২৩ নভেম্বর, ২০১৬

খায়বার যুদ্ধ - ১৯: লুটের মাল ভাগাভাগি - নাটা ও শিইখ অঞ্চল!: কুরানে বিগ্যান (পর্ব-১৪৮): ত্রাস, হত্যা ও হামলার আদেশ – একশত বাইশ

লিখেছেন গোলাপ

(আগের পর্বগুলোর সূচী এখানে)

"যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।"

স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) খায়বারের জনপদবাসীদের তিলে তিলে সঞ্চিত গচ্ছিত স্থাবর ও অস্থাবর সমস্ত সম্পদ অমানুষিক নৃশংসতায় জোরপূর্বক লুণ্ঠন করার পর তা কীভাবে তাঁর অনুসারীদের মধ্যে বণ্টন করে দিয়েছিলেন নিজে হস্তগত করেছিলেন, তার প্রাণবন্ত বর্ণনা ইসলামে নিবেদিতপ্রাণ মুসলিম ঐতিহাসিকরাই লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন; যা সর্বপ্রথম লেখা হয়েছে আজ থেকে ১২০০-১২৫০ বছরের ও অধিক পূর্বে, মুহাম্মদের মৃত্যু-পরবর্তী সবচেয়ে নিকটবর্তী সময়ে (পর্ব: ৪৪)! তাঁদের লেখা এই ইতিহাসগুলো মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহর মনস্তত্ত্ব ও কর্মকাণ্ডের ঐতিহাসিক দলিল।

ইসলামে নিবেদিতপ্রাণ সেই সব বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকদেরই প্রাণবন্ত বর্ণনার আলোকে খায়বারের নিরীহ জনপদবাসীদের খুন, জখম ও বন্দী করার পর কী প্রক্রিয়ায় মুহাম্মদ তাঁর অনুসারীদের মধ্যে সেই লুটের মালের হিস্যা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন (পর্ব: ১৪৬); কোন অনুসারীদের তিনি সেই মালের হিস্যা থেকে বঞ্চিত করে তা থেকে তাদেরকে তিনি শুধু উপহার সামগ্রী প্রদান করেছিলেন(পর্ব: ১৪৭); তার আলোচনা গত দু'টি পর্বে করা হয়েছে। অতঃপর মুহাম্মদ সেই লুণ্ঠিত সম্পদগুলো নিজে গ্রহণ করেন ও তাঁর অন্যান্য অনুসারীদের মধ্যে  বিলি-বণ্টনের ব্যবস্থা করেন।

আল-ওয়াকিদির (৭৪৮-৮২২ খ্রিষ্টাব্দ) অব্যাহত বিস্তারিত বর্ণনা: [1] [2]

'তারা যা বলেছেন: খায়বারের দিনটিতে আল্লাহর নবী ফারওয়া বিন আমর বিন আল-বায়েদা-কে লুটের মাল এর বিষয়ে নিযুক্ত করেন। তিনি আল-নাটা, আল-শিইখ ও আল-কাতিবা দুর্গ থেকে মুসলমানদের লুট করা সম্পদগুলো সংগ্রহ করেন। তিনি আল-কাতিবার জনপদবাসী পুরুষ, মহিলা ও শিশুদের একজনকেও অব্যাহতি দেননি, যাদের গায়ে শুধুমাত্র তাদের পরিধেয় বস্ত্র ছাড়া অন্য কিছু সঙ্গে ছিল [পর্ব-১৪০]

তারা প্রচুর পরিমাণ আসবাবপত্র, পোশাক-পরিচ্ছদ, মখমল, বহু অস্ত্রশস্ত্র, ভেড়া, গবাদিপশু, খাদ্যদ্রব্য ও বহু সংখ্যক উট জড়ো করে। খাদ্যদ্রব্য, উট ও গবাদিপশুর খাবারগুলো পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়নি। সেখান থেকে লোকেরা যার যার প্রয়োজনমত তা গ্রহণ করে। যুদ্ধ করার জন্য যার অস্ত্র দরকার ছিল, সেই লুটের মাল যাদের কাছে ছিল, তা থেকে সে সেটা গ্রহণ করে, যতক্ষণে না আল্লাহ তাদের জন্য খায়বার বিজয় ঘটান; অতঃপর সেগুলো সে লুটের মাল হিসাবে ফেরত দেয়। যখন সমস্ত সম্পদই সংগ্রহ করা হয়, তখন আল্লাহর নবী আদেশ করেন যে, তা যেন পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়। একটি অংশ লিখা ছিল আল্লাহর  নামে, আর বাকি অংশগুলো রাখা হয়েছিল বেনামী।

