২৮ নভেম্বর, ২০১৬

সত্যিকারের ডাইনিদের গল্প - ৩

লিখেছেন সরকার আশেক মাহমুদ

(ছোটবেলার রূপকথার বইতে জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া ভাই-বোনদের ডাইনি বুড়ির খপ্পরে পড়ার কাহিনী আপনারা সবাই হয়ত পড়েছেন। অথবা শুনেছেন হয়ত, ঝাড়ুতে ভর করে কীভাবে কীভাবে জাদুকরী উড়ে যেতে পারে আকাশে। আধুনিক রূপকথার হ্যারি পটারের কাহিনীতেও আমরা জাদুর বলে ঝাড়ুতে ভর করে উড়ে যাবার দৃশ্য দেখতে পেয়েছি। এই গল্পগুলো আমাদের জন্য যতই বিনোদনদায়ক হোক না কেন, এই জাতীয় গল্পের ঐতিহাসিক উৎসস্থলে ফিরে গেলে আমাদের নৃশংসতা আর বর্বরতা দেখে আঁতকে উঠতে হবে। মানুষের অজ্ঞতার যুগে ধর্মান্ধতার বাড়াবাড়ি পশ্চিমা বিশ্বের মানুষকেও কীভাবে ভয়ানক বর্বরতার দিকে ঠেলে দিয়েছিল, তা থেকে উঠে আসা পশ্চিমা বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতির সাথে তুলনা করতে গেলে যা কিনা অভাবনীয় মনে হবে। সেই সাথে আমাদের ভাবতে সাহায্য করে - আমাদের অজ্ঞতা, অন্ধবিশ্বাস এবং অযৌক্তিক ভীতি কীভাবে আমাদের ঠেলে দিতে পারে সহিংসতার দিকে।)

ডাইনি গল্প তিন: অষ্ট্রিয়া 

কোনো ডাইনিকে বাঁচতে দিয়ো না। (বাইবেল, যাত্রাপুস্তক ২২:১৮)

১৬৭৫ সাল থেকে ১৬৯০ সাল ব্যাপী অস্ট্রিয়ার Salzburg-এর একটা ঘটনা। ১৬৭৫ সালে Barbara Kollerin নাম্নী এক মহিলাকে চুরির এবং জাদু করার অভিযোগে গ্রেফতার করা হল। নির্যাতনের সময় সে স্বীকার করল যে, তার ছেলে Paul Jacob Koller শয়তানের সাথে আঁতাত করেছে এবং তার সঙ্গী এই বিষয়ে স্বীকারোক্তি প্রকাশ করে বর্ণনা করে এবং বলে, জেকব একজন ২০ বছর বয়সের যুবক এবং তার মা তাকে চুরি, ভিক্ষা করা এবং প্রতারণা করা শিখিয়েছে। Barbara Kollerin-কে ১৬৭৫ সালে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় এবং কর্তৃপক্ষ তার ছেলেকে গ্রেফতারের জন্য হুলিয়া জারি করে এবং কালক্রমে এই জেকব Wizard Jackl or Magician Jackl বা Jäckel নামে পরিচিত হয়। (জার্মান - Schinderjackl /"Zaubererjackl")

১৬৭৭ সালে কর্তৃপক্ষ জানতে পারে, Magician Jackl মরে গেছে। তবে তারা ১২ বছর বয়সের (Dionysos Feldner) একজন প্রতিবন্ধী ভিক্ষুককে ধরে আনে, যার নাম দেয়া হয় dirty animal এবং দাবি করা হয় যে, তার সাথে তিন সপ্তাহ আগে জাদুকর Jackl এর দেখা হয়েছিল। অত্যাচারের সময় এই শিশু-ভিক্ষুক বলে যে, জাদুকর Jackl বস্তির একদল গরীব ভিক্ষুক শিশু এবং কিশোরদের নেতা। এবং সে তাদের কালো জাদু শিখিয়েছে। এই খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এবং গরীব গৃহহীন শিশু-কিশোর ভিক্ষুকদের গণগ্রেফতার শুরু হয়। আর এই অসহায় টোকাইদের ওপরে যতো বেশি অত্যাচার করা হয়, জাদুকর Jackl সম্পর্কে তত বেশি গুজব বাড়তে থাকে। বলা হল, এই জাদুকর অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে এবং ইঁদুরদের ওপর জাদু করে কৃষকদের ফসল নষ্ট করে দিতে পারে। এক পর্যায়ে এটাও বলা হল যে, জাদুকর Jackl একজন খুনি এবং সে এত ভয়ানক যে, তাকে গ্রেফতার করা ঠিক হবে না। সে এক সময় শহরের ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত জাদুকর হিসেবে প্রচারিত হয়। যদিও এই কাল্পনিক জাদুকর Jackl-কে কখনই গ্রেফতার করা হয়নি, তবে বিপুল সংখ্যক গরীব শিশু-কিশোরদের ধরে আনা হয় এবং তাদের ওপর আগের বছরের খারাপ আবহাওয়ার জন্য দোষারোপ করা হয়।

সর্বমোট ১৩৯ জনকে হত্যা করা হয় জাদুকর Jackl-এর অনুসারী অভিযোগ দিয়ে। তাদের মধ্যে ৩৯ জন শিশু ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী। ৫৩ জন ১৫-২১ বছর বয়সী। ১১৩ জন পুরুষ, বাকিরা নারী। witchcraft বিচারের কলঙ্কজনক ইতিহাসে এটা ছিল অস্বাভাবিক একটি অধ্যায়, কারণ অধিকাংশ ছিল ভুক্তভোগী ছিল পুরুষ। সবচেয়ে কম বয়সের Hannerl ছিল ১০ বছর বয়সী এবং সবচেয়ে বেশি বয়সের ছিল Margarethe Reinberg ৮০ বছর বয়সী।

