জামাটা খুলে চেয়ারের ওপর রাখতেই আমি তার হাত ধরে মুক্তি পাবার শেষ চেষ্টা করলাম, ‘ভাবী, আমি দেখতে ছেলেদের মতো হলেও মনে-প্রাণে আমি আসলে মেয়ে। তোমার দোহাই লাগে, ভাবী, আমাকে ছেড়ে দাও।’ 

কথা শেষ হওয়ামাত্র ভাবীর বাম হাতের হ্যাঁচকা টানে আমার কোমর থেকে লুঙ্গিখানা পা বেয়ে পড়ে গেল মেঝেতে। তার দু-চোখের দৃষ্টি নিবদ্ধ আমার উত্থিত পুরুষাঙ্গের দিকে। আমার শেষ কথাটি শোনামাত্র ভাবীর মুখে আঁধার জমেছিল, কিন্তু উত্থিত পুরুষাঙ্গ যেন ভাবীর মুখে আলোর রোশনাই ছড়িয়ে দিল! ভাবী ঠোঁটে খুশির ঝলক ছড়িয়ে বললো, ‘মিথ্যুক!’ 

তারপর প্রায় পাঁজাকোলা ক’রে আমাকে বিছানায় তুলে ভাবী তার শরীর রাখলো আমার শরীরের ওপর। দীর্ঘসময় পর খাবার পেলে অভুক্ত মানুষ যেমন খাবারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তেমনি ভাবীও চুমু-লেহনের বর্ষণে তার মুখের লালায় ভাসাতে লাগলো আমার মুখমণ্ডল আর গলা। কিছুক্ষণ পর সে আমার শরীর বেয়ে নেমে গেল নিচের দিকে, আমার তলপেটে সুড়সুড়ি দিল, তারপর পুরুষাঙ্গে চুমু খেয়ে বললো, ‘এতো ছোটো, একটা বড় সাইজের কাঁচামরিচের মতো!’

ভাবী আমার কাঁচামরিচটা মুখে পুরে নিল, সুড়সুড়ির প্রবলতায় আমার শরীর থেকে কেঁপে কেঁপে উঠলো! 

আমার মনোলিঙ্গ নারীর হলেও জৈবলিঙ্গ যেহেতু পুরুষের তাই ধর্ম অনুযায়ী জৈবলিঙ্গ জেগে উঠেছে, জেগে উঠেছে আমার শরীরও। কিন্তু আমার মনোলিঙ্গের কোনো সাড়া নেই, সে খাঁচায় বন্দী পাখির মতো ছটফট করছে মুক্তির অপেক্ষায়। 

আমি আমার দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ ক’রে রেখে সুড়সুড়ির প্রবলতায় চোখ বুজে আছি দেখে ভাবী বিরক্ত হয়ে বললো, ‘অমন ভ্যাদামাছের মতো উল্টে আছো কেন, কখনো ব্লু-ফিল্ম দেখোনি!’

সত্যিই আমি তখনো ব্লু-ফিল্ম দেখিনি। আজকের দিনের মতো তখন তো আর হাতে হাতে মোবাইল-ইন্টারনেট ছিল না। তখন সিনেমা-ই দেখতে হ’তো হলে গিয়ে, নয়তো ভিসিআর ভাড়া ক’রে এনে। ব্লু-ফিল্ম না দেখলেও শারীরিক সম্পর্কের বিষয়ে আমি অবগত, আর ধর্ম অনুযায়ী শরীরও তখন ভাবীকে জড়িয়ে ধরতে চাইছে; কিন্তু মন চাইছে রায়হান ভাইকে জড়িয়ে ধরতে! তবু শরীরের ধর্মে সায় দিয়ে আমি এক হাতে ভাবীর চুল মুঠি ক’রে ধরলাম, আরেক হাতে স্পর্শ করলাম ভাবীর নগ্ন মসৃণ কাঁধ।

এরপর ভাবী আমাকে তার শরীরের ওপর তুলে নিলো। আমার ডানহাত নিয়ে নিজের স্তনের ওপর রেখে বললো, ‘অ আ কিচ্ছু জানো না, সব শিখিয়ে নিতে হবে দেখছি! চাপ দাও।’ 

আমার মনোলিঙ্গ মূর্ছা গেছে, আর জৈবলিঙ্গ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মতো ফুঁসে উঠে লাভা ধাবমান ভাবীর শরীরের সকল গিরিখাদে। আমার জৈবলিঙ্গ আমার ঠোঁট আর জিভ দিয়ে চুম্বন-লেহন করিয়ে নিচ্ছে ভাবীর ঠোঁট-গাল-গলা; হাত দিয়ে মন্থন করিয়ে নিচ্ছে ভাবীর কোমল স্তন। এরপর ভাবী নিজেই উদ্যোগী হ’য়ে আমার শক্ত পুরুষাঙ্গ অবগাহন করালো তার অথৈই যোনিসরোবরে! ভাবীর দেহসমুদ্রে আমি এক আনাড়ি দাঁড়ি, তার যোনি-সরোবরে আমার অসহায় কৃশ কাম-দাঁড়! ভাবীর পীড়াপীড়িতে আমি একপ্রকার ঘোরের মধ্যে অযাচিত কামযাত্রা শুরু করেছি, একজন চৈত্তিক নারী হ’য়ে একজন দৈহিক নারীর সঙ্গে মিলেছি অযাচিত রতিরঙ্গে!

পর্বতশিখরে আরোহণের পর ক্লান্তির ভারে দেহ যেমনি নুয়ে পড়ে ভূমিতে তেমনি অল্পক্ষণের মধ্যেই রতিপাতের ক্লান্তিকর দীর্ঘ তপ্ত শ্বাস ফেলতে ফেলতে আমি মুখ থুবড়ে পড়লাম ভাবীর স্তনযুগলের ওপর। ভাবী তখন উত্তাল সমুদ্র, আমাকে রণেভঙ্গ দিতে দেখে ভাবী একহাতে আমার চুল আরেক হাতে মুখ ধ’রে বললো, ‘কী হলো?’

ভাবীর বাম স্তনে থুতনি আর তার চোখে লাজুক চোখ রেখে বললাম, ‘আর পারবো না ভাবী, আমার ইয়ে হ’য়ে গেছে....!’ 

ভাবীর মুখে হতাশা ঘনীভূত হলেও আমার মাথায় আদর বোলাতে বোলাতে বললো, ‘কী আমার পুরুষরে, ষাট বছরের বুড়োও বোধহয় তোমার চেয়ে বেশি করতে পারবে! যাও ওই জগ থেকে একটু জল খেয়ে আবার এসো।’

আমি ভাবীর শরীরের ওপর থেকে নেমে পাশে বসলাম, ‘আবার!’

‘তয়, আমার তো কিছুই হয়নি!’

আমি মিনতির সুরে বলরাম, ‘আর পারবো না, ভাবী।’

ভাবী এবার চাপাস্বরে আমাকে ধমক মারলো, ‘যা বলছি, তাই শোনো, বোকার হদ্দ কোথাকার!’

আমি বিছানা থেকে নেমে গিয়ে টেবিলে রাখা জগ থেকে দুই ঢোক জল খেলাম। আমার দেহ-মন আমাকে পালাতে বলছে, কিন্তু ভাবী যদি রেগে গিয়ে কোনো কাণ্ড ক’রে বসে! তাই জল খেয়ে আমি অসহায়ের মতো ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম। 

ভাবী অধৈর্য, ‘কী হলো, এসো!’

আমি ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম বিছানার কাছে, ‘প্লিজ, ভাবী, আমাকে এখন যেতে দাও।’ 

ভাবী বিরক্ত, ‘বারবার এক কথা ব’লো না তো!’

ভাবী বিছানায় উঠে বসে আমার হাত ধরে বিছানায় তুলে শুইয়ে দিল আমাকে। আমার শরীরের ওপর এক পা তুলে বুকে স্তন ঠেকিয়ে মুখের কাছে মুখ এনে বললো, ‘প্রথম প্রথম এমন তাড়াতাড়িই হয়, অভ্যাস হয়ে গেলে অনেক সময় থাকতে পারবা।’ 

ভাবী আমার ঠোঁটে আর গালে পর পর কয়েকবার চুমু খেল, জিভ দিয়ে চাটলো, এরপর তার ডানহাতের আঙুলগুলো আমার শরীরের ঊর্ধ্বাঙ্গে সুড়সুড়ি দিতে দিতে নেমে গেল নিচের দিকে। ভাবীর আঙুল, ঠোঁট আর জিহ্বার কুশলী আদরে অল্পক্ষণের মধ্যেই পুনরায় জেগে উঠলো আমার পুরুষাঙ্গ। তারপর অবাধ্য ছেলেকে ঘাড় ধরে শাসনের মতো পুনরায় সে আমার শিশ্ন তার যোনি-সরোবরে প্রবেশ করিয়ে আমার শরীরের ওপর ওঠ-বস করতে লাগলো। আমি কেবল অবাক হয়ে ভাবীকে দেখছি, দেখছি তার অদ্ভুত মুখভঙ্গি, শুনছি তার বিস্ময়কর কন্ঠস্বর; চেনা ভাবীর সঙ্গে এই ভাবীকে কিছুতেই মেলাতে পারছি না। অমন হাসি-খুশি, স্নেহশীল-মিশুক স্বভাবের ভাবীর এ কোন রূপ! 

কিছুক্ষণ পর আমার শরীরের ওপর থেকে নেমে ভাবী পুনরায় আমাকে টেনে নিল তার শরীরের ওপর। এবার আমার পুরুষাঙ্গ আপনা-আপনি-ই চিনে নিল তার যোনি-সরোবর। ভাবীর মুখে কখনো অস্ফুট কখনো স্ফুট শব্দ। দুই হাতে সে আমাকে জাপটে ধ’রে তার বুকের সাথে পিষে চলেছে, পাগলিনীর আমার মাথার চুল মুঠো ক’রে ধরছে, উন্মত্তের মতো আমার কাঁধে আর ঘাড়ে কামড়ে দাঁত বসিয়ে দিচ্ছে! আমর পিঠ খাঁমচে ধরে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলছে, ‘জোরে শাহিন, আরো জোরে! ঝড় তোলো, আমাকে লণ্ডভণ্ড ক’রে দাও!’ 

আমি তাকে কী লণ্ডভণ্ড করবো, আমি তো নিজেই লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছি! ভাবী যেন সর্বগ্রাসী পদ্মা আর আমি পদ্মাপাড়ের এক অসহায় জনপদ, কেবল নিজের ভাঙন দেখছি! পারলে সে তার শরীরে আমাকে লোশনের মতো নিঃশেষ ক’রে ফেলে!

‘আগুন, আগুন আমার শরীরে, নিভিয়ে দাও, শাহিন, নিভিয়ে দাও!’ বুঝিবা সুখের আতিশয্যে ভাবীর চোখের কোনা দিয়ে জল গড়াচ্ছে। 

এবারো অল্পক্ষণেই মধ্যেই রণেভঙ্গ দিয়ে আমি মুখ থুবড়ে পড়লাম ভাবীর বুকের ওপর। ভাবী আমার পুরুষাঙ্গের শিথিলতা অনুভব ক’রে প্রচণ্ড ক্ষিপ্রতায় দুই হাত দিয়ে আমাকে তার শরীরের ওপর থেকে ছুড়ে ফেলে দিলো আর আমি নেভাতে ব্যর্থ হওয়ায় তার শরীরের জলন্ত আগুনের ফুলকি ছিটকে বেরোলো মুখ থেকে, ‘হিজড়া কোথাকার একটা! যা, দূর হ আমার সামনে থেকে!’ 

