১১ অক্টোবর, ২০১৬

সাইমুম (উপন্যাস: পর্ব ৭)

লিখেছেন উজান কৌরাগ


কে শোনে কার কথা! আর কথা না বাড়িয়ে আমি সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলাম। ক্ষুধার জ্বালায় মেজাজ বিগড়ে গেছে! সারাদিন না খাইয়ে রেখে সন্ধেবেলা দামড়া খাসির ঠ্যাং খাওয়ার আদর! রাস্তায় বেরিয়ে হাঁটছি আর ভাবছি, কী করি, তেইশ টাকায় আমার এখনকার ক্ষুধা মিটানো অসম্ভব। ধুর শালা, খাবই না! বাড়ির মানুষের প্রতি রাগ আরো জমাট হলো, আর মায়ের প্রতি হলো অভিমান। একদিনের মধ্যেই মা এমন বদলে গেলেন, একদিনের মধ্যেই মাকে কেমন দূরের আর অচেনা লাগছে; ধর্মের এতোই শক্তি যে, মায়ের কাছ থেকে তার সন্তানকে দূরে ঠেলে দেয়! ধর্মের প্রতি মোহগ্রস্ত থেকে মা তার সন্তানকে এভাবে না খাইয়ে কষ্ট দিতে পারেন! আমি খেতে চাইলে মা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে টেবিলে খাবার বেড়ে দেন; আমি যদি মাকে জানাই যে, মা আমার অমুক খাবারটা খেতে ইচ্ছে করছে, তাহলে মা সেদিনই আমাকে সেই খাবার বানিয়ে খাওয়ান; সন্ধেবেলা যদি বলি, "মা, বাইরে নাস্তা খাব", মা বিনাবাক্যে আমার হাতে টাকা ধরিয়ে দেয়। আমার সেই মা আজ হঠাৎ এমন বদলে গেলেন! আমার চোখ ফেটে পানি আসতে চাইছে। না খেয়ে থাকার জন্য না, আমি এমনিভাবে আরো দু'দিন না খেয়ে থাকতেও রাজি আছি; আমার কষ্ট হচ্ছে মায়ের জন্য, মা যে আমার কাছ থেকে দূরে সরে গেলেন। আমি বাবাকে ভয় করি, বাবা আমার বন্ধু নয়, বাবা কেবলই একজন রাশভারি-বদমেজাজি বাবা। তাই বাবা আমাকে দূরে সরিয়ে রাখলেও খুব একটা কষ্ট পাব না। কিন্তু মা তো আমার বন্ধু; আমার যতো আবদার মায়ের কাছে, আমার যতো দুষ্টুমি মায়ের সাথে; সেই মাকে তার ধর্ম আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিল! ধর্মের এতো শক্তি যে, মা-ছেলের সম্পর্কও তার কাছে পরাজিত হয়! আমি কি আর কখনোই আমার মাকে আগের মতো ক’রে পাব, নাকি কাল্পনিক আল্লাহ এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকবে আমার আর মায়ের মাঝখানে?

এইসব কথা ভাবতে ভাবতে ছয় নম্বর বাজার পেরিয়ে প্রশিকা মোড় ছাড়িয়ে অবচেতনেই যেন পৌঁছে গেলাম স্টেডিয়ামের কাছে। এরপর রাস্তা পেরিয়ে ন্যাশনাল বাংলা স্কুলের মাঠে ঢুকে দক্ষিণ দিকের গাছের ছায়ায় গিয়ে বসলাম, তখন ন্যাশনাল বাংলা স্কুলের মাঠের গেট না থাকায় মানুষের প্রবেশ অবাধ ছিল। পা ছড়িয়ে শরীরের ভার দু'হাতে রেখে তাকিয়ে আছি আকাশের দিকে, আকাশে সাদা সাদা মেঘ; কিন্তু আমার দৃষ্টি জুড়ে কেবল সাদা ভাত, শুকনো মরিচ দিয়ে মাখানো আলুভর্তা, পটলভাজা আর ডাল! এই প্রথম আমি অনুভব করলাম যে, মানুষ কী ভীষণ নিঃসঙ্গ আর অসহায়!

