২৯ আগস্ট, ২০১৬

খায়বার যুদ্ধ - ৯: আল-নাটার ইহুদিদের পরিণতি!: কুরানে বিগ্যান (পর্ব- ১৩৮): ত্রাস, হত্যা ও হামলার আদেশ – একশত বারো

লিখেছেন গোলাপ

(আগের পর্বগুলোর সূচী এখানে)

"যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।" 

অমানুষিক নৃশংসতায় খায়বারের নিরপরাধ ইহুদি জনপদের ওপর আগ্রাসী আক্রমণ চালিয়ে স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও তাঁর অনুসারীরা আল-নাটার আল-সাব বিন মুয়াধ দুর্গগুলো জোরপূর্বক দখল করার পর কীভাবে তাঁদের গচ্ছিত খাদ্যসামগ্রী ও অন্যান্য সমস্ত  সম্পদ লুণ্ঠন করেছিলেন; সেই লুণ্ঠিত সামগ্রীর তালিকায় কী ধরনের জিনিসপত্র ছিলো; এই দুর্গগুলো থেকে তারা কী পরিমাণ সম্পদ হস্তগত করেছিলেন; রান্না ও গৃহকর্মের প্রয়োজনে যে কাঠগুলো তাঁরা মওজুদ করে রেখেছিলেন, মুহাম্মদের নির্দেশে তাঁর অনুসারীরা কীভাবে সেগুলো ধ্বংস করেছিলেন - ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনা আগের পর্বে করা হয়েছে।

আল-ওয়াকিদির (৭৪৮-৮২২ খ্রিষ্টাব্দ) অব্যাহত বর্ণনার পুনরারম্ভ: [1]
পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ১৩৭) পর:

ইশাক বিন আবদুল্লাহ হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ইবনে আবি-সাবরা আমাকে যা বলেছে:

'-----ইতিমধ্যে মুসলমানরা আল-সাব বিন মুয়াধ দুর্গে ঘুরে বেড়ায়, এটির ছিলো একাধিক প্রবেশ পথ। তারা এক ইহুদিকে ভেতর থেকে ধরে নিয়ে আসে ও তার কল্লা কেটে ফেলে ও তার রক্তের কালো রং দেখে তারা বিস্মিত হয়। তাদের একজন বলে, "আমি এমন কালো রক্ত কখনোই দেখিনি।" সে বলেছে যে, এক বর্ণনাকারী তাকে বলেছে, "ঐ শেলফগুলোর একটিতে রাখা ছিলো রসুন ও জুস," আর সে কারণেই ইহুদিটি তাদের দৃষ্টিগোচর হয়। তারা তাকে সামনে নিয়ে আসে ও তার কল্লা কেটে ফেলে।

আল-নাইম দুর্গের সকল ইহুদি, যারা আল-সাব বিন মুয়াধ দুর্গে ছিলো তারা ও নাটায় অবস্থিত প্রত্যেক-টি দুর্গে যারা ছিলো তাদের সকলকে ‘কালাত আল-যুবায়ের (Qalat al-Zubayr)’ নামের এক দুর্গে স্থানান্তরিত করা হয়। আল্লাহর নবী ও মুসলমানরা দ্রুতগতিতে তাদের দিকে এগিয়ে আসে। তাদের দুর্গ মধ্যে তারা তাদেরকে ঘেরাও ও রুদ্ধ করে রাখে, যার ভেতরে প্রবেশ সহজগম্য ছিলো না। প্রকৃতপক্ষেই এটি ছিলো এক পাহাড়ের চূড়ায়, যেখানে কোনো ঘোড়া কিংবা মানুষ আরোহণ করতে পারতো না, সে কারণেই তা ছিল দুর্গম। নাটার দুর্গ মধ্যে যারা অবশিষ্ট ছিলো, দু'-একজন ছাড়া তাদের সম্বন্ধে কিছুই উল্লেখিত হয়নি। তাদেরকে সম্মুখে থেকে পাহারা দেওয়ার জন্য আল্লাহর নবী লোক নিযুক্ত করেন। ইহুদিদের মধ্যে এমন কেউ ছিলো না, যে তাদের সম্মুখে এসেছিলো, কিন্তু তাকে হত্যা করা হয়নি।কালাত আল-যুবায়ের’ এর লোকদের ঘেরাও করে রাখা অবস্থায় আল্লাহর নবী সেখানে তিন দিন যাবত অবস্থান করেন।