আমি কোনোক্রমে একটা পা মাটিতে রেখে মেঝেতে পড়ে যাওয়ার হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করেছি, দু-হাত দিয়ে বিছানার চাদর আঁকড়ে ধ’রে তাকিয়ে আছি ভাবীর অতৃপ্ত কামোন্মত্ত ক্রুদ্ধ চেহারার দিকে! তার বুক ঘন ঘন ওঠা-নামা করছে, স্তন দুটো কামারের হাপরের মতো ফুঁসে উঠছে; সারা মুখে যেন বজ্ররেখা, কন্ঠস্বরে বজ্রপাত, ‘যা যা শালার হিজড়া মাগি, আমার সামনে থেকে যা!’ 

আমি একই অবস্থানে থেকে দাঁতে দাঁত চেপে আছি, দু'চোখে ক্ষোভের আগুন। হঠাৎই আমাকে অবাক ক’রে ভাবী ডুঁকরে কেঁদে উঠে প্রচণ্ড আক্রোশে বামহাতে খাঁমচে ধরলো নিজের ডান স্তন আর দাঁতে কামড়ে ধরলো ডানহাতের আঙুলগুলো! আমি ভাবীর দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে আছি, অনাকাঙ্ক্ষিত এই কান্নার দৃশ্য আমার ক্ষোভের আগুনে জল ঢেলে দিল। এখন আর ভাবীকে বর্ষার সর্বগ্রাসী পদ্মার মতো মনে হচ্ছে না, তাকে দেখে মনে হচ্ছে জল বিনে কাতর গ্রীষ্মের শুষ্ক অসহায় পদ্মা! তার প্রতিটি অশ্রুবিন্দু আছড়ে পড়ছে আমার বুকে, আমার অক্ষমতা অপরাধ আর অনুশোচনার মতো যেন পোড়াচ্ছে আমাকে। জ্ঞান হবার পর থেকে এই প্রথম আমার মনে হলো, আহারে, আমি যদি দৈহিক এবং চৈত্তিকভাবে একজন পরিপূর্ণ সমর্থ পুরুষ হতাম, তাহলে এই স্বামী পরবাসী অতৃপ্ত অসুখী নারীকে পরিপূর্ণ তৃপ্ত এবং সুখী করতে পারতাম!

সেদিনই বিকেলবেলা ভাবী আমাদের বাসায় এলো; বাড়িতে তখন আমি, মা আর মেজোবুবু; বাবা অফিসে আর ছোটবুবু তখনো কলেজ থেকে ফেরেনি। আমি বারান্দার চেয়ারে ব’সে থাকলেও ভাবীকে দেখেই নিজের ঘরে চ’লে গেলাম। ভাবী এসেই রান্নাঘরের বারান্দায় মোড়া টেনে বসলো। মা রান্নাঘরের মধ্যে কোনো কাজ করছে, আর মেজোবুবু রান্নাঘরের বারান্দায় বসে ভাত খাচ্ছে। তিনজনে একথা-সেকথা বলছে। তাদের কথা থেকেই জানতে পারলাম যে, সিরাজ চাচা আর চাচী আজ ফিরবে না, তাই মেজোবুবুকে ভাবীর সাথে থাকতে ব’লে গেছেন চাচী। মেজোবুবুর খাওয়া শেষ হ’লে টিউবয়েলে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে ওর ঘরে গেল। ততক্ষণে ভাবীও রান্নাঘরের বারান্দা থেকে আমাদের শোবার ঘরের বারান্দায় উঠে এসেছে। মেজোবুবু ঘর থেকে ভাবীর উদ্দেশে বললো, ‘ভাবী, দেখ, লুডু বোধ হয় শাহিনের ঘরে।’

ভাবী আমার ঘরে এলো। আমি বিছনায় ব’সে নিমাই ভট্টচার্যের ‘মেম সাহেব’ উপন্যাসে মুখ গুঁজে পড়ার ভান করছি। ভাবী বললো, ‘লুডু কোথায়?’

ভয়-সঙ্কোচ-দ্বিধা আমার কন্ঠে চেপে বসেছে যেন, তবু আমি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টায় ভাবীর দিকে না তাকিয়েই বললাম, ‘বুক সেল্ফের নিচের তাকে।’ 

ভাবী সেল্ফের তাক থেকে লুডু এবং গুটি নিয়ে বললো, ‘আসো লুডু খেলি।’ অন্যদিনের মতোই তার সরল প্রস্তাব, যেন দুপুরে তার সঙ্গে আমার কিছুই হয়নি! 

আমি এক মুহুর্তের জন্য আড়চোখে ভাবীর দিকে তাকিয়ে আবার বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজলাম। কি চেহারায় কি কথায়, ভাবী একদম সাবলীল, দুপুরে যে আমাদের মধ্যে অমন একটি কাণ্ড ঘটলো, তা যেন গত জীবনের ঘটনা! কিন্তু আমি ভাবীর মতো সহজ হ’তে পারছি না, আমার মন অন্ধকার দুপুরের ঘটনায়, আমি নিশ্চিত মুখেও পড়েছে অন্ধকারের ছায়া। কোনোরকমে বললাম, ‘না, আমি খেলবো না।’

ব’লে একবার আড়চোখে ভাবীর দিকে তাকালাম, ভাবী ঠোঁট টিপে হেসে বললো, ‘পারো না তো, তা খেলবা কী!’