প্রথমেই যে-অংশটি গ্রহণ করা হয়, তা হলো - আল্লাহর নবীর ভাগ, তিনি তাঁর ঐ এক-পঞ্চমাংশ পছন্দ করে গ্রহণ করেননি। অতঃপর আল্লাহর নবী ঘোষণা করেন যে, কেউ যদি তার চার-পঞ্চমাংশের অংশ, যারা তা কিনতে চায়, তাদেরকে তারা তা বিক্রয় করতে পারে; ফারওয়া তা ক্রেতাদের কাছে বিক্রয় করা শুরু করে। আল্লাহর নবী সে কারণে আশীর্বাদ কামনা করেন এই বলে, "হে আল্লাহ, এর সমস্তই যেন বিক্রি হয়, সেই ব্যবস্থা তুমি করো।"

ফারওয়া বিন আমর যা বলেছে: বিলক্ষণ আমি যা দেখেছি, তা হলো - লোকেরা আমাকে পেছনে ফেলে সেখানে দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয় যতক্ষণে না দু'দিনে তা বিক্রি হয়ে যায়, যেখানে আমি ভেবেছিলাম যে, তা আমরা সম্পূর্ণ করতে পারবো না, এই কারণে যে এর পরিমাণ ছিল এতটাই বেশি।

এক-পঞ্চমাংশ, যা আল্লাহর নবীর ভাগে আসে, তা ছিল লুটের মালের সম্পদ থেকে। তিনি এই অস্ত্রশস্ত্র ও পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী দান করেন। তিনি তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের দান করেন পোশাক-পরিচ্ছদ, জপমালা ও বাসনকোসন। তিনি আবদুল মুত্তালিবের পরিবারের পুরুষ ও মহিলা সদস্যদের তা প্রদান করেন, আর তিনি তা দান করেন এতিম ও ভিক্ষুকদের। লুটের মালের সাথে তৌরাতের পাণ্ডুলিপিগুলোও জড়ো করা হয়। ইহুদিরা তা নেবার জন্য আসে ও তারা আল্লাহর নবীর সাথে এই বিষয়ে কথা বলে সনির্বন্ধ মিনতি জানায়, যেন সেগুলো তাদেরকে ফেরত দেয়া হয়। আল্লাহর নবীর ঘোষক উচ্চস্বরে ঘোষণা করেন: সুঁই-সুতা পর্যন্ত যেন ফেরত দেয়া হয়, কারণ অবশ্যই অতিরিক্ত গ্রহণকারীদের বিচারের দিনে লজ্জা,  কলঙ্ক ও আগুনের সম্মুখীন করা হবে। -----


আল্লাহর নবী খায়বারে তিনটি অশ্ব পরিচালনা করেন; লিযায, আল-যারিব ও আল-সাকব। আল-যুবায়ের বিন আল-আওয়াম ও অশ্ব পরিচালনা করে। খিরাশ বিন আল-সিমমা পরিচালনা করে দু'টি অশ্ব। এবং আল্লাহর নবীর পুত্র ইবরাহিমের পালক পিতা আল-বারা বিন আউস বিন খালিদ বিন আল-জা'দ বিন আউফ (যাকে আরও বলা হতো আবু ইবরাহিম) পরিচালনা করে দু'টি অশ্ব; ও আবু আমর বিন আল-আনসারি পরিচালনা করে দুটি অশ্ব।

সে বলেছে: যারা দু’টি অশ্ব পরিচালনা করেছিল, তাদের প্রত্যেককে আল্লাহর নবী পাঁচ অংশ প্রদান করেন। চারটি তার দুই ঘোড়ার জন্য ও একটি তার নিজের জন্য। দু'টির বেশি ঘোড়ার জন্য তিনি কোনো অংশ প্রদান করেননি। অন্যরা বলে যে, তিনি শুধু একটি ঘোড়ার জন্য অংশ প্রদান করেছিলেন। যা নিশ্চিত, তা হলো - তিনি একটি ঘোড়ার অংশ প্রদান করেছিলেন। অন্যরা বলে যে, খায়বার দিনে তিনি ঘোড়াদের আরব ঘোড়া ও সংকর জাতের ঘোড়া হিসাবে শ্রেণী বিভাগ করেন; অতঃপর তিনি আরব ঘোড়াদের জন্য অংশ নির্ধারণ করেন আর সংকর জাতের ঘোড়াদের উপেক্ষা করেন। কিছু লোক বলে: আল্লাহর নবীর সময় সংকর জাতের ঘোড়া ছিল না। উমর ইবনে খাত্তাবের শাসন আমলে তার ইরাক ও আল-শাম বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত তখন ছিল শুধু আরব ঘোড়া। যে ঘোড়াগুলো আল্লাহর নবীর অধীনে ছিল, তার একটি ঘোড়ার অংশ ছাড়া অন্য কোনো অংশ তিনি গ্রহণ করেছিলেন, এমন শোনা যায়নি। নাটায় আল্লাহর নবীর অংশ ছিল তিনটি: তাঁর ঘোড়ার জন্য দুই অংশ ও তাঁর নিজের জন্য এক অংশ। ঘোড়াটি ছিল আসিম বিন আদির কাছে।

হিযাম বিন সা'দ বিন মুহায়েসা হইতে > ইশাক বিন আবদুল্লাহ বিন আবি ফারওয়া হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ইবনে আবি সাবরা আমাকে বলেছেন, তিনি যা বলেছেন:

সুয়ায়েদ বিন আল-নু'মান এক ঘোড়া নিয়ে রওনা হয়। রাত্রি বেলায় যখন সে খায়বারের বাড়ি-ঘরগুলো দেখতে পায়, সে তার ঘোড়া নিয়ে পড়ে যায়। ঘোড়াটি মারা যায় ও সুয়ায়েদের হাত যায় ভেঙ্গে। সে তার ক্যাম্প থেকে বের হয়ে বাইরে আসতে পারেনি, যতক্ষণে না আল্লাহর নবী খায়বার বিজয় করেন। আল্লাহর নবী তাকে তার ঘোড়ার অংশটি প্রদান করেন।

তারা বলেছেন: অশ্বারোহী সৈন্যদলে ছিল দুই শত ঘোড়া; কিছু লোক বলে, তা ছিল তিন শত। আমাদের সঙ্গে দুই শত সংখ্যাটি নিশ্চিত করা হয়েছে। যায়েদ বিন থাবিত ছিল সেই লোক, যার দায়িত্ব ছিল মুসলমানদের সংখ্যা গণনা করা। আল্লাহর নবী লুটের মালগুলোর বিক্রি করা অংশ থেকে তাদেরকে হিস্যা প্রদান করেন। অতঃপর তিনি তাদের সংখ্যা গণনা করেন।  তাদের সংখ্যা ছিল ১৪০০ জন।  সেখানে ছিল দুই শত ঘোড়া।  সেখানে ছিল আঠারটি ভাগ। তারা ছিল সেই লোক যাদেরকে আল্লাহর নবী হিস্যা প্রদান করেছিলেন। সৈন্যদলের জন্য ছিল ১৪০০ টি অংশ। সেনাদলে যে দুই শত ঘোড়া ছিল, তদের জন্য নির্ধারিত ছিল  ৪০০টি অংশ।

আল্লাহর নবী নাটা অথবা আল-শিইখে যে হিস্যাগুলো প্রদান করেন, তা ছিল তিনটি অনিয়ন্ত্রিত ভাগে বিভক্ত; এটি আল্লাহর নবীর শর্তমাফিক ছিল না, তা না ছিল নিয়ন্ত্রিত অথবা বণ্টিত। বরং, তার প্রত্যেকটির নাম দেয়া হয়েছিল তার নেতাদের নাম অনুসারে। প্রতি এক শত লোকের জন্য ছিল একজন পরিচিত নেতা, যে তার লোকদের মধ্যে তার ভাগের প্রাপ্ত অংশটি বণ্টন করে দিয়েছিল। আল-শিইখ ও আল-নাটার নেতারা ছিল:

আসিম বিন আদি; আলী ইবনে আবু-তালিব; আবদুল রহমান বিন আউফ; তালহা বিন উবায়েদুল্লাহ, আল্লাহ তার ওপর শান্তি বর্ষণ করুন। আর ছিল বানু সায়েদা গোত্রের ভাগ ও বানু আল-নাজজার গোত্রের ভাগ গ্রহণের জন্য ছিল তাদের নেতারা। হারিথা বিন আল-হারিথের ভাগ;  আসলাম ও গিফফার গোত্রের ভাগ; বানু সালিমা গোত্রের ভাগ, যারা ছিল সংখ্যায় অধিক - যাদের নেতা ছিল মুয়াধ বিন জাবাল। আর ছিল উবায়েদা এর ভাগ, যে ছিল ইহুদিদের একজন; আউস, বানু যুবায়ের, উসায়েদ বিন হুদায়ের ও বালহারিথ বিন খাযরাজ গোত্রের ভাগ; যার নেতা ছিল আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা। একটি ভাগ ছিল বায়েদা-দের জন্যে, যার নেতা ছিল ফারওয়া বিন আমর; এবং নাইম দুর্গের [পর্ব: ১৩৪] জন্য ছিল এক ভাগ। এগুলো হলো আল-শিইখ ও নাটার আঠারটি অনিয়ন্ত্রিত ভাগ, তাদের নেতারা এই ভাগগুলো গ্রহণ করেছিল, যা তারা উপার্জন করেছিল ও অতঃপর তা তারা তাদের লোকদের মধ্যে বণ্টন করে দিয়েছিল। যে কোনো লোক তার অংশটি বিক্রয় করতে পারতো ও তা ছিল বৈধ। বাস্তবিকই, খায়বারে আল্লাহর নবী বানু গিফফার গোত্রের এক লোকের কাছ থেকে তার অংশটি দু'টি উটের বিনিময়ে খরিদ করেছিলেন। অতঃপর তিনি তাকে বলেছিলেন, "জেনে রাখো, তোমার কাছ থেকে যে জিনিস আমি গ্রহণ করেছি, তা তোমাকে দেয়া আমার জিনিসের চেয়ে উত্তম; আর তোমাকে আমি যা দিয়েছি, তার পরিমাণ তোমার কাছ থেকে আমি যা নিয়েছি, তার চেয়ে কম। যদি তুমি চাও, তবে তা নিতে পারো, আর না চাইলে তা তুমি রেখে দিতে পারো।" গিফফারি লোকটি তা গ্রহণ করে।

উমর ইবনে খাত্তাব [পর্ব: ১৩২] আল্লাহর নবীর হিস্যা থেকে একটি অংশ খরিদ করে। সে তা গ্রহণ করে তার সঙ্গের ১০০ জন সঙ্গীর মধ্য থেকে। সেটি ছিল আউস গোত্রের  অংশ, উমর তা তার ভাগে না নেয়ার পূর্ব পর্যন্ত যে অংশটির নাম রাখা হয়েছিল আল-লাফিফ। মুহাম্মদ বিন মাসলামা [পর্ব: ৪৮] কয়েকটি অংশ আসলাম গোত্রের ভাগ থেকে খরিদ করে। যা বলা হয়েছে, আসলাম গোত্রের লোকদের সংখ্যা ছিল ৭০ জনের আশেপাশে, আর গিফফার গোত্রের লোকদের সংখ্যা ছিল প্রায় বিশ জন; একত্রে তাদের সংখ্যা ছিল এক শত জন। কেউ কেউ বলে যে আসলাম গোত্রের লোকদের সংখ্যা ছিল ১৭০ জন, আর গিফফার গোত্রের লোকদের সংখ্যা ছিল বিশ জনের আশে পাশে; যা ছিল দুই শত অংশ। প্রথম বিবৃতিটি আমাদের সঙ্গে নিশ্চিত করা হয়েছে।'----

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের (৭০৪-৭৬৮ সাল) বর্ণনা: [2]

'যে অনুসারীদের মধ্যে খায়বার বণ্টন করে দেয়া হয়েছিল, তাদের অংশ ও ঘোড়ার অংশের মোট পরিমাণ ছিল ১৮০০; ১৪০০ ব্যক্তি ও ২০০টি ঘোড়া; প্রত্যেকটি ঘোড়ার জন্য ছিল দুই ভাগ ও তার আরোহীর জন্য ছিল এক ভাগ; প্রত্যেক পদাতিক অনুসারীদের জন্য ছিল এক ভাগ। প্রতি ১০০ জন মানুষ ও তাদের বিলি-বণ্টনের জন্য ছিল একজন নেতা, অর্থাৎ ১৮ ব্লকে বণ্টন কৃত হিস্যা। [3]

যারা নেতা ছিলেন তারা হলেন: আলী; আল-যুবায়ের বিন আল-আওয়াম; তালহা বিন উবায়েদুল্লাহ; উমর; আবদুর রাহমান; আসিম বিন আদিব; উসায়েদ বিন হুদায়ের। আর ছিলো আল-হারিথ বিন আল-খাযরাজ এর হিস্যা; আর নাইম এর হিস্যা; আর বানু বায়েদা গোত্রের হিস্যা, বানু ওবায়েদ, বানু সালিমা গোত্রের অন্তর্ভুক্ত বানু হারাম, আর উবায়েদ এর হিস্যা [4], সায়েদা, গিফফার ও আসলাম, আল-নাজজার, হারিথা ও আউস গোত্রের হিস্যা।

সর্বপ্রথম অংশটি পড়ে আল-যুবায়েরের ভাগে, যার নাম ছিল আল-খায়ু (al-Khau) ও তারপরেই আল-সুরায়ের এর; দ্বিতীয়টি পড়ে বানু বায়েদা গোত্রের ভাগে; তৃতীয়টি উসায়েদ এর, চতুর্থটি বানু হারিথ গোত্রের; আর নাইম এর পঞ্চমটি বানু আউফ বিন আল-খাযরাজ গোত্র, মুযায়েনা ও তার পার্টনারদের ভাগে পড়ে। যেখানে মাহমুদ বিন মাসলামা [পর্ব-১৩১] নিহত হয়েছিল। এই পরিমাণ ছিল নাটায় [পর্ব-১৩৮]।

অতঃপর তারা আল-শিইখ অঞ্চলে নেমে আসে [পর্ব-১৩৯]: সর্বপ্রথম অংশটি পড়ে বানু আল-আজলান গোত্রের আসিম বিন আদি নামের এক ভাইয়ের ভাগে ও তার সাথে ছিল আল্লাহর নবীর অংশটি; তারপর আবদুর রাহমান এর অংশগুলো, সায়েদা, আল-নাজজার, আলী, তালহা, গিফফার ও আসলাম, উমার, সালামা বিন উবায়েদ ও বানু হারাম গোত্র, হারিথা, উবায়েদ এর অংশ; তারপর আউসদের অংশ, যেটি ছিল আল-লাফিফ এর অংশ যেখানে যুক্ত হয়েছিল জুহায়েনা ও খায়বারে অবস্থিত অন্যান্য আরবরা; ওপাশে ছিল আল্লাহর নবীর অংশ, যা তিনি আসিম এর অংশের সাথে পেয়েছিলেন।’

(*) এই জটিল ও অগোছালো হিসাবটি যেভাবে বোঝা যেতে পারে, তা হলো: ১,৮০০ অংশ, ১৮টি ভাগে ভাগ করে দেয়া হয়েছিল:

(ক) নেতাদের ৭ ভাগ, যথা:
[১] আলী,
[২] আল-যুবায়ের,
[৩] তালহা,
[৪] উমর,
[৫] আবদুর রহমান,
[৬] আসিম, ও
[৭] উসায়েদে এর ভাগ।

