১৬ নভেম্বর, ২০১৬

সাইমুম (উপন্যাস: পর্ব ১২)

লিখেছেন উজান কৌরাগ


ভার্সিটিতে যাচ্ছি, মিরপুর ১০ থেকে বাসে উঠে টেকনিক্যালে নেমেছি, তারপর ভার্সিটির বাস এলে তাতে উঠে বসেছি একদম পিছনের সিটে। আমি টেকনিক্যাল থেকে উঠি ব’লে বেশিরভাগ দিনই বসার সিট পাই না। যেদিন পাই সেদিন একটু সুবিধে হয়, ঘুম না হলেও চোখ বুজে থাকি, একধরনের আরামদায়ক তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব আসে। বসে গেলে চোখে এবং মস্তিষ্ককে একটু আরাম পাওয়া যায়; কিন্তু দাঁড়িয়ে গেলে আর তা হয় না, দাঁড়নো অবস্থায় চোখ বুজে থাকলে অন্যরা মজা করে আর হাসে। 

বাস এখন গাবতলী ব্রিজের ওপর। তুরাগের বুকের আয়নায় মুখ দেখছে সদ্য ওঠা লালচে সূর্য। এই জায়গায় তুরাগকে সারাক্ষণ ব্যতিব্যস্ত রাখে মানুষ আর যন্ত্র। দিবারাত্রি বালি-পাথর ভর্তি কার্গো জাহাজ এবং লঞ্চ এখানে নোঙর করে, আবার এখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার চতুর্দিকে; ঢাকার ভেতরে এবং আশ-পাশে বালি-পাথর নেওয়া হয় ট্রাকে। মানুষের লোভ সম্প্রসারিত হচ্ছে, লোভের চাপে ব্রিজের দু’পাশ থেকে ক্রমশ ছোট হচ্ছে তুরাগ, বালি ভরাট ক’রে গড়ে উঠছে ট্রাকস্ট্যান্ড। কে জানে, আমাদের উত্তরপুরুষ তুরাগকে দেখতে পাবে কি না, তারা হয়তো তুরাগের কথা পড়বে বইয়ের পাতায়! 

ব্রিজ পার হয়ে ছুটে চলেছে বাস। এতোক্ষণ ভ্যাপসা গরম লাগলেও এখন বেশ স্বস্তি লাগছে জানালা দিয়ে ঢোকা ডানপিটে বাতাসে। আমি চোখ বন্ধ করলাম। কাল রাতে শুতে দেরি হওয়ায় ঘুম কম হয়েছে, চোখের পাতায় এবং মগজে দারুণ আরাম বোধ হচ্ছে এখন। আর এই আরামদায়ক অনুভূতির ভেতরেই হঠাৎ ফিরে এলো দাদার স্মৃতি। দাদা মারা গেছেন চোদ্দ বছর হলো, আমার বয়স তখন দশ। আজকে দাদার মৃত্যুবার্ষিকী, বাসার সবাই মিরপুর কবরস্থানে গেছে দাদার কবর জিয়ারত করতে; আমি যাইনি। গত চার বছর যাবৎ আমি পরিবারের সঙ্গে দাদার কবর জিয়ারত করতে যাই না। মুসলিমদের কবর জিয়ারত করার ব্যাপারটা বেশ স্ববিরোধী। মুহাম্মদ যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন তার দুই স্ত্রী উম্মে হাবীবা এবং উম্মে সালামা তার কাছে মারিয়া নামক গীর্জার বর্ণনা করেছিলেন, যে গীর্জার ভেতরে মৃত মানুষের মূর্তি এবং ছবি ছিল; যা তারা দেখেছিলেন হাবশায় প্রবাসী থাকাকালীন। দুই স্ত্রীর মুখে গীর্জার বর্ণনা শুনে মুহাম্মদ যা বলেছিলেন, হাদিস অনুযায়ী তা এরকম, ‘আল্লাহ ইহুদী এবং খ্রিষ্টানদের প্রতি লা’নত বর্ষণ করুন, কারণ তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদ এবং সিজদার স্থান ক’রে নিয়েছে। কিয়ামতের দিন এরা হবে মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট সৃষ্টি।’ 