ইহুদিদের মধ্যে থেকে ঘাযযাল (Ghazzal) নামের এক লোক আবির্ভূত হয়। সে বলে, "আবু কাসেম, আমার নিরাপত্তা মঞ্জুর করুন; পরিবর্তে আমি আপনাকে এমনভাবে পথপ্রদর্শন করাবো, যা আপনাদের নাটার জনগণদের কাছ থেকে মুক্তি দেবে ও আপনারা বের হয়ে আল-শিইক (al-Shiqq) এর লোকদের উদ্দেশে রওনা দিতে পারবেন, এটি এ জন্যেই যে, প্রকৃতপক্ষেই আল-শিইক-এর জনগণ আপনাদের ভয়ে ভীত হয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় আছে।" সে বলেছে: আল্লাহর নবী তার, তার পরিবার ও তার সম্পদের নিরাপত্তা প্রদান করেন।

সেই ইহুদিটি বলে, "আপনারা যদি এক মাসও অবস্থান করেন, তারা তার পরোয়া করবে না এই কারণে যে, ভূগর্ভস্থ স্থানে তাদের একাধিক জলপ্রবাহ আছে। তারা রাতের বেলা বের হয়ে আসতে পারে, ও সেখানে পানি পান করে তাদের দুর্গে প্রত্যাবর্তন করতে পারে, যা আপনার জন্য দুর্গম। কিন্তু আপনি যদি তাদের পানির উৎসটি কেটে দেন, তবে তারা নিদারুণ যন্ত্রণায় পতিত হবে।" আল্লাহর নবী তাদের জলপ্রবাহের উৎসস্থানে গমন করেন ও সেগুলো বন্ধ করে দেন। যখন তিনি তাদের পানি পানের উৎসটি বন্ধ করে দেন, তারা তৃষ্ণার্ত অবস্থায় থাকতে পারে না। তারা বের হয়ে আসে ও প্রাণপণে যুদ্ধ করে। সেই সময় কিছু মুসলমান নিহত হয় ও সেদিন দশজন ইহুদিকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। আল্লাহর নবী তা দখল করেন ও এটিই ছিলো নাটার শেষ দুর্গ।

নাটা দখল সম্পন্ন করার পর আল্লাহর নবী আদেশ করেন যে, তারা যেন স্থানান্তরিত হয়, সেনাদল তাদের স্টেশনটি আল-রাজী থেকে স্থানান্তর করে পুনরায় আল-মাযিলোতে নিয়ে আসে। আল্লাহর নবীকে রাতের আক্রমণ থেকে রক্ষা করা হয়েছিলো, যেটি ছিলো ইহুদিদের যুদ্ধকৌশল, তাদের কাছ থেকে যে ভয়টি তিনি করতেন। নাটার জনগণ ছিলো ইহুদিদের মধ্যে সবচেয়ে সহিংস ও যার অন্তর্ভুক্ত ছিলো নাজাদ-এর লোকেরা। অতঃপর আল্লাহর নবী আল-শিইখ লোকদের উদ্দেশে যাত্রা করেন।----'

- অনুবাদ, টাইটেল ও [**] যোগ - লেখক।

>>> আদি উৎসে ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় আমরা জানতে পারি, খায়বারের আল-নাটা নামক স্থানে মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা সর্বশেষ যে-দুর্গটি দখল করে নিয়েছিলেন, তা হলো "কালাত আল-যুবায়ের" দুর্গটি। আল-সাদ বিন মুয়াধ দুর্গটি দখল করার পর মুহাম্মদ অনুসারীরা এই দুর্গ মধ্য থেকে এক ইহুদিকে ধরে নিয়ে এসে তাঁর কল্লা কেটে ফেলে। আল-ওয়াকিদির ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় আমরা আরও জানতে পারি, মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের আগ্রাসী আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়ে আল-নাইম, আল-সাব বিন মুয়াধ ও নাটায় অবস্থিত অন্যান্য দুর্গের প্রায় সকল ইহুদি পালিয়ে 'কালাত আল-যুবায়ের' নামের এক দুর্গম দুর্গে আশ্রয় নেন। মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা দ্রুতগতিতে এগিয়ে এসে তাদের সেই দুর্গটি চারিদিক থেকে ঘেