৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

সাইমুম (উপন্যাস: পর্ব ২)

লিখেছেন উজান কৌরাগ


আমি জানতাম শব্দ হবে, এবং শব্দটা কে করছে, তাও জানি। বাবা। আমি মশারি থেকে বেরিয়ে আমার ঘরের লাইট জ্বাললাম চোখে আলোটা সওয়ানোর জন্য, নইলে অন্ধকারে দরজা খুলে দিতেই ডাইনিংয়ের লাইটের আলো আমার চোখে পড়বে আর আমার চোখ-মুখ কুঁচকে যাবে; আমার চোখ-মুখ কোঁচকানো দেখে বাবা হয়তো ভাববেন যে, আমাকে ঘুম থেকে ডাকার জন্যই আমি চোখ-মুখ কুঁচকে তার দিকে তাকিয়েছি। কিন্তু আমি চাই না বাবা এই ভুলটা বুঝুন, তাই লাইট জ্বালিয়ে চোখে আলো সইয়ে তারপর আমি দরজা খুললাম। দরজার সামনে বাবা দাঁড়িয়ে আছেন, একটু কোনাকুনিভাবে দাঁড়ানোয় বাবার বামগালের কাঁচাপাকা দাড়িতে, দাড়ির ওপরের অনাবৃত ফর্সা ত্বকে এবং কপালের বামদিকে চকচক করছে লাইটের আলো; ঘুম থেকে সদ্য জেগে মুখ ধোয়ায় বেশ সজীব লাগছে বাবাকে। মাথায় সাদা টুপি পরেছেন, গায়ে সাদা পাঞ্জাবি, পরনে সাদা-কালো চেক লুঙ্গি। এমনিতেও বাবা সুদর্শন, সুদর্শন বলেই নাকি মায়ের চেয়ে তেরো বছরের বড় হওয়া সত্ত্বেও মা বাবাকে পছন্দ করেছিলেন, অতঃপর বিয়েতে রাজি হয়েছিলেন। বারো বছর আগে বাবার বয়স ছিল আটচল্লিশ বছর, কিন্তু তখন তাকে দেখলে মনে হতো সবে চল্লিশে পা দিয়েছেন; তারপর চাচার প্ররোচনায় যখন দাড়ি রাখতে শুরু করলেন, তখন এক ঝটকায় বাবার বয়স যেন বেড়ে গেল দশ বছরেও বেশি! হঠাৎ করেই বাবা যেন বুড়ো হ’য়ে গেলেন! বাবার বয়স এখন ষাট, সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর বাবা যেন আরো বুড়ো হ’য়ে গেছেন। কিন্তু আমি নিশ্চিত জানি, এই দাড়িটাই বাবার বয়স বাড়িয়ে দিয়েছে। দাড়িটা কেটে ফেললেই বাবার বয়স আরো দশ বছর কম মনে হবে। আমার মায়ের থেকে বাবা এমনিতেই তেরো বছরের বড়, বাবা দাড়ি রাখার কারণে দু’জনের বয়সের ব্যবধান যেন আরো বেড়ে গেছে। মায়ের সঙ্গে বাবাকে এখন একদমই মানায় না! আমি তো জানি যে, ধর্মীয় কারণে বাবা দাড়ি রেখেছেন এবং তা যতো না নিজের ইচ্ছায় তার চেয়েও বেশি চাচার ইচ্ছায়। 