হাদিস ঘাঁটলে জানা যায় যে, মৃতের কফিনে বা কবরে সিজদা করা, পূজা করা, ফুল দেওয়া, মোমবাতি বা ধুপকাঠি জ্বালানো, লোবান দেওয়া বা অন্য কোনো প্রকারে মর্যাদা বা সম্মান দেওয়া শিরক এবং বেদাত। তবে শুধুমাত্র জিয়ারত করা বা দোয়া-খায়েরের জন্য কবরে যাওয়া জায়েজ। স্ববিরোধিতার ব্যাপারটা এখানেই, যখন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা মৃত ব্যক্তির সমাধিতে গিয়ে ফুল দিয়ে বা অন্য কোনোভাবে সম্মান জানায়, তখন মুসলমানরা সেটাকে পূজা করা বলে। মুহাম্মদ তাদের ধ্বংস কামনা ক’রে তাদেরকে আল্লাহর নিকৃষ্ট সৃষ্টি ব’লে আখ্যা দিয়েছেন। অথচ মুসলমানরা কবরের সামনে দাঁড়িয়ে জিয়ারত করলে কিংবা দোয়া পড়লে সেটা পূজা নয়, কেন? অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের কবরে সম্মান জানানোটা যদি পূজা হয়, তবে মুসলমানদের কবর জিয়ারত করাও নিশ্চয় এক ধরনের পূজা, রীতিটা কেবল আলাদা। তাছাড়া মাজারের কথা নাহয় বাদই দিলাম, এখন কবরও খ্রিষ্টানদের সমাধির মতো পাকা ক’রে বাঁধানো নয়। কবরেও ধুপকাঠি জ্বালানো হয়, ফুল দেওয়া হয়। স্বয়ং মুহাম্মদের কবরও জিয়ারত করছে তার কোটি কোটি অন্ধ ভক্ত। এসবই মুসলিমদের স্ববিরোধিতা। অন্যরা যা করছে, সেটা ভাল নয়, খুব খারাপ; আমি যেটা করছি, সেটাই সর্বোৎকৃষ্ট ভেবে অন্যদের ধ্বংস কামনা করার প্রবল মানসিকতা থেকেই জন্ম হয় সহিংসতা-সংঘর্ষের। এই মানসিকতা থেকেই মুসলমান মানসে সৃষ্টি হয় সাইমুম, আর সময়ে-অসময়ে তা আছড়ে পড়ে ভিন্নমতাদর্শীদের ওপর।

গত চার বছর যাবৎ আমি দাদার মৃত্যুবার্ষিকী পালন করি আমার মতো ক’রে। সেখানে কোনো ধর্মীয় রীতি-নীতি বা অনুশাসন থাকে না, থাকে ভালবাসা-শ্রদ্ধা। মৃত্যুবার্ষিকীর দিন বিকেলে একগুচ্ছ ফুল নিয়ে আমি একা যাই কবরস্থানে; দাদার কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাই, দাদার সঙ্গে একান্তে কথা বলি, তার গন্ধ-স্পর্শ অনুভব করি। আত্মা, পরকাল এসবে আমি বিশ্বাসী নই; কিন্তু তারপরও আমি যাই এজন্য যে, আমি মনে করি মৃতের কবরে শ্রদ্ধা জানানো যেতেই পারে। দাদা ছিলেন বলেই আমি আছি, তাই দাদার প্রতি কৃতজ্ঞতাবশত আমার এই শ্রদ্ধাজ্ঞাপন। আমি আজও যাব, বিকেল আর সন্ধ্যাটা কাটিয়ে আসবো কবরস্থানে।

বিকেলে ক্লাস শেষে ফেরার পথে ভার্সিটির বাস থেকে নেমে পড়লাম গাবতলীতে, মাজার রোডের মাথায়। রিক্সাযোগে এসে নামলাম কবরস্থানের গেটে। পিঠে বইয়ের ব্যাগ আর হাতে একগুচ্ছ সাদা এবং হলুদ গোলাপ নিয়ে এখন আমি হাঁটছি কবরস্থানের রাস্তা ধ’রে। লোকজন খুব একটা নেই। আলাদা দুটো কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তিনজন মানুষ জিয়ারত করছেন। তাদের থেকে সামান্য তফাতেই একটি বাঁধানো কবরের ওপর গোলাপ এবং রজনীগন্ধার ম্রিয়মাণ পাপড়ি ছড়ানো রয়েছে। অন্য একটি কবরের পাশে শুকিয়ে যাওয়া একটি ফুলের তোড়া। কোরান-হাদিস অনুযায়ী এই পুষ্পাঞ্জলি নিঃসন্দেহে শরীয়ত বিরোধী কাজ। হয়তোবা না জেনেই প্রয়াত লোকটির স্বজন-প্রিয়জনেরা শ্রদ্ধাভরে তার কবরের ওপর পুষ্পাঞ্জলি করেছে। এই যে প্রিয়জনেরা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে গেছে তাদের এক সময়ের খুব কাছের একজন মানুষের কবরে; জীবদ্দশায় এই মানুষটি প্রিয়জনদেরকে ভালবেসেছে, স্নেহের পরশ বুলিয়েছে সন্তানের গায়ে, আদর বুলিয়েছে প্রেয়সীর গালে; তো সেই প্রিয় মানুষটির কবরে ফুলের মতো সুন্দর বস্তু দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো কি কখনো খারাপ কাজ হতে পারে! যে বলে এটা খারাপ কাজ, শরিয়তবিরোধী কাজ; সে এক হৃদয়হীন পাষণ্ড! যে পুস্তকে লেখা এই শরিয়ত, নিকুচি করি আমি সেই পুস্তক! 

