১৯ নভেম্বর, ২০১৬

সত্যিকারের ডাইনিদের গল্প - ২

লিখেছেন সরকার আশেক মাহমুদ

(ছোটবেলার রূপকথার বইতে জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া ভাই-বোনদের ডাইনি বুড়ির খপ্পরে পড়ার কাহিনী আপনারা সবাই হয়ত পড়েছেন। অথবা শুনেছেন হয়ত, ঝাড়ুতে ভর করে কীভাবে কীভাবে জাদুকরী উড়ে যেতে পারে আকাশে। আধুনিক রূপকথার হ্যারি পটারের কাহিনীতেও আমরা জাদুর বলে ঝাড়ুতে ভর করে উড়ে যাবার দৃশ্য দেখতে পেয়েছি। এই গল্পগুলো আমাদের জন্য যতই বিনোদনদায়ক হোক না কেন, এই জাতীয় গল্পের ঐতিহাসিক উৎসস্থলে ফিরে গেলে আমাদের নৃশংসতা আর বর্বরতা দেখে আঁতকে উঠতে হবে। মানুষের অজ্ঞতার যুগে ধর্মান্ধতার বাড়াবাড়ি পশ্চিমা বিশ্বের মানুষকেও কীভাবে ভয়ানক বর্বরতার দিকে ঠেলে দিয়েছিল, তা থেকে উঠে আসা পশ্চিমা বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতির সাথে তুলনা করতে গেলে যা কিনা অভাবনীয় মনে হবে। সেই সাথে আমাদের ভাবতে সাহায্য করে - আমাদের অজ্ঞতা, অন্ধবিশ্বাস এবং অযৌক্তিক ভীতি কীভাবে আমাদের ঠেলে দিতে পারে সহিংসতার দিকে।)

ডাইনি গল্প দুই: জার্মানী 

কোনো ডাইনিকে বাঁচতে দিয়ো না। (বাইবেল, যাত্রাপুস্তক ২২:১৮)

১৫৯৫ সালে এক বৃদ্ধা বাস করতেন কন্সট্যান্স (জার্মান উচ্চারণে - কন্সটাঞ্জ) নামক গ্রামের পাশে। গ্রামের আনন্দ-উৎসবে তাঁকে আমন্ত্রণ না করার কারণে তিনি বিড়বিড় করে ক্ষোভ প্রকাশ করতে করতে পাহাড়ের উপর দিয়ে সে সবার দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলেন। কিন্তু দুই ঘন্টা পর দেখা গেল ভয়ংকর বজ্র-বৃষ্টি ওখানে আঘাত হানল, যা কিনা নৃত্যশিল্পীদের ভিজিয়ে দিল এবং এলাকার ফসলের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি করলো। আর তাই গ্রামবাসী বৃদ্ধার বিরুদ্ধে ডাইনি হিসাবে জাদু করার অভিযোগ - সে একটা গর্তে মদ ঢেলে তাতে কাঠি দিয়ে ঘুটা দিতে দিতে ঝড় সৃষ্টি করেছে । আর তাই তাকে ধরে এনে উপর্যপুরি নির্যাতন করা হলো যতক্ষণ না সে স্বীকার করে যে সে ডাইনি এবং সে ঝড় সৃষ্টি করেছে। এবং বলা বাহুল্য, পরদিন তাকে জীবন্ত আগুনে জ্বালিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলো। 

এখানে বিশ্লেষণ করা দরকার, কী ঘটেছিল?