আমার দাদাবাড়ির লোকজন বাবা আর মায়ের বিয়ের প্রস্তাব উত্থাপন করার পর নানা নাকি বলেছিলেন, ‘ছেলের পরিবার স্বচ্ছল, দেখতে-শুনতে ভাল, সরকারি চাকরি করে; পাত্র হিসেবে উত্তম, তবে ছেলে-মেয়ের বয়সের ব্যবধান তো বেশি, এজন্য কুসুমের মত নেওয়া দরকার, কুসুম রাজি হলে আমার কোনো আপত্তি নেই।’ কুসুম আমার মায়ের ডাকনাম, কাগুজে নাম জাহানারা খাতুন। তো কুসুম তার চেয়ে তেরো বছরের বড় পাত্রের রূপ-বর্ণ দেখে মুগ্ধ হয়ে বিয়েতে রাজি হয়েছিলো। পনের বছরের কিশোরী কুসুমের সেই প্রিয় পুরুষের রূপ এখন দাড়ির জঙ্গলে ঢাকা। অবশ্য কুসুমও আর সেই কুসুম নেই, বাবার বাড়ির উদার-সাংস্কৃতিক পরিবেশে খেলাধুলা-ছুটোছুটি ক’রে বড় হওয়া কুসুম শ্বশুরবাড়ির ধর্মান্ধ পরিবেশের সাথে দিব্যি মানিয়ে নিয়েছে; মাঝের তেত্রিশ বছরে চারটে সন্তানের জন্ম দিলেও টিকে আছে তিনটে, তার নামাজ কখনো কাজা হয় না, বোরখা ছাড়া সে কখনো বাইরে যায় না, ভূমিকম্প হলেও সে বোরখার ভেতরে সেঁধিয়ে তবেই নিচে নামে; এমনকি কুসুম এখন তার বাবার ভুল নিয়েও চুলচেরা বিশ্লেষণ করে, হিন্দু বন্ধুবান্ধবের সাথে মেলামেশার কারণে তার বাবার আচার-আচরণে নাকি হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি ছিল, ছেলেমেয়েদের সঠিক ধর্মীয় শিক্ষায় মানুষ করেননি, ছোটবেলায় আরবী শিক্ষার পরিবর্তে গানের স্কুলে ভর্তি ক’রে দিয়েছিলেন! আমার মায়ের জীবনের সবচেয়ে বড় আফসোস যে, তিনি আরবী ভাষায় কোরান শরীফ পড়তে পারেন না এবং এর জন্য তিনি দায়ী করেন আমার নানাকে। মা কথায় কথায় নানাকে দোষ দিয়ে আমার উদ্দেশে বলেন, আমি নাকি নানার স্বভাব পেয়েছি। যদিও নানা আমার মতো নাস্তিক ছিলেন না। 

বাবা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হাত-মুখ ধুয়ে এসো, আমাদের সঙ্গে সেহেরী খাও; এবার থেকে রোজা রাখো।’ 

আগে বাবা আমাকে তুই ক’রে বলতেন, আমিও বাবাকে আব্বা আর মাকে আম্মা বলতাম। বছর চারেক হলো আমি তাদেরকে বাবা-মা বলতে শুরু করি। পুরো পরিবারের সঙ্গে আমার বিশ্বাসের দ্বন্দ্বের শুরুও তখন থেকেই। তখন থেকেই তিনি আমাকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন, আর আমাকে তুই’র বদলে তুমি ক’রে বলতে শুরু করেছেন। মা অবশ্য এখনো আমার সঙ্গে তুই করেই কথা বলেন। বাবার আর আমার মাঝখানে একটা প্রাচীর গড়ে উঠেছে; ধর্মের প্রাচীর, বিশ্বাসের প্রাচীর। আমার চাচা নিপুণ হাতে আমাদের পিতাপুত্রের মাঝের এই প্রাচীরটা আরো উঁচু করেছেন, প্রাচীরের ওপরে কাঁটাতার স্থাপন করেছেন এবং এখন তা যত্নের সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ করছেন তিনি। 

আমি বাবার আলো-ছায়াময় মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। মা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে ডাইনিং টেবিলে কোনো একটা খাবারের বাটি রেখে বাবার মাথার পাশ দিয়ে একবার আমার দিকে তাকিয়ে পুনরায় রান্নাঘরে চলে গেলেন। বাবা মমতা মাখানো কন্ঠে আবার বললেন, ‘যাও, হাত-মুখ ধুয়ে এসো, আমার কথাটা রাখো।’

বাবার এই মমতা মাখানো শব্দগুলোর যে অন্তর্গত দ্যোতনা আমার কানে বাজলো, তা ব্যথা হয়ে আছড়ে পড়লো আমার হৃদয়ে, অপরাধীর মতো চোখ নামিয়ে নিলাম বাবার চোখ থেকে, যদিও জানি, আমি অপরাধী নই। আমাকে একই রকম নিরুত্তর দেখে এবার বাবা আমার ডান হাতটা তার দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে বললেন, ‘বাবা হিসেবে সবসময় আমি তোমার ভাল চাই, আমার অনুরোধটা রাখো, আমাকে একটু শান্তি দাও।’

