৩ অক্টোবর, ২০১৬

খায়বার যুদ্ধ-১৩: মুহাম্মদ (সাঃ) এর উদারতা ও সহানুভূতি!: কুরানে বিগ্যান (পর্ব-১৪২): ত্রাস, হত্যা ও হামলার আদেশ – একশত ষোল

লিখেছেন গোলাপ

(আগের পর্বগুলোর সূচী এখানে)

"যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।" 

স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও তাঁর অনুসারীরা অমানুষিক নৃশংসতায় আদি মদিনাবাসী বনি নাদির গোত্রের (পর্ব: ৫২) যে সমস্ত মানুষকে তাঁদের শত শত বছরের পৈত্রিক ভিটে-মাটি থেকে প্রায় এক বস্ত্রে বিতাড়িত করেছিলেন (পর্ব: ৭৫), অনন্যোপায় হয়ে তাঁদের কিছু লোক আশ্রয় নিয়েছিলেন খায়বারে। কিনানা বিন আল-রাবি নামের তাঁদেরই এক গোত্রনেতাকে মুহাম্মদ কী কারণে অমানুষিক নৃশংসতায় নির্যাতন ও খুন করার আদেশ জারি করেছিলেন, তার বিস্তারিত আলোচনা আগের পর্বে করা হয়েছে।

আবু আল-হুকায়েকের পরিবারের অর্থ-ভাণ্ডার, তাদের সর্বপ্রকার অলংকার ও উটের চামড়ার থলিতে তাঁদের যে গুপ্তধনগুলো মুহাম্মদের করাল গ্রাস থেকে কিনানা রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন, তা মুহাম্মদের কাছে নিয়ে আসা হয়। কী ছিল সেই সম্পদ?   

আল-ওয়াকিদির (৭৪৮-৮২২ খ্রিষ্টাব্দ) অব্যাহত বর্ণনার পুনরারম্ভ: [1]
পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ১৪১) পর:

'আল্লাহর নবীর কাছে নিয়ে আসা ও তাঁর সম্মুখে রাখা উটের চামড়ার থলিতে কী ছিল, তা যাঁরা প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তাঁদের একজনের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে হিলাল বিন উসামা হইতে > খালিদ বিন রাবিয়া বিন আবি হিলাল আমাকে বলেছেন। ভেতরে যা ছিল, তার অধিকাংশই হলো:

[১] সোনার ব্রেসলেট ও চুড়ি,
[২] সোনার নূপুর, গলার হাড় ও কানের দুল,
[] মণি দিয়ে তৈরি অঙ্গুলি রিং, যা সোনা দিয়ে তিলকিত করা।

আল্লাহর নবী মণি-রত্নের বিন্যাস দেখেন ও সেগুলো তাঁর কিছু পরিবার সদস্যদের দান করেন, আয়েশা অথবা তাঁর কন্যাদের মধ্যে একজনকে। সে তা গ্রহণ করে, কিন্তু দিনের এক ঘণ্টার বেশি তা তার কাছে না রেখে যাদের প্রয়োজন আছে তাদের ও বিধবা মহিলাদের মধ্যে তা বিতরণ করে। কিছু জিনিস খরিদ করে আবু আল-শালম। যখন সন্ধ্যা হয়, তখন আল্লাহর নবী তাঁর বিছানায় আসেন কিন্তু ঘুমাতে পারেন না। পরদিন প্রত্যুষে নাস্তার সময় তিনি আয়েশার কাছে আসেন - যদিও সেই রাতটি আয়েশার ভাগের রাত ছিল না - অথবা আসেন তাঁর কন্যার কাছে, ও বলেন, "মণি-রত্নগুলো ফেরত দাও, কারণ এগুলো প্রকৃতপক্ষে আমার জন্য নয় ও তোমার এতে কোনো অধিকার নেই।" সে তা দিয়ে কী করেছে, তা তাঁকে জানায়। তিনি আল্লাহর প্রশংসা আদায় করেন, অতঃপর ফিরে  যান।

সাফিয়া বিনতে হুয়েই যা বলতো, তা হলো: গলার সেই হারগুলো ছিলো কিনানার কন্যাদের জন্য। কিনানা বিন আবি আল-হুকায়েক সাফিয়া-কে বিবাহ করেছিল। কাতিবা আগমনের পূর্বেই আল্লাহর নবী তাকে [সাফিয়া] বন্দী করেন। আল্লাহর নবী তাকে নিয়ে আসার জন্য বেলালকে তার ঘোড়াসহ পাঠান। যে লোকদেরকে হত্যা করা হয়েছিল, তাদের পাশ দিয়ে বেলাল তাকে ও তার কাজিন-কে নিয়ে আসে, কাজিন-টি তীক্ষ্ণ আর্তনাদ করে ওঠে। বেলাল যা করেছে, তা আল্লাহর নবী দারুণ অপছন্দ করেন।