(খ) উপজাতীয়দের ৯ ভাগ, যথা: 
[৮] আল-হারিথ বিন আল-খাযরাজ,
[৯] বানু বায়েদা,
[১০] বানু উবায়েদ, বা
[১১] বানু হারাম,
[১২] বানু সায়েদা,
[১৩] বানু গিফফার ও আসলাম,
[১৪] বানু আল-নাজজার,
[১৫] বানু হারিথা,
[১৬] বানু আউস ও অন্যান্যরা

(গ) যে স্থানের সম্পত্তি তার নাম অনুসারে এক ভাগ, যথা:

(ঘ) সম্পত্তির মালিক এর নাম অনুসারে এক ভাগ, যথা:
[১৮] উবায়েদ এর ভাগ, যিনি অংশগুলো কিনে নিয়েছিলেন।’

- অনুবাদ, টাইটেল, [**] ও নম্বর যোগ - লেখক।

>>> আদি উৎসে আল-ওয়াকিদির ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় আমরা জানতে পারি, খায়বারের আল-নাটা ও আল-শিইক স্থানের লুণ্ঠিত সমস্ত সম্পদ মুহাম্মদ মোট পাঁচটি ভাগে ভাগ করেছিলেন। আল-ওয়াকিদির এই বিস্তারিত বর্ণনায় প্রতীয়মান হয় যে, এই পাঁচ ভাগের এক ভাগ তিনি "আল্লাহর নামে” রেখে দিয়েছিলেন, যা প্রথমেই রাখা হয়েছিলো সংরক্ষিত। 

আর বাকি চার ভাগের সম্পূর্ণ অংশের এক-পঞ্চমাংশ তিনি নিজে গ্রহণ করেছিলেন। বাকি চার-পঞ্চমাংশ তিনি তাঁর ১৪০০ অনুসারীদের মধ্যে এক বিশেষ নিয়মে ভাগ করে দিয়েছিলেন। প্রত্যেকটি অনুসারীদের জন্য নির্ধারিত ছিল এক অংশ, মোট  ১৪০০ টি অংশ। তাঁর যে অনুসারীরা এই অভিযানে ঘোড়া পরিচালনা করেছিলেন, সেই ঘোড়ার জন্য তিনি তাঁদেরকে অতিরিক্ত আরও দুই অংশ হিস্যা প্রদান করেছিলেন। অর্থাৎ অশ্বারোহী অনুসারীদের জন্য নির্ধারিত ছিল  তিন অংশ, আর পদাতিক অনুসারীদের জন্য নির্ধারিত ছিল এক অংশ। এই অভিযানে ২০০ টি ঘোড়ার অংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল চারশতটি অংশ। সর্বমোট ১৮০০ টি অংশ। গড়ে প্রায় প্রতি ১০০ জন অনুসারীদের জন্য তিনি একজন করে নেতা নিযুক্ত করেছিলেন; সমস্ত সম্পদ মোট ১৮ ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। নির্বাচিত সেই নেতারা তাঁদের ভাগটি গ্রহণ করেছিলেন। অতঃপর তা তারা তাদের অধীন প্রায় ১০০ জন অনুসারীদের মধ্যে বিলি-বণ্টনের ব্যবস্থা করেছিলেন। 

স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রচারিত ও প্রতিষ্ঠিত 'ইসলাম' নামক মতবাদে অবিশ্বাসী জনপদের ওপর অতর্কিত আগ্রাসী আক্রমণে তাঁদেরকে হত্যা, জখম, বন্দী, দাস ও যৌনদাসী-করণ ও ভাগাভাগি, তাঁদের সমস্ত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ লুণ্ঠন ও ভাগাভাগি 'সম্পূর্ণরূপে নৈতিক ও সর্বশ্রেষ্ঠ সৎকর্ম' নামে অভিহিত!' এ বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা "জিহাদ' এর ফজিলত (পর্ব-১৩৫)!" পর্বে করা হয়েছে!

ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে আল-ওয়াকিদির মূল ইংরেজি অনুবাদের অংশটিও সংযুক্ত করছি। ইবনে ইশাকের মূল ইংরেজি অনুবাদ ইন্টারনেটে বিনামূল্যে ডাউনলোড লিঙ্ক: তথ্যসূত্র [2]

The detailed narrative of Al-Waqidi (continued): [1]
‘They said: The Messenger of God appointed Farwa b. Amr al-Bayādī over the plunder, on the day of Khaybar. He collected the booty of the Muslims in the fortresses of Naṭā, al-Shiqq and al-Katība. He did not leave other than the garment on his/her back for even one of the people of al-Katība among its men, women and children. They gathered much furniture, cloth, velvet, many weapons, sheep, cattle, food, and many camels. The food, camels and fodder were not divided into five portions. The people took what they needed from it. He who needed weapons to fight with took it from the one who possessed plunder, until God conquered for them and that was returned in the plunder. When all of that was collected the Messenger of God commanded that it be apportioned into five portions. One portion was written to God, and the rest of the portions were left anonymous.

The first of what was taken out was the portion of the Prophet, and he did not choose his fifth. Then the Messenger of God commanded the selling of the four-fifths to those who desired, and Farwa began to sell to those who desired. The Prophet asked blessings for it, saying, “O God, let it all be sold.” Farwa b. Amr said: Surely I saw the people overtake me and rush to it until it was sold in two days, and I had thought that we could not finish it for there was so much of it.

The fifth, which came to the Prophet, was from the plunder. He gave from it as God desired, from the weapons and clothing. He gave to those of his family clothing, beads, and utensils. He gave to the men and women of the Banū Abd al-Muṭṭalib, and he gave to the orphan and the beggar. Manuscripts of the Torah were also collected with the plunder. The Jews came seeking them and they spoke to the Messenger of God about them [Page 681] pleading that they be returned to them. A herald of the Messenger of God called out: Return even the thread and needle, for indeed the excess taken will bring shame, vice and fire on the day of Judgment. -----

      The Messenger of God led three horses in Khaybar, Lizāz, al-arib, and al-Sakb. Al-Zubayr b. al-Awwām also led horses. Khirāsh b. al-imma led two horses. And al-Barā b. Aws b. Khālid b. al-Jad b. Awf (also called Abū Ibrāhīm) the nursing father of Ibrāhīm, the son of the Prophet, led two horses and Abū Amr al-Anṣārī led two horses. He said: The Messenger of God apportioned to each one who had two horses five portions. Four for his two horses, and a portion for himself. Where there were more than two horses he did not apportion to him. Others said that he apportioned only to one horse. It is confirmed that he apportioned for one horse. Others said that he classified the horses into Arab horses and the mixed breed on the day of Khaybar, and he apportioned for the Arab horses but neglected the mixed breed. Some said: There were no mixed breeds in the time of the Messenger of God. There were only Arab horses until the time of Umar b. al-Khaṭṭāb, when he conquered Iraq and al-Shām.

[Page 689] It was not heard that the Messenger of God struck a portion for the horses that were with him except for one horse, and it was known as the portion of the horse. The portions of the Messenger of God in Naṭā were three portions: for his horse two portions, and for him one portion. The horse was with ‛Āsim b. Adī. Ibn Abī Sabra related to me from Isḥāq b. Abdullah b. Abī Farwa, from izām b. Sad b. Muayyia, who said: Suwayd b. al-Numān set out on a horse. When he saw the houses of Khaybar in the night, he fell with his horse. The horse was destroyed and Suwayd’s hand was broken. He did not set out from his camp until the Messenger of God conquered Khaybar. The Messenger of God apportioned to him the portion of his horse.

They said: The cavalry constituted two hundred horses; some said three hundred. Two hundred is confirmed with us. He who was in charge of counting the Muslims was Zayd b. Thābit. The Prophet apportioned between them what they plundered from the goods that were sold. Then he counted them. They numbered one thousand four hundred. There were two hundred horses. There were eighteen portions. They were those that the Messenger of God gave as portions. For the cavalry were fourteen hundred shares. As for the cavalry’s two hundred horses, to them were allotted four hundred shares.