বহুকাল ধরে মানবসমাজে ঝড়, বৃষ্টি, রোগ-বালাইয়ের কোনো বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা মানুষের ছিল না। আবহাওয়ার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া কীভাবে চলে কিংবা মানুষের স্বাভাবিক চোখে অদৃশ্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবাণু যে মানুষের রোগের জন্য দায়ী, তা জানা ছিল না, আর তাই রোগ-বালাইয়ের কারণ উদ্ধার করতে পারতো না। তাই তারা সব অমঙ্গলের জন্য ধর্মীয় কুসংস্কারভিত্তিক ব্যাখ্যা খুঁজতো। কারো ফসল নষ্ট হয়ে গেল কিংবা গবাদি পশু মারা গেল সে তার প্রতিবেশী বৃদ্ধার বিরুদ্ধে হয়তো ডাইনি হয়ে জাদু করার অভিযোগ আনতো। বৃদ্ধা ডাইনিদের সম্পর্কে মনে করা হতো যে,

১. তারা শয়তানের সাথে সখ্যতা করে, যৌনসম্পর্ক করে,
২. রাতের বেলা ঝাড়ুতে ভর করে উড়ে বেড়ায়,
৩. মানুষের মাংস খায় এবং 
৪. শরীরের আকৃতি পরিবর্তন করে বেড়াল, খরগোসে পরিণত হতে পারে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি রোগ-বালাইয়ের কারণ হিসেবে জীবাণুর ভুমিকা আবিষ্কৃত হয়েছিল। তার আগ পর্যন্ত মানুষ নিজেদের বা গবাদিপশুর রোগ-বালাই এবং মৃত্যুর ক্ষেত্রে উপস্থিত বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা না থাকার কারণে অতিপ্রাকৃতিক ব্যাখ্যা দাঁড় করাতো। আমাদের অঞ্চলে হয়ত যেটাকে জ্বীন-ভুত-জাদুটোনা বলা হত, সেটাকে ওরা বলতো শয়তান (devil) বা কালো জাদুর (Black Magic) প্রভাব। 

থুরথুরে বৃদ্ধাকে ধরে এনে তাঁর বিরুদ্ধে শক্তিশালী মানুষকে হত্যা করার অভিযোগ কিংবা ঘোড়াকে ঘাড় মটকিয়ে হত্যা করার অভিযোগ স্বীকার করানো হত নির্যাতনের সাথে জেরার মাধ্যমে। সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হল, খুব কম মানুষই এই ধরনের অভিযোগ যে মিথ্যা হতে পারে তা সত্যিকার অর্থে উপলব্ধি করতে পেরেছে। এই অত্যাচার চালিয়ে যাওয়া হযেছে স্রেফ ধর্মান্ধতার যুক্তি মাথায় রেখে যে, শয়তান তার যন্ত্রণাকে অনুভূতিশূন্য করে দিয়েছে, যদিও সবাই রেহাই পেতে দোয়া ভিক্ষা করেছে, তাতে কাজ হয়নি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পুরুষ এবং নারীদের অভিযুক্ত করে হয়েছে কখনো শুধুমাত্র এই খোঁড়া যুক্তি দিয়ে যে, তারা দেখতে বিচ্ছিরি, বৃদ্ধ, বিধবা কিংবা মানসিক রোগী এবং তাদের ধরে এনে অত্যাচার করে হত্যা করা হয়েছে ঈশ্বরের নামে। 

একটা বিষয় রহস্যজনক মনে হতে পারে: যীশুখ্রিষ্টের ভালবাসার কথা বলা ধর্ম যেখানে এক গালে থাপ্পড় খেলে অন্য গাল পেতে দেবার উপদেশ দেয়, কীভাবে সেই ধর্মের নাম করে  এরকম অত্যাচার এবং বর্বরতা চলতে থাকলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। আসলে এটা মোটেও রহস্যময় নয়। অন্যসব ধর্মগ্রন্থের মত বাইবেলও অজস্র পরস্পর অসঙ্গতিপূর্ণ প্রলাপে পরিপূর্ণ। যার কারনে অন্যান্য ধর্মের মতই যে যার ইচ্ছা হাসিল করার জন্য নিজস্ব ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে ধর্মচর্চা করে যেতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে খারাপ বিষয়টা হল অন্ধ বিশ্বাস। কোনো একটা মতাদর্শকে অবিসংবাদিত, তর্কাতীত, প্রশ্নাতীত মেনে নিয়ে সমাজের লোকজন যখন নিজের বিবেচনাশক্তি অন্ধবিশ্বাসের কাছে সমর্পণ করে এবং দলগত আনুগত্য মেনে নেয়, তখন এমনটা ঘটতে থাকাই স্বাভাবিক। মানুষকে যদি বিশ্বাস করানো যায় যে, অবিশ্বাসীরা নরকে জ্বলবে অনন্তকাল, বাকিটা বিশ্বাস করানো তেমন কঠিন কিছু নয়। ইনকুইজেসনের (inquisition) নামে নির্যাতনের মাধ্যমে দোষ স্বীকার করানোর গ্রহণযোগ্য হতো না যে পর্যন্ত না তার সাথে এই “পাপে” আর কে কে সঙ্গ দিয়েছে, তাদের নাম প্রকাশ না করে। এই ধরনের নির্যাতনের যৌক্তিকতা পাওয়া গেছে সরাসরি Saint Augustine থেকে “if torture was appropriate for those who broke the laws of men, it was even more fitting for those who broke the laws of God.”

এখানে উল্লেখ্য যে, ইনকুইজিশন-এর নামে জেরার বাহানায় নির্যাতন করার শুরুটা ছিল অত্যন্ত মোলায়েম, কারণ ১২১৫ সালের আগে অফিসিয়ালি নির্যাতন অনুমোদন পায়নি। কিন্তু তার আগে দুটো বিষয় এই ধরনের বিচার-তরিকা তরান্বিত করেছে। ১১৯৯ সালে Pope Innocent III ঘোষণা করেছিল অভিযুক্ত ব্যক্তির (হেরেটিকের) সকল সম্পত্তি গির্জা কর্তৃক বাজেয়াপ্ত করা হবে এবং গির্জা সে সম্পত্তি লোকাল অফিসিয়ালদের এবং অভিযোগকারীর মধ্যে বন্টন করে দেবে। দ্বিতীয়ত, Dominican order.9 Saint Dominic নিজে বুঝিয়ে দিলেন কীভাবে ভাল ক্যাথলিক হওয়া যাবে: 
"For many years I have exhorted you in vain, with gentleness, preaching, praying, weeping. But according to the proverb of my country, 'where blessing can accomplish nothing, blows may avail.' We shall rouse against you princes and prelates, who, alas, will arm nations and kingdoms against this land. . . .”

এই ধরনের ডাইনি শিকার মানে এই নয় যে, ঘরে ঘরে নক করে গিয়ে ডাইনি খোঁজা। এটার ধর হলো, কর্তৃপক্ষ লোকজনকে উৎসাহিত করতো তাদের একে অপরকে অভিযুক্ত করতে। তৎকালীন গ্রামবাসীরা এই ধরনের ডাইনি বিচার-প্রক্রিয়াকে একটা চমৎকার অস্ত্র হিসেবে পেল, যার মাধ্যমে কল্পিত কিংবা সত্যিকারের শত্রুকে ঘায়েল করা খুবই সহজ হয়ে গেল এবং কর্তৃপক্ষ তা থামানোর জন্য কোনো চেষ্টাই করেনি। 

১৪৮৪ সালে এমনকি একটা গাইড বই প্রকাশ করা হয়, যার মাধ্যমে ডাইনিদের বিচার করার তরিকা বর্ণনা করা হয়েছে। Malleus Maleficarum বা Hammer of Witches নামক বইতে লিখিতভাবে বিস্তারিত নীতিমালা পাওয়া যায় কীভাবে ডাইনীদের শনাক্ত করা হবে এবং বিচার করা হবে। নির্যাতনের বিধানও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। প্রায় দুশো বছর ধরে বাইবেলের পরে এই বইটা ছিল সর্বাধিক বিক্রিত বই।

(চলবে)