হাঁটতে হাঁটতে দাদার কবরের কাছে পৌঁছে গেলাম। দাদার কবরটা রাস্তা থেকে খানিকটা ভেতরের দিকে, বেশ সুনসান জায়গায়। সামান্য তফাতেই একটা নিমগাছ। সাদা টাইলস-এ বাঁধানো দাদার কবরটি চকচক করছে। কবরের ওপর কোনো ফুলের পাপড়ি বা ফুল নেই; আছে কয়েকটি ঝরে পড়া নিমপাতা। ইসলাম ধর্মমতে কবরে ফুল দেওয়া যে বেদাত, তা আমার পরিবার জানে, এ জন্যই তারা কবরে এসে শুধুই জিয়ারত ক’রে চ’লে যায়। কিন্তু গত চার বছর ধ’রে আমি কবরস্থানে আসার সময় একগুচ্ছ ফুল নিয়ে আসি দাদার কবরে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। ফুল আমার খুবই প্রিয়, ফুলের ব্যবহার আমি পছন্দ করি; হোক তা জীবিত মানুষের হাতে কিংবা খোঁপায়, মৃত মানুষের শয্যায়-কফিনে কিংবা কবরে-সমাধিতে। 

নিস্তেজ সূর্য এখন হেলে পড়েছে পশ্চিমে। এদিকের কবরগুলোর ওপর মাতৃস্নেহের মতো গাছের নিবিড় ছায়া পড়েছে। আমি কাঁধের ব্যাগ মাটিতে নামিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে দাদার কবরের ওপর ফুলের গুচ্ছ রেখে কবর স্পর্শ করলাম, হাত বুলাতে লাগলাম কবরে। দাদার কবরে হাতের পরশ বুলাতে বুলাতে আমি আমার সারা গায়ে দাদার হাতের স্পর্শ অনুভব করলাম যেন! দাদা প্রায়ই আমার সারা গায়ে গ্রাম থেকে আনা ঘানি সরিষার তেল মালিশ ক’রে দিতেন স্নানের আগে। সেই স্পর্শের অনুভূতি, সেই ঘানি সরিষার তেল আর দাদার গায়ের গন্ধ, সেই ছবি এখনো আমার স্মৃতিতে সজীব। আসলে আমি তার ছেলের ঘরের প্রথম নাতি ব’লে দাদা আমাকে সবার চেয়ে বেশি ভালবাসতেন। এটা নিয়ে আমার চাচী বেশ মনঃক্ষুণ্ণও ছিলেন। 

ব্যাগে কিছু গোলাপের পাপড়ি এনেছি, সেখান থেকে দু-মুঠো পাপড়ি নিয়ে ছড়িয়ে দিলাম দাদার কবরের ওপর আর অবশিষ্ট পাপড়িগুলো রেখে দিলাম ব্যাগে। আমি দাদার কবর স্পর্শ ক’রে বসে আছি। মনে মনে কথাও বলছি দাদার সঙ্গে, অনেক কথা! কেবল দাদার মৃত্যুবার্ষিকীতেই নয়, প্রায়ই আমি কবরে আসি, ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন শ্মশানেও যাই। কবর কিংবা শ্মশানে মানুষের প্রায়ই আসা উচিত, একা। তাহলে জীবনটা একটু অন্যভাবে উপলব্ধি করা যায়, এই উপলব্ধিটা আসলে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। ব্যাপারটা বিমূর্ত শিল্পের মতো, কেবল অনুভব করাই ভাল, ব্যাখ্যা করতে যাওয়াও বোকামি। 

আশপাশের গাছগুলোয় পাখি ডাকছে, দু'-একটা চড়ুইপাখি গাছের ডালে নাচতে নাচতে হঠাৎই নিচে নেমে বসছে কোনো বাঁধানো কবর কিংবা বাঁশের বেড়ার ওপর। নিমডালের একটা ঝুলে পড়া ডালের আগার দিকে বসে ঈষৎ ঘাড় নেড়ে যেন বা দার্শনিক ভাবনায় মগ্ন একটা হলদে পাখি! হঠাৎ একপশলা বাতাস ছুঁয়ে গেল নিমগাছ, বাঁধানো কবরগুলো আর আমাকে; উড়ে গেল হলদে পাখিটা। আচমকা আমি নিজেই যেন হলদে পাখি হয়ে গেলাম! কালের গায়ে ঠেস দিয়ে হলদে পাখি হয়ে আমি উড়ে গেলাম মহাকালের শরীর বেয়ে অতীতের দিকে! আমি উড়ছি, আমি উড়ছি... ক্রমাগত উড়ছি গ্রাম, উপশহর, শহরের ওপর দিয়ে; কতো জনপদ, কত খালবিল, নদী-নালা পেরিয়ে, মেঘ ফুঁড়ে আমি উড়েই চলেছি; কতো জনপদের ওপর পড়ছে আমার ছায়া, কতো নদী বা বিলের ওপর প্রতিবিম্ব! উড়তে উড়তে আমি পৌঁছলাম চর্তুদশ শতকের প্রাচীন নগর শ্রীহট্টে, শ্রীহট্টের আকাশে চক্কর মারতে মারতে একটি নদীতে দৃষ্টি পড়তেই আমি ভীষণ তৃষ্ণা অনুভব করলাম। তৃষ্ণা মেটাতে অবতরণ করলাম নদীটির পারে, সুরমা নদী; সুরমার জলে ঠোঁট ডুবিয়ে জলপান করতেই আবার আমি মানুষ হয়ে গেলাম! জলের ওপর ঝুঁকে বেশ কিছুক্ষণ ধরে দেখলাম নিজের প্রতিবিম্ব! সুরমার শীতল জল আঁজলায় তুলে পুনরায় পান করলাম আর মুখমণ্ডলে জল ছিটিয়ে জলের কাছে সঁপে দিলাম ক্লান্তি। তারপর নদীর ঢাল বেয়ে উঠে হাঁটতে শুরু করলাম সুরমা পারের পোড়া ইটের রাস্তা ধরে। হাঁটতে হাঁটতে থমকে দাঁড়ালাম একটা নৌবন্দরের কাছে এসে। বন্দরে অনেকগুলো নৌকা; ছোট, মাঝারি এবং বৃহৎ বাণিজ্য-নৌকা। মানুুষেরা নৌকায় মালামাল তুলছে-নামাচ্ছে; কিছু নৌকা বন্দরে নোঙর করছে, আবার কিছু বন্দর ছেড়ে যাচ্ছে। আমি আবার হাঁটতে শুরু করলাম বন্দর পেছনে ফেলে। লাল ইট বাঁধানো প্রশস্ত রাস্তার একদিকে বসতি, কোথাও ছোট-বড় ইমারত কোথাও বা মাটির ঘর; অন্যদিকে সুরমা নদী। সুরমা পারের একটা প্রাচীন বটগাছের নিচে এসে দাঁড়ালাম, পাশেই একটা ভাঙা মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, ধ্বসে পড়া ছাদ আর দেয়ালের ইটে স্যাঁতার অরণ্য। মন্দিরটার সামান্যই অবশিষ্ট আছে তবু তারই ভেতর থেকে ডানপিটে বালক-বালিকার মতো মাথা উঁচু ক’রে দাঁড়িয়েছে একটি অশ্বত্থ আর দু'টি বটের চারা। কেউ বা কারা ভাঙা দেয়ালের স্যাঁতাপড়া ইটে সিঁদুরের ফোঁটা দিয়ে রেখেছে, যা দেখেই কেবল অনুমান করা যায় যে এটা একটা মন্দির ছিল। হঠাৎ আমার দৃষ্টি পড়লো নদীর ঢাল বেয়ে উঠে আসা একজন মানুষের দিকে; কৃষ্ণবর্ণ তার শরীর, গায়ের রঙ আমার মতো উজ্জ্বল নয়, কালো। মাথায় কাঁচা-পাকা চুল, শ্মশ্রুমুণ্ডিত মুখ। মাঝারি গড়নের উদোম শরীর, পরনে মলিন লুঙ্গি। চোখে বিষাদমাখা উদাসীনতা। কাছে এসে অপলক চোখ রাখলেন আমার দিকে, আমিও তার চোখে চোখ রাখলাম। তাকে চিনতে পেরে আমি হতবাক, আবেগাপ্লুত! কী ক’রে কথা শুরু করবো, কোথা থেকে শুরু করবো, বোধগম্য হচ্ছে না! তিনি আমার পূর্বপুরুষ, দু'চোখ মেলে আমি কেবল তাকিয়ে আছি আমার পূর্বপুরুষের দিকে, যার শরীরের জিন-সেল মাঝখানের অনেক পুরুষের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বইছে আমার শরীরে। আমি তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকি মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত। তার নাকটা অবিকল আমারই মতো বড়, ভ্রু আর চোখেও দারুণ মিল, চিবুকের টোল একইরকম! তার ঠোঁট দুটো যেন আমার বাবার ঠোঁট, চুলগুলোও বাবার মতো; তার মেদহীন শরীর, চিকন হাত বেশ লম্বা, হাত-পায়ের আঙুলগুলো সরু; ঠিক আমার বাবা-চাচার মতো! তার বাম বাহুতে বেশ বড় একটি কাটা দাগ। তিনিও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন আমাকে, হয়তো আমারই মতো সাদৃশ্য খুঁজছেন। তার কন্ঠস্বর শোনার আকুলতায় নীরবতার অদৃশ্য আব্রু সরিয়ে বললাম, ‘কেমন আছেন?’ 