The portions of the Muslims that the Messenger of God apportioned in Naṭā or in al-Shiqq were three unregulated portions; it was not according to the agreement of the Messenger of God and it was not limited, nor apportioned. Rather to each of them were named leaders. For every hundred was a known leader who divided among his companions what came out from its revenue. The leaders in al-Shiqq and Naṭā were: ‛Āsim b. Adī, Alī b. Abī Ṭālib, Abd al-Ramān b. Awf, ala b. Ubaydullah, may the grace of God be upon them. And the portion of the Banū Sā‛ida and the portion of the Banū al-Najjār had a leader. The portion of [Page 690] Ḥāritha b. al-Ḥārith and the portions of Aslam and Ghifār, and the portion of Banū Salima who were more in number—and their leader was Mu‛ādh b. Jabal. And there was a portion to Ubayda, a man from the Jews; a portion to the Aws, the Banū Zubayr, Usayd b. uayr, and Balḥārith b. Khazraj; its leader was Abdullah b. Rawāḥa. A portion to Bayāḍa, whose chief was Farwa b. Amr, and a portion to Nā‛im. These were eighteen unregulated portions in al-Shiqq and Naṭā, and their leaders took what was earned and then divided it among them. A man would sell his share and that was lawful. Indeed, the Messenger of God bought, from a man from the Banū Ghifār, his portion in Khaybar, with two camels. Then he said to him, “Know that what I take from you is better than what I give you; and what I give you is less than what I take from you. If you wish take, and if you wish, keep it.” The Ghifārī took it.

Umar b. al-Kaṭṭāb bought a share from the Messenger of God. He took from his companions who were a hundred. It was the portion of Aws, named the portion of al-Lafīf, until it came to Umar b. al-Khaṭṭāb. Muammad b. Maslama bought from the portion of the Aslam several portions. It was said, the Aslam numbered around seventy and the Ghifār some twenty, and together they numbered a hundred. Some said that the Aslam numbered a hundred and seventy, and at Ghifār around twenty and this was two hundred portions. The first saying is confirmed with us.’-----

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] আল-ওয়াকিদির বিস্তারিত বর্ণনা: “কিতাব আল-মাগাজি”- লেখক:  আল-ওয়াকিদি (৭৪৮-৮২২ খৃষ্টাব্দ), ed. Marsden Jones, লন্ডন ১৯৬৬; ভলুম ২, পৃষ্ঠা ৬৮০-৬৮১ ৬৮৮-৬৯১; ইংরেজি অনুবাদ: Rizwi Faizer, Amal Ismail and Abdul Kader Tayob; ISBN: 978-0-415-86485-5 (pbk); পৃষ্ঠা ৩৩৪-৩৩৫ ৩৩৮-৩৪১

[2] অনুরূপ বর্ণনা: “সিরাত রসুল আল্লাহ”- লেখক: মুহাম্মদ ইবনে ইশাক (৭০৪-৭৬৮ খৃষ্টাব্দ), সম্পাদনা: ইবনে হিশাম (মৃত্যু ৮৩৩ খৃষ্টাব্দ), ইংরেজি অনুবাদ: A. GUILLAUME, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, করাচী, ১৯৫৫, ISBN 0-19-636033-1, পৃষ্ঠা ৫২২

[3] Ibid “সিরাত রসুল আল্লাহ”- ইবনে হিশামের নোট নম্বর: ৭৭০, পৃষ্ঠা ৭৭১ 'খায়বারের ঐ দিনটিতে আল্লাহর নবী যা স্থির করেছিলেন তা হলো কোনটি ছিল আরব ঘোড়া আর কোনটি ছিল মিশ্রিত-রক্তের ঘোড়া’।

[4] Ibid “সিরাত রসুল আল্লাহ”- ইবনে হিশামের নোট নম্বর: ৭৭১, পৃষ্ঠা ৭৭১
“তাকে যে নামে ডাকা হতো তা হলো "উবায়েদ বিন সিহাম", কারণ হলো সে হিস্যাগুলো কিনে নিয়েছিল। তার নাম ছিলো উবায়েদ বিন আউস, বানু হারিথা বিন আল-হারিথ, বিন আল-খাযরাজ বিন আমর বিন মালিক বিন আউস গোত্রের এক লোক।

(*) Ibid “সিরাত রসুল আল্লাহ”; A. GUILLAUME নোট, পৃষ্ঠা ৫২২