একবার ভাবলাম বন্ধু আদিলের বাসায় যাব কি না, ওর বাসা মিরপুর ২ নম্বরেই, হেঁটে যেতে পাঁচ মিনিট সময় লাগবে। পর মুহূর্তেই মনে হলো, না, যাব না। রোজার প্রথম দিনেই অযাচিত অতিথি হ’য়ে ওদেরকে বিরক্ত করবো না। তারপর মনে হলো, পকেটে তেইশ টাকা আছে, হাঁটতে হাঁটতে টেকনিক্যাল যাই, ওখান থেকে বাসে জাহাঙ্গীর নগর ক্যাম্পাসে চলে যাই। আমার বন্ধু অমিত আর জাহিদ হলে থাকে, আরো অনেক সহপাঠীই থাকে। কিন্তু বন্ধু বলতে যা বোঝায়, তারা তা নয়, আমার সত্যিকারের বন্ধু অমিত আর জাহিদ। অবশ্য জাহিদ এখন হলে নেই, ও বাড়িতে গেছে। অমিত আছে হলে। 

জাহিদ সংশয়বাদী আর অমিত নাস্তিক। দু'জনেরই আছে জীবনকে জানার-বোঝার অদম্য কৌতূহল, দু'জনেরই আছে সংবেদনশীল মন। আমাদের তিনজনের বোঝাপড়া চমৎকার। জাহিদ সংশয়বাদী হলেও আমাদের একসাথে পথ চলতে অসুবিধা হয় না, কেননা ওর আছে যুক্তিকে গ্রহণ করার মানসিকতা। 

এর মাঝে ছোট আপুকে ফোন ক’রে জানিয়ে দিয়েছি, ‘আমি ক্যাম্পাসে যাচ্ছি, আজ আর ফিরবো না। আর আমার ফোনে চার্জ নেই, একটু পরই সেলফোন বন্ধ হয়ে যাবে।’ 

ফোনে চার্জ না থাকার কথাটা ডাঁহা মিথ্যে, মিথ্যে কথা আমি বলি না। কিন্তু এই মিথ্যেটা বলতে পেরে আমার দারুণ সুখ অনুভূত হলো। কেননা ফোন খোলা রাখলে বাসা থেকে বাবা-মা কল করবে, বাসায় ফিরতে বলবে। কিন্তু আজ আর আমার বাসায় ফেরার ইচ্ছে নেই, তাই আপুকে কল করার পরই ফোন বন্ধ ক’রে রেখেছি।

হাঁটতে হাঁটতে টেকনিক্যাল চ’লে গেলাম, ওখান থেকে বাসে উঠে সন্ধ্যার মুখে ক্যাম্পাসে পৌঁছতেই আযান শুরু হলো। ক্যাম্পাসের রাস্তা ফাঁকা, খাবার সামনে নিয়ে মাঠে গোল হ’য়ে বা মুখোমুখি ব’সে যারা আজানের অপেক্ষা করছিল খেতে শুরু করেছে। আমি হাঁটতে হাঁটতে দু’একবার রোজাদারদের দিকে তাকালাম, আমাকেও দেখলো কেউ কেউ। সবাই ইফতার করছে, কেবল আমিই একা হেঁটে যাচ্ছি রাস্তা দিয়ে। যারা আমার দিকে তাকাচ্ছে, কী ভাবছে তারা? নিশ্চয় ভাবছে, আমি একটা হিন্দু অথবা খ্রিষ্টান, নাকি একথাও ভাবছে কেউ যে, আমি নাস্তিক! ভাবলে ভাবুক, তাতে আমার কিচ্ছু আসে যায় না। আমি গটগট ক’রে হাঁটা শুরু করলাম অমিতের হলের দিকে। 

অমিতকে রুমেই পেলাম। আমাকে দেখেই অমিত বললো, ‘কী রে, তোর মুখ এমন শুকনো লাগছে কেন? খাসনি কিছু?’ 

অমিত জানে, একজন নাস্তিককে সে রোজা রেখেছে কি না সরাসরি তা জিজ্ঞাসা করা অভদ্রতা এবং তাকে অসম্মান করা। তাই ও প্রশ্নটা ঘুরিয়ে করলো। ক্ষুধা তাহলে আমার মুখেও ছড়িয়েছে! বললাম, ‘বাইরে চল, বলছি।’

আমরা বাইরে এসে পুকুরের পাড়ে বসলাম। কিছু যে একটা হয়েছে তা অমিত আঁচ করতে পেরেছে। বললো, ‘কী হয়েছে তোর, বল তো?’ 

কাল রাত থেকে আজ পর্যন্ত যা যা ঘটেছে, সব ওকে বললাম। 

‘আমাদের বাড়িতেও....’ ও কিছু বলতে গিয়ে আবার চুপ হ’য়ে গেল।

আমি বললাম, ‘তোদের বাড়িতেও কী?’

‘না কিছু না।’ ও চেপে গেল।

‘না লুকিয়ে কী বলতে চাইছিলি, বল?’