তিনি বলেন, "তোমার উদারতা কি লোপ পেয়েছে, যে-কারণে তুমি এক যুবতী মেয়েকে মৃত মানুষদের পাশ দিয়ে নিয়ে এসেছো?" বেলাল বলে, "হে আল্লাহর নবী, আমি চিন্তা করিনি যে, আপনি তা ঘৃণা করবেন। তাদের লোকদের ধ্বংস হওয়ার দৃশ্য আমি তাকে দেখাতে চেয়েছিলাম।" আল্লাহর নবী মেয়েটিকে বলেন, "এ কেবল এক শয়তান।"

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের (৭০৪-৭৬৮ সাল) বর্ণনা: [2] [3]

'যখন আল্লাহর নবী বানু আবুল হুকায়েকের মালিকানাধীন আল-কামুস দুর্গটি জয় করেন, সাফিয়া বিনতে হুয়েই বিন আকতাব-কে অন্য এক মহিলার সঙ্গে তাঁর কাছে হাজির করা হয়। বেলাল ছিল সেই লোক, যে তাদের কে নিহত ইহুদিদের পাশ দিয়ে নিয়ে এসেছিলো; অতঃপর সাফিয়ার সঙ্গের মহিলাটি যখন তাদেরকে দেখে, সে তীক্ষ্ণ চিৎকার শুরু করে, নিজ গালে চপেটাঘাত করে ও তার মাথার ওপর ধুলাবালি ছিটায়। যখন আল্লাহর নবী তাকে দেখেন, তিনি বলেন, "এই ডাইনিকে আমার কাছ থেকে দূরে সরাও (Take this she-devil away from me)।" তিনি হুকুম করেন যে, সাফিয়াকে যেন তাঁর পেছনে রাখা হয় ও তিনি তাঁর ঢিলা বড় জামাটা তার ওপর নিক্ষেপ করেন, যাতে মুসলমানরা জানতে পারে যে, তিনি তাঁকে তাঁর নিজের জন্য পছন্দ করেছেন।

আমি শুনেছি, যখন ইহুদি মহিলাটি এমন আচরণ করেছিলেন, তখন আল্লাহর নবী বেলালকে বলেছিলেন, "বেলাল, এই দুই মহিলাকে তাদের মৃত স্বামীদের পাশ দিয়ে যখন নিয়ে আসছিলে, তখন তোমার কী কোন সহানুভূতি হয়নি?"

- অনুবাদ, টাইটেল, [**] ও নম্বর যোগ - লেখক।

>>> মুহাম্মদ ইবনে ইশাক, আল-ওয়াকিদি ও আল-তাবারীর ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় আমরা জানতে পারি যে, কিনানা বিন আবি আল-হুকায়েক ছিলেন সাফিয়া বিনতে হুয়েই বিন আখতাবের স্বামী ও তাঁদের সম্পদগুলোর মধ্য থেকে মুহাম্মদ যে গলার হারগুলো হস্তগত করেছিলেন, সেই হারগুলো ছিল কিনানার কন্যাদের জন্য।  কিনান-কে নির্যাতন ও খুন ও তাঁদের সমস্ত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি হস্তগত করার পর মুহাম্মদ সাফিয়া ও তাঁর কাজিনকে তাঁর কাছে ধরে নিয়ে আসার জন্য বেলালকে আদেশ করেন। মুহাম্মদের নির্দেশে তাঁর অনুসারীরা খায়বারের নিরপরাধ জনগণের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে অমানুষিক নৃশংসতায় যাদেরকে হত্যা করেছিলেন, বেলাল সেই মৃতদেহগুলোর পাশ দিয়ে সাফিয়া ও তাঁর কাজিন-কে নিয়ে আসে। এই বীভৎসতা দৃশ্যে সাফিয়ার কাজিন  তীক্ষ্ণ আর্তনাদ শুরু করে, নিজ গালে চপেটাঘাত করে ও তার মাথার ওপর ধুলাবালি ছিটিয়ে বিলাপ ও ক্রন্দন শুরু করে। মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের বর্ণনায় যা আমরা জানতে পারি, তা হলো, যখন এই আর্তনাদগ্রস্ত মহিলাটিকে মুহাম্মদের কাছে ধরে নিয়ে আসা হয়, তখন মুহাম্মদ বলেন, "এই ডাইনিকে আমার কাছ থেকে দূরে সরাও!" ও অতঃপর তিনি তাঁর জামাটি সাফিয়ার ওপর নিক্ষেপ করে মুসলমানদের জানিয়ে দেন যে, সাফিয়াকে তিনি পছন্দ করেছেন।    