তিনি আমার কথার উত্তর দিলেন না, ছলছল চোখে এমনভাবে তাকিয়ে রইলেন, যেন ত্বক ভেদ ক’রে তিনি আমার শরীরের অভ্যন্তর দেখছেন! আমি পুনরায় প্রশ্ন করলাম, ‘আমাকে চিনতে পেরেছেন?’

এবার তিনি মৃদুভাবে হ্যাঁ-সূচক ঘাড় নাড়লেন, মুখে কিছু বললেন না। কথা বলছেন না দেখে আমি বোঝার চেষ্টা করলাম আমার এই পূর্বপুরুষ বোবা ছিলেন কি-না। তার চোখে জোয়ারের পূর্বাভাস, নিমীলিত ঠোঁটে প্রভূত আনন্দের হাসি। তিনি নীরবে দু'হাত বাড়িয়ে আমাকে বুকে টেনে নিলেন। আমি মাথা পেতে তার বুকের স্পন্দন শুনলাম, তার শরীরের ঘ্রাণে নাক গুঁজে রাখলাম। আরে, এ যে চেনা স্পর্শের অনুভূতি, চেনা ঘ্রাণ! আমার বাবা আর দাদার স্পর্শের অনুভূতি আর তাদের গায়ের ঘ্রাণের মতোই! আমি আমার মগজের কোষে কোষে সঞ্চয় করলাম তার শরীরের গন্ধ-স্পর্শ। তার চোখ থেকে একফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়লো আমার ঘাড়ে। বেশ কিছুক্ষণ তার বুকে মুখ গুঁজে থাকার পর আমি মুখ তুলে তাকালাম তার দিকে, এরই মধ্যে আমার দু'চোখ থেকে জল গড়িয়ে নেমেছে গাল বেয়ে, তিনি ডান হাতের পরশে আমার চোখের জল মুছিয়ে দিলেন, আমার মাথায়-মুখে-বুকে-কাঁধে হাতের স্নেহস্পর্শ বুলিয়ে বললেন, ‘কেঁদো না।’

আমি এতোক্ষণে নিশ্চিত হলাম যে তিনি বোবা নন, কথা বলতে পারেন। কিছুটা অভিমানের সুরে বললেন, ‘এতোকাল পর এই প্রথম আমার কোনো উত্তরপুরুষ তার পূর্বপুরুষের কথা ভাবলো!’

বললাম, ‘এর আগে আর কেউই ভাবেনি?’

