২২ নভেম্বর, ২০১৬

ইসলামী পাটিগণিত - ৭

লিখেছেন আবুল কাশেম


ইসলামিক উত্তরাধিকার সম্পত্তি বণ্টনের হিসাব

[দ্রষ্টব্য: এই রচনায় উদ্ধৃত কোরানের অধিকাংশ আয়াত নেওয়া হয়েছে তফসীর মাআরেফুল কোরআন (বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তফসীর), হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ শাফী’ (রহঃ), অনুবাদ মাওলানা মুহিউদ্দীন খান হতে।]

বাংলাদেশ সহ বিশ্বের সমস্ত ইসলামিক দেশগুলোতে উত্তরাধিকার আইন ইসলামসম্মত কায়দা-কানুনে তৈরি। আমরা অনেকেই জানি যে, এই আইন অনুযায়ী এক নারীর প্রাপ্য এক পুরুষের অর্ধেক। বলা হয় যে, এই আইন নাকি আল্লাহ পাক দিয়েছেন—স্বর্গ হতে। অর্থাৎ কোরানের বিধান অনুযায়ী। তাহলে আমরা প্রত্যাশা করি যে, কোরানে লিখিত আল্লাহ্‌র আইন একেবারে নিখুঁত, পূর্ণাঙ্গ এবং যথাযথ। আল্লার হিসাবে কোনো গরমিল থাকা অসম্ভব। এখন দেখা যাক, আল্লাহ্‌র যোগ-বিয়োগ, গুণ, ভাগের দৌড় কতটুকু।

প্রথমেই আমরা কোরান থেকে পড়ে নিই কয়েকটি আয়াত, যেখানে আল্লাহ্‌ পাক উত্তরাধিকার আইন দিয়েছেন।
৪:১১ আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে আদেশ করেন: একজন পুরুষের অংশ দু’জন নারীর অংশের সমান। অতঃপর যদি শুধু নারীই হয় দু‑এর অধিক, তবে তাদের জন্যে ঐ মালের তিন ভাগের দুই ভাগ যা ত্যাগ করে মরে এবং যদি একজনই হয়, তবে তার জন্য অর্ধেক। মৃতের পিতা‑মাতার মধ্য থেকে প্রত্যেকের জন্যে ত্যাজ্য সম্পত্তির ছয় ভাগের এক ভাগ, যদি মৃতের পুত্র থাকে। যদি পুত্র না থাকে এবং পিতা‑মাতাই ওয়ারীস হয়, তবে মাতা পাবে তিন ভাগের এক ভাগ। অতঃপর যদি মৃতের কয়েকজন ভাই থাকে, তবে তার মাতা পাবে ছয় ভাগের এক ভাগ ওছিয়্যতের পর, যা করে মরেছে কিংবা ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের পিতা ও পুত্রের মধ্যে কে তোমাদের জন্যে অধিক উপকারী তোমরা জান না। এটা আল্লাহ্ কর্তৃক নির্ধারিত অংশ নিশ্চয় আল্লাহ্‌ সর্বজ্ঞ, রহস্যবিদ।
৪:১২ আর তোমাদের হবে অর্ধেক সম্পত্তি, যা ছেড়ে যায় তোমাদের স্ত্রীরা যদি তাদের কোন সন্তান না থাকে। যদি তাদের সন্তান থাকে, তবে তোমাদের হবে এক‑চতুর্থাংশ ঐ সম্পত্তির, যা তারা ছেড়ে যায়, ওছিয়্যতের পর, যা তারা করে এবং ঋণ পরিশোধের পর। স্ত্রীদের জন্যে এক‑চতুর্থাংশ হবে ঐ সম্পত্তির, যা তোমরা ছেড়ে যাও যদি তোমাদের কোন সন্তান না থাকে। আর যদি তোমাদের সন্তান থাকে, তবে তাদের জন্যে হবে ঐ সম্পত্তির আট ভাগের এক ভাগ, যা তোমরা ছেড়ে যাও ওছিয়্যতের পর, যা তোমরা কর এবং ঋণ পরিশোধের পর। যে পুরুষের, ত্যাজ্য সম্পত্তি, তার যদি পিতা‑পুত্র কিংবা স্ত্রী না থাকে এবং এই মৃতের এক ভাই কিংবা এক বোন থেকে, তবে উভয়ের প্রত্যেকে ছয়‑ভাগের এক পাবে। আর যদি ততোধিক থাকে, তবে তারা এক তৃতীয়াংশ অংশীদার হবে ওছিয়্যতের পর, যা করা হয় অথবা ঋণের পর এমতাবস্থায় যে, ক্ষতি না করে, এ বিধান আল্লাহ্‌র। আল্লাহ্‌ সর্বজ্ঞ, সহনশীল।
৪:১৭৬ তারা তোমার নিকট ফতোয়া প্রার্থনা করছে, তুমি বলঃ আল্লাহ তোমাদের পিতা-পুত্রহীন (ব্যক্তির অর্থ বণ্টন সম্বন্ধে ফতোয়া দান করেছেন, যদি কোন ব্যক্তি নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যায় এবং তার ভগ্নী থাকে তবে সে তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি হতে অর্ধাংশ পাবে; এবং যদি কোন নারীর সন্তান ন থাকে তবে তার ভ্রাতাই তদীয় উত্তরাধিকারী হবে; কিন্তু যদি দুভগ্নি থাকে তবে তাদের উভয়ের জন্যে পরিত্যাক্ত বিষয়ের দুই তৃতীয়াংশ এবং যদি তার ভ্রাতা-ভগ্নি পুরুষ ও নারীগণ থাকে, তবে পুরুষ দু’নারীর তুল্য অংশ পাবে, আল্লাহ তোমাদের জন্যে বর্ণনা করেছেন যেন তোমরা বিভ্রান্ত না হও এবং আল্লাহ সর্ববিষয়ে মহাজ্ঞানী। [দ্রষ্টব্য: মারেফুল কোরআনের বাংলা অনুবাদে এই আয়াতের অনুবাদ দূর্বোধ্য মনে হয়েছে আমার। তাই আমি বাংলা তাফসীর কুর’আনুল কারীম; অনুবাদ প্রফেসর ডঃ মুহাম্মদ মুজীবুর রহমান ব্যাবহার করেছি। প্রকাশকঃ দারুস সালাম, রিয়াদ সৌদি আরব, তৃতীয় সংস্করণ, জানুয়ারি ২০০৭।]
মূলতঃ এই তিনটি আয়াতের ওপর ভিত্তি করে কয়েকটি উদাহরণ দেখা যাক।