বাবার মুখনিশ্রিত প্রতিটি শব্দের গায়ে জড়ানো অনুরোধ, আকুতি, আবদার আর অসহায়ত্ব! বাবা কখনোই এভাবে কথা বলেন না আমার সঙ্গে, এমন কি দাদী এবং চাচার সামনেও তাকে এতোটা অসহায় অবস্থায় দেখিনি কখনো; বাবা যেন অসহায়ত্বের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেছেন! বাবার কন্ঠস্বর শুনে আমার বুক ভেঙে যাচ্ছে, আমি কি কেঁদে ফেলবো! আমি বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে আমার বাঁ হাত দিয়ে তার ডানটা ধরলাম, ‘তোমাকে আর মাকে শান্তি দিতে পারলে আমার চেয়ে সুখী কেউ হবে না, বাবা।’

‘শুধু আমার এই অনুরোধটা রাখো, তাহলেই তোমার মা আর আমি শান্তি পাব।’

আমাদের চার হাত এক জায়গায়, আমি আমার দুই হাতের মধ্যে বাবার ডান হাতটা আরেকটু শক্ত ক’রে ধ’রে বললাম, ‘আমাকে ক্ষমা করো, বাবা। তুমি আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দাও, তোমাদের সম্মান বাঁচাতে আমাকে মেরে ফেলো, আমি হাসিমুখে সব মেনে নেব, তবু এই অনুরোধটি আমাকে ক’রো না। আমি তোমাদের জন্য আমার জীবন দিতেও রাজি আছি, কিন্তু ধর্মের জন্য আমি আমার শিক্ষা এবং জ্ঞান অস্বীকার করতে পারবো না; আমার সত্তাকে আমি অপমান করতে পারবো না, বাবা। আমি তোমাদের সুযোগ্য সন্তান নই, হয়তো কোনোদিন হতেও পারবো না; কিন্তু তোমাদের প্রতি আমার ভালবাসার কোনো কমতি নেই, কোনোদিন কমবেও না।’ 

বাবার পিছনে মা এসে দাঁড়িয়েছেন, মায়ের চোখ ছলছল করছে। বাবা সহজে কাঁদেন না, কিন্তু আমি জানি, তার হৃদয় কাঁদছে আমার মতো একটা গুনাহগার জন্ম দেবার অপরাধে, পরকালে আমার দোজখগমনের কথা চিন্তা ক’রে। 

বাবা তার অসহায় দুটো চোখ আমার চোখ থেকে নামিয়ে নিলেন, আমি তার হাতের শিথিলতা অনুভব ক’রে বুঝলাম, বাবা আমার সামনে থেকে সরে পড়তে চাইছেন। অথচ তার হাত ছাড়তে ইচ্ছে করছে না আমার, অনেকদিন বাবার এমন নিবিড় স্পর্শ আমি পাইনি; ইচ্ছে করছে বাবাকে জড়িয়ে ধরি! কিন্তু বাবা তার বাঁ হাত সরিয়ে নিলেন, আমার হাতের মধ্যে তার শিথিল ডান হাত। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমি আমার হাত শিথিল করলাম, বাবার তার হাত নামিয়ে নিলেন। আমি তাকিয়ে রইলাম তাঁর অসহায় মুখের দিকে, বাবা তাঁর চোখ-মুখের এই অসহায়ত্ব কিছুক্ষণ পরই লুকোতে চাইবে, অন্যরা আসার আগে হয়তো লুকিয়েও ফেলবে, কিন্তু আমি জানি, তার ভেতরটা বেশ কয়েকদিন যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকবে। বাবাকে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেবার উপায় আমার জানা নেই। কতোবার তো বলেছি যে, ‘বাবা, পৃথিবীটা মায়ার সংসার, কিন্তু মায়া-মমতারও তো একটা সীমা থাকা দরকার, আমার ইহকালের সুখশান্তি নিয়ে তোমরা চিন্তা করো ঠিক আছে, তা ব’লে আমার পরকাল নিয়েও তোমরা দুঃশ্চিন্তা করবে! আমার পরকালের ভাবনাটা আমার ওপরই ছেড়ে দাও।’

কিন্তু লাভ হয়নি কোনো। বাবা-মা আমাকে এতোটাই ভালবাসেন যে, তারা আমার পরকাল নিয়েও সারাক্ষণ উদ্বিগ্ন থাকেন। 

মা আবার রান্নঘরে ঢুকেছেন। বাবা চলে যেতে উদ্যত হতেই বললাম, ‘বাবা, আমি জানি আমার জন্য তোমরা ভীষণ অসুখী; কিন্তু আমরা প্রত্যেকেই যদি যার যার বিশ্বাসের জায়গাটা ব্যক্তিগত পর্যায়ে রাখি, তাহলে আমাদের প্রত্যেকের জীবনই সুন্দর হবে। আমরা সবাই সুখী হবো।’ 

বাবা কিছুই বললেন না, আমার দিকে তাকালেনও না। নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। কয়েক পা পথ মাত্র, অথচ আমার মনে হলো এই কয়েক পা পথ অতিক্রম করতেই তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।

আমি নিজের ঘরে এসে চেয়ারে বসলাম। ডাইনিংয়ের আলো শুয়ে আছে আমার ঘরের মেঝেতে। ছোট আপু আর মা ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজাচ্ছে। দাদি উঠে এসেছেন ডাইনিং রুমে, বললেন, ‘ওরা দেরি করতাছে ক্যান? টের পাইছে তো?’

‘হ, পাইছে। আইবো অহনই, আপনার পোলায় ফোন দিছিলো।’ মায়ের কন্ঠস্বর। 

‘ছোডবউ তো এট্টু আগে আইয়া তোমাগো লগে হাত লাগাইতে পারে, হ্যায় কি সৌদি বাদশার বিবি নি!’

‘আমরাই পারবো, আম্মা, আপনি বসেন।’ 

‘তোমরা পারবা তা তো জানি, কিন্তু হেতে আইয়া এট্টু হাত লাগাইলে তার হাত ক্ষয় অইবো নি!’ 

একটু বিরতি দিয়ে দাদি আবার বললেন, ‘অয় কি রোজা রাখবো?’ 

অয়, মানে আমি। কিছুক্ষণ নীরবতা, শুধু টেবিল আর প্লেটের ঠোকাঠুকির শব্দ। দাদি আবার বললেন, ‘কী কইলাম, হুনো নাই? অয় কি রোজা রাখবো?’

‘না।’ মা বললেন। 

‘প্যাটে পোলা এট্টা ধরছো, গুষ্টির মুহে চুনকালি মাখতে, দাদা-পরদাদারে দোজখে টানতে এমন এট্টা পোলাই যথেষ্ট!’

মা নিরুত্তর। এই শুরু হলো গঞ্জনা, সারাবছরই কমবেশি বাবা-মাকে এসব শুনতে হয় বাড়ির মানুষ কিংবা আত্মীয়স্বজনদের কাছে; কিন্তু রোজার মাসে তা বহুগুণ বেড়ে যায়।

সদর দরজা খোলাই ছিল; ফুফু, ফুফা আর ফুফাতো বোন এলো; চাচা-চাচী আর চাচাতো বোনও হয়তো এখনই এসে পড়বে। আমি উঠে গিয়ে আমার ঘরের দরজাটা বন্ধ ক’রে আবার শুয়ে পড়লাম, এই ভোরবেলায় আমি আমার বাবা-মাকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে ফেলতে চাই না। কেননা চাচা যদি আমাকে নিয়ে কোনো কথা বলে, তা আমার সহ্য হবে না। আমি প্রতিবাদ করবো, আর চাচাও তার জায়গায় অনড় থাকবে এবং পরিস্থিতি আমার বাবা-মায়ের জন্য মোটেও সুখকর হবে না। 

