২১ আগস্ট, ২০১৬

খায়বার যুদ্ধ - ৮: আল-সাব বিন মুয়াধ দুর্গ লুণ্ঠন!: কুরানে বিগ্যান (পর্ব- ১৩৭): ত্রাস, হত্যা ও হামলার আদেশ – একশত এগার

লিখেছেন গোলাপ

(আগের পর্বগুলোর সূচী এখানে)

"যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।" 

স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও তাঁর অনুসারীদের অতর্কিত আগ্রাসী আক্রমণে আক্রান্ত খায়বারের আল-সাব বিন মুয়াধ দুর্গের অধিবাসীরা আল-নাইম দুর্গের অধিবাসীদের মতই [পর্ব: ১৩৪] নিজেদের প্রাণ ও সম্পদ রক্ষার প্রচেষ্টায় কীভাবে মরণপণ লড়াই করেছিলেন; তিন দিন যাবত দুঃসাহসী ও নৃশংস যুদ্ধ শেষে কীভাবে তাঁরা পরাজিত হয়ে বন্দীত্ব বরণ করেছিলেন; তাঁদের দুর্গ মধ্যে প্রবেশের প্রাক্কালে মুসলমানরা কীভাবে মুহুর্মুহু "আল্লাহু আকবর (মহান)" চিৎকারের মাধ্যমে খায়বারের জনপদবাসীদের আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছিলেন; কী কারণে মুহাম্মদ তাঁর অনুসারীদের জন্য তাঁর  ‘জিহাদ’ নামের কর্মকাণ্ডের ফজিলত (পুরস্কার) দুনিয়া ও আখিরাতে "সর্বোচ্চ ও শ্রেষ্ঠ সৎকর্ম " আখ্যায় আখ্যায়িত করে তাঁর অনুসারীদের মধ্যে বাজারজাত করেছিলেন - তার আলোচনা আগের পর্বে করা হয়েছে।

আল-ওয়াকিদির (৭৪৮-৮২২ খ্রিষ্টাব্দ) বর্ণনার পুনরারম্ভ: [1]
পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ১৩৬) পর:

ইবনে আবি সাবরা < ইশাক বিন আবদুল্লাহ বিন আবি ফারওয়া হইতে < আবদ আল-রাহমান বিন জাবির বিন আবদুল্লাহ হইতে < তার পিতা হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে [আল-ওয়াকিদির অব্যাহত] বর্ণনা:

'---আল্লাহর কসম, আমরা যে সকল খাদ্যের সন্ধান পাই, যা আমরা চিন্তাও করিনি যে সেখানে আছে, তা হলো: বার্লি, খেজুর, ঘি, মধু, তেল ও মাংস। আল্লাহর নবীর ঘোষক ঘোষণা করে, "তোমরা খাও ও পশুদের খাওয়াও, কিন্তু কোনোকিছু সাথে করে নিয়ে যেয়ো না।" সে বলেছে: এগুলো তোমাদের দেশে নিয়ে যেয়ো না। মুসলমানরা সেখানে অবস্থানকালে খাবারের জন্য ও তাদের সত্তয়ারের পশুদের খাবারের জন্য দুর্গ থেকে খাবারগুলো নিয়ে যাচ্ছিলো। কাউকেই তার প্রয়োজনীয় খাবার নিতে নিষেধ করা হয়নি, কিন্তু তা নির্দিষ্ট প্রাপ্য অনুযায়ী ভাগ-বাটোয়ারা করে বণ্টন করা হয়নি।

তারা সেই দুর্গে দেখতে পায় পরিধেয় বস্ত্র ও কাচের তৈরি জিনিসপত্র। তাদেরকে হুকুম করা হয়, তারা যেন মদের বয়ামগুলো (jars) ভেঙে ফেলে। তারা তা ভেঙে ফেলে যতক্ষণে না দুর্গের সবখানে টপটপ করে মদগুলো পড়তে থাকে। বয়ামগুলো ছিলো বিশাল ও তা বহন করে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিলো না। আবু থালাবা আল-খুসানি যা বললো, তা হলো, "আমরা সেখানে দেখতে পাই পিতল ও মাটির তৈরি পাত্র।" ইহুদিরা সেগুলোতে করে তাদের খাবার খেতো ও পানীয় পান করতো। আমরা আল্লাহর নবীকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করি ও তিনি বলেন, "এগুলো ধুয়ে নাও ও তাতে করে খাবার রান্না করো, খাবার খাও ও পানীয় পান করো।" তিনি বলেন, "এগুলোতে আগে পানি গরম করো ও তারপর তাতে রান্না করো। খাবার খাও ও পানীয় পান করো।"

আমরা সেখান থেকে অনেকগুলো ভেড়া, গবাদি-পশু ও গাধা হস্তগত করি। আমরা আরও হস্তগত করি অনেক যুদ্ধ সরঞ্জাম, একটি ম্যাংগোনেল (Mangonel) ও কাঠের তৈরি বিভিন্ন রকমের বর্তন। আমরা জানতাম, তারা মনে করেছিলো যে, এই অবরোধটি চলবে একটানা, কিন্তু আল্লাহ তাদের অপমানকর অবস্থা ত্বরান্বিত করে। [2]

আবদ আল-হামিদ বিন জাফর তার পিতা হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমাকে বলেছে, সে বলেছে: আল-সাব বিন মুয়াধ দুর্গগুলোর একটি থেকে যা বের করে আনা হয়, তা হলো,

[১] বিশ গাঁটরি পোশাক-পরিচ্ছদ,
[২] ইয়েমেন থেকে আনা মালপত্রের অনেকগুলো বাণ্ডিল,
[৩] এক হাজার পাঁচ শত টুকরা মখমল। প্রত্যেকটি লোক তার পরিবারের জন্য মখমল সঙ্গে করে নিয়ে আসে।

তারা দশ বোঝা জ্বালানী কাঠ হস্তগত করে। আদেশ করা হয় যে, কাঠগুলো যেন দুর্গ থেকে বের করে নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়। সেগুলো পোড়াতে কয়েক দিন সময় লেগে যায়। মদের বয়াম গুলো ভেঙে ফেলা হয়, আর চামড়ার ব্যাগে ভর্তি মদগুলো উল্টে ফেলে দেয়া হয়। সেই সময় মুসলমানদের একজন সেখানে আসে ও ঐ মদগুলো থেকে মদ পান করে ও এই বিষয়টি আল্লাহর নবীর সম্মুখে পেশ করা হায়। যখন তাকে তাঁর সম্মুখে আনা হয়, তখন তিনি তা ভীষণ অপছন্দ করেন, তিনি তাকে এক স্যান্ডেল দিয়ে প্রহার করেন ও সেখানে যারা অবস্থান করছিলো, তারাও তাকে তাদের স্যান্ডেল দ্বারা পিটান। তার নাম ছিলো মাতাল আবদুল্লাহ। সে ছিলো ঐ লোক, যে মদপান থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারতো না ও আল্লাহর নবী তাকে কয়েকবার পিটিয়েছেন। উমর বিন আল-খাত্তাব বলে, "তার ওপর আল্লাহর অভিশাপ পড়ুক! কতবার তাকে মারধর করা আবশ্যক হবে?" আল্লাহর নবী বলেন, "হে উমর, এভাবে বলো না, কারণ প্রকৃতপক্ষেই সে আল্লাহ ও তার রসুলকে ভালবাসে।" সে বলে: অতঃপর আবদুল্লাহ স্বচ্ছন্দ বোধ করে ও তাদের সাথে এমন ভাবে বসে পড়ে যে, মনে হয় সে ছিলো তাদেরই মত একজন।