‘পরে বলবো। এখন চল, খাবি কিছু।’

‘না আগে বল।’

আমার জোরাজুরিতে বলতেই হলো ওকে, ‘আমাদের বাড়িতেও নানারকম পূজাপার্বণ হয়, মা তো সব পূজায়ই উপবাস করেন, অন্যরাও উপবাস করে বিশেষ কোনো পূজায়। মা উপবাস থেকেও আমাদের জন্য রান্না করেন, সবাই উপবাস থাকলেও আমার একার জন্য রান্না করেন। এতে মা’র পূজা-পার্বণে তো কোনো অসুবিধা হয় না। যদিও হিন্দুদের মধ্যেও কেউ কেউ আছে মাছ-মাংস খায় না, কোনো বাড়িতে মাছ-মাংস রান্না করতে দেখলে কিংবা ঘ্রাণ নাকে যাওয়ামাত্র তারা নাকে-মুখে কাপড় চেপে দূরে সরে যায়, নাক-মুখ সিঁটকে কেউ কেউ বলেও ফেলে, “নাড়ে বাড়ির মতো গোন্ধ’; কিন্তু ছোটবেলায় আমি আমার দিদাকে মানে আমার মায়ের মাকে দেখেছি, তিনি সাধু টাইপের মানুষ, তিনি মাছ-মাংস খেতেন না, কিন্তু আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এলে নিজে মাছ-মাংস রান্না ক’রে সবাইকে খাওয়ান। সংযমের কথা যদি ওঠে, তবে আমার মা কিংবা দিদার রান্না ক’রে দেওয়াটাই সংযম; যে নাকে কাপড় দিয়ে বলে “নাড়ে বাড়ির মতো গোন্ধ’ কিংবা রোজার মাসে আমাদের দেশে যে বাড়াবাড়িটা হয়, সেটা সংযম নয়। লোক দেখানো সংযম কেবল বিরক্তিকর নয়, কপটতাও।’

অমিতের মা উপবাস থেকেও ওকে রান্না ক’রে দেন শুনে আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না, আপনা-আপনিই আমার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়লো। বিশ বছর বয়সে রাগ-অভিমান-আবেগ সবই বেশি। অমিত আমার কাঁধে হাত রেখে বললো, ‘প্লিজ, কাঁদিস না। এজন্যই আমি কথাটা এখন তোকে বলতে চাইনি। আমার মা আমাকে রান্না করে দেন, কিন্তু ধর্মে বিশ্বাস করি না বলে আমার বাবা কিন্তু ঠিকই মাকে দোষারোপ করে বলেন “তোমার ছেলে গোল্লায় গেছে।” আমাদের আরো অনেক কিছু সহ্য করতে হবে বন্ধু। অভিজিৎ, অনন্ত নিলয়, বাবুর মতো জীবনও দিতে হতে পারে।’ 

আমি নিজেকে সংযত করলাম। সংযমের ব্যাপারটা আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। বললাম, ‘তুই সংযমের কথা বললি না? বালের সংযম! মুসলমানরা সংযম-সংযম ক’রে মুখে ফ্যানা তোলে, অথচ এরাই সবচেয়ে বেশি অসংযমী। রোজার মাসে বেশিরভাগ হোটেলে রান্না বন্ধ, রাস্তার টোঙ দোকানের সামনে পর্দা ঝোলে। কেন? রোজাদার ব্যক্তিকে যাতে অন্যের খাওয়া দেখতে না হয়। নারীদের রোরখা প’রে রাস্তায় বের হতে হবে। কেন? হাটহাজারির শফি হুজুরের মতে, মেয়েরা হচ্ছে তেঁতুলের মতো; তেঁতুল দেখলে মানুষের জিভে যেমন জল আসে তেমনি নারী দেখলেও পুরুষের অন্তরে লালা ঝরে। তাই মেয়েদের বোরখা পরে রাস্তায় বের হ’তে হবে। তাহলে সংযমটা কোথায়? অন্যের খাওয়া দেখে যদি কারো লোভ লাগে, রাস্তায় বেপর্দা নারী দেখলেই যদি কারো অন্তরে লালা ঝরে আর ঈমানদণ্ড দাঁড়িয়ে যায়, তবে সে মানুষ নয়, হিংস্র পশু। হরিণ দেখলেই বাঘের লালা ঝরে, হামলে পড়ে হরিণের ওপর; ছাগী দেখলেই পাঠার লিঙ্গ দাঁড়িয়ে যায়, লিঙ্গের মাথা দিয়ে ঝোল পড়ে; ওরা হিংস্র পশু, সংযম বোঝে না। মানুষেরও যদি খাবার আর নারী দেখলে একই অবস্থা হয়, তবে সে কীসের মানুষ! মুখে সংযমের বুলি কিন্তু কাজে প্যাট আর চ্যাটমুখী! কারো অন্তর যদি কেউ সংযমী না হয়, তাহলে কি আর পর্দায় সংযম হয়! যার অন্তর অসংযমী খাবারের দোকানের সামনে পর্দা দেওয়া থাকলেও অই পর্দার দিকে দিকে তাকালেই তার চোখের সামনে খাবারের ছবি ভেসে উঠবে; নারী বোরখা প’রে থাকলেও তার নগ্ন ঊরু, পেট, বুক কল্পনা করতে অসুবিধা হবে না। মুখে বালের সংযম চোদায় সব। সারাদিন না খেয়ে থেকে রাক্ষুসে খাওয়া খাবে সন্ধেবেলা! এই বড় বড় খাসির ঠ্যাং, আস্ত মুরগি, কতো আইটেম আর কী তার বাহারি নাম! এর নাম সংযম! আমাদের বাসায় এই একমাসে খাবার বাবদ যে টাকা ব্যয় হয়, ঈদের পরের দুই মাসেও সেই টাকা ব্যয় হয় না। আমার বালের সংযম।’