প্রথমত, তাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে নির্যাতন করা হয়েছে এবং আগুনে পোড়ানো হয়েছে। কিছু সংখ্যক মানুষকে জীবন্ত জ্বালানো হয়েছে মৃত্যু নিশ্চিত করা পর্যন্ত। কাউকে কাউকে ফাসি দেয়া হয়েছে, কারো কারো গলা কেটে ফেলা হয়েছে। কারো কারো হাত কেটে জ্বলন্ত লোহা দিয়ে পোড়ানো হয়েছে।

জার্মান কবি Friedrich Spee বলেছিলেন “... If all of us have not confessed ourselves witches, that is only because we have not all been tortured." কিন্তু Spee এই উপসংহারে নিজে নিজে উপনীত হননি। তার এক বন্ধু ছিলেন Duke of Brunswick, যিনি ডাইনি বলে অভিযুক্ত এক নারীকে শৈল্পিক উপায়ে নির্যাতন এবং জেরার ব্যবস্থা করছিলেন তাঁর উপস্থিতিতে। ঐ নারী তখন বলতে শুরু করে যে, সে দেখেছে যে Spee নিজে তাঁর আকৃতি পরিবর্তন করে নেকড়ে, ছাগল এবং অন্যান্য পশুতে পরিবর্তিত হযেছে এবং ডাইনীদের সাথে মিশে জন্ম দিয়েছে অসংখ্য শিশু, যাদের মাথা ব্যাঙের মতো এবং পা গুলো মাকড়শার মতো। Spee আসলেই বিশ্বস্ত বন্ধুর সান্নিধ্যে ছিলেন বলে তাকে অভিযুক্ত হতে হয়নি। আর তাই তড়িঘড়ি করে তিনি ১৬৩১ সালের বই Cautio Criminalis রচনা করেন, যেখানে তিনি উল্লেখ করেন ডাইনি বিচার কেন বস্তুত অবিচার ও তা অন্যায্য। Spee ছিলেন প্রথম সৌভাগ্যবান ব্যক্তি, যিনি ডাইনী স্বীকারোক্তি আদায়ের নামে নির্যাতনের সমালোচনা করেও পার পেয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর আগে এই রকম বিচার প্রক্রিয়ায় সন্দেহপোষনকারীদের ওপর জাদুকরী এবং ডাইনি-বাজির অভিযোগ এনে হত্যা করা হয়েছিল । 

বার্ট্রান্ড রাসেল যেমনটা বর্ণনা করেছেন: “কিছু কিছু সন্দেহবাদী সাহস করে প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল - এই ঝড়, বজ্রপাত কিংবা শিলাবৃষ্টি কীভাবে কোনো নারীর কারসাজিতে হতে পারে? এই ধরনের প্রকাশ্যে সন্দেহবাদীদের রেহাই দেয়া হয়নি। ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে University of Treves এর রেক্টর জনাব Flade, যিনি কিনা প্রধান বিচারক হিসেবে অসংখ নারী ডাইনি অভিযুক্ত করে শাস্তি দিয়েছেন, একটা পর্যায়ে বলে বসলেন, হয়তো এই নারীরা নিজেদের ডাইনি হিসেবে স্বীকার করেছে তাদের ওপর করা অসহ্য অত্যাচার সহ্য করতে না পারার কারণে। কিন্তু ধর্মীয় রীতিসম্মত বিচারপন্থার ওপর সন্দেহ আরোপ করার জন্য এই বিচারকের ওপর অভিযোগ আনা হল যে, তিনি তাঁর আত্মাকে শয়তানের কাছে বেচে দিয়েছেন। তারপর Flade-কে অত্যাচারের সাথে জেরা করা শুরু করা হল স্বীকারোক্তি আদায় করা পর্যন্ত। ১৫৮৯ সালে তাঁকে ফাঁসি দিয়ে তারপর আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হয়।” (B. Russell, Religion and Science (1935; reprint, Oxford: Oxford Univ. Press, 1997), 95.)

ক্যাথলিক চার্চ ১৮১৬ সালে Pope Pius VII-এর সময়ে অবশেষে এই নির্যাতন-প্রক্রিয়াকে সর্বপ্রথম অফিশিয়ালি নিন্দা প্রকাশ করে।

যেসব আবহাওয়াগত প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা রোগ-শোক বা অকস্মাৎ মৃত্যুর কারণে জাদুকর বা ডাইনিদের অভিযুক্ত করা হতো, বর্তমান কালে বিজ্ঞানের অগ্রগতির কারণে তার অনেক কিছুই মানুষ জানে ও বোঝে। কিন্তু অজানা ও অনিশ্চয়তার কারণে ধর্মীয় রীতিতে মানুষহত্যা বা নির্যাতন কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদেরকে বিজ্ঞানভিত্তিক যৌক্তিক অনুসন্ধান প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে। আদিম যুগে মূর্খদের রচিত কোনো পরস্পরবিরোধিতাময় বাণী সম্বলিত ধর্মগ্রন্থের মধ্যে সবকিছুর উত্তর আছে ভেবে নিলে হানাহানি চলতেই থাকবে এবং সভ্যতা ও পৃথিবীর অগ্রগতি অসম্ভব হয়ে পড়বে।