ভাবী ঢিলটা কোথায় ছুড়লো, তা আমি বেশ বুঝতে পারলাম। লুডু খেলায় আমি বেশ পটু, সহজে হারি না; তবু আমি ভাবীর কথার প্রতিবাদ না ক’রে কথাটা হজম করলাম দুপুরের পরাজয়ের কারণে। হঠাৎ ভাবী তার ব্লাউজের ভেতর হাত ঢুকিয়ে এক টুকরো কাগজ বের ক’রে আমার মুখের কাছে ছুড়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আমার দৃষ্টি তার শেষ ছায়াটুকু অনুসরণ করার পর ফিরে এলো দোমড়ানো-মোচড়ানো ছোট্ট এক টুকরো কাগজের ওপর, যে কাগজটা ভাবীর বুকের গন্ধ-স্পর্শ নিয়ে এসেছে। ঘরে আমি একা, অন্য কারো আসার সম্ভাবনাও কম; তবু দ্রুত কাগজখানা তুলে বইয়ের মাঝখানে নিয়ে খুলে তাতে চোখ বুলালাম - ‘কাল কলেজে যাবার সময় অবশ্যই আমার সঙ্গে দেখা করবে, আমি তোমার সঙ্গে যাব, আমার ব্যাংকে একটু কাজ আছে। যদি আমাকে নিয়ে না যাও, আমি সবাইকে....।’

একবার পড়া শেষ হ’লে আবার পড়লাম, তারপর আবার....! তিনবার পড়ার পর চিরকুটটা মুখে পুরে চিবিয়ে পিষতে লাগলাম আর আমার চোখে ভাসতে লাগলো দুপুরের দৃশ্যগুলো!

পরদিন সকালবেলা কলেজে যাবার সময় ভয়ে ভয়ে ভাবীদের বাড়ির সদর দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। ভাবী চিরকুটের শেষ বাক্যে লিখেছে, ‘যদি না আমাকে নিয়ে না যাও, আমি সবাইকে....।’ কী বলবে ভাবী? সে নিজেই তো আমাকে.....; অথচ এখন কিনা সবাইকে ব’লে দেবার ভয় দেখাচ্ছে! ভাবীর পেটে তলে তলে এতো শয়তানি! এখন আবার তাকে ব্যাংকে নিয়ে যেতে হবে, যদি না যাই তাহলে কি সে সত্যিই ব’লে দেবে বুবুদেরকে? যাব কি যাব না এই নিয়ে ভেতরে দ্বিধা। আকাশ এখন মেঘলা, আবহাওয়া তপ্ত নয়, তবু আমি ঘামছি! হঠাৎ সদর দরজা খুলে গেল এবং আমি দেখলাম সামনে দাঁড়ানো ভাবী; পরনে একটা জলপাই রঙের শাড়ি, গায়ে একই রঙের ব্লাউজ-হাতে চুড়ি। ভাবী তবে সেজে-গুঁজে তৈরি হয়েই ছিল, নিশ্চয় জানালা দিয়ে আমাকে দেখে বেরিয়ে এসেছে। আমার দিকে ভ্যানিটি ব্যাগটা বাড়িয়ে দিয়ে বললো, ‘ধরো এটা, না ডেকে এখানে চুপ ক’রে দাঁড়িয়ে আছো কেন?’ 

আমি কোনো উত্তর না দিয়ে ভাবীর বাড়িয়ে দেওয়া ব্যাগটা ধরলাম। ভাবী সদর দরজায় তালা দিয়ে আমার হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে চাবির গুচ্ছ ব্যাগের ভেতর রেখে বললো, ‘চলো।’

দু’জনে পাশাপাশি হাঁটছি, আমি মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটছি আর মাঝে মাঝে আড়চোখে তাকিয়ে দেখছি ভাবীকে। ভাবীও মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে আমার দিকে। একটুখানি হাঁটার পরই আমরা রিক্সা পেয়ে গেলাম। রিক্সায় উঠার আগে রিক্সাওয়ালা জিজ্ঞাসা করলো, ‘কনে যাবেন?’

ভাবী বললো, ‘আগান, তারপর বলছি। যা ভাড়া তাই দেব, আপনাকে ঠকাবো না।’ 

রিক্সা চলছে, আমি অন্যদিকে তাকিয়ে আছি। ভাবী আমার বামহাতে চাপ দিয়ে ফিসফিস ক’রে বললো, ‘কী, এভাবে চুপ ক’রে থাকবা, কথা বলবা না?’

আমি না তাকিয়ে বললাম, ‘আমরা কোন ব্যাংকে যাব?’

‘ব্যাংকে কি মানুষের টাকা গোনা দেখতে যাব!’

আমি অবাক হ’য়ে এবার ভাবী দিকে মুখ ফেরালাম, ‘মানে? তাহলে আমরা কোথায় যাব?’

ভাবী আমার মাথাটা তার দিকে টেনে কানের কাছে মুখ নিয়ে আস্তে বললো, ‘প্রেম করতে!’

আমি বিস্ময়ে ভাবীর দিকে তাকালাম, তার হাত এখনো আমার ঘাড়ে। সত্যিই ভাবীকে সুন্দর লাগছে, খোলা চুল বাতাসে উড়ছে। দারুণ একটা সুগন্ধ ছড়াচ্ছে তার শরীর! আমার মনোলিঙ্গ পুরুষের হ’লে সত্যিই আমি নিজেকে সঁপে দিতাম তার কাছে, তার দেহ-মনে এতো মায়া যে, কেবল পাথুরে হৃদয়ের পুরুষই তাকে উপেক্ষা করতে পারে! আমি আবার বললাম, ‘আমরা কোথায় যাচ্ছি।’

ভাবী রিক্সাওয়ালার উদ্দেশে বললো, ‘চাচা, বেড়িবাঁধের দিকে যান।’

আমার প্রতিবাদী প্রশ্ন, ‘বেড়িবাঁধে কেন?’

ভাবী তার হাতের মুঠোয় আমার চুল ধ’রে ঝাঁকুনি দিয়ে ফিসফিস ক’রে বললো, ‘বললাম না প্রেম করতে!’

‘আমি কলেজে যাব।’

‘আজ আর কলেজে যাওয়া হবে না চান্দু, সারাদিন আমাকে সময় দিতে হবে।’ 

‘আমাকে নামিয়ে দাও, আমি কলেজে যাব।’

ভাবী আবার আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো, ‘অবাধ্যতা করলে রাস্তার লোকজনের সামনে তোমাকে চুমু খাব কিন্তু!’ 

