২১ অক্টোবর, ২০১৬

ইসলামী পাটিগণিত - ৩

লিখেছেন আবুল কাশেম


ইসলামী বর্ষপঞ্জী বা ক্যালেণ্ডার 

প্রতি বৎসর ইসলামী বিশ্বে এক দারুণ বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়, যখন দেখা যায় যে, বিভিন্ন দেশে ঈদ পালিত হচ্ছে বিভিন্ন দিনে। যেদিন সৌদি আরবে ঈদ পালিত হয়, হয়তো তার এক বা দুই দিন পরে বাংলাদেশে ঈদ পালিত হয়। অনেক সময় এই সময়ের তারতম্য দুইদিনেরও বেশি হতে পারে। রমজান বা রোজা রাখা নিয়েও এই পরিস্থিতি। আমার জানা মতে, বর্ষপঞ্জী নিয়ে ইসলাম ছাড়া এই ধরণের বিদঘুটে পরিস্থিতি অন্য কোনো ধর্ম বা সমাজব্যবস্থায় নেই। এই বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির কোনো সমাধান আজ পর্যন্ত ইসলামী বিশ্ব করেনি বা করতে রাজি নয়। তার কারণ কী? আল্লাহ পাক কি এই ধরণের বিভ্রান্তি চান? 

আমরা দেখব, কেন এই সমস্যা কেয়ামত অবধি বিদ্যমান থাকবে। ইসলামী পাটিগণিত যে কেমন অনির্ভরযোগ্য, তা এই ইসলামী বর্ষপঞ্জীর হাল থেকেই বোঝা যাবে।

ইসলামী বর্ষপঞ্জী শুরু হয় খ্রিঃ ৬২২ সালে (উইকিপিডিয়া); এই বর্ষপঞ্জী শুরু হয় নবী মুহাম্মদের মদিনায় হিজরির দিন থেকে। এই দিন, যথা ১৭ই জুলাই ৬২২ থেকে এই হিজরি বর্ষপঞ্জী শুরু। অর্থাৎ, ১৭ই জুলাই ৬২২ হচ্ছে ইসলামী হিজরি পহেলা (১) মুহররম হিজরি ১ সন। হিজরি বর্ষপঞ্জীতে বারোটি মাস নির্ধারিত হয়েছে: যথা—মুহররম, সফর, রবিউল-আওয়াল, রবিউল-আখির, জামাদউল-আওয়াল, জামাদিউল-আখির, রজব, শাবান, রমজান, জ্বেল-ক্বদ, জ্বেল-হজ্ব।

ইসলামের আগমনের অনেক আগে থেকেই আরব বেদুইনরা ঠিক করেছিল যে, তারা সারা বছর রক্তপাত করবে না। তাই তারা বৎসরের চারটি মাসকে ‘নিষিদ্ধ’ বা পবিত্র মাস হিসেবে স্বীকৃতি জানিয়েছিল। এই চারটি মাস হচ্ছে—জ্বেল-ক্বদ, জ্বেল-হজ্ব, মুহররম এবং রজব। মুহাম্মদের আগমনের পূর্বে কোনো আরব গোষ্ঠী কখনই এই নিয়ম ভঙ্গ করেনি, যতই শত্রুতা থাকুক না কেন বিভিন্ন গোত্রের মাঝে। যতটুকু জানা যায়, একমাত্র নবী মুহাম্মদই একতরফাভাবে অনেক সময় এই নিয়ম ভঙ্গ করেছেন—এই সব নিষিদ্ধ মাসগুলিতে যুদ্ধ চালিয়েছেন এবং রক্তপাত ঘটিয়েছেন।

আল্লাহ পাক নিজেই পৌত্তলিক আরবদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এই সব সম্মানের মাসগুলিকে সম্মানের মাস হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছেন।
৯:৩৬ নিশ্চয় আল্লাহ্‌র বিধান ও গণনায় মাস বারটি, আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত। এটিই সূপ্রতিষ্ঠিত বিধান; সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না। আর মুশরিকদের সাথে তোমরা যুদ্ধ কর সমবেতভাবে, যেমন তারাও তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছে সমবেতভাবে। আর মনে রেখো, আল্লাহ্‌ মুত্তাকীনদের সাথে রয়েছেন।
কিন্তু আল্লাহ্‌ পাক কোরানের কোথায়ও পরিষ্কারভাবে জানাননি এই সম্মানিত মাসগুলি কোন কোন মাস।

