২ নভেম্বর, ২০১৬

সাইমুম (উপন্যাস: পর্ব ১০)

লিখেছেন উজান কৌরাগ


আমি দোতলার অর্ধেক সিঁড়ি বেয়ে উঠতেই দেখলাম, ঘরের ভেতরে দরজার কাছে দাঁড়ানো চাচার বাম গালে ঠাস ক’রে চড় মারলেন দরজার বাইরে দাঁড়ানো বড়ফুফু। আমার আশঙ্কা যে, চাচা যদি আবার বড়ফুফুর গায়ে হাত তোলে! বদমেজাজি চাচার পক্ষে তা সম্ভব কি অসম্ভব, সে ব্যাপারে আমি অবশ্য নিশ্চিত নই। আমি দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উঠে বড়ফুফুর পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার সামনে বড়ফুফুর হাতের চড় খেয়ে চাচা কিছুটা হতভম্ব এবং নীরব! চাচার হয়ে পেছন থেকে কথার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন চাচী, আর তিনতলায় আমাদের ফ্ল্যাটের সামনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে গলা বাড়িয়ে ফোঁড়ন কাটছেন মেজোফুফু। চাচী বলছেন, ‘কতো বড় সাহস, গায়ে হাত তোলে!’

বড়ফুফু, ‘আমার ভাই বেয়াদ্দপি করছে, আমি মারছি, তাতে তোমার কী! মায় তো প্যাটের থেইকা বাইর কইরা দিয়াই খালাস, ত্যালতুল মাইখা, নাউয়াইয়া-খাউয়াইয়া এগুলারে বড় করছি তো আমি, তহন কই আছিলা তুমি! জবর দরদ দ্যাহাইতাছো!’

এই কথার পর চাচা আর কোনো কথা বললেন না। দরজার মুখ থেকে সরে গিয়ে ডাইনিংয়ের চেয়ারে বসলেন।

তিনতলার সিঁড়ি থেকে মেজোফুফু, ‘আসছো কেন তুমি, আইসাই ঝামেলা পাকাও! আম্মা তোমারে আসতে নিষেধ করে, তবু নির্লজ্জের মতো কেন আসো তুমি!’

এবার তিনতলার সিঁড়ির দিকে সরে ওপরের দিকে তাকিয়ে আমি মুখ খুললাম, ‘মেজোফুফু, এটা তোমাদের বাবার বাড়ি। তোমার বাবা, তার রোজগারের টাকা আর গ্রাম থেকে তার বাবার জমি বিক্রি ক’রে এনে এই বাড়ির জমি কিনেছিলেন। বাড়ির কাজ শুরু ক’রে প্রায় শেষও ক’রে এনেছিলেন তিনিই। দাদা মারা যাবার পর বাড়ির অসম্পূর্ণ কাজ বাবা-চাচা করলেও তাদের নিজের রোজগারের টাকায় করেননি, গ্রামের জমি বেচে সেই টাকা দিয়েই করেছেন। বড়ফুফু দাদার বড় সন্তান, সুতরাং এই বাড়িতে তার অধিকার আছে, তার যখন খুশি আসবে-যাবে। তাকে আসতে নিষেধ করার অধিকার তোমার নেই।’

আমার মা নিশ্চয় আমাদের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, মেজোফুফু তার ঝুলন্ত মুখখানা সরিয়ে মায়ের উদ্দেশে বললেন, ‘দেখছো, ভাবী, তোমার পোলার কথা শুনছো। দরদ উথলায়ে উঠতাছে।’ 

মায়ের কন্ঠ, ‘আমজাদ, বড়দের কথার মধ্যে তোকে কথা বলতে হবে না; তুই ওপরে আয়।’ 

‘বড়রা কোনো অন্যায় করলে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা উচিত, মা। মেজোফুফু কোনোভাবেই বড়ফুফুকে এ বাড়িতে আসতে নিষেধ করতে পারে না।’

মেজোফুফু আবার কথার কামান দাগালেন, ‘দুইদিনের পোলা তুই, ওরে কী দিছে না দিছে, তুই তার কী জানোস! অহন আইছে বাড়ির ভাগ লইতে! ’

‘বড়ফুফুকে কী দিয়েছে, তা আমি জানি; এও জানি যে, বড়ফুফু তোমার মতো রাজনীতি বোঝেন না, যদি বুঝতেন, তাহলে বড়ফুফুও তোমার মতো এই বাড়িতে একটা ফ্ল্যাট পেতেন, বাবার বাড়ি থাকতেও তাকে মাসে মাসে ভাড়া গুনতে হতো না।’

‘আমি রাজনীতি করি, অয় ভাবী, তোমার পোলায় কয় কী! আমি নাকি রাজনীতি করি, রাজনীতি করি আমি! ভাই বাজার থেইকা আসুক আগে...!’ এইসব বলতে বলতে মেজোফুফু কেঁদেকেটে একাকার ক’রে ফেললেন। 

এদিকে চাচীর মুখ থেকে কথার স্রোত বইছে। চাচীর দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘চাচী, এবার একটু থামেন তো।’

চাচী তেড়ে উঠলেন, ‘কোন সাহসে উনি তোর চাচার গায়ে হাত তুললো!’

‘চাচা যে ভাষায় বড়ফুফুর সঙ্গে কথা বলেছে, সেই ভাষায় যদি আমি আপনার সঙ্গে কথা বলি, আপনি আমাকে চড় মারবেন না! অন্যায় করলে মুরুব্বি হিসেবে নিশ্চয় আমাকে চড় মারা অসঙ্গত না, তাই না?’

আমি বড়ফুফুর কাঁধে হাত রেখে বললাম, ‘চলো, ওপরে চলো।’

‘ওপর থেইকাই তো আইলাম, বাসায় যামু।’

‘তাইলে চলো, আমি আগায়ে দেই।’

বড়ফুফুকে নিয়ে আমি নিচে নেমে এলাম। ওপরে চাচী আর মেজোফুফু একসঙ্গে কথার ঝড় তুলেছে; মেজোফুফু বোধহয় দোতলায় নেমে এসেছেন। আমার মা এখন এর মধ্যে আসবেন না, তা আমি জানি, কেননা এর মধ্যে আমি জড়িয়ে পড়েছি; এলে আমাকে জন্ম দেওয়া এবং মানুষ করতে না পারার অপরাধে তাকে কথা শুনতে হবে। আমি গেট খুলে বড়ফুফুকে নিয়ে বাইরে বের হলাম। বড়ফুফুর কাঁধে হাত রেখে পাশাপাশি হাঁটছি। বড়ফুফুর বাসা এখানেই, এক মিনিটের রাস্তা। আমার পড়ার টেবিল থেকে বড়ফুফুর বাসা দেখা যায়, বড়ফুফু বারান্দায় এলেই আমি তাকে দেখতে পাই। 

‘আমার সংসারডা যে কেমনে চলতাছে রে, বাবা, তা খালি আমিই জানি, আম্মারে কোনোভাবেই বোঝাইতে পারতাছি না। কইলাম যে, টু-লেট লাগাইছো, বাসা খালি অইবো, আমি উঠি। দিবো না, কয় ভাড়া অইয়া গেছে, এরশাদুল টু-লেট নামানোর কতা ভুইলা গেছে। ডাহা মিছা কতা! আমার আম্মারে আমি চিনি না! সারাজীবন আব্বার লগে মিছা কতা কইয়া সংসার করলো! এরপর কইলাম, তাইলে আমারে নিচতলার হাফ ইউনিটে থাকতে দাও। দুইডা রুম আর এট্টা ডাইনিং, ওতেই আমার অইবো; অহনও তো অমনেই আছি, দরকার অইলে আমি তোমারে অর্ধেক ভাড়া দিমুনে। আম্মা কয়, ভাড়া দিয়া যেহানে আছিস সেইহানেই থাক; আমার বাড়িতে তোরে আইতে অইবো না। আমি তার সৎ মাইয়ানি, ক্যাডা জানে!’ বলতে বলতে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন বড়ফুফু।

আমি বড়ফুফুকে আমার শরীরের আরো কাছে টেনে বললাম, ‘চুপ করো, কেঁদো না।’

বড়ফুফু আবার বললেন, ‘আল্লারে, নিজের প্যাটের মাইয়ার লগে কেউ এমন করে, আমি পারুম আমার মাইয়া কষ্টে থাকলে এমন চোখ বুইজা থাকতে! মাইয়া আমার কলেজ থেইকা আইতে এট্টু দেরি করলেই উতলা অইয়া আমি ফোন দেই। আর হ্যারা বচ্ছর বচ্ছর কুত্তা-বিলাইর মতো বিয়াইছে, মইরা-ধইরাও তো কমডি নাই। হ্যার লাইগাই দয়া-মায়া কম!’

