২৬ আগস্ট, ২০১৬

ইসলামি সম্মেলন সংস্থার মহাসচিব: "পরকালের কোনো সত্যতা নেই"

লিখেছেন ক্যাটম্যান

গত ১৯-০৮-২০১৬ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার প্রথম পাতায় প্রকাশিত একটি খবরের উপ-শিরোনাম খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। খবরটির উপ-শিরোনামে মুদ্রিত হয়েছে— “যুবকদের পরকালের মিথ্যা প্রলোভন যারা দেখাচ্ছে তাদের খুঁজে বের করতে হবে: ওআইসি মহাসচিব”।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবনে ওআইসি (Organisation of Islamic Cooperation) মহাসচিব ইয়াদ বিন আমিন মাদানি সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎকালে ওআইসি মহাসচিব বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলার প্রেক্ষিতে বলেন, ‘যুবকদের পরকালের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে আত্মত্যাগের এই ভুল পথে কারা পরিচালিত করছে তা আমাদেরকে খুঁজে বের করতে হবে।’ আর তাই ওআইসি মহাসচিবের সেই বাণী উপজীব্য করে পরের দিন ইত্তেফাক পত্রিকার প্রথম পাতায় উপর্যুক্ত উপ-শিরোনামটি গুরুত্বসহকারে প্রকাশিত হয়। ওআইসি মহাসচিব প্রদত্ত বাণীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, ‘পরকালের মিথ্যা প্রলোভন’ বাক্যাংশটি; অর্থাৎ তিনি তার বাণীতে স্বীকার করেছেন যে, পরকালের কোনো সত্যতা নেই। তাই পরকালের যাবতীয় প্রলোভন মিথ্যা। জনাব মাদানি প্রদত্ত বাণীটি সাধারণের বোধগম্য হওয়া সত্ত্বেও মাথামোটা মুমিন-মুসলমানগণ তা বুঝতে অপারগ। তাই উক্ত বাণীটির অনুকূল অর্থান্তর করার মানসে তারা অযৌক্তিক ব্যাখ্যার অবতারণায় লিপ্ত হয়। তারা বোঝাতে চায়, জনাব মাদানি উক্ত বাণীতে পরকালকে মিথ্যা বলেননি; তিনি পরকালের প্রলোভনকে শুধু মিথ্যা বলেছেন। তাদের এমন দাবি যে ধোপে টিকবে না, জনাব মাদানি প্রদত্ত বাণীটি সামান্য বিশ্লেষণ করলেই বিষয়টি আমাদের নিকট স্পষ্ট হবে। জনাব মাদানি প্রদত্ত বাণীটি একটু ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে লিখলে যা হয়, তা নিম্নরূপ:

মূল বাণী: পরকালের মিথ্যা প্রলোভন।
(ক) পরিবর্তিত বাণী: পরকালের প্রলোভন মিথ্যা।
(খ) পরিবর্তিত বাণী: মিথ্যা পরকালের প্রলোভন।

উপর্যুক্ত পরিবর্তিত বাণী দু'টির প্রথমটির অর্থ হলো - পরকালের যাবতীয় প্রলোভন মিথ্যা। এখানে সত্য প্রলোভন বা মিথ্যা প্রলোভন বলে কোনো আলাদা বিষয় নেই। আর দ্বিতীয় পরিবর্তিত বাণীটির অর্থ হলো- পরকাল মিথ্যা, বিধায় সেই মিথ্যা পরকালের যাবতীয় প্রলোভনও মিথ্যা, অর্থাৎ কোনো প্রলোভন সত্য হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। পুরো বিষয়টি ঈমানি প্রতারণার সামিল।

অপরপক্ষে জনাব মাদানি প্রদত্ত মূল বাণীটির সঠিক অর্থ নিরূপণে মুমিন-মুসলমানদের ব্যাখ্যাও যদি অনুসরণ করি, সেক্ষেত্রে প্রশ্ন জাগে পরকালের মিথ্যা প্রলোভনের বিপরীতে পরকালের সত্য প্রলোভন কী কী? আর মস্তিষ্ক প্রক্ষালক ধর্মীয় গুরুরা নাশকতাকারী মুসলিম জঙ্গীদেরকে কী কী মিথ্যা প্রলোভনে প্রলোভিত করে থাকে?

আল-কুরআন ও আল-হাদিস ঘেঁটে আমরা জানতে পারি যে, ইসলাম প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ করতে মুহম্মদের আল্লাহ প্রত্যেক মুসলিম পুরুষকে জান্নাতে গমন ও তথায় বিষমকামিতা চরিতার্থকরণে উদ্ভিন্নযৌবনা ও আয়তলোচনা হুর, সমকামিতা চরিতার্থকরণে মুক্তা সদৃশ গেলমান অর্থাৎ সুন্দর সুন্দর বালক, পানাহারের নিমিত্তে দুধ, মধু, মদ, শীতল পানি ও ফলের ন্যায় স্থূল বিষয়ের প্রলোভন দেখিয়েছেন। এবং একই উদ্দেশ্যে মুসলিম নারীদেরকে একজন জান্নাতি কামুক পুরুষের যৌনদাসী হয়ে জান্নাতে প্রবেশের প্রলোভন দেখিয়েছেন, যা নির্বোধ মুমিন-মুসলমানদের নিকট সত্য প্রলোভন বলে বিবেচিত।

অপরপক্ষে মস্তিষ্ক প্রক্ষালক ধর্মীয় গুরুরা মুসলিম জঙ্গীদেরকে নাশকতা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ করতে একইভাবে আল-কুরআন ও আল-হাদিসে বর্ণিত উপর্যুক্ত স্থুল প্রলোভনসমূহ দেখিয়ে থাকেন, যা আমরা সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গীদের প্রদত্ত জবানবন্দির সুবাদে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম হতে জানতে পেরেছি। বিধায় নাশকতাকারী জঙ্গী মুসলমানগণ যে সকল প্রলোভনে প্রলোভিত হয়ে নাশকতা সৃষ্টি করে থাকে, কুরআন-হাদিসের বিবেচনায় তা সত্য প্রলোভন। অপরপক্ষে মুসলিম জঙ্গীদের অনুসৃত প্রলোভনসমূহ যদি মিথ্যা প্রলোভন বিবেচিত হয়, সেক্ষেত্রে মুমিন-মুসলমানদের দাবিকৃত সত্য প্রলোভনসমূহও মিথ্যা প্রলোভনে পর্যবসিত হতে বাধ্য। তাহলে সত্য প্রলোভন ও মিথ্যা প্রলোভনের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। এই বিবেচনায় ওআইসি মহাসচিব ইয়াদ বিন আমিন মাদানি প্রদত্ত বাণীটি সঠিক; অর্থাৎ ‘পরকালের মিথ্যা প্রলোভন’ বাক্যাংশ দ্বারা মিথ্যা পরকালের যাবতীয় প্রলোভনকেই মিথ্যা সাব্যস্ত করেছেন তিনি। মুসলিম বিশ্বের ওপর কর্তৃত্বপরায়ণ বৃহত্তম সংগঠন ইসলামি সম্মেলন সংস্থা বা ওআইসি। আর সেই বৃহত্তম সংগঠনের মহাসচিব পদে আসীন থেকে কাফেরসুলভ ভঙ্গিমায় সময়োচিত যে-বাণী জনাব মাদানি প্রদান করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।

যুবকদেরকে পরকালের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে আত্মত্যাগের ভুলপথে পরিচালনাকারীদের খুঁজে বের করার তাগিদ অনুভব করেছেন তিনি। তার ন্যায় আমরাও সেই একই তাগিদ সদা সর্বদা অনুভব করে থাকি। আর তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমরা যা দেখতে পাই, তা হলো, সারা পৃথিবীতে যাবতীয় ইসলামি জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদের মূল উৎস নিহিত রয়েছে আল-কুরআন, আল-হাদিস ও কুরআন-হাদিস নির্ভর ধর্মীয় কিতাবগুলোয়। সারা পৃথিবীর সম্ভাবনাময় তরুণ সমাজ কুরআন-হাদিসের সন্ত্রাসবাদী আদর্শের খপ্পরে পড়েই জঙ্গিবাদের ন্যায় আত্মবিনাশী পথ বেছে নেয়। কুরআন-হাদিস ইসলামি জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদের পাশাপাশি পারলৌকিক মিথ্যা প্রলোভনেরও আকর গ্রন্থ। তাই কুরআন-হাদিস থেকেই ইসলামি জঙ্গিরা পরকালের মিথ্যা প্রলোভন লাভ করে থাকে। অথচ সন্ত্রাসবাদের ধারক ও বাহক কুরআন-হাদিসের বিষয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। বরং ইসলামি সন্ত্রাসবাদ ও পারলৌকিক মিথ্যা প্রলোভনের আকর গ্রন্থ কুরআন-হাদিস অনুসরণ করে যে সকল ধর্মীয় গোষ্ঠী ও ব্যক্তি সম্ভাবনাময় তরুণ সমাজকে নাশকতা সৃষ্টির ভুল পথে পরিচালিত করে, তাদেরকে খুঁজে পেতেই তিনি বেশি আগ্রহী। অথচ তাদেরকে খুঁজে পেলে তিনি যে কোনো বিপ্লব করে ফেলবেন, তা-ও নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে ওআইসি মহাসচিব সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষকদের খুঁজে বের করার যে তাগিদ ব্যক্ত করেছেন, মূলত তা তার বাগাড়ম্বর ছাড়া অন্য কিছু নয়। কারণ পারলৌকিক সমস্ত মিথ্যা প্রলোভনকে পুঁজি করে ইসলামি জঙ্গিদের নেতৃত্ব দান ও ইসলামি জঙ্গিবাদের সুচারু ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে কুরআন-হাদিসের হীন আদর্শ অনুসরণকারী বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী। তন্মধ্যে কট্টরপন্থী ওয়াহহাবি গোষ্ঠী গত কয়েক শতাব্দী যাবৎ সারা পৃথিবীব্যাপী ইসলামি জঙ্গিবাদের প্রচার, প্রসার ও প্রতিষ্ঠায় অন্যতম ভূমিকা পালন করছে। আর সেই ওয়াহহাবিবাদের ভিত্তিভূমি ও কেন্দ্র হলো ওআইসি মহাসচিব জনাব মাদানির জন্মভূমি সৌদি আরব। যে ওয়াহহাবিবাদের সুবিধা নিয়ে সৌদি রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, নিজ দেশে সেই ওয়াহহাবিবাদের ভয়াবহ বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতেই রাজতান্ত্রিক পৃষ্ঠপোষকতায় তা সারা বিশ্বে রপ্তানি করছে ওআইসির গডফাদার সৌদি আরব। খোদ ওআইসি মহাসচিব কিনা যে দেশের নাগরিক। ওআইসি মহাসচিবের তাগিদ অনুযায়ী জঙ্গীবাদের পৃষ্ঠপোষক ও পরিচালনাকারীদের খুঁজে বের করতে আমরা যতই সচেষ্ট হই না কেন, তবে তিনি কখনও তাদেরকে খুঁজে বের করতে সচেষ্ট হবেন না; প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে যদিও তিনি বলেছেন ‘যুবকদের পরকালের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে আত্মত্যাগের এই ভুল পথে কারা পরিচালিত করছে তা আমাদেরকে খুঁজে বের করতে হবে।’