ইবনে আবি সাবরা <আবদ আল-রহমান বিন আবদুল্লাহ বিন আবি সাসা হইতে <আল-হারিথ বিন আবদুল্লাহ বিন কা'ব হইতে <উম্মে উমারা হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমাকে বলেছে যে, সে [উম্মে উমারা] বলেছে:

আমরা আল-সাব বিন মুয়াধ দুর্গে দেখতে পাই এমন সব খাবার - আমি যা চিন্তাও করিনি যে, তা খায়বারে থাকতে পারে। মুসলমানরা যদি সেখানে মাসের পর মাস অবস্থান করতো কিংবা তার চেয়েও বেশি, তারা তাদের দুর্গ থেকে তারা সেগুলো খেতে পারতো ও তাদের পশুদের খাওয়াতে পারতো। কাউকেই বাধা দেওয়া হয়নি ও এক-পঞ্চমাংশ অংশটিও নেওয়া হয়নি [কুরান: ৮:৪১]। আল-মিকসামে বিক্রি করার জন্য আমি পোশাক-পরিচ্ছদের মধ্যে থেকে অনেক জিনিস নিয়ে আসি। সেখানে ছিলো ইহুদিদের তসবিগুলোর পুঁতি। তাকে বলা হয়েছিলো, "আল-মিকসামে কে এমন আছে, যে এগুলো কিনবে?" সে বলেছিলো, "আল-কাতিবা অঞ্চলের ইহুদিদের মধ্যে থেকে যারা ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়েছে তারা, ও সেখানে উপস্থিত বেদুইনরা।" এর সবগুলোই খরিদ করা হয়েছিলো। মুসলমানদের মধ্যে যারা পুঁতিগুলো কিনেছিল, তা লুণ্ঠিত মালের অংশ বাবদ বাদ দেয়া হয়েছিলো। -----’

- অনুবাদ, টাইটেল, [**] ও নম্বর যোগ - লেখক।

>>> মুহাম্মদ ইবনে ইশাক, আল-তাবারী ও আল-ওয়াকিদির খায়বার যুদ্ধ উপাখ্যানের বর্ণনায় আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি যে, বানু খোজা গোত্রের অন্তর্ভুক্ত বানু আসলাম গোত্রের অধীন বানু সাহম গোত্রের লোকেরা মুহাম্মদের কাছে এসে যখন তাদের নিঃসম্বল ও দুরবস্থার কথা জানায়, তা শুনে মুহাম্মদ তাঁর আল্লাহর কাছে যে দোয়া করেছিলেন, তা হলো এই যে, আল্লাহ যেন তাদেরকে খায়বারের সবচেয়ে খাদ্য ও সম্পদশালী দুর্গটি দখলের ব্যবস্থা করে দিয়ে তার ভেতরের সমস্ত খাদ্য ও সম্পদ লুণ্ঠন কারার তৌফিক দান করে। অতঃপর তিনি যুদ্ধের ঝাণ্ডাটি আল-হুবাব বিন আল-মুনধির বিন আল-জামুহ নামের এক অনুসারীকে দেন ও তাঁর অনুসারীদের আল-সাব বিন মুয়াধ দুর্গ আক্রমণ করার জন্য পাঠান [বিস্তারিত: 'জিহাদের ফজিলত (পর্ব: ১৩৫)'!]। অমানুষিক নৃশংসতায় তাঁর এই অনুসারীরা ঐ দুর্গের বহু নিরপরাধ ইহুদিকে হত্যা ও বন্দী করে এই দুর্গটি দখল করে নেন (পর্ব: ১৩৬)। আদি উৎসের আল-ওয়াকিদির ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় আমরা জানতে পারি যে, এই দুর্গ দখলের পর মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা এই দুর্গের ভেতরে ইহুদিদের গচ্ছিত সমস্ত খাদ্যদ্রব্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, মালামাল, মখমল ও গবাদিপশু লুন্ঠন করেন।

এভাবেই অন্যের সম্পত্তি জোরপূর্বক কেড়ে নিয়ে মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা তাঁদের জীবিকা নির্বাহ ও সচ্ছলতার ব্যবস্থা করতেন।

ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে আল-ওয়াকিদির মূল ইংরেজি অনুবাদের অংশটিও সংযুক্ত করছি।


The detailed narrative of Al-Waqidi: [1]

Ibn Abi Sabra related to me from Ishaq b Abdullah b Abi Farwa from < Abd al-Rahman b Jabir b Abdullah from <his father. He said: [continued]

‘-- We found, by God, from the foods, what we did not think was there: barley, and dates, and ghee, honey, oil and fat. The herald of the Messenger of God called out, “Eat and feed your cattle but do not take away.” He says: Do not take it to your land. The Muslims were taking food from the fortress for their stay and for their riding beasts. No one was forbidden to take his needs but the food was not apportioned. They found clothes and glass in the fortress. They are commanded to break the jars of alcohol. They were broke them until the alcohol dripped all over the fortress. The jars were large and it was not possible to carry them. Abu Thalaba al-Khushani used to say, “We found in it containers of brass and clay.” The Jews used to eat and drink with them. We asked the Messenger of God and he said, “Wash it and cook and eat and drink with it.” He said, “Heat water in it and cook after. Eat and drink.” We took many sheep, cattle and donkeys from there. We also took many tools of war, a mangonel and many wooden vessels. We knew that they thought that the seize would be forever, but God hastened their humiliation.

Abd al-Hamid b Jafar related to me from his father, who said:
There went out from one of the fortresses of al-Sab b Muadh, twenty bundles of cloths, packages of coarse goods from Yemen, and one thousand five hundred pieces of velvet. Every man arrived with velvet for his family. They founds ten loads of wood. It was commanded that the wood be taken out of the fortress and burnt. They took several days to burn. The jars of alcohol were broken, and the skins of wine, spilled.  One of the Muslims came, at that time, and drank from the wine and the issue was raised before the Messenger of God. He detested it- when he was brought before him, he beat him with a sandal, and those who were present beat him with their sandals. He was named Abdullah the alcoholic. He was a man who could not abstain from drink, and the Prophet struck him several times. Umar b al-Khattab said, “God curse him! How often must he be beaten?” The Messenger of God said, “O Umar, do not say that, for indeed he loves God and His Messenger.” He said: Then Abdullah relaxed and sat down wih them as though he were one of them.

Ibn Abi Sabra related to me from Abd al-Rahman b Abdullah b Abi Sasaa   from al-Harith b Abdullah b Ka’b from Umm Umara. She said:  We found in the fortress of al-Sab b Muadh, food – I did not think could be there in Khaybar. The Muslims were able to eat during their stay for months and more than that, from the fortress, and feed their animals. No one was prevented, and there was no taking of the fifth. I took out from the cloth many things to sell in al-Miqsam. There were beads from the beads of the Jews. It was said to her, “Who is it that will purchase it in al-Miqsam?” She said, “The Muslims, the Jews in al-Katiba who have converted, and those Bedouin whi are present.” And all of those bought. As for those Muslims who purchased beads, it was deducted as booty. -----’
 
(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] “কিতাব আল-মাগাজি”- লেখক:  আল-ওয়াকিদি (৭৪৮-৮২২ খৃষ্টাব্দ), ed. Marsden Jones, লন্ডন ১৯৬৬; ভলুম ২, পৃষ্ঠা ৬৬৪-৬৬৫; ইংরেজি অনুবাদ: Rizwi Faizer, Amal Ismail and Abdul Kader Tayob; ISBN: 978-0-415-86485-5 (pbk); পৃষ্ঠা ৩২৭-৩২৮

[2] ম্যাংগোনেল (Mangonel)’ - গুলতির মত করে ভারী পাথর নিক্ষেপ করার জন্য মধ্যযুগে ব্যবহৃত এক ধরণের যুদ্ধাস্ত্রবিশেষ।