আদি উৎসের ওপরে বর্ণিত আল-ওয়াকিদির বর্ণনায় আমরা জানতে পারি যে বেলাল আশা করেছিলেন যে, তার এই কর্মটি মুহাম্মদ ঘৃণা করবেন না। কিন্তু, মুহাম্মদ তা অপছন্দ করেন ও বেলালের কাছে প্রশ্ন রাখেন, মৃত স্বামীদের পাশ দিয়ে তাঁদেরকে নিয়ে আসার সময় বেলালের কোনো সহানুভূতি হয়েছিলো কি না। বদর যুদ্ধে বেলাল তার প্রাক্তন মনিব উমাইয়া বিন খালাফ ও তাঁর ছেলে আলী-কে কী অমানুষিক নৃশংসতায় খুন করেছিলেন তার বিস্তারিত আলোচনা 'বদর যুদ্ধ: নৃশংস যাত্রার সূচনা (পর্ব: ৩২)' পর্বে করা হয়েছে।

প্রশ্ন হলো:
“খায়বার যুদ্ধ উপাখ্যানের সকল ঐতিহাসিক ঘটনা প্রবাহের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবেচনায় কোন ব্যক্তিটিকে অধিক উদারতা ও সহানুভূতি বিবর্জিত ব্যক্তি হিসাবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে?”

খায়বারের নিরপরাধ জনপদবাসীদের আক্রমণ, খুন, জখম, তাঁদের সমস্ত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি লুট ও তাঁদের বন্দী করে দাস ও যৌন-দাসীতে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নকারী অধিনায়ক (mastermind and leader) মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ? নাকি তাঁর অনুগত অনুসারী হযরত বেলাল (রাঃ)?

বিচারের ভার পাঠকদের ওপরই ছেড়ে দিলাম।

ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে আল-ওয়াকিদির মূল ইংরেজি অনুবাদের অংশটিও সংযুক্ত করছি। ইবনে ইশাকের মূল ইংরেজি অনুবাদ ইন্টারনেটে বিনামূল্যে ডাউনলোড লিঙ্ক: তথ্যসূত্র [2]

The detailed narrative of Al-Waqidi (continued): [1]

‘Khalid b Rabia b Abi Hilal related to me from Hilal b Usama from one of those who observed what was in the skin of the camel, which was brought and laid before the Messenger of God. Most of it consisted of bracelets and bangles of gold, anklets, necklaces and earings of gold, a string of gems and emeralds, rings of gold, toe rings of onyx of Zafar dappled with gold. The Messenger of God saw an arrangement of Jewelery and gave it to some of his family, either to Aisha or one of his daughters. She accepted it but did not keep it for more than an hour of the day, when she divided it among the people of need and the widows. Abu al-Shalm bought bits of it. When it was evening the Messenger of God came to his bed and could not sleep. The next morning at breakfast he came to Aisha – though it was not her night – or to his daughter, and said, “Return the Jewelry for indeed it is not for me, and you have no right to it either.” She informed him of what she had done with it. He praised God and went back.

Safiyya bt Huyayy used to say: That was the necklace for the daughter of Kinana. Safiyya was married to Kinana b Abi al-Huqayq. The Messenger of God had taken her prisoner before he reached al-Katiba. The Messenger of God sent her with Bilal to his ride.  Bilal passed by the killed with her and her cousin, and her cousin screamed. The Messengr of God detested what Bilal did. He said, “Has graciousness left you that you take a young girl past the dead?” Bilal said, “O Messenger of God, I did not think that you would hate that. I wanted her to see the destruction of her people.” The Messenger of God said to the Girl, “This is only a devil.”  

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] “কিতাব আল-মাগাজি”- লেখক:  আল-ওয়াকিদি (৭৪৮-৮২২ খৃষ্টাব্দ), ed. Marsden Jones, লন্ডন ১৯৬৬; ভলুম ২, পৃষ্ঠা ৬৭৩-৬৭৪; ইংরেজি অনুবাদ: Rizwi Faizer, Amal Ismail and Abdul Kader Tayob; ISBN: 978-0-415-86485-5 (pbk); পৃষ্ঠা ৩৩১

[2] “সিরাত রসুল আল্লাহ”- লেখক: মুহাম্মদ ইবনে ইশাক (৭০৪-৭৬৮ খৃষ্টাব্দ), সম্পাদনা: ইবনে হিশাম (মৃত্যু ৮৩৩ খৃষ্টাব্দ), ইংরেজি অনুবাদ: A. GUILLAUME, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, করাচী, ১৯৫৫, ISBN 0-19-636033-1, পৃষ্ঠা ৫১৪-৫১৫

[3] “তারিক আল রসুল ওয়াল মুলুক”- লেখক: আল-তাবারী (৮৩৮-৯২৩ খৃষ্টাব্দ), ভলুউম ৮, ইংরেজী অনুবাদ: Michael Fishbein, University of California, Los Angeles, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৮৭, ISBN 0-7914-3150—9 (pbk), পৃষ্ঠা (Leiden) ১৫৮১-১৫৮২