এ কোন ভাবী, গতকাল দুপুরের পর থেকে ভাবীকে যেন প্রতি মুহূর্তে নতুন লাগছে! আমি চুপ ক’রে বসে রইলাম রিক্সায়। ভাবী আমার অসহায়তা দেখে মিটিমিটি হাসতে লাগলো। শহর ছাড়িয়ে বেড়িবাঁধের ফাঁকা রাস্তায় ওঠার পর কে জানে কোন আনন্দে ভাবী নিচু গলায় গেয়ে উঠলো, ‘এতো দিন যে বসে ছিলেম পথ চেয়ে আর কাল গুণে, দেখা পেলেম ফাল্গুনে।’ 

ভাবী এই ভরা বর্ষায় গাইছে বসন্তের গান! প্রকৃতিতে যে ঋতুই হোক ভাবীর মনে এখন বইছে বসন্তের মাতাল হাওয়া, তা তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কি আছে তার মনে বুঝতে পারছি না, আজ আবার কোন কাণ্ড করবে কে জানে! আমি পদ্মার উত্তাল বুকের দিকে তাকিয়ে থাকলেও আমার কান ভাবীর গানে। গলায় বেশ সুর আছে। হতে পারে, বিয়ের আগে সে গান গাইতো। 

বেড়িবাঁধ এখন নির্জন, বিকেলের দিকে জোড়া জোড়া প্রেমাতুর যৌবন ভিড় করে বেড়িবাঁধে; অনেকে বন্ধু-বান্ধব কিংবা পরিবার নিয়েও আসে। আমরা রিক্সা থেকে নামলাম একটা মেহগনিগাছের নিচে, ভাবী রিক্সাভাড়া মিটিয়ে আমার হাত ধরে রাস্তার কোনারদিকের ঘাস দেখিয়ে বললো, ‘চলো, ওখানে বসি।’ 

আমি বসলাম রাস্তার ঢালের দিকে পা ছড়িয়ে; ভাবী বসলো আমার ডানপাশে গা ঘেঁষে, এতোটাই ঘেঁষে যে, আমি তার শরীরের উত্তাপ টের পাচ্ছি। আমি পদ্মার বুকে দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে বললাম, ‘আমাকে এখানে নিয়ে এলো কেন?’

‘বললাম না, প্রেম করবো!’

‘ভাবী, আমার এসব ভাললাগে না।’

ভাবী আমার হাতদুটো তার হাতের মধ্যে নিয়ে বললো, ‘কালকের ঘটনার জন্য আমি দুঃখিত। হঠাৎ ক’রে তোমাকে ওই পরিস্থিতিতে ফেলা আমার উচিত হয়নি।’ 

এখন আর ভাবীর মুখে সেই হাসিখুশি ভাবটি নেই, বেশ গম্ভীর। মুখ থেকে আমার হাতটা তার কোলের ওপর নিয়ে বললো, ‘কালকে হঠাৎ বাড়ি ফাঁকা পেয়ে আমার দেহমন হঠাৎ-ই অশান্ত হয়ে উঠেছিল, মাথায় দুষ্টুবুদ্ধির ভূত চেপেছিল। গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম যে, কখন তোমাকে পাই, না পেলেও তোমাদের বাড়িতে গিয়ে তোমাকে ডেকে আনতাম, এমন রোখ চেপে গিয়েছিল! কাল কেন অমন হয়েছিল, কে জানে, তীব্র কামনার ঘোরে ছিলাম আমি। অতৃপ্ত হয়ে অসভ্যের মতো তোমাকে যা-তা বলেছি; প্লিজ, শাহিন, তুমি কিছু মনে ক’রো না।’

আমি চুপ ক’রে রইলাম। ভাবী বললো, ‘বিয়ের কুড়িদিন পর তোমার ভাই ইতালি চ’লে গেল, সেও আজ দেড় বছর। আসার নামগন্ধও নেই মুখে, সে ভালই আছে....! কিন্তু আমি? আমারও তো মন আছে, বারুদভরা শরীর আছে, শরীর আর মনের কিছু চাহিদা আছে; কিন্তু সেসব বোঝার মতো মন তোমার ভাইয়ের নেই। সে আমাকে ওখানে নেবে না, আবার বছরে একবার আসবেও না। এই নিয়ে চিঠিতে ঝগড়া হয়; মাসে একবার টিএনটি অফিসে গিয়ে ফোন করি, ফোনেও ঝগড়া হয়। আমাকে জানিয়েছে বছরখানেক পর একবার এসে ঘুরে যাবে, তারপর একটানা চার-পাঁচ বছর থেকে একেবারে চ’লে আসবে। এখানে এসে ব্যবসা-বাণিজ্য করবে। অথচ বিয়ের আগে বলেছিল ইতালিতে সে ভাল চাকরি করে, আমাকেও নিয়ে যাবে। বছরখানেক পর কেন দেশে আসবে জানো, আমাকে গর্ভবতী করতে! আমার প্রেমের টানে নয়, আমার শরীরের টানেও নয়, প্রয়োজনে। আমি যেন বাচ্চা উৎপাদন করার একখণ্ড জমি, বীজ পুঁতে দিয়েই চ’লে যাবে! আমার শরীর-মনের যেন কোনো চাহিদা নেই! কী করবো আমি? যে স্বামী স্ত্রীর শরীর-মন বোঝে না, তার জন্য শরীর আগলে অপেক্ষা করতে করতে বুড়ি হবো? সে তো ওখানে ঠিকই সাদা মাগিগুলোর সঙ্গে শুচ্ছে, শরীরের যন্ত্রণা উপশম করছে! অনেক অপেক্ষা করেছি আমি, আর পারবো না।’

এটুকু ব’লে থামলো ভাবী; আশপাশে কোনো মানুষ নেই, মানুষের সাড়াশব্দও। আছে কেবল ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আর গাছে বসা একটা-দুটো পাখির ডাক। ভাবী এখন শক্ত ক’রে আমার ডানহাতটা ধ’রে আছে। আমি কী বলবো, বুঝতে পারছি না। মানুষের সাথে দিনের পর দিন মেলামেশা করলে কিংবা কথাবার্তা বললেও আমরা তার ভেতরের কথা কতোটুকু জানতে পারি? হয়তো খুব সামান্যই। ভাবীর ভেতরে এতো ব্যথা, এতো না-পাওয়া ছিল, তা আমি কখনো বুঝতেও পারিনি। হাসি-খুশি ভাবীকে দেখে বুঝেছি, সে তো দারুণ সুখী, বর বিদেশ থেকে কাড়ি কাড়ি টাকা রোজগার ক’রে পাঠায়, আর সে শ্বশুর-শাশুড়িকে নিয়ে আরামে থাকে! 