যাহোক, ওআইসি মহাসচিব তাঁর প্রতিশ্রুত তাগিদ যথাযথভাবে অনুসরণ না করলেও, বিশ্ব ওয়াহহাবিবাদের কেন্দ্র সৌদি আরব নিয়ন্ত্রিত বৃহত্তম ইসলামি সংস্থার মহাসচিব পদে আসীন থেকে ‘পরকালের মিথ্যা প্রলোভন’ অর্থাৎ পরকালের প্রলোভনকে মিথ্যা বলে যে সত্যভাষণ প্রদান করেছেন, সেজন্যই তিনি সাধুবাদ পাবার যোগ্য। তাঁর অবস্থা “এতক্ষণে” অরিন্দম কহিলা বিষাদে-এর ন্যায়। তিনি ইসলামি সন্ত্রাসবাদ ও ওয়াহহাবি জঙ্গিবাদের কুফল অনুভব করে বিষাদগ্রস্ত মনে উপর্যুক্ত সত্যভাষণটি প্রদান করেছেন। শুধু তা-ই নয়, ওয়াহহাবিপন্থীদের কট্টর ব্যাখ্যানুযায়ী উক্ত ঐতিহাসিক বাণী ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে জনাব মাদানি ইতোমধ্যেই নিজেকে একজন কাফের প্রমাণ করেছেন; যার কারণে ওআইসির ইতিহাসে একজন কাফের মহাসচিব হিসাবে জনাব মাদানির নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

যদিও তথাকথিত মুমিন-মুসলমানগণ দাবি করছেন যে, জনাব মাদানি ‘পরকালের মিথ্যা প্রলোভন’ বাক্যাংশটি অন্য কোনো বিষয় বোঝাতে গিয়ে হয়ত অজ্ঞতাবশত বলে ফেলেছেন। তবে এ জাতীয় কোনো দাবিই বিচক্ষণ জনাব মাদানির কাফের হওয়ার পথে প্রতিবন্ধক হতে পারে না। কারণ ওয়াহহাবিবাদের প্রতিষ্ঠাতা শায়খ মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব তার লিখিত ‘কাশফুশ শুবহাত’ পুস্তকে উক্ত বিষয়ে স্পষ্টতই লিখেছেন: “কেননা যখন তুমি বুঝতে পারলে যে, মানুষ তার মুখ থেকে একটা কূফরী কথা বের করলেও তার জন্য সে কাফের হয়ে যায়, এমন কি যদি সে উক্ত কথাটি অজ্ঞতাবশতঃ বলে ফেলে, তবু তার কোন ওযর আপত্তি খাটে না।” (পৃষ্ঠা-১১, অনুবাদ: আবদুল মতীন সালাফী, ১৪২০ হিজরী।)

সেই বিবেচনায় জনাব মাদানি নিঃসন্দেহে একজন জলিল কদর কাফের, যাকে নিয়ে মুসলিম বিশ্বের প্রগতিশীল জনগণ গর্ব করতে পারে। আর এমন গুরুতর বিষয় অবগত হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ব ওয়াহহাবিবাদের দাসানুদাস হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর নেতৃবৃন্দের যে কোনোরকম পায়ুপীড়া নেই, সে জন্যে তারাও ধন্যবাদার্হ।