বড়ফুফুর কথা বলার ধরনে আমার হাসি পেলেও আমি চেপে রাখলাম। বড়ফুফু আবার বললেন, ‘কতো কইরা বুঝাইলাম, কিছুতেই সে বোঝে না।’ 

‘তোমার আম্মা কি বোঝার বান্দা যে, তুমি বোঝাইলেই সে বুঝবে! সে কি তার বুদ্ধিতে চলে? সে চলে চাচা আর মেজোফুফুর বুদ্ধিতে। আর আমার বাবা-মাও তাদের কথায় তাল দেয়। বললাম যে, মামলা করো, তা না ক’রে তুমি বুড়ির কাছে যাও ঘানঘ্যান করতে, আর সারা বাড়ির মানুষের কাছে অপমানিত হও।’ 

‘নিজের আম্মা, নিজের ছোট ভাই, তাগো বিরুদ্ধে মামলা করলে মাইনষে কইবো কী! মামলা করুম না বইলাই তো সালিশ ডাকছিলাম। সালিশে আইলো মাত্র দুইজন মুরুব্বি।’

‘আসবে কি, বাবা আর চাচা তো আগেই সবার বাড়ি গিয়ে তাদের আসতে নিষেধ করছে। বাপ-চাচার ক্ষমতা আছে, তোমার তো ক্ষমতা নাই; কে দাঁড়াবে তোমার পক্ষে! যে দুইজন আসছিল তারা ভাল মানুষ, এজন্যই তো মহল্লার মানুষ তাদের দেখতে পারে না।’ 

বড়ফুফুর বাসার সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। বললাম, ‘যাও, বাসায় যাও।’

‘তুই বাসায় চল, ভাত খাইয়া যাস।’

‘না, এখন আর উপরে উঠবো না। তুমি যাও।’

‘না, তুই চল। লাউ দিয়া শোলমাছ রানছি, তুই তো পছন্দ করস; খাইয়া যা। তুই ছাড়া আমার বাপের বাড়িতে আপন বলতে আর ক্যাডা আছে, যারে এট্টু ভাল-মন্দ রাইন্ধে খাওয়ামু, যার লগে মন খুইলা দুইডা কথা কমু, আমি তো সবার শত্তুর! চল...।’

‘তাইলে তুমি যাও, আমি বাসায় গিয়ে গোসল ক’রে আসি।’

‘আইবি তো?’

‘হ আসবো।’ 

বড়ফুফুকে গেটে ঢুকিয়ে দিয়ে আমি ফিরলাম, সিঁড়ি দিয়ে উঠার সময় দেখলাম, দোতলায় চাচার বাসার সামনে চাচী আর মেজোফুফু আলাপ করছে; যথারীতি সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এরশাদুল। আমার উপস্থিতি তাদের গতিময় আলাপ কিছুটা ছন্দ হারালো, আমি চুপচাপ ওপরে উঠে এলাম। স্নানে যাবার আগে মাকে বললাম, ‘আমি রাতে খাব না।’

‘খাবি না ক্যান?’

‘বড়ফুফুর বাসায় খাব।’

আমি মাকে আর কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে নিজের ঘরে ফিরে গামছাখানা নিয়ে বাথরুমে ঢুকলাম। জ্যৈষ্ঠের অস্বস্তিকর গরম থেকে এসে শাওয়ারের পানির নিচের দাঁড়াতেই প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়লো দেহ-মনে। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে। বেশ সময় নিয়ে গোসল ক’রে বের হলাম। থ্রি কোয়ার্টার আর গেঞ্জির ভেতরে শরীর গলাতেই ফোন বেজে উঠলো। বিছানায় রাখা মোবাইলের স্ক্রীনে তাকাতেই দেখি শাশ্বতীদির নাম। গামছাখানা বারান্দার তারে নেড়ে দিয়ে এসে ফোন রিসিভ করলাম, ‘হ্যালো... দিদি, কেমন আছো?’

‘ভাল। তুই ঢাকায় আছিস?’

‘হ্যাঁ।’

‘আগামী সোমবার সন্ধ্যায় বাসায় আসিস।’

‘কেন?’

‘আসিস তো, এলেই দেখতে পাবি।’

‘ও বুঝতে পেরেছি, তোমাদের অ্যানির্ভাস্যারি। পরাগদা কোথায়?’

‘ও এখনো ফেরেনি, রাস্তায়। শোন, গল্পটার দ্বিতীয় পর্ব ব্লগে দিয়েছি, ফেইসবুকেও শেয়ার দিয়েছি, পড়ে দেখিস।’

‘হ্যাঁ, পড়বো, আজ রাতেই পড়বো। প্রথম পর্ব পড়ার পর আমি ভীষণ আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় আছি। এই সময়ে তোমার এই লেখাটা ভীষণ প্রয়োজনীয়, এই কথাগুলো মানুষকে জানানো দরকার। শিক্ষিতও মানুষও না জেনে এই বিষয়ে অসভ্যের মতো মন্তব্য ক’রে বসে। এগুলোকে সভ্য করতে হ’লে এ ধরনের লেখার কোনো বিকল্প নেই।’

‘দেখিসনি, কী রকম গালাগালির বন্যা বইয়ে দিয়েছে!’

‘তোমার বেশিরভাগ পোস্টেই তো মুমিনরা কোরান তেলাওয়াত আর গোঁড়া হিন্দুরা গীতাপাঠ করে! লেখাপড়া ক’রে কি আর সবাই সভ্য হয়? এরাও হবে না। তবে হাজার জনের মধ্যে দু’জনও যদি তোমার লেখা পড়ে বিষয়টা সম্পর্কে গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারে, সেখানেই সার্থকতা।’ 

‘আমিও তাই মনে করি। মানসিকতার পরিবর্তনটা আসতে সময় লাগবে। তবে সংখ্যায় খুব কম হলেও নতুন প্রজন্মের কিছু ছেলেমেয়ের মধ্যে ইতিবাচক মানসিকতা দেখতে পাচ্ছি। এটা আমাকে আশা জাগাচ্ছে।’

‘পরিবর্তনের ব্যাপারে আমি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগি। দেশে যেভাবে মাদ্রাসা বেড়েই চলেছে, দেশটা যে কোনদিকে যাচ্ছে! তবে মুক্তচিন্তার মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে, এটা সত্য। হয়তো সমাজ কখনো বদলাবে, কিন্তু আমরা তা দেখে যেতে পারবো না।’

‘নিশ্চয় বদলাবে, এখন আমরা হয়তো একটা অন্ধকার সময় পার করছি। কিন্তু মহাকালের হিসাবে একশো-দুশো বছর সামান্য সময়। শোন, তুই কিন্তু সন্ধ্যার মধ্যেই চলে আসিস।’

‘সোমবার তোমরা অফিসে যাবে না?’

‘অফিস থেকে দুপুরের পরপরই চলে আসবো। বাসায় ব’লে আসিস যে, রাতে থাকবি, জমিয়ে আড্ডা দেব।’

‘ঠিক আছে, আমি সন্ধ্যার মধ্যেই এসে পড়বো।... ওকে, বাই।’

ফোন রাখতেই দেখি আমার দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে দাদি, তাকিয়ে আছে আমার দিকে, চোখে-মুখে অপ্রসন্নতা। বললাম, ‘কী গো কমলাসুন্দরী, চোখে-মুখে তো প্রেম একেবারে উছলাইয়া পড়তাছে। অমন প্রেমময় দৃষ্টিতে কী দ্যাখতাছো? আসো, ভেতরে আসো।’

দাদী দেয়ালের মুখোশগুলোর দিকে তাকালো, তারপর পুনরায় আমার দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বললো, ‘তর ঘরে ঢুকুম না, তোর ঘরে ঢোকনও গুনাহ্। আল্লারে আল্লাহ, পেত্নি-পুত্নি ঝুলাইয়া ঘরডারে করছে কী! এই বাড়িতে নি ফেরেশতা আইবো! যে জইন্যে হিন্দুগো বাড়িভাড়া দেই না, সেই বেশরিয়তী কাম অহন আমার বাড়ির মইদ্যে। আল্লাহ্ আমারে তুইলা নেয় না ক্যান!’

এক বাড়িতে থাকলেও দাদি আমার বাড়িতে প্রবেশ করেন না অনেকদিন। বললাম, ‘এই যে রোজার দিনে এতোক্ষণ বইসা ইন্ডিয়ান বেপর্দা মালাউন মাইয়াগো নাটক দ্যাখতাছিলে, তাতে তোমার গুনাহ অয় নাই? আমার ঘরের ছবি আর ভাস্কর্য দেখলেই তোমার যতো গুনাহ অয়! টিভিতে নাটক-সিনেমা দ্যাখন তো হারাম। এই হারাম জিনিস দেইখা একটু পর আবার তারাবি নামাজ পড়বা।’ 

‘তোর কাছ থেইকা আমার ধর্মের জ্ঞান নিতে অইবো না। তোরে আমি যা কই, তাই শোন।’

‘কও, কী কবা।’ 

‘তুই শামীমারে যা-তা কইছস ক্যান?’

‘যা-তা তো কই নাই। মেজোফুফু বড়ফুফুকে এই বাসায় আসতে নিষেধ করছিলো, তাই আমি তারে কইছি, বাপের বাড়িতে বড়ফুফু যখন খুশি আইবো, তুমি নিষেধ করার কে।’

‘মাইয়া আমার, তোর লগে এতো খাতির কিয়ের?’

‘সত্যিই তোমার মাইয়া! নাকি দাদার লগে কারো গোপন সম্পর্ক আছিল, তার মাইয়া।’ 

‘তোর দাদা তোগো মতো গুনাহগার আছিল না।’

‘তোমার মাইয়াই যদি অইবো, তাইলে তুমি মাইয়াডারে এতো শাস্তি দিতাছো ক্যান?’

‘ওরে শাস্তি দিলাম কই! তুই দুইদিনের পোলা, তুই কী জানোস? ওরে কম দেই নাই! বহুত দিছি ওরে। দুই-দুইবার বিয়া দিতে খরচ অইচে। আগের জামাইডা ভাল আছিল না, মারধর করতো; ছাড়াইয়া নিয়া আইলাম। বহুত খরচাপাতি কইরা আবার বিয়া দিলাম। এই জামাইডা এমনিতে ভাল আছিল, মারধর করতো না; ব্যভারও ভাল আছিল। তয় বেহিসেবী আছিল, কী ফুডানি তার, খাওন-পরনের কী বাহার! জামায় এট্টা ভাঁজ পড়ছেনি কুনোদিন, মনে অইতো জমিদারের ব্যাডা! ট্যাহা-পয়সা গুছাইতে পারে নাই, হ্যার দায় কি আমার! ডি ব্লকে ওগো তো প্লটও আছে, মামলা চলতাছে। মামলায় অরাই জিতবো।’

‘কবে মামলা জিতবো, সেই আশায় বাতাস খাইয়া থাকবো ওরা! অই জমির পার্টি তিনটা; জিতলেও তিনভাগ অইবো, ফুফারা তিন ভাই।’ 

‘কয়দিন পর ওর মাইয়া পাস দিয়া বাইর অইবো, বাইর অইলেই তো চাকরি পাইবো। তহন ওগো ভাত খাইবো পরে।’

উহ্! এই বুড়ির সাথে কথা বলা মানে বাজে সময় নষ্ট করা। মেজাজও ঠিক থাকে না। বললাম, ‘তাই ব’লে বাপের সম্পত্তি থেইকা তুমি তারে বঞ্চিত করবা?’ 

দাদীও এবার উত্তেজিত, ‘বুঞ্চিত করলাম কই, কইলাম না ওরে বহুত দিছি। হুন, তরে এইসব নিয়া মাথা ঘামাইতে অইবো না। এ নিয়া মাথা ঘামানের লাইগা আমি আছি, তর বাপ-চাচা আছে।’ 

‘আমি তো মাথা ঘামাই না। কিন্তু কইয়া দিও, কেউ যেন বড়ফুফুরে এই বাড়িতে আসতে নিষেধ না করে। তাইলে কিন্তু আমি তারে ছাইড়া কথা কমু না।’

‘ই...মার পোড়ে না, পোড়ে মাসির!’ 

দাদীর মুখে প্রবাদবাক্য শুনে আমার হাসি পেল! যতো রকমের বাঙালিয়ানা আছে, তাকে হিন্দুয়ানা আখ্যা দিয়ে উঠতে-বসতে এরা ফোঁড়ন কাটে; অথচ চাল-চলন, কথাবার্তায় নিজেরাই সেই বাঙালিয়ানা থেকে বের হতে পারে না। মওলানারা কেন যে এদের জন্য আরবি প্রবাদ অনুবাদ এবং প্রচলন করে না! 

বললাম, ‘বড়ফুফু তোমারে ভালবাসে, তাই সে বারবার আইসা তোমারে তোষামোদ করতাছে, কিন্তু তুমি কোনো কথা কানেই নিতাছো না। যহন মামলা দিবো, কাঠগড়ায় যাইয়া দাঁড়াইবা, তহন কিন্তু আদালতের কথা ঠিকই কানে নিতে অইবো।’

দাদীর চোখ-মুখের তেজ হঠাৎ যেন কমে গেল, আমার ঘরের ভেতরে কয়েক পা এগিয়ে এলো, ‘অই কি মামলা দিবো নাকি, তরে কইছে কিছু?’

‘তোমরা তারে বাপের সম্পত্তি থেইকা বঞ্চিত করবা, আর সে চুপ কইরা বইসা থাকবো!’ 

‘হ, অতো সোজা না, মামলা দিলেই অইলো, আমি বাঁইচ্চা আছি না!’

‘এইটা ব্রিটিশ আমল না আর তুমিও রানি ভিক্টোরিয়া না, মামলা দিলে কিন্তু ঠিকই তারে সম্পত্তি দিতে অইবো।’

‘মামলার ব্যাপারে অয় তরে কী কইছে, আমারে ক তো।’

দাদীর নরম সুর দেখে তার হাত ধরে বিছানায় এনে বসালাম, কোনোরকম জোরাজুরি করতে হলো না। অর্থাৎ মামলা বিষয়ে ফুফু আমাকে কিছু বলেছে কি না, সেই ব্যাপারে তার আগ্রহ। কিন্তু আমি মামলার প্রসঙ্গ এড়িয়ে তুললাম মুহাম্মদীয় তরিকা, ‘আচ্ছা আমারে তো উঠতে বসতে গুনাহগার কও, দোজখের আগুনে পোড়ার ভয় দেহাও, গরম তেলে ভাজার আর গরম জলে সিদ্ধ হওয়ার ভয় দেহাও। মাইয়া ফাঁকি দেওনের অপরাধে তোমার আল্লায় যে তোমারেও আগুনে পোড়াইবো, গরম তেলে ভাজবো, তা কি তুমি জানো!’

‘হ, তরে কইছে!’

‘আমারে কইবো ক্যা, তোমার আল্লার সাহস আছেনি আমার সামনে আসার। কইছে নাকি তোমাগো পিয়ারের মুহাম্মদরে, বসো দেহাইতাছি।’

আমার কথা শেষ হওয়ামাত্র দাদী উঠে যেতে চাইলে আমি তাকে জোর ক’রে বসালাম। দ্রুততার সঙ্গে বইয়ের তাক থেকে কোরান নিয়ে সুরা নিসার সম্পত্তি বণ্টন সংক্রান্ত এগারো নম্বর আয়াত দাদীকে পড়ে শুনিয়ে বললাম, ‘বুঝলে কিছু? এক ছেলের সমান সম্পত্তি পাবে দুই মেয়ে; সেই হিসাবে বড়ফুফু কিন্তু একটা ফ্ল্যাট পায়।’ 

শুনে দাদী গম্ভীর, মুখে কোনো কথা নেই। এরপর শোনালাম তেরো এবং চৌদ্দ নম্বর আয়াত- ‘এসব আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। আর যে আল্লাহ্ ও রসুলের অনুগত হয়ে চলবে, আল্লাহ তাকে স্থান দেবেন জান্নাতে, যার নিচে বইবে নদী। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে, আর এ মহাসাফল্য।’ সুরা নিসা (৪:১৩)। 

‘অপরদিকে যে আল্লাহ ও তার রসুলের অবাধ্য হবে ও তার নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করবে তিনি তাকে আগুনে ছুড়ে ফেলে দেবেন, সেখানে সে থাকবে চিরকাল; আর তার জন্য রয়েছে অপমানকর শাস্তি।’ সুরা নিসা (৪:১৪)।

দাদীর মুখ গম্ভীর, তিনি এখন ভেতরে ভেতরে বিচলিত, তা বেশ বুঝতে পারছি। তাকে আরো বিচলিত করতে বললাম, ‘কী বুঝলে, মুখে মুখে সারাক্ষণ যতোই আল্লা-বিল্লারে ডাকো, আগুনের হাত থেইকা কিন্তু তোমারও রেহাই নাই। সময় থাকতে মাইয়ার সম্পত্তি বুঝাইয়া দাও।’