ভাবী আমার কাঁধে মাথা রেখে বললো, ‘জানো, কতোদিন মনে হয়েছে তোমার সঙ্গে সম্পর্কে জড়াই, কিন্তু সরাসরি কিছু বলতে পারিনি। আকারে-ইঙ্গিতে বুঝিয়েছি, কিন্তু তুমি এমন ছেলেমানুষ যে, সেসব বুঝতেও পারোনি!’ 

ভাবী এবার কাঁধ থেকে মুখ তুলে বললো, ‘শাহিন, তোমার চাল-চলন দেখে অন্যরা যা-ই বলুক, তোমাকে আমার ভাল লাগে; তুমি খুব সহজ-সরল। তোমার প্রতি আমার মায়া জন্মে গেছে, আমি ভালবেসে ফেলেছি তোমাকে।’

হায়, কী সর্বনাশের কথা! আমার ভাল লাগে আমাদেরই পাড়ার রায়হান ভাইকে, শাড়ি প’রে সেজেগুঁজে রায়হান ভাইয়ের হাত ধ’রে ওর সঙ্গে ঘুরতে বেরুতে ইচ্ছে করে আমার, ওকে জড়িয়ে ধ’রে আদর করতে এবং আদর পেতে ইচ্ছে করে, শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দিতে ইচ্ছে করে ওর মুখের ঘাম, ওর কোলে মাথা রেখে শুয়ে রাত জেগে পাহারা দিতে ইচ্ছে করে পূর্ণিমার চাঁদ! দেহটা পুরুষের হলেও মনে-প্রাণে তো আমি নারী, অথচ অন্য একজন মনো-দৈহিক নারী কিনা বলছে, সে আমাকে ভালবাসে! এখন এই নারীকে আমি কী বলবো! 

ভাবী তার ডানহাত আমার ডানগালে রেখে মুখটা তার দিকে ঘুরিয়ে বললো, ‘কালকের ঘটনার জন্য আমি খুবই লজ্জিত, তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি। ওই ঘটনাকে মনে রেখে তুমি আবার ভেবো না যে, আমি কেবল দৈহিক ক্ষুধা মেটানোর জন্য তোমার ভালবাসা প্রার্থনা করছি, সত্যিই আমি ভালবেসে ফেলেছি তোমাকে। আমার স্বামী-সংসার যেমন আছে থাকুক, কিন্তু তোমার সঙ্গে আমার ভালবাসার গোপন সম্পর্কটা থাকুক না, শাহিন, তাহলে আমি মনে শান্তি পাব। এটা তোমার আর আমার গোপন সংসার, যতোদিন বেঁচে থাকবো যত্ন নেবো এই সম্পর্কের, আগলে রাখবো এই সংসার। আর ভবিষ্যতে তুমি যদি কখনো আমাকে বিয়ে করতে চাও, তবে বর্তমানের এই সাজানো সংসার ছেড়ে আমি তোমার কাছেই চ’লে আসবো। আমার দৈহিক প্রয়োজনে যেমনি তোমাকে প্রয়োজন, তেমনি মানসিক প্রয়োজনেও।’ 

ভাবী আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো আমার মুখ থেকে কিছু শোনার অপেক্ষায় আর আমি তাকিয়ে রইলাম রাস্তার ঢালের ঘাসের দিকে, যেখানে ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে। আমার মৌনতা দেখে ভাবী বললো, ‘কথা বলছো না কেন তুমি?’

‘ভাবছি, কী বলবো।’

‘এতো ভাবাভাবির কী আছে! 

‘তুমি তো কাল দেখলেই আমি শারীরিকভাবে অক্ষম,’ আমি মনের কথাটা না ব’লে কেবল শরীরের কথাটাই বললাম। 

‘ও তেমন কিছু না, প্রথম প্রথম অমনই হয়। আমি অহেতুক উত্তেজিত হয়ে তোমাকে বকেছি। অভ্যস্ত হ’লে ঠিক হ’য়ে যাবে।’ 

ওহ, আমি কী বলবো? আমি কি সব খুলে বলবো ভাবীকে! কিন্তু সব শুনে আবার যদি কালকের মতো রণচণ্ডী রূপ ধারণ করে! ভাবী এবার আমার ডান গালের সঙ্গে তার বাম গাল স্পর্শ ক’রে বললো, ‘প্লিজ শাহিন, আমাকে বোঝার চেষ্টা করো। দেহ-মনের এই জ্বালা আমি আর সইতে পারছি না।’ 

ভাবী তার ঠোঁট দুটো চেপে ধরলো আমার গালে। আমি ভাবীর মাথাটা ধরে সতর্ক করলাম, ‘ভাবী, লোকজন আসতে পারে।’

ভাবী এবার আমার কাঁধে মাথা রেখে বাহুবেষ্টনে আমাকে জড়িয়ে ধরলো, অল্পক্ষণ পরই একটা মোটরসাইকেলের আগমনী বার্তা কানে আসায় ভাবী আমাকে ছেড়ে সোজা হয়ে বসলো। শাঁই ক’রে মোটরসাইকেলটি বেরিয়ে গেল আমাদের পেছন দিয়ে। 