একজন পুরুষ মারা গেল। উত্তরাধিকারী হিসেবে সে রেখে গেল এক স্ত্রী, কয়েক কন্যা, মাতা এবং পিতা। এখন ওপরে উদ্ধৃত আয়াত অনুযায়ী সম্পত্তির বণ্টন হবে এই রকম:

স্ত্রী পাবে এক অষ্টমাংশ, অর্থাৎ ১/৮ = ৩/২৪ (আয়াত ৪: ১২)
কন্যারা (দুই অথবা ততোধিক) পাবে দুই তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ২/৩ = ১৬/ ২৪ (আয়াত ৪:১১, ৪:১৭৬)
পিতা পাবেন এক-ষষ্টমাংশ, অর্থাৎ ১/৬ = ৪/২৪ (আয়াত ৪:১১)
মাতা পাবেন এক-ষষ্টমাংশ, অর্থাৎ ১/৬ – ৪/২৪ (আয়াত ৪:১১)

এই ভগ্নাংশগুলো যোগ করলে আমরা পাই ৩/২৪ + ১৬/২৪ + ৪/২৪ + ৪/২৪ ২৭/২৪ = ১.১২৫

দেখা যাচ্ছে, এই যোগফল একের চাইতে বেশি হচ্ছে। অর্থাৎ বণ্টন সম্পত্তি মূল সম্পত্তির চাইতে বেশি। এটা ভগ্নাংশ যোগের মৌলিক নীতি লঙ্ঘন করছে।

আরও একটি ব্যাপার লক্ষণীয়। এই উদাহরণ থেকে দেখা যাচ্ছে, আল্লাহ্‌ পাক নিজেই নিজের আইন ভঙ্গ করেছেন। কারণ আল্লাহ্‌ বলেছেন, নারী পাবে পুরুষের অর্ধেক (অথবা পুরুষ পাবে নারীর দ্বিগুন)। সেইমতে মাতা পাবেন পিতার অর্ধেক—অর্থাৎ ১/১২। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, আল্লাহ্‌ পাক পিতা এবং মাতা উভয়কেই একই পরিমাণ দিচ্ছেন

আরেকটা উদাহরণ দেখা যাক:

এক ব্যক্তি মারা গেল। উত্তরাধিকারী হিসেবে রেখে গেল, এক ভগিনী এবং এক ভাই। এরা পাবে—

ভগিনী পাবে অর্ধেক, অর্থাৎ ১/২ (আয়াত ৪:১১)
ভ্রাতা পাবে সম্পূর্ণ, অর্থাৎ ১ (পুরুষ পাবে নারীর দ্বিগুণ অর্থাৎ ১) (আয়াত ৪:১১)

এই সংখ্যা দুটি যোগ করলে আমরা পাব ৩/২ অথবা ১.৫

দেখা যাচ্ছে সম্পত্তি ভণ্টনের পর শতকরা পঞ্চাশ ভাগ বেশি হয়ে গেছে।

তাজ্জবের ব্যাপারই বটে।

দেখুন নিচের উদাহরণগুলো:

এক বিবাহিত নারী মারা গেল সন্তানহীন অবস্থায়। তার ছিল স্বামী, দুই ভগিনী এবং ভ্রাতা। এই নারীর উত্তরাধিকারী হচ্ছে নিম্নরূপ:

স্বামী পাবে অর্ধেক বা ১/২ (আয়াত ৪:১২)
ভগিনীরা পাবে ১/৩ (আয়াত ৪:১৭৬)
ভ্রাতারা পাবে ভগিনীর দ্বিগুন অর্থাৎ ২/৩ (আয়াত ৪:১১)

যোগ করলে আমরা পাই ১/২ + ১/৩ + ২/৩ = ৭/৬ = ১.১৭

কী আশ্চর্যের ব্যাপার। 

এক সন্তানহীন নারী মারা গেল। রেখে গেল স্বামী, ভগিনী এবং মাতা।

এই নারীর সম্পত্তি বণ্টন হবে

স্বামী পাবে অর্ধেক, অর্থাৎ ১/২ = ৩/৬ (আয়াৎ ৪:১২)
ভগিনী পাবে অর্ধেক, অর্থাৎ ১/২ – ৩/৬ (আয়াত ৪:১১)
মাতা পাবে এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ১/৩ -২/৬ (আয়াত ৪:১১)

এই ভগ্নাংশগুলো যোগ করলে আমরা পাই ৩/৬ + ৩/৬ + ২/৬ = ৮/৬ = ১.৩৩

কেমন করে সম্পত্তি বন্টন হবে?

এক ব্যক্তি সন্তানহীন অবস্থায় মারা গেল। রেখে গেল এক স্ত্রী, মাতা,এবং ভগিনী। ইসলামী আইন অনুযায়ী তার সম্পত্তির বণ্টন হবে নিম্নরূপে:

স্ত্রী পাবে এক-চতুর্থাংশ, অর্থাৎ ১/৪ = ৩/১২ (আয়াত ৪:১২)
মাতা পাবে এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ১/৩ = ৪/১২ (আয়াত ৪:১২)
ভগিনীরা পাবে দুই-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ২/৩ = ৮/১২ (৪:১৭৬)

এই সকল ভগ্নাংশগুলোর যোগফল হবে ৩/১২ + ৪/১২ + ৮/১২ = ১৫/১২ = ১.২৫

আশ্চর্য হবারই কথা।

এক বিবাহিত নারী মারা গেল। তার উত্তরাধিকারী থাকল:

ভগিনীরা পাবে দুই-তৃতীয়াংশ বা ২/৩ (আয়াত ৪:১৭৬)
ভ্রাতারা পাবে (ভগিনীর দ্বিগুণ) ৪/৩ (আয়াত ৪:১৭৬)

এই ভগ্নাংশের যোগফল হবে ২/৩ + ৪/৩ = ৬/৩ = ২

দেখা যাচ্ছে সম্পত্তি বণ্টনের পর ইসলামী আইন অনুযায়ী সম্পত্তি দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। ভেল্কীবাজিই বটে।

তবে এখানে লক্ষণীয় ব্যাপার এই যে, ৪:১৭৬ আয়াতে এই পরিস্থিতিতে বোন এবং ভাই-এর অংশ সম্পর্কে নির্দিষ্ট কিছুই উল্লেখ করা হয়নি—শুধু বলা হয়েছে ‘পুরুষ দু’নারীর তুল্য অংশ পাবে।’ 

এই সব উদাহরণ থেকে আল্লাহর পাটিগণিতের জ্ঞান দেখে তাজ্জব না হয়ে পারা যায় না। এই আল্লাহ্‌র পাটিগণিত আমাদের স্কুল, কলেজ, ব্যবসা-বাণিজ্যে যদি ব্যবহার করা হয়, তার পরিণতি কী হবে, তা বলা নিষ্প্রয়োজন।

এখন একটা ব্যবহারিক উদাহরণ দেওয়া যাক।

এক ব্যক্তি মারা গেল। রেখে গেল ২৭ ০০০ ডলার। এখন তার উত্তরাধিকারীরা কী পরিমাণ পাবে, তা ইসলামী নীতি অনুযায়ী হবে:

স্ত্রী ১/৮ (আয়াত ৪:১২) = ১/৮ গুণ ২৭ ০০০ = ৩ ৩৭৫
মাতা ১/৬ (আয়াত ৪:১১) = ১/৬ গুণ ২৭ ০০০ = ৪ ৫০০
পিতা ১/৬ (আয়াত ৪:১১) = ১/৬ গুণ ২৭ ০০০ = ৪ ৫০০
দুই কন্যা ২/৩ (আয়াত ৪:১১, ৪;১৭৬) = ২/৩ গুণ ২৭ ০০০ = ১৮ ০০০

এই সংখ্যাগুলোর যোগফল হচ্ছে ৩০ ৩৭৫ ডলার।

দেখা যাচ্ছে সম্পত্তি বণ্টন করতে গিয়ে আল্লাহ্‌ পাক ৩০ ৩৭৫ বিয়োগ ২৭ ০০০ = ৩ ৩৭৫ অতিরিক্ত ডলার সৃষ্টি করে ফেলেছেন।

আরও বিচিত্র ব্যাপার আছে। আগেই লেখা হয়েছিল যে, কোরানে আল্লাহ্‌ পাক নিজেই নিজের আইন ভঙ্গ করেছেন। অর্থাৎ পুরুষ পাবে নারীর দ্বিগুণ—এই আইন আল্লাহ্‌ পাক অনেক স্থানেই পালন করেননি। সেইমত হলে ওপরের ডলারের হিসাব হবে নিম্ন প্রকার:

স্ত্রী ১/৮ (আয়াত ৪:১২) = ১/৮ গুণ ২৭ ০০০ = ৩ ৩৭৫
মাতা ১/৬ (আয়াত ৪:১১) = ১/৬ গুণ ২৭ ০০০ = ৪ ৫০০
পিতা ২/৬ (পুরুষ পাবে নারীর দ্বিগুণ) = ২/৬ গুণ ২৭ ০০০ = ৯ ০০০
দুই কন্যা ২/৩ (আয়াত ৪:১১, ৪;১৭৬) = ২/৩ গুণ ২৭ ০০০ = ১৮ ০০০

এখন যোগ করলে ফলাফল দাঁড়ায় ৪৩ ৮৭৫ ডলার।

অর্থাৎ আল্লাহ্‌ পাক ভেল্কীবাজি দিয়ে (৪৩ ৮৭৫ বিয়োগ ২৭ ০০০) ১৬ ৮৭৫ ডলার বানিয়ে দিলেন।

এই সব উদাহরণ থেকে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, আল্লাহ্‌ পাক ভগ্নাংশের যোগ-বিয়োগ জানেন না। আসল ব্যাপারটা হচ্ছে নিরক্ষর নবী এবং তাঁর অধিকাংশ অশিক্ষিত, অমার্জিত, অসভ্য বেদুইন সাঙ্গপাঙ্গরা ভগ্নাংশের কিছুই জানত না। তাই যেভাবে খুশি সংখ্যা বলে গেছে, কিন্তু নবীর জীবদ্দশায় তা যাচাই করে দেখেনি।

এখন প্রশ্ন হতে পারে, এই আধুনিক যুগে ইসলামী দেশসমূহে এই বিচিত্র ইসলামী উত্তরাধিকার আইন কেমন করে চালানো হচ্ছে? এর উত্তরও ইসলামিস্টরা করে দিয়েছে — আরও বিচিত্রভাবে। এই সব ছলচাতুরী হাস্যকর ছাড়া কিছুই নয়। তাদের এই প্রক্রিয়া যে অঙ্কশাস্ত্রের মৌলিক নীতি লঙ্ঘন করে, তা তাদেরকে কে বোঝাবে? আগ্রহী পাঠকেরা যে কোনো ইসলামী সাইটে গিয়ে ইসলামিস্টদের এই ছলাকলা দেখে নিতে পারেন। এই অদ্ভুত হিসাবব্যবস্থা শত শত বৎসর যাবত উপমহাদেশের নির্দোষ সাধারণ মুসলিমদের পারিবারিক আইন হিসেবে তাদের গলায় ঝুলছে। এই অযৌক্তিক নিয়ম থেকে পরিত্রাণের কোনো আশু সম্ভাবনাই নেই। তাফসীর পড়ে আরও অবাক হতে হয়। আল্লাহ্‌ পাকের (নবী মুহাম্মদ পড়ুন) পাটিগণিতের দৌড়ের বিব্রতকর অবস্থা রক্ষা করতে এই সব তাফসিরকাররা নিজের মনগড়া ভাষ্য দিয়ে গেছেন, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোরানের সাথে মোটেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই প্রসঙ্গে আগ্রহী পাঠক ইবনে কাসীরের তাফসির পড়তে পারেন। 

আল্লাহ্‌র ব্যাপ্তিকালের হিসাব

আল্লাহ্‌র সময়ের হিসাব করেন কীভাবে? আমরা হয়ত মনে করি, আল্লাহ্‌র সময়ের হিসাবে আমাদের পার্থিব হিসাবের মতই। কিন্তু এই ধারণা সঠিক নয়। দেখা যাক আল্লাহ্‌ পাক কী লিখেছেন আয়াত ২২:৪৭-এ:
২২:৪৭ তারা আপনাকে আযাব ত্বরান্বিত করতে বলে। অথচ আল্লাহ্‌ কখনও তাঁর ওয়াদা ভঙ্গ করেন না। আপনার পালনকর্তার কাছে একদিন তোমাদের গণনার এক হাজার বছরের সমান
এই আয়াতে আল্লাহ বলেছেন

আল্লাহ্‌র ১ দিন = মানুষের ১ ০০০ বছর।

তার অর্থ আল্লাহ্‌র ২৪ ঘণ্টা = মানুষের ১ ০০০ বছর

অর্থাৎ, আল্লাহ্‌র ১ ঘণ্টা = মানুষের ১ ০০০/২৪ = ৪১.৭ বছর

এভাবে হিসাব করলে আমরা পাই 

আল্লাহ্‌র ১ মিনিট = মানুষের ০.৭ বছর বা ২৫৬ দিন

আল্লাহ্‌র ১ সেকেণ্ড = মানুষের ০.০১১ বছর বা ৪ দিন
৩২:৫ তিনি আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত সমস্ত কর্ম পরিচালনা করেন, অতঃপর তা তাঁর কাছে পৌঁছবে এমন এক দিনে, যাঁর পরিমাণ তোমাদের গণনায় হাজার বছরের সমান।
৭০:৪ ফেরেশতাগণ এবং রূহ আল্লাহ্‌ তাআলার দিকে ঊর্ধগামী হয় এমন একদিনে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর।
উপসংহার

এই প্রবন্ধে দেখা যায়, আল্লাহ্‌ পাক পাটিগণিতের অনেক মৌলিক নিয়ম জানেন না। যেমন পরিসংখ্যান তত্ত্ব, সাধারণ যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ ইত্যাদিতেও আল্লাহ পাক পারদর্শী নন। তারপর আছে সংখ্যা লেখার পদ্ধতি। বিশাল সংখ্যা লেখার জন্য সাধারণত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়—অর্থাৎ সংখ্যাকে দশ-এর সুচক বা ১০ এর ঘাত দিয়ে লেখা হয়। উদাহরণ হচ্ছে—বিলিয়ন, ট্রিলিয়ন...ইত্যাদি, যদিও আল্লাহ্‌রই সৃষ্ট মানবকূল এই পদ্ধতি ব্যবহার করে আসছে—যুগ যুগ ধরে। সবকিছুই যদি আল্লাহ্‌র ইচ্ছাতে হয়, তা’হলে এটা কেমন করে সম্ভব যে, যা মানুষ জানে—তা আল্লাহ্‌ পাক তা জানেন না? 

সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়েও আল্লাহ্‌ মহাবিভ্রান্তিতে আছেন। তাঁর সৃষ্টিরহস্যের যে সমীকরণ, তারও তিনি সমাধান কেমন করে করতে হয়, তা জানেন না। তারপর তাঁরই সৃষ্ট বর্ষপঞ্জী নিয়ে তিনি মহাবিব্রত—যার কুফল আজও সমগ্র ইসলামী জগৎ পাচ্ছে—অর্থাৎ ইসলামী আচার অনুষ্ঠান, রোজা, হজ্জ্ব, ঈদ—এই সব একক দিনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। এই ব্যাপারটা মাছের বাজারের মত হয়ে গেছে—যার যা ইচ্ছে, সেই মতো ফতোয়া দিয়ে বেড়াচ্ছে, যা অনেক সময়ই পরস্পরবিরোধী হয়ে যাচ্ছে। তাই বলতেই হয় যে ইসলামী বর্ষপঞ্জী আধুনিক যুগে মোটেই নির্ভরযোগ্য নয়।

এটা স্বীকার্য যে, আধুনিক দশমিক পদ্ধতিতে যোগ, বিয়োগ, গুণ ভাগ, সরলকরণ ইত্যাদি বুনিয়াদী পাটিগণিতের নিয়ম সহজ নয়। এই সব দক্ষতা অর্জনের জন্যই বিদ্যার্থীরা অনেক বছর অতিবাহিত করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তারপরেও অনেকেই রয়ে যায় অপারদর্শী। সেইজন্যেই বিশ্বের সর্বত্রই মৌলিক পাটিগণিত বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে পাঠ করতে হয় অতি অল্প বয়সেই। আমরা অবাক হয়ে দেখি যে, আল্লাহ্‌ পাকও এই বিদ্যায় অজ্ঞ। পাটিগণিতে আল্লাহ্‌র দৌড় ধরা পড়ে শতকরা হিসাবে এবং ভগ্নাংশের হিসাবে। এই সব গণনার জন্য দরকার উৎপাদক, ল সা গু, গ সা গু ইত্যাদির জ্ঞান। বোঝা যাচ্ছে, আল্লাহ্‌ পাক তাও জানেন না।

আল্লাহ্‌ পাক কোরানে (৭:১৫৮, ২৯:৪৮) লিখেছেন যে, তাঁর প্রিয়তম সৃষ্টি নবী করীম ছিলেন নিরক্ষর। নিরক্ষরের অর্থ যে অশিক্ষিত, তা নয়। তবে নবী যে পাটিগণিতের কোনো নিয়ম জানতেন না, তা পরিষ্কার। এছাড়াও তাঁর বেশিরভাগ সাহাবীও (সাঙ্গ-পাঙ্গরা) ছিলেন নিরক্ষর ও আনুষ্ঠানিক শিক্ষাবর্জিত। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, আল্লাহ পাকও নিরক্ষর ও অশিক্ষিত। কিন্তু ইসলাম বলে, আল্লাহ্‌ পাক সবজান্তা, সর্বশক্তিমান। তাই যদি সত্যি হয়, তবে স্বীকার করতেই হয় যে, কোরান আল্লাহ্‌র লিখিত কিতাব নয়। কোরান নবী মুহাম্মদ এবং তাঁর অনুসারীদেরই লেখা।

সমাপ্ত

সূত্র:

আজকাল ইসলামের বেশির ভাগ মৌলিক গ্রন্থ বিভিন্ন ওয়েব সাইটে পাওয়া যাচ্ছে। দেখতে পারেন:





Alim CD ROM

Jalalu’d-Din Al‑Mahali and Jalal’ud‑Din As‑Suyuti. Tafsir Al‑Jalalyn, translated in English by Aisha Bewley. Dar Al‑Taqwa Ltd. 7A Melcombe Street, Baker Street, London NW1 6AE, 2007. ISBN: 1‑870582‑61‑6