‘সর, তারাবি পড়মু।’ উঠে পড়লেন দাদী।

বুঝিয়ে-সুজিয়ে কোনো কাজ হবে না, বড়ফুফুকে ফ্ল্যাট না দেবার সিদ্ধান্তে সবাই অনড়। তাই বিষে বিষক্ষয় করার পথ বাতলেছি। অবশ্য এতে কাজ হবে কি না, আমি জানি না, চেষ্টা তো ক’রে দেখি। কোনোভাবে দাদীকে একবার রাজি করাতে পারলেই কাজ হবে; কারণ দাদী যদি একবার বলে যে, বড়ফুফুকে ফ্ল্যাট দেওয়া হবে, তাহলে বাবা-চাচার সাধ্য নেই দাদীর মুখের ওপর কথা বলার। দাদী ভয়ানক কড়া, চেঁচামেচি ক’রে মহল্লার লোগ জড়ো করবে; বছর চারেক আগেও চাচাকে চড় মেরেছিলেন। আর ধমক তো তিনি সবাইকেই দেন, কেবল আমার সঙ্গেই সুবিধামতো খবরদারি করতে পারেন না। 

আমার বড়ফুফু একদম সরল মনের মানুষ। আমি তাঁকে আমার মায়ের মতোই ভালবাসি, এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে মায়ের চেয়েও তাকে বেশি শ্রদ্ধা করি। আমার দাদার মধ্যে যে সারল্য ছিল, সেটাই পেয়েছেন বড়ফুফু; ছোটফুফুও অনেকটা এরকম। বাবা, চাচা আর মেজোফুফু পেয়েছে দাদীর স্বভাব; তবে মেজোফুফু দাদীকেও ছাড়িয়ে গেছেন। তুখোর কূটনৈতিক জ্ঞান; আমার ধারণা, তিনি গোয়েন্দা, সাংবাদিক কিংবা রাষ্ট্রদূত হলে একবারে মাত ক’রে দিতেন! কিন্তু বিএ পাস করেও তিনি পারিবারিক কূটনীতিতেই জীবনের অপচয় করলেন। 

ছোটবেলা থেকেই নাকি মেজোফুফু আত্মসচেতন; ঈদে ভাল জামাটা তার চাই, বাসার ভাল খাবারটা তার চাই। আর বড়ফুফু ঠিক এর উল্টো, নিজের চেয়ে বোনের জামাটা ভাল হলেই তিনি খুশি, নিজের খাবারটা ভাই-বোনের মুখে তুলে দিতে পারলেই তিনি খুশি। অথচ তার সেই ভাইবোনদের কাছেই আজ তিনি ব্রাত্য। বড়ফুফুর প্রথম বিয়েটা টিকেছিল বছর খানেক। তার বর এবং বরের পরিবার তাকে নির্যাতন করতো, দাদার কাছ থেকে টাকা নেওয়ার জন্য তাকে চাপ দিতো। ফলে দাদা বড়ফুফুকে ডিভোর্স করিয়ে নিজের কাছে নিয়ে এসেছিলেন। এরপর বড়ফুফু আর বিয়ে করতে চাননি, বাবা-মা, ভাইদের সঙ্গেই বাকি জীবন কাটাতে চেয়েছিলেন। পরে দাদা তার ভবিষ্যতের কথা ভেবে অনেক বুঝিয়ে-সুজিয়ে আবার বিয়ে দিয়েছেন, মাঝখানে কেটে গেছে এগারো বছর। 

আমার এই ফুফা খুব ভাল মানুষ ছিলেন। সৌখিন ছিলেন খুব, পরিপাটি থাকতে পছন্দ করতেন। বছরে অন্তত দু'বার পরিবার নিয়ে ঘুরতে যেতেন। নিজে খেতে এবং মানুষকে খাওয়াতে ভীষণ পছন্দ করতেন। কাছাকাছি শ্বশুরবাড়ি, কিন্তু খালিহাতে কখনোই আসতেন না, ছোটদের জন্য আইসক্রিম হলেও নিয়ে আসতেন। তার এই স্বভাবই আমার দাদী পছন্দ করতেন না। বলতেন, ‘জমিদারের ব্যাডা, খালি ফুডানি!’