অমিত বললো, ‘তুই যে কথাগুলো আমাকে বললি, এই কথাগুলোই যদি আমি আমার মুসলমান বন্ধুদের কাছে বলি কিংবা ফেসবুকে লিখি, তাহলে আমার ওপর সবাই হামলে পড়বে। বলবে, তুমি শালা মালাউন, ইসলাম ধর্মের কী বোঝো, সারাক্ষণ মুসলমান ধর্মের পিছনে লেগে থাকো! নাস্তিকতার ভেক ধরছো, কিন্তু নিজের ধর্মের প্রতি ঠিকই দরদ আছে।’

এরপর অমিত আমার হাত ধরে টেনে তুললো, ‘চল, আগে কিছু খাবি। কথা বলার জন্য সারারাত পড়ে আছে।’ 

আমি পরদিনও বাসায় ফিরলাম না, সেলফোনও বন্ধ রাখলাম। তার পরদিন সকালে আমি ঘুমিয়ে আছি, তখন নয়টা-দশটা বাজে। অমিত আগেই উঠেছে, আমাকে জাগিয়ে বললো, ‘হাত-মুখ ধুয়ে আয়।’

আমি বাথরুম থেকে ফিরে আসতেই বললো, ‘জামা-প্যান্ট পর, নাস্তা করতে যাব।’ 

তারপর নিচে নামার সময় বললো, ‘শোন, তোর বাবা আর আপু এসেছেন তোকে নিতে, নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। নাস্তা করে ওনাদের সাথে বাসায় যা।’ 

নাস্তা খেয়ে বাবা আর ছোট আপুর সঙ্গে বাসায় ফিরলাম। সারা রাস্তায় বাবার আমার সাথে কোনো কথা বলেনি, বাসায় ফিরেও না। রোজা রাখার ব্যাপারে আমাকে আর কেউ জোরাজুরি করেনি, রাগারাগি তো নয়ই। কেবল দাদী আমাকে শুনিয়ে মাকে বলেছে, ‘কী আর করবা, সবই নসিব!’ 

তারপর থেকেই আমার জন্য পাউরুটি এনে রাখে সকালের নাস্তার জন্য। প্রথম প্রথম ছোট আপু কিংবা মা দুপুরে ভাত রান্না ক’রে ফ্রিজের তরকারি গরম ক’রে দিতো। আমি তাদের বলেছি ‘তোমাদের ভাত রান্না ক’রে দিতে হবে না, আমি নিজেই রান্না ক’রে নেব।’

তারপর থেকে আমি প্রত্যেক রমজান মাসের দুপুরে বাসায় থাকলে নিজের ভাত নিজেই ফুটিয়ে ফ্রিজের তরকারি গরম ক’রে খাই। তবে তখন থেকেই সম্পর্কের সুতোটা একটু যেন আলগা হ’য়ে গেছে। আমার দিক থেকে নয়, পরিবারের অন্যদের দিক থেকে। তবে আমি জানি, বাবা-মা ভেতরে ভেতরে আমাকে আগের মতোই ভালবাসেন, আমার বাসায় ফিরতে দেরি হলে তারা আগের মতোই উদ্বিগ্ন হন। আসলে আমার জন্য সমাজে তাদের মাথা নত হয়েছে কিনা! তাই হয়তো তারা কষ্ট পেয়েছেন; এজন্যই সম্পর্কের ওপর অভিমানের একটা বিষাদময় চাদর বিছিয়ে রেখেছেন। গত চার বছর এভাবেই চলছে, প্রত্যেক রোজার প্রথমদিন সেহেরীর সময় বাবা আমাকে জাগিয়ে সেহেরি খাওয়া এবং রোজা রাখার আহ্বান জানিয়েছে আর যথারীতি আমি বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখান করেছি। 