‘না, ভাবেনি। আমার উত্তরপুরুষেরা তাদের পূর্বপুরুষের কথা স্মরণ করার চেষ্টা করেনি। ওরা কেবল ওদের সৃষ্টিকর্তা, নিজের আর পরিবারের জীবন্ত মানুষগুলোকে নিয়েই ভেবেছে। যেন ওদের কোনো পূর্বপুরুষ ছিল না, ওরাই ওদের বংশের গোড়াপত্তন করেছে! অনেক বেশরিয়তী কর্ম ক’রেও প্রতিনিয়ত সহি মুসলমান হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে। তুমি কেন পূর্বপুরুষদের সন্ধান করছো?’ 

‘আমি ইতিহাসবিস্মৃত হতে পারিনি, নিজের শিকড় অনুসন্ধান করবার অদম্য কৌতূহল আমার মধ্যে বিদ্যমান। আমি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি আমার সেইসব পূর্বপুরুষকে, যারা জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য ক’রে, অনেক লড়াই-সংগ্রাম ক’রে জীবনটাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন বার্ধক্যের দিকে।’ 

তিনি বিড়বিড় করতে লাগলেন, ‘ইতিহাস, শিকড়, ইতিহাস! বড় নির্মম, বড় নিষ্ঠুর!’ 

তারপর স্পষ্টভাবে বললেন, ‘আমারই উত্তরপুরুষেরা বারবার আঘাত করেছে আমার সেইসব স্বজনের উত্তরপুরুষকে, যারা শ্রীহট্ট থেকে পালাতে পেরেছিল, যাদেরকে ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হতে হয়নি। কী নির্মম পরিহাস! একই রক্তের একটি ধারা আরেকটি ধারাকে হত্যা করছে! হায়, আমার উত্তরপুরুষরা আজ ইতিহাসবিস্মৃত, শিকড়চ্যূত!’

‘আপনার স্বজনেরা পালিয়েছিল কেন?’

‘না পালালে যে আমার আরো অনেক স্বজনের মতো হয় ওদেরকে তরবারির আঘাতে মরতে হতো, নয়তো ইসলাম গ্রহণ করতে হতো।’ 

‘তরবারি! আমি যে শুনেছি ভারতবর্ষে শান্তিপূর্ণভাবে সূফীদের অলৌকিক ক্রিয়া, তাদের মুখে ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃতের কথা, শান্তির বার্তা শুনে মানুষ মুগ্ধ হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে!’

আমার এই কথায় মুহূর্তে তার চোখ-মুখের ভাষা বদলে গেল, উত্তেজনায়-আক্রোশে দু'হাত দিয়ে নিজের মাথার চুল টানতে লাগলেন, তারপর ভগ্ন মন্দিরের দেয়ালে পরপর সজোরে কয়েকটি ঘুষি দিয়ে মাথা ঠুকতে ঠুকতে বলতে লাগলেন, ‘মিথ্যে কথা, মিথ্যে কথা, ডাহা মিথ্যে কথা!’

আমি দ্রুত তাকে জাপটে ধরলাম। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন আর কান্না-জড়ানো গলায় বারবার বলতে লাগলেন, ‘মিথ্যে কথা, ডাহা মিথ্যে কথা!’

বেশ কিছুক্ষণ আমি তাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে রাখলাম। তারপর তিনি নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে চোখ-মুখের জল মুছলেন। কিছুটা শান্ত হলে আমি বললাম, ‘আমি সত্যটা আপনার কাছ থেকে জানতে চাই।’

তিনি তার বাম বাহুর দাগটি দেখিয়ে বললেন, ‘দেখ, এটা তরবারির কোপের দাগ।’

আমি দাগের ওপর আলতোভাবে হাত বুলাতে লাগলাম। বললাম, ‘কে কোপ মেরেছিল?’

‘ভারবর্ষের শ্রেষ্ঠ সুফিসাধক নিজামুদ্দিন আউলিয়ার যোগ্য শিষ্য, বঙ্গের শ্রেষ্ঠ সুফিসাধক, তোমাদের শান্তিকামী মহান সুফীসাধক হযরত শাহ্ জালাল।’

আমি আঁৎকে উঠলাম, ‘হযরত শাহ্ জালাল!’ 