এখন আমরা দেখব কী বিচিত্র এই ইসলামী বর্ষপঞ্জী।

ইসলামী বর্ষপঞ্জী চান্দ্র বৎসরের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই ব্যবস্থা ইসলামের আগমনের অনেক আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। ইসলামী বর্ষপঞ্জীতে আছে ৩৫৪ অথবা ৩৫৫ দিন। এই তারতম্যের কারণ হচ্ছে—গ্রেগরিয়ান (বর্তমান ইংরাজি) বর্ষপঞ্জীর মতো ইসলামী বর্ষপঞ্জীতেও লিপ-ইয়ারের ব্যাবস্থা আছে। এই ইসলামী লিপ ইয়ার হয় প্রতি সাত বছরে এক বার।

আল্লাহ্‌ তা’আলা কোরানে বলেছেন, ইসলামী বর্ষপঞ্জী গণনা চন্দ্রের ওপর নির্ভর করে।
১০:৫ তিনিই সে মহান সত্তা, যিনি বানিয়েছেন সুর্যকে উজ্জ্বল আলোকময়, আর চন্দ্রকে স্নিগ্ধ আলো বিতরণকারীরূপে এবং অতঃপর নির্ধারিত করেছেন এর জন্য মনযিলসমূহ, যাতে করে তোমরা পার বছরগুলোর সংখ্যা ও হিসাব। আল্লাহ্‌ এই সমস্ত কিছু এমনিতেই সৃষ্টি করেননি, কিন্তু যথার্থতার সাথে। তিনি প্রকাশ করেন লক্ষণসমূহ সে সমস্ত লোকের জন্য যাদের জ্ঞান আছে।
মনে রাখতে হবে চন্দ্রের আবর্তন চক্র (সাইকেল) হচ্ছে ২৮ দিন। সেই মতে, এক বৎসরে ইসলামী দিনের সংখ্যা হওয়া উচিত ১২ গুণ ২৮ = ৩৩৬ দিন।

এখন ৩৫৪ কে ১২ দিয়ে ভাগ করলে আমরা পাই ২৯.৫ দিন।

৩৫৫ কে ১২ দিয়ে ভাগ করলে আমরা পাই ২৯.৫৮ দিন।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, ইসলামী বর্ষপঞ্জী কোনোভাবেই চন্দ্রের আবর্তন-চক্র পালন করছে না।

সেই জন্য কোনো কোনো ইসলামী মাস ধরা হয় ২৯ দিন আর কোনো কোনো ইসলামী মাস ধরা হয় ৩০ দিন—অনেকটা ইংরেজি বর্ষপঞ্জীর পদ্ধতিতে।

তাহলে অসুবিধাটা কোথায়?

লক্ষ্য করুন যে, ইংরেজি মাসগুলোতে কত দিন হবে, তা অনেক আগে থেকেই নির্ধারিত হয়েছে: যেমন, জানুয়ারি - ৩১ দিন, ফেব্রুয়ারি - ২৮ দিন (লিপ-ইয়ার ছাড়া), মার্চ - ৩১ দিন, এপ্রিল - ৩০ দিন...ইত্যাদি। এই পদ্ধতি বিশ্বের সর্বত্র একইভাবে পালন করা হয়। তাই যে সব আচার-অনুষ্ঠান ইংরেজি বর্ষপঞ্জীর ওপর প্রতিষ্ঠিত, সেগুলি প্রতি বছর ঐ একই দিনে পালিত হয়, কোনো ব্যতিক্রম হয় না। তাই ইংরেজি বর্ষপঞ্জী নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কোনো সুযোগ নেই।