চাচার কন্ঠ শুনতে পাচ্ছি। পরপর চেয়ার আর মেঝের সংঘর্ষের শব্দ হচ্ছে, সম্ভবত সবাই এসে পড়েছে। আমি কল্পনা করতে পারছি কয়েক জোড়া বিরক্তিমাখা চোখ এখন আমার দরজার ওপর ঘুরছে। চাচা, চাচী কিংবা ফুফু আমার সম্পর্কে খোঁচা মেরে কিছু হয়তো বলবেও। ওদের বলায় আমার কিছু যায়-আসে না, কিন্তু আমার খারাপ লাগে বাবা-মায়ের জন্য। ওদের প্রতিটি কথা নিশ্চয় তীরের মতো বিদ্ধ করে বাবা-মায়ের বুক। আমি চাই না ওদের কোনো কথা এখন আমার কানে আসুক, তাই মোবাইলে ওস্তাদ রশিদ খানের রাগ বাগেশ্রী চালিয়ে কানে ইয়ারফোন লাগালাম। রশিদ খানের কন্ঠ ছাপিয়ে শুনতে পাচ্ছি মাইকের আপডেট- ‘সেহেরীর আর মাত্র ত্রিশ মিনিট বাকি আছে, সেহেরীর আর মাত্র ত্রিশ মিনিট বাকি আছে, আপনারা উঠুন, সেহেরী খেয়ে নিন। সেহেরীর আর মাত্র ত্রিশ মিনিট বাকি আছে, সেহেরীর আর মাত্র ত্রিশ মিনিট বাকি আছে, আপনারা উঠুন, সেহেরী খেয়ে নিন।’ 

সত্যিই বাবার জন্য এখন আমার খুব খারাপ লাগছে, আমার হাতের ভেতর বাবার আশাহত শিথিল হাতদুটোর স্পর্শ আমি অনুভব করতে পারছি, আমার চোখের সামনে ভাসছে সামনের দিকে ঝুঁকে বাবার ঘরে ফেরার দৃশ্য। আমি মাঝে মাঝেই ভাবি, বাবা যদি আমার মতো একটা ছেলের বাবা না হয়ে আমার চাচাতো ভাই ফাহাদ অর্থাৎ মোহাম্মদ আবরার ফাহাদের মতো একটা ছেলের বাবা হতেন, তাহলে কী সুখেরই না হতো তাঁর জীবন! আমার জন্য বাবাকে কম অপদস্থ হতে হয় না; বাসায় আত্মীয়স্বজন এলে তারা বাবাকে উপদেশ এবং পরামর্শ দেয় - কী উপায়ে আমাকে পথে ফিরিয়ে আনা যায়; পথ মানে ইসলামের পথ, আল্লাহর পথ; তারা বাবার সামনে ফাহাদের প্রশংসা করে, আমাদের অন্যান্য আত্মীয়ের ছেলেদের প্রশংসা করে; তারপর তারা বাবার মুখের সামনে বিলম্বিত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘কী আর করবেন, সবই আল্লার ইচ্ছা, কপালের দোষ।’ বাবা মসজিদে নামাজ পড়তে গেলেও শান্তি নেই, সেখানেও তাকে খুব ভদ্র-মোলায়েম ভাষায় পরিচিতজনদের দ্বারা অপমানিত হতে হয়। আমাদের বাসার পাশেই আলিশান মসজিদ। জুম্মাবারে বাবা, চাচা আর ফাহাদ একসঙ্গে নামাজ পড়তে যায় মসজিদে। যেহেতু বাবা-চাচা বাড়িওয়ালা, তাই মহল্লার অন্যান্য বাড়িওয়ালারাও তাদের চেনে। আর এইসব বাড়িওয়ালারা ভেতরে ভেতরে একজন আরেকজনের প্রতিদ্বন্দ্বী। কার ছেলে-মেয়ে কী করে, তাদের আচার-আচরণ কেমন, ধর্মে-কর্মে মতি আছে কি না, এসব ব্যাপারে জানার অদম্য কৌতুহল তাদের। নামাজ পড়া শেষে মসজিদের সামনে কিছুক্ষণের জন্য ছোট ছোট জটলা হয়, সেসব জটলায় এই সমস্ত পারিবারিক আলোচনাই হয় বেশি। বাবা আজকাল এসব জটলা এড়িয়েই চলেন, তবু চেনাজানা কেউ যখন সালাম দিয়ে হাত বাড়িয়ে কথা বলতে শুরু করেন, তখন তো আর তাদের উপেক্ষা করা যায় না। বাবার হাত ধরে চাচা আর ফাহাদের সামনেই অনেকে বলেন, ‘আপনার ছেলেকে তো মসজিদে দেখি না!’ মহল্লায় আমার দু-একজন স্কুলের সহপাঠী আছে, ওরা কেউ কেউ আমার সম্পর্কে কিছু কিছু কথা জানে। ওদের মাধ্যমে জেনেছে ওদের বাড়ির মানুষ। তারপর নামাজের পরের জটলায় তা আরো ছড়িয়েছে। 