ভাবী পুনরায় আমার কাঁধে মাথা রেখে বামহাত দিয়ে পিঠ জাপটে ধরলো। আমি তাকিয়ে আছি পদ্মার বুকের ওপর দিয়ে শূন্যে আর আমার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে জল। মানুষের ভালবাসা পেলে আমার কান্না পায়। কিন্তু আমাদের সমাজে যে ছেলের স্বভাব মেয়েদের মতো, বেশিরভাগ মানুষ স্নেহ-ভালবাসা দেবার পরিবর্তে তাকে নিয়ে কৌতুক করে, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ক’রে মজা পায়। অথচ একজন নারী আমাকে নিয়ে মজা না ক’রে অসহায়ভাবে আমার ভালবাসা প্রার্থনা করছে, আমার চোখে জল আসবে না তো কি চোখ দিয়ে আগুন ঝরবে! কিন্তু এখন আমি যদি বলি যে ভাবী আমিও তোমাকে ভালবাসি, যতদিন বেঁচে থাকবো তোমার-আমার গোপন প্রণয় অটুট থাকবে। তবে তা মিথ্যে বলা হবে, তার সাথে প্রতারণা করা হবে, প্রতরণা করা হবে নিজের সত্তার সঙ্গেও। প্রতারণা আমি করতে পারবো না, তার চেয়ে ভাবীকে সব খুলে বলাই শ্রেয়। 

আমার দীর্ঘ মৌনতা দেখে ভাবী বললো, ‘কী হলো, তুমি কিছু বলবে না?’

আমি ভাবীর মুখের দিকে তাকালাম; তার হৃদয়ে এখন যে স্বপ্ন-আশা-ভালবাসার দ্বীপ জ্বলেছে, তার রোশনাই ছড়িয়েছে মুখেও; কি ক’রে আমি এখন এই দ্বীপ নিভিয়ে দিই, মুখের রোশনাই ঢেকে দিই অন্ধকারে! কিন্তু দ্বীপ নেভানো ছাড়া তো ভিন্ন কোনো পথও নেই। 

অবশেষে আমি সত্যের পথই ধরলাম, ‘কি বলবো ভাবী, আমিও যে তোমার মতোই নারী!’ 

‘ধ্যাৎ, বাজে কথা ব’লো না!’

‘বাজে কথা নয় ভাবী, সত্যি বলছি, নিজেকে আমি নারী-ই মনে করি।’

ভাবী এবার আমার কাঁধ থেকে মাথা তুলে মুখের দিকে তাকালো, চোখে-কপোলে জল দেখে খানিকটা ধাক্কাও খেল। 

‘কাঁদছো কেন তুমি?’

আমি ভাবীর চোখে চোখ রাখলাম, ‘তোমার ভালবাসা পেয়ে। আমি হয়তো তোমার এই ভালবাসার মূল্য দিতে পারবো না। কিন্তু তোমার এই ভালবাসাটুকু আমার সারাজীবনের সঞ্চয় হ’য়ে থাকবে ভাবী।’

‘মানে?’

‘ওই যে বললাম, আমি নারী। তোমাকে সব খুলেই বলি, আমি তো এসব কথা কারো সঙ্গে শেয়ার করতে পারি না, আমার ভেতরে কথা গুমরে মরে। জানো, সারাক্ষণ আমার শরীরের সাথে মনের ঝগড়া হয়; মন চায় তোমার মতো একটি শরীর। আমারও তোমার মতো শাড়ি পরতে ইচ্ছে করে, গয়না পরতে ইচ্ছে করে, কপালে টিপ পরতে ইচ্ছে করে, চোখে কাজল দিতে ইচ্ছে করে, ভীষণ সাজতে ইচ্ছে করে; আমিও তোমার মতোই এমন একজন পুরুষের স্বপ্ন দেখি যে তার হৃদয় উপুড় ক’রে আমাকে ভালবাসা দেবে, আমিও যাকে হৃদয় উজার ক’রে ভালবাসতে পারবো। সবাই ভাবে আমি মেয়েলি স্বভাবের ছেলে, আমায় নিয়ে হাসাহাসি করে। কিন্তু তুমি বিশ্বাস করো ভাবী, আমার শরীরটা পুরুষের হলেও মনটা নারীর; মনে-প্রাণে আমি একজন নারী।’ 

ভাবী বিস্ময়াবিভূত চোখে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা শুনলো। আমি আবার বললাম, ‘এই কথাগুলো আমি কাউকে বলতে পারি না, জানো, এমনকি আমার পরিবারের কারো কাছেও না। বাবা-মা’র ছেলের স্বপ্ন ছিল, তাইতো প্রথম তিনটি সন্তান মেয়ে হবার পর আবার তারা সন্তান নিয়েছেন। আমাকে পেয়ে তারা নিশ্চয় খুব খুশি হয়েছিলেন, এখনো আমাকে ঘিরেই তারা স্বপ্ন বোনেন। বাবা-মা আঘাত পাবে ব’লে আমি তাদেরকে কিছু বলি না, কিন্তু কোনো একদিন তাদেরকে এই সত্যের মুখোমুখি হতেই হবে। তারা এই আঘাত কি ক’রে সামলাবে আমি জানিনা। বাবা-মার কথা ভেবে আমার ভীষণ খারাপ লাগে। আমি জানি যে বাবা-মা আমার কথা শুনে যতো না আঘাত পাবে আর চেয়ে বেশি আঘাত পাবে পাড়া-পড়শির কথায়। ’ 

আমি অপেক্ষায় ছিলাম ভাবীর প্রতিক্রিয়া কি হয় তা দেখার জন্য, ভাবী খুব স্বাভাবিকভাবে আমার পিঠে স্নেহের হাত রেখে বললো, ‘এটা, বোধহয়, এক ধরনের অসুস্থতা। তুমি বাড়িতে খুলে বলো, তুমি যদি বলতে না পারো আমি বলি। ডাক্তার দেখালে সব ঠিক হ’য়ে যাবে।’ 