কিন্তু ইসলামী গণনা পদ্ধতি এমন নয়। ইসলামী মাসের গণনা শুরু হয় চাঁদ দেখা গেল বা দেখা গেল না এর ওপর। ইসলামী দিন গণনা শুরু হয় সন্ধ্যায়, চাঁদ দেখার পর। যদি মাসের ২৯ দিনে সন্ধ্যায় নতুন চাঁদ দেখা যায়, তবে ঐ মাস হবে ২৯ দিন, আর যদি না দেখা যায়, তবে ঐ মাসটি হবে ৩০ দিন। এই জন্যই কোনো কোনো বছর ২৯টি রোজা হয় আর কোনো কোনো বছর রোজা হয় ৩০ টি, আবার কোনো কোনো বছর ২৮ দিনও। এমনও হয় যে, কোনো বছর দুইবার রমজানের শুরু হয় এবং ঈদও হয় দুইবার। আমাদের জীবদ্দশাতেই হয়তো অনেকেই তা পর্যবেক্ষণ করেছি। লক্ষ্য করবেন যে, এক সময় রমজান পালিত হচ্ছে হাড় কাঁপানো শীতকালে, আবার এক সময় রমজান পালিত হচ্ছে গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড গরমের সময়। আর যখন এক ইসলামী দেশে ঈদ বা রমজান শুরু হয়, অন্য আর এক (এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশেও) দেশে তা হয় না।

ইসলামী বর্ষপঞ্জীর আরও অনেক দ্ব্যর্থকতা বা অস্পষ্টতার পরিচয় পাওয়া যায় এই কয়েকটি আয়াতে:
২৯:১৪ আমি নূহ (আঃ)—কে তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরণ করেছিলাম। তিনি তাদের মধ্যে পঞ্চাশ কম এক হাজার বছর অবস্থান করেছিলেন। অতঃপর তাদেরকে মহাপ্লাবন গ্রাস করেছিল। তারা ছিল পাপী।
১৮:২৫ তাদের উপর তাদের গুহায় তিনশ’ বছর অতিরিক্ত আরও নয় বছর অতিবাহিত হয়েছে।
তাজ্জবের ব্যাপার হচ্ছে আল্লাহ্‌ পাক সরাসরি নির্ভুলভাবে বলতে পারেন না কত সময় লেগেছিল—তাই ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে এই অদ্ভুত ভাষা ব্যবহার করেছেন। এখন চিন্তা করুন চিকিৎসা ক্ষেত্রে অথবা গাড়ি বা বাড়ি কিনবার সময় যদি এই ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হয়, তবে তার পরিণতি কী হতে পারে।

এইসব বিভ্রান্তিমূলক গণনা কিসের ওপর প্রতিষ্ঠিত, তা আল্লাহ্‌ তা’আলা জানাননি। এই বিড়ম্বনা এড়াতে আজকাল অনেক ইসলামী পণ্ডিত বলেন—বৎসরগুলি চন্দ্র এবং সৌর গণনার ওপর। কী বিচিত্র যুক্তি! কিন্তু রূপান্তরিত গণনা করলেও আমরা এই দুই সংখ্যা এক পাব না। এখানে একটা উদাহরণ দিচ্ছি। আয়াত ২৯:১৪ দেখুন: 

আমরা আগেই দেখেছি, এক সৌর বছরে আছে ৩৬৫ দিন আর এক চন্দ্র বছরে আছে ৩৫৪ দিন (লিপ ইয়ার বাদে); মনে রাখতে হবে, এক দিনের সময় মাপ একই হতে হবে অর্থাৎ এক দিন = ২৪ ঘণ্টা তা সৌর বছরই হোক বা চন্দ্র বছরই হোক।

এখন গণনা করা যাক: 
চন্দ্র বছরে ১০০০ বছর গুণ ৩৫৪ = ৩৫৪ ০০০ দিন
সৌর বছরে ৯৫০ বছর গুণ ৩৬৫ = ৩৪৬ ৭৫০ দিন
এই দুই হিসাবের তারতম্য হচ্ছে ৩৫৪ ০০০ বিয়োগ ৩৪৬ ৭৫০ = ৭ ২৫০ দিন
এই তফাতকে সৌর বছরে রূপান্তরিত করা যাক—৭ ২৫০ ভাগ ৩৬৫ = ১৯.৯ বছর বা ১৯ বছর ৩২৯ দিন।

তাহলে ইসলামী পণ্ডিতদের যুক্তির সার্থকতা কোথায়?

এখন আয়াত ১৮:২৫ যে সময়ের কথা আল্লাহ্‌ পাক বলেছেন, তার গণনা করুন ওপরের উদাহরণের মত। দেখুন, কি ফলাফল।

(চলবে)