ফুফা হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন বছর দেড়েক হলো। ফুফা যেহেতু কৃপণ ছিলেন না, আবার পেশাগত জীবনেও সৎ ছিলেন, ফলে তিনি খুব বেশি সঞ্চয় করতে পারেননি। আকস্মিক ফুফা মারা যাবার পর দুই সন্তান নিয়ে ফুফু খুব সমস্যায় পড়েছেন। তার বাবার বাড়ির পাওনা ফ্ল্যাটে উঠতে চাইলেও দাদী এবং আমার বাবা-চাচা তাকে উঠতে দেননি। তিন রুম, ড্রয়িং-ডাইনিংয়ের বাসা ছেড়ে ফুফু এখন দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে দুই রুম আর ছোট্ট একটু ডাইনিংয়ের বাসায় ভাড়া থাকেন। স্থান সংকুলানের অভাবে বেশিরভাগ ফার্নিচার বিক্রি ক’রে দিয়েছেন। বড়ফুফুর মেয়ে নাদিয়া আপু ইডেন কলেজে পড়ছে, অনার্স ফোর্থ ইয়ার; ছেলে আবিদ একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও ফুফা মারা যাবার পর খরচ টানতে পারবে না ব’লে এক বছর লস দিয়ে কমার্স কলেজে ভর্তি হয়েছে।

সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ একটি ইসলামী রাষ্ট্র, দেশের নব্বই ভাগ মানুষ মুসলমান; সম্পত্তির বণ্টন সম্পর্কে কোরানে স্পষ্ট লেখা আছে, দেশের প্রচলিত আইনেও তা আছে; যদিও তা নারীর সঙ্গে স্পষ্টত প্রতারণা। মুসলমানরা মুখে মুখে নারী অধিকারের কথা বললেও আদতে ইসলামই সর্বক্ষেত্রে নারীকে সবচেয়ে বেশি অবরুদ্ধ করেছে এবং পদে পদে নারীর সঙ্গে করেছে প্রতারণা; সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রেও তাই করেছে এক পুরুষের সমান সম্পত্তি দুই নারীকে দিতে ব’লে। তারপরও আমার বড়ফুফুর মতো লাখ লাখ নারী পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যে বাড়িতে তারা জন্মেছে, বেড়ে উঠেছে, বিয়ের পর সেই বাড়িতে বাস করার অধিকার তারা হারাচ্ছে স্বয়ং মা-বাবা এবং ভাইদের চক্রান্তে। দেশে আশংকাজনক হারে বাড়ছে সম্পত্তি সংক্রান্ত মামলা। কেবল ভাইয়ের বিরুদ্ধে বোন নয়, ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাই, মায়ের বিরুদ্ধে মেয়ে, বোনের বিরুদ্ধে বোন, চাচার বিরুদ্ধে ভাতিজা, মামার বিরুদ্ধে ভাগ্নে-ভাগ্নি ইত্যাদি ধরণের মামলা দিনকে দিন বাড়ছে। অথচ এরা নিজেদের মুসলমান দাবি করে, নামাজ পড়তে পড়তে কপালে সহি দাগ পড়ে যায়, মসজিদের মাইক দিনে পাঁচবার হেঁকে ওঠে, বছর বছর হজ্বে যায়, মহল্লায় মহল্লায় ওয়াজের শব্দে কানের বারোটা বাজে। যে ধর্মগ্রন্থের জন্য এদেরই কেউ কেউ জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করছে, নিজের স্বার্থের জন্য সেই ধর্মগ্রন্থকেই আবার অমান্য ক’রে চলেছে এরা। 

ফুফুর বাসায় খেয়ে নাদিয়া আপু আর আবিদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে এগারোটা বেজে গেল। ওদের সঙ্গে আড্ডা দিতে আমার ভাল লাগে, আমি উপভোগ করি। বাড়াবাড়ি রকমের ধর্মীয় পরিবেশে বড় হয়নি ব’লে ওরা ধার্মিক না এবং অনেক উদার। নাদিয়া আপু সবগুলো রোজা রাখলেও আবিদের টেনেটুনে পাঁচ-সাতটা হয়। আমি যে নাস্তিক, এই ব্যাপারে ওদের কোনো অ্যালার্জি নেই আমাদের বাসার মতো। আমি তো আমার ছোট আপু আর চাচাতো ভাই-বোনের সাথে দশ মিনিটও আলাপ করতে পারি না। ওরা আমার সঙ্গে আড্ডা চালিয়ে যাওয়ার মতো কথা খুঁজে পায় না, আমিও ওদের সঙ্গে আলাপের সময় বিষয়বৈচিত্র্যে ভুগি। ফলে প্রয়োজনের বাইরে অন্য কোনো বিষয় নিয়ে ওদের সঙ্গে আমার কথা হয় না। পরিবার এবং আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে একটু মন খুলে কথা বলতে পারি শুধু নাদিয়া আপু আর আবিদের সঙ্গেই। 

(চলবে)