এই তো আমাদের পাশের বাসার ইব্রাহিম চাচা কয়েক সপ্তাহ আগে জুম্মার নামাজের পর বাবাকে বলেছিলেন, ‘আজাদ সাহেব, শুনলাম আপনার পোলা নাকি নামাজ-কালাম পড়েনা, ধর্ম-টর্ম মানে না; এসব তো ভাল কতা না। ও মনে অয় নাস্তিক বোলোগারগো পাল্লায় পড়ছে, দ্যাহেন, ওরে পথে ফিরাইয়া আনতে পারেন কি না।’

আমি নিশ্চিত জানি ইব্রাহিম চাচা কোনোদিন ব্লগে ঢোকেননি, তিনি ইন্টারনেট ব্যবহার করতে জানেন না। এমনকি মোবাইলে তিনি কল ধরা আর কল করা ছাড়া আর কিছুই জানেন না। অথচ তিনি জানেন যে, ব্লগার মানেই নাস্তিক! কতো ধার্মিক, কতো ধর্মান্ধ, কতো মাদ্রাসা পড়ুয়া, কতো ইসলামী জঙ্গি যে ব্লগ ব্যবহার ক’রে তাদের উগ্র আদর্শ প্রচার করছে, তার কোনো খবরই এঁরা জানেন না, কেবল জানেন - ব্লগার মানেই নাস্তিক! 

আমাদের সামনের বাড়ির রহমান চাচা একদিন বাবাকে বলেছিলেন, ‘একটা মাত্র ছেলে আপনার, অথচ ছেলেটাকে মানুষ করতে পারলেন না আজাদ ভাই। ফাহাদ কতো ভাল, আদব-কায়দা জানে; আপনার ছেলে রাস্তায় দেখা হলে সালাম-আদাবও দেয় না। অথচ দুইজন একই বাড়ির ছেলে।’ 

সেদিনও আমার চাচা আর ফাহাদ বাবার সঙ্গে ছিল। আমি স্পষ্ট কল্পনা করতে পারি আমার বাবার সেই অসহায়, করুণ মুখ। আমি অনুভব করতে পারি বাবার বুকের ব্যথা। আমার চাচার গর্বিত মুখও আমার অকল্পনীয় নয়। বাবা এখন নামাজ পড়ার পর পারলে যেন পালিয়ে আসেন! আমাদের কোনো আত্মীয়-স্বজনের বিয়ে, জন্মদিন ইত্যাদি অনুষ্ঠানেও বাবা আজকাল যান না। আর আমি তো সেই কবে থেকেই এসব অনুষ্ঠান বর্জন করেছি। এখন সকল প্রকার নিমন্ত্রণ রক্ষা করেন মা আর ছোট আপু। আমি জানি যে, বাবার এইসব অনুষ্ঠান উপেক্ষা করার কারণ আমি; আত্মীয়স্বজন বা পরিচিতজনরা আমার বিষয়ে বাবাকে বিব্রত প্রশ্ন, পরামর্শ, সহমর্মিতা প্রকাশ করবে, তাই বাবা এসব অনুষ্ঠান উপেক্ষা করেন। মাকেও এসব পরিস্থির মুখোমুখি হতে হয়, কিন্তু কেউ না গেলে আত্মীয়তা রক্ষা হয় না, তাই বাধ্য হয়েই মাকে যেতে হয়। বাবা-মাকে এই সংকট থেকে রক্ষা করার একমাত্র উপায় হলো আমার ধার্মিক হওয়া এবং নামাজ-রোজা রাখা। কিন্তু আমার পক্ষে তা একেবারেই অসম্ভব। তাই এই সংকটের সমাধান বাবা-মাকেই করতে হবে। এই সংকটের একমাত্র সমাধান প্রতিবাদ করে মানুষের মুখ বন্ধ করা, কিন্তু বাবা-মা কখনোই তা করেন না, কোনোদিন করবেনও না; কারণ মানুষের এইসব অন্যায় আচরণই তাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়। ফলে বাবা-মাকে বারবার মাথা নিচু ক’রে মানুষের অপমান হজম করতে হয়।

(চলবে)