‘হ্যাঁ, হযরত শাহ্ জালাল।’

আমি বিস্ময়ে তাকালাম তার মুখের দিকে, তিনি আমার পূর্বপুরুষ, আমি তাকে অবিশ্বাস করতে পারি না। আবার হযরত শাহ্ জালাল যে তাকে তরবারির আঘাত করেছে, একথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। যে শাহ্ জালালের নামে বিশাল মাজার হয়েছে, কোটি কোটি ভক্ত তাকে অহিংস সুফিসাধক জেনে তার মাজারে আসে শ্রদ্ধা জানাতে-মানত করতে, যার সম্পর্কে কেবলই ভাল ভাল কথা শুনেছি, সেই সুফিসাধক হযরত শাহ্ জালাল হাতে তরবারি তুলে নিয়েছিলেন! 

‘তাহলে হযরত শাহ্ জালাল সম্পর্কে যেসব কথা শুনতে পাই তা কি...।’

‘সব মিথ্যে, বানানো কথা।’

রাস্তার পাশের সবুজ ঘাস দেখিয়ে আমি তাকে বললাম, ‘চলুন, ওখানে গিয়ে বসি। আমি শুনতে চাই সেসব কথা।’

দু’জনে পাশাপাশি হেঁটে গিয়ে বসলাম ঘাসের ওপর। তিনি সুরমার বুকে দৃষ্টি ছুড়ে বলতে শুরু করলেন, ‘তখন আমাদের শ্রীহট্টের রাজা ছিলেন গৌরগোবিন্দ। গৌড়ের সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহ’র নির্দেশে তার ভাতিজা সিকান্দার খান গাজী দু'বার আমাদের রাজ্যে হামলা চালিয়েছিল, রাজ্যের কিছু ধন-প্রাণের ক্ষয়ক্ষতি হলেও হামলাকারীরা দু'বারই পরাজিত হয়েছিল আমাদের রাজ্যের বাহিনীর কাছে। সুলতানের প্রধান সেনাপতি নাসিরুদ্দিন তৃতীয়বার যখন আমাদের রাজ্যে হামলা চালায়, তখন আমার বয়স তেরো। নিজামুদ্দিন আউলিয়ার আদেশে এই হামলায় নাসিরুদ্দিনের পক্ষে যুদ্ধ করতে তিনশো ষাট জন অনুসারীসহ শ্রীহট্টে এসেছিল শেখ শাহ্ জালাল। দু-পক্ষে তুমুল যুদ্ধ হয়। চারদিকে খবর রটে যায় যে সুলতানের পক্ষে যুদ্ধ করতে দিল্লী থেকে শেখ শাহ্ জালাল নামে এক অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন যোদ্ধার নেতৃত্বে একদল দুর্ধর্ষ যোদ্ধা এসেছে, যাদের পরাজিত করা অসম্ভব! রাজা গৌরগোবিন্দের বাহিনীকে তারা কচুকাটা করছে। রাজ্যের পরাজয় আসন্ন ভেবে অনেকেই তখন পরিবার-পরিজন নিয়ে ধর্ম এবং জীবন বাঁচাতে পালিয়ে যেতে শুরু করে আসাম আর কামরূপের জঙ্গলের দিকে, অনেকে শ্রীহট্ট ছেড়ে অন্য কোথাও। আবার অনেকেই রয়ে যায় এই আশায় যে আগের দু'বার সুলতানের বাহিনী পরাজিত হয়েছে, নিশ্চয় এবারো হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয় আমাদের রাজা গৌরগোবিন্দ। রাতের অন্ধকারে ঘরবাড়ি নিরীহ মানুষের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয় সুলতানের বাহিনী, পুরুষদের নির্বিচারে হত্যা করে; বন্দী করে নারী ও শিশুদের। 