ওই ঘটনার পর চাচা বেশ কয়েক মাস আমার সঙ্গে কথা বলেননি। তারপর থেকে কথা বলা শুরু করলেও আমার সঙ্গে তার আচরণ পাশের বাড়ির ছেলের মতো। তবে সার্বক্ষণিক ধর্মের বন্ধনে আবদ্ধ যার মন, সে তো সুযোগ পেলে তার ধর্মীয় অনুশাসনের কথা তুলবেই। চাচাও তোলেন অনেক সময়, সরাসরি আমাকে কিছু না বললেও আমাকে শুনিয়ে বলেন; আমি এড়িয়ে চলি। তবে মাস ছয়েক আগে আমার বড় আপার দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের পর তার সঙ্গে এক নতুন বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিলাম। আপার দ্বিতীয় সন্তানটি ছেলে, ওর আকিকা হয়েছিল আমাদের বাড়িতেই। আকিকার আগের সন্ধ্যায় আমি ক্যাম্পাস থেকে ফিরে নিচের গেট দিয়ে ঢুকতেই দেখি গ্রিলের সাথে বাঁধা বেশ তাগড়া দুটো খাসি ম্যা ম্যা ক’রে ডাকছে। তারপর বাসায় ঢুকে দেখি মা, বড় আপু, ছোটো আপু, চাচা-চাচী, ফুফু, ফুফাতো বোন আফিয়া মালিহা, চাচাতো বোন আনতারা রাইদাহ সবাই আমাদের ড্রয়িংরুমে-ডাইনিংরুমে ব’সে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। সকলের মধ্যমণি এবং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু আমার ছোট্ট ভাগ্নে। আমি সাধারণত পারিবারিক এমন জটলা এড়িয়ে চলি। কিন্তু বাসায় ঢোকামাত্রই মালিহা বললো, ‘এই তো ভাইয়া এসে গেছে, দেখি, ভাইয়ার কোন নামটা পছন্দ হয়।’ 

আমার ভাগ্নের জন্য কী নাম বাছাই করা রাখা হচ্ছে, তা শুনে আমি কীভাবে নিজের ঘরে যাই! ফলে আমি ড্রয়িংরুমের দিকে এগোলাম। আমার ফুফাতো বোনের কোলে শুয়ে ড্যাবড্যাব ক’রে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে ভাগ্নে। আমাদের পরিবারের এবং কাছের আত্মীয়দের নবজাতকের নাম সাধারণত আমার চাচাই রাখেন। নামকরণের ব্যাপারে সকলেই চাচার ওপর নির্ভর করেন আর ব্যাপারটা চাচা বেশ উপভোগ করেন, গর্ববোধও। ফলে আমি এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহ যে, যথারীতি এবারও ভাগ্নের জন্য নাম বাছাই করেছেন চাচা। কয়েক মুহূর্ত ভাগ্নের হাসিমুখটা দেখে মালিহার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘কী কী নাম?’ 

‘একটা হলো ফাহিম আসাদ, আরেকটা আহনাফ আবিদ; আমি, ছোট আপু আর রাইদাহ পছন্দ করেছি আহনাফ আবিদ; মা, মামা আর মামীদের পছন্দ ফাহিম আসাদ। বড় আপু দুধভাত, কিছুই বলছে না। ভাইয়া, প্লিজ তুমি আমাদের দিকে ভোট দাও।’

চাচাকে বরাবরই স্বৈরশাসক বলেই জানি, নাম রাখার ব্যাপারে তিনি হঠাৎ গণতান্ত্রিক হয়ে গেলেন কী কারণে, কে জানে! নাকি নামদুটোর ব্যাপারে তিনি নিজেই দ্বিধায় ভুগছেন! রাইদাহ বললো, ‘বড়রা বুঝতেই পারছে না যে, ফাহিম আসাদ কমন নাম?’

আমি বললাম, ‘ফাহিম আসাদ মানে কী?

এবার ওরা চাচার দিকে তাকাচ্ছে। মানে ওরা জানে না, জানে চাচা।

চাচা বললেন, ‘বুদ্ধিমান সিংহ।’

শোনামাত্র আমি হো হো ক’রে হাসতে হাসতে মালিহার পাশে সোফায় বসে পড়লাম। হাসির দমক কমলে দেখি, সবাই অবাক হ’য়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে, রাগত চোখ দুটো আমার দিকে ছুড়ে দিয়ে গম্ভীর কন্ঠে চাচা বললেন, ‘এতে হাসির কী হলো?’ 