‘তোমার মতো আমিও তাই ভাবতাম। ভাবতাম, এটা একধরনের অসুখ; নইলে পুরুষ হয়ে জন্মেছি, অথচ নারীর প্রতি আমার কোনো আসক্তি নেই কেন, কেন পুরুষই আমাকে আকর্ষণ করে। সেজন্যই কিছুদিন আগে গোপনে ডাক্তার দেখিয়েছি। তখনই জানতে পারি যে, এটা কোনো অসুস্থতা নয়, আমার প্রকৃতিই এমন। আমার জৈবলিঙ্গ পুরুষের, কিন্তু আমার মনোলিঙ্গ নারীর।’

একটু থেমে আবার বললাম, ‘জানো, ভাবী, ডাক্তারের কাছে না গেলে আমি বুঝতেই পারতাম না যে, আমাদের শরীরও একটা মহাবিশ্ব; মহাবিশ্বের মতো শরীরেও রয়েছে অসংখ্য গ্রহ-নক্ষত্র, বিচিত্র এর গতি-প্রকৃতি, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া! আমরা সাধারণ মানুষ এসবের কতোটুকুই বা জানতে পারি! এমনকি বিজ্ঞানীরাও প্রতিনিয়ত শরীর ঘেঁটে উদ্ঘাটন করছে নতুন নতুন বিস্ময়কর সব তথ্য। নারী-পুরুষ উভয়ের শরীরেই থাকে পুরুষ হরমোন টেস্টোস্টেরন আর নারী হরমোন এস্ট্রোজেন। পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরন আর নারীর শরীরে এস্ট্রোজেন হরমোন বেশি থাকে। কিন্তু পুরুষের শরীরে যদি নারী হরমোন এস্ট্রোজেনের মাত্রা বেশি হয়, তাহলে তার চেহারায় এবং আচরণে নারীত্ব প্রকট হয়ে ওঠে, আবার একইভাবে যদি নারীর শরীরে পুরুষ হরমোন টেস্টোস্টেরন হরমোন বেশি হয়, তাহলে তার চেহারা এবং আচরণে পুরুষত্ব প্রকট হয়ে ওঠে। এর জন্য সেই পুরুষ বা নারী কোনোভাইে দায়ী নয় এবং এটা কোনো রোগও নয়। কেবল আমিই নই, আমাদের দেশে নাকি বহু মানুষ আছে, যারা পুরুষের দেহ নিয়ে জন্মালেও ভেতরে ভেতরে আসলে নারী। কিন্তু সমাজের অপমান-লজ্জা থেকে বাঁচতে তারা তাদের মনোলিঙ্গের কথা গোপন করে। কেউ কেউ সামাজিকতার জন্য বিয়ে করে, সন্তান হয়; স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এক সাজানো মিথ্যে সংসার ক’রে যায় আজীবন। কেউ কেউ স্ত্রীর সাথে সংসার করলেও শরীরের তাড়নায় গোপনে পুরুষের সাথে শারীরিক সম্পর্কে জড়ায়। আবার এর উল্টোটাও আছে অনেকে নারীর শরীর নিয়ে জন্মায় কিন্তু তার মনোলিঙ্গ পুরুষের। এটা অসুস্থতা নয়, কিছু মানুষের প্রকৃতিই এমন হয়, আমিও তাই।’

আমি নদীর দিকে তাকিয়ে কথা বলছিলাম, হঠাৎ ভাবীর দিকে মুখ ফেরাতেই দেখলাম তার দু-চোখ থেকে জলের ধারা নামছে কপোল বেয়ে। ভাবীর হাতের মধ্যে আমার ডান হাত, বললাম, ‘ভাবী!’

ভাবী আমার হাত ছেড়ে দুইহাতে নিজের মুখ ঢেকে হু হু ক’রে কেঁদে উঠলো। আমি অশ্রুসিক্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। ভাবীর নারী হৃদয় আহত হয়েছে, তার স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে; এ তার স্বপ্নভঙ্গের কান্না। কাঁদুক, কেঁদে বুকের ভার নামাক। 

বেশ কিছুক্ষণ পর আমি ভাবীর মাথায় হাত রাখলাম, ‘ভাবী।’

ভাবী মুখ তুলে তার অশ্রুভেজা চোখ আমার চোখে রাখলো, ‘আমি না জেনে তোমার সঙ্গে সত্যিই খুব অন্যায় করেছি, এখন নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে।’ 

‘প্লিজ, ভাবী, এভাবে ব’লো না। তোমার কষ্টটাও আমি বুঝতে পারি।’

‘শাহিন, তোমার প্রতি আমার যে ভালবাসা জন্মেছে, তা তো মিথ্যে নয়, ফুরাবারও নয়। আজ থেকে তুমি আমার সই; যে গোপন দুঃখ-ব্যথা আমরা কারো কাছে প্রকাশ করতে পারি না, তা একে অন্যের সাথে ভাগ ক’রে নেব। আমরা একে অন্যের সুখের ভাগীদার যেমনি হবো, তেমনি দুঃখও ছোব!’

আমি ভাবীর চোখের দিকে তাকালাম, সেখানে স্বপ্নভঙ্গের হতাশা নেই, আছে আমার জন্য অকৃত্রিম মমতা। ভাবী বামহাত দিয়ে আমার কাঁধ জড়িয়ে ধরে মাথায় মাথা ঠেকালো, আমিও ডানহাতে ভাবীকে জড়িয়ে ধরলাম; একজন চৈত্তিক-দৈহিক নারী আর আরেকজন কেবল চৈত্তিক নারী সই পাতিয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে, গালে গাল ঠেকিয়ে, একে অন্যের নিগূঢ় ব্যথা স্পর্শ ক’রে সময়ের হিসাব ভুলে কল্লোলিত পদ্মার দিকে তাকিয়ে বসে রইলাম! 

(চলবে)