আমাদের পাড়ায় আক্রমণ করেছিল শাহ্ জালাল আর তার কিছু অনুসারী। তখন প্রায় সন্ধে, সাড়া পাড়ায় দাউ দাউ ক’রে আগুন জ্বলছে; মানুষের চিৎকার, কান্নাকাটি, আহাজারি ভাসছে বাতাসে। আমি তখন বাবার সাথে হাট থেকে ফিরছিলাম, পথেই শাহ্ জালালের বাহিনীর সামনে পড়ে যাই। একজন বাবাকে কোপ দিতে গেলে আমি ভয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরি, কোপটা লাগে আমার বাম বাহুতে। গলগল ক’রে রক্ত বেরোতে থাকে কাটা বাহু থেকে। অন্য একজন আমার চুলের মুঠি ধরে আমাকে বাবার কাছ থেকে আলাদা করে, তারপর এক তরবারির এক কোপে বাবার ধর থেকে মাথাটা আলাদা ক’রে দেয়, ছিটকে ধুলোর মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়ে বাবার মাথাটা। আমি আর্তচিৎকার ক’রে ওঠায় বাবার খুনি আমার দিকে তরবারি তুলতেই হাতের ইশারায় তাকে বাধা দেয় সে, যার তরবারির কোপ লেগেছিল আমার বাহুতে। দুর্বোধ্য ভাষায় সে কিছু একটা বলে, যা আমি বুঝতে পারিনি। এরপর আমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে আগে থেকেই আমার মতো অনেক কিশোর, শিশু, নারী ও পুরুষ ছিল। আমার মতো যারা আহত ছিল, তাদের হাতে কবিরাজি ওষুধ লাগিয়ে কাপড়ে বেঁধে দেওয়া হয়। আমাদেরকে জানানো হয় ইসলাম গ্রহণ করলে আমরা প্রাণে বাঁচতে পারবো, অন্যথায় আমাদেরকে হত্যা করা হবে। দু'দিন পর আমাদের মুসলমান হিসেবে দীক্ষিত করা হয়। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ ক’রে প্রাণে বেঁচে গেলাম; কানাই মণ্ডল থেকে আমি হলাম মোহাম্মদ কলিমুদ্দি।

যার তরবারির আঘাতে আমার বাহুতে ক্ষত হয়েছিল, তার কাছেই আমরা কেবল কলেমা পড়ে ইসলামে দীক্ষিত হই। সেদিন একসঙ্গে বহু মানুষকে ইসলামে দীক্ষিত করা হয়েছিল, তাই কাউকেই খৎনা করা হয়নি; শুধুমাত্র শেখানো কলেমা মুখে মুখে বলেই আমরা মুসলমান হই।’ 

এ পর্যন্ত ব’লে তিনি থামলেন, ছলছল চোখে উদাসীন দৃষ্টি আকাশে ভাসিয়ে কয়েক মুহূর্ত পর বললেন, ‘আমার পূর্বপুরুষেরা সনাতন ধর্মাবলম্বী, আমার উত্তরপুরুষেরা খৎনা করা মুসলমান; মাঝখানে আমি দাঁড়িয়ে খৎনাবিহীন এক মুসলমান, আমিও সনাতন ধর্মাবলম্বী ছিলাম জীবনের প্রথম তেরো বছর। আমি এক অভিশপ্ত মানুষ, আমি আমার পূর্বপুরুষ এবং উত্তরপুরুষ থেকে বিচ্ছিন্ন; মুসলমান হওয়ার পর থেকে আমি পূজাপার্বণ করতে পারিনি, আবার মুসলমান হয়ে ঠিকমতো নামাজপড়া-কলেমা পড়াও শিখতে পারিনি। আমি নিঃসঙ্গ। সারা জীবন আমি কেবলই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেরিয়েছি, আমার জীবনেই কেন এমন দুর্ঘটনা ঘটলো? কেন আমাকেই এতো রক্তপাত, স্বজনের মৃত্যু দেখতে হলো, আমার আগের কিংবা পরের কোনো পুরুষের ক্ষেত্রে এমন দুর্ঘটনা ঘটলো না!’ 

তিনি উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকেন শূন্যে, আমি ঝাপসা চোখে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি। আমার কানে বাজতে থাকে তার বলা শেষ কথাগুলো আর চোখের সামনে ভাসতে থাকে শাহ্ জালালের মাজার, অসংখ্য ভক্তের ভিড়; তাদের মানত, মোমবাতি-আগরবাতি প্রজ্জ্বলন, ভক্তি-শ্রদ্ধার কতোরকম দৃশ্য; অথচ তারা জানেও না যে, যাকে তারা এতো ভক্তি-শ্রদ্ধা করছে, তারই হাতে নির্যাতিত, খুন এবং বলপূর্বক ধর্মান্তরিত হয়েছে তাদেরই পূর্বপুরুষ-নারীরা। আমার চোখের সামনে ভাসে সিলেট শাহ্ জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। যে সুফি একজন গোঁড়া-ধর্মান্ধ-হিংস্র মুসলিম, যে সুফি ইসলামের সাম্রাজ্য বিস্তারে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল, যে সুফি ইসলামী শিক্ষা ব্যতীত অন্য কোনো শিক্ষার কথা ভাবতেও পারেনি; তার নামেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়! দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নামকরণও হয়েছে তারই নামে! হায় রে, ইতিহাসের গায়ে পরিহাসের নিষ্ঠুর আলখাল্লা!

(চলবে)