হাসির রেশ তখনো আমার মুখে। বললাম, ‘বাহ্, হাসবো না! আমি সম্মানিত সিংহ, আমার ভাই ন্যায়বান সিংহ, আর আমাদের ভাগ্নে হবে বুদ্ধিমান সিংহ!’

‘এতে তো হাসির কিছু দেখছি না!’

‘আপনারাই তো বলেন, মানুষ হচ্ছে আশরাফুল মাকলুকাত, সৃষ্টির সেরা জীব; তো সেই সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে জন্মগ্রহণ করেও আমাদের পরিচিত হতে হচ্ছে একটা হিংস্র পশুর নামে, ব্যাপারটা হাস্যকর না!’ 

‘এটা পবিত্র আরবি ভাষার নাম, হাস্যকৌতুকের বিষয় নয়। মুসলমান সন্তানের আরবি ভাষায় নাম রাখা সোয়াব।’

‘আপনি তো ফাহাদের নাম রেখেছেন আবরার ফাহাদ, মানে ন্যায়বান সিংহ। কিছুদিন আগে সৌদি আরব আবরার নামটি সহ মোট পঞ্চাশটি নাম নিষিদ্ধ করেছে। আপনি ধর্মপ্রাণ মুসলমান, আপনার ছেলেও ধর্মপ্রাণ মুসলমান, কিন্তু ফাহাদ এখন সৌদি আরবের নিষিদ্ধ ঘোষিত নাম নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এতে ওর গুণাহ হচ্ছে না! আপনার শ্বশুরের নামও তো নিষিদ্ধ, মোহাম্মদ কিবরিয়া। আপনার শ্বশুরও তো মহা ধর্মপ্রাণ মুসলমান, তার গুনাহ হচ্ছে না! আরবী ভাষার গু-ও আপনাদের কাছে পবিত্র, অমৃত; আর বাংলা ভাষার অমৃতও আপনাদের কাছে তেতো!'

‘বেয়াদবের মতো কথা বলবা না।’

‘বেয়াদবের মতো কথা বললাম কোথায়, এটাই সত্য। বাংলা ভাষায় এতো সুন্দর সুন্দর নাম থাকতে আরবি ভাষায় নাম রাখতে হবে কেন?’ 

‘আরবি নবীজির পবিত্র ভাষা, বাংলা তো হিন্দুদের ভাষা!’ 

হায়! যার পূর্বপুরুষ হিন্দু থেকে মুসলমান হয়েছে; বংশপরম্পরায় হিন্দুদের রক্ত, জিন, সেল বহন ক’রে চলেছে শরীরে; হিন্দুুদের জমির শস্যদানা খেয়ে জীবনধারণ করছে; এসবে কোনো দোষ নেই, যতো দোষ ভাষার! যে ভাষার জন্য রফিক-সালাম-বরকতেরা জীবন দিয়েছিলেন, সেই ভাষার মানুষই কিনা বলছে, বাংলা হিন্দুদের ভাষা; বাংলা এখনো বাঙালির ভাষা হতে পারেনি!

‘বাংলা অপবিত্র ভাষা, এটা আপনাকে কে শিখিয়েছে?’ 

‘বাংলা হিন্দুদের ভাষা, এই ভাষায় মুসলমানদের নাম রাখা উচিত না। গুনাহ হতে পারে।’

‘আপনারা না বলেন যে, সবকিছু আল্লাহ’র সৃষ্টি; সবকিছু যদি আল্লাহ’র সৃষ্টি হয়, তাহলে পৃথিবীর সব ভাষাই তো আল্লাহ’র সৃষ্টি। সেক্ষেত্রে কেবল আরবি নয়, পৃথিবীর সব ভাষাই তো পবিত্র। এমনকি বিলুপ্তপ্রায় যে-ভাষাটিতে এখন মাত্র এক-দুজন মানুষ কথা বলেন, সে ভাষাটিও পবিত্র! আর আরবি মুসলমানদের ভাষা, এটা আপনাকে কে বলেছে?’

‘পবিত্র আরবি ভাষা নবীজির ভাষা, মুসলমানের ভাষা; এটা কে না জানে!’ 

‘মুহাম্মদ ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক, সেটা সর্বজনবিদিত, কিন্তু তিনি যে আরবি ভাষারও প্রচলন করেছিলেন, এমন কথা তো শুনিনি। কোরান-হাদিসে আছে কোথাও?’

‘ইসলাম সম্পর্কে না জেনে কথা বলাটা তোমার মতো গুনাহগার নাস্তিকদের অভ্যাস। আরবি মুসলমানদের ভাষা, পবিত্র কোরান আরবি ভাষায় নাজিল হয়েছে।’

‘কোরান আরবি ভাষায় লেখা হয়েছে, কিন্তু সেটা পৌত্তলিকদের ভাষা। পৌত্তলিকরা আরবি ভাষায় কথা বলতো, আরবি ভাষায় গান করতো, কবিতা লিখতো, আল্লার কাছে প্রার্থনাও করতো, এমনকি খিস্তি-খেউড়ও করতো। মুহাম্মদের জন্মের আগেই এই ভাষার উৎপত্তি; এমনকি ‘আল্লাহ’ শব্দের উৎপত্তি এবং ব্যবহারও মুহাম্মদের জন্মের বহু আগে থেকেই। পৌত্তলিকরাও তাদের সৃষ্টিকর্তাকে ‘আল্লাহ’ নামেই ডাকতো। মুহাম্মদের বাবা আবদুল্লাহ মুহাম্মদের আগে জন্মায়নি, আর তার ধর্মও ইসলাম ছিল না, তিনি পৌত্তলিক-ই ছিলেন। আবদুল্লাহ শব্দের অর্থ আল্লাহ’র দাস। তাই একথা বলা অজ্ঞানতা যে, আরবি মুসলমানদের ভাষা। আর কাবাঘর? সেখানেও তো মুহম্মদের জন্মের আগে থেকেই পৌত্তলিকদের তীর্থস্থান ছিল, সমগ্র আরবের মানুষ সেখানে তীর্থ করতে আসতো। তিনশো ষাটটি মূর্তি ছিল ওখানে, যা মক্কা বিজয়ের সময় মুহাম্মদ ধ্বংস করে। সুতরাং একথা বলার কোনো সুযোগ নেই যে, আরবি মুসলমানদের ভাষা আর কাবাঘর মুসলমানদের তীর্থস্থান। দুটোই মুহাম্মদ দখল করেছে, আরবের বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং জাতির লোকাচারই মুহাম্মদ গ্রহণ করেছে; যেগুলো সম্পর্কে আজকের মুসলমানরা বিশ্বাস করে যে, এসবের প্রবর্তক মুহাম্মদ বা মুসলমানরাই। সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং মজার ব্যাপার হলো, মুহাম্মদের মূর্তিপূজার বিরোধিতা সত্ত্বেও পৌত্তলিকদের তীর্থস্থানেই মুসলমানরা হজ্বের নামে পাথরপূজা করছে!'

চাচার সুখ যেন পাথরের চাঁই আর চোখ অগ্নিকুণ্ড, ‘তুমি শয়তানের ভাষায় কথা বলছো। মুসলমানরা হিন্দুদের মতো পূজা করে না, মুসলমানরা করে ইবাদত।’

‘হিন্দুরা সরাসরি হাত মুখে তুলে খায়, আর আপনারা হাতটা মাথার চারপাশে ঘুরিয়ে এনে খান। বাংলা ভাষায় যা পূজা, আরবী ভাষায় সেটাই ইবাদত।’ 

‘তোমার মতো শয়তানের কাছ থেকে আল্লাহ আর তার পবিত্র কাবাঘর সম্পর্কে ভুলপাঠ নিতে চাই না আমি।’

‘আমারও উলোবনে মুক্তো ছড়ানোর কোনো ইচ্ছে নেই। কিন্তু আপনি বাংলা ভাষাকে অপমান করেছেন, একজন বাংলা ভাষাপ্রেমিক বাঙালি হিসেবে এর প্রতিবাদ করাটা আমার নৈতিক দায়িত্ব। আপনারা পৌত্তলিকদের আল্লাহকে গ্রহণ করেছেন, পৌত্তলিকদের তীর্থস্থানে তীর্থ করতে যাচ্ছেন, আর নিজ ভাষা বাংলায় সন্তানের নাম রাখলেই আপনাদের সোয়াবে টান পড়ে, গুনাহ হয়! আমার ভাগ্নের নাম আমি বাংলায় রাখবো, কারো ইচ্ছে হলে ওকে সেই নামে ডাকবে, ইচ্ছে না হলে ডাকবে না; আমি একাই ডাকবো।’ বলেই আমি উঠে পড়ি।

আমি আমার ভাগ্নের নাম রেখেছি অয়ন। প্রথম প্রথম আমি একাই এই নামে ওকে ডাকতাম। এখন আমার বড় বড়আপু-দুলাভাই, ছোট আপু অয়ন নামেই ওকে ডাকে। ওই ন্যায়বান সিংহ, মানে ফহিম আসাদ নামটিও আছে কাগুজে নাম হিসেবে। কাগুজে নামটি আরবিতে না হলে তো সোয়াব হবে না! 

আমার ধারণা চাচার প্রিয় পশু সিংহ, নইলে এমন নাম রাখবে কেন আমাদের! তাছাড়া সিংহকে বনের রাজা বলা হয়, আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সিংহ ভীষণ শক্তিশালী পশু। আর কে না চায় তার বংশের ছেলে রাজার মতো হবে, খুব শক্তিশালী হবে; এজন্যই বোধহয় শক্তিশালী সিংহের নামে আমাদের নাম রেখেছেন। তবে আমাদের এই সিংহত্রয়ের মধ্যে সবচেয়ে বিপদের মধ্যে আছি আমি। মনে হয় না কোনো পশ্চিমা দেশ আমাকে ভিসা দেবে। এক ভয়ংকর ইসলামী সন্ত্রাসীর নামের একটা অংশ আর আমার নামের একটা অংশ এক-উসামা। আমজাদ উসামা, মানে সম্মানিত সিংহ! আমার চাচাতো ভাই আবরার ফাহাদের নামের অর্থ হলো ন্যায়বান সিংহ।

আমার মামাও একটা বাংলা নাম রেখেছিলেন আমার - সবুজ; যদিও এই নামে আমাদের বাড়ির কেউ আমাকে ডাকে না। আমি সবুজের সঙ্গে আরেকটা শব্দ যোগ ক’রে নিয়েছি - সমতল, সবুজ সমতল। এই নামেই আমি ফেইসবুকিং-ব্লগিং করি। ক্যাম্পাসের সহপাঠী-বন্ধুরা এখন আমাকে এই নামেই ডাকে, তবে এর জন্য ওদেরকে খাওয়াতে হয়েছে। ওরা তো প্রথমদিকে আমাকে উসামা বলে ডাকতো, কেউ কেউ দুষ্টমি ক’রে লাদেন নামেও ডাকতো। একদিন ওদেরকে খাইয়ে অনেক অনুরোধ করার পর থেকেই ওরা ওইসব উসামা-লাদেন, এসবের পরিবর্তে সবুজ ব’লে ডাকতে শুরু করেছে। একবার গ্রুপ অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার আগেরদিন আমার এক বান্ধবী হৃদিকা বললো, ‘এই যে সম্মানিত সিংহ, তোমার নামের স্পেলিংটা কাগজে লিখে দাও।’ 

আমি তখনো আমার নামের মানে জানি না। বললাম, ‘আমি আবার সম্মানিত সিংহ হলাম কবে থেকে?’

ও হেসে বললো, ‘কবে থেকে আবার, আকিকার দিন থেকে।’

‘মানে?’

ও তখন হাসি আরো প্রলম্বিত ক’রে অন্য বন্ধুদের শুনিয়ে বললো, ‘ওরে এ দেখি বেআক্কেল গাধা, ভুল ক’রে নাম রেখেছে সম্মানিত সিংহ!’ 

আমাকে নিয়ে অনেক হাসি-ঠাট্টার পর হৃদিকা ব্যাপারটা খোলাসা করেছিল। সেদিনই ক্যাম্পাস থেকে ফিরে চাচার কাছ থেকে আমি আমার সব ভাইবোনদের নামের অর্থ জেনেছিলাম। হাস্যকর আর বিরক্তিকর সব নাম। স্ববিরোধী নামও আছে, যেমন আমার চাচাতো বোনের নাম আনতারা রাইদাহ; মানে হলো - বীরাঙ্গনা নেত্রী! যে ধর্ম নারীকে গৃহবন্দী ক’রে রাখার কথা বলে, যে ধর্ম স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে নারীকে পুরুষের অধীন থাকার কথা বলে, যে ধর্ম নারীকে পুরুষের যৌনদাসী ক’রে রাখার কথা বলে, যে ধর্ম শিখিয়েছে নারী নেতৃত্ব হারাম, যে ধর্ম শিখিয়েছে নারীর নেতৃত্বে থাকার চেয়ে পুরুষের ম’রে যাওয়াই উত্তম; সেই ধর্মের এক নারীর নাম বীরাঙ্গনা নেত্রী! এ ভীষণ স্ববিরোধী, বড়ই কৌতুকর নাম! আমার চাচাতো বোন আনতারা রাইদাহ বোরখা প’রে কেবল চোখ দুটো খোলা রেখে বাইরে যায়। বোরকা বীরাঙ্গনা নেত্রীর পোশাক বটে! 

আমি ভাবছি আমার নামটি এফিডেভিট ক’রে সবুজ সমতল ক’রে নেব। একটা হিংস্র পশুর নামে আমার নাম, ভাবলেই অসহ্য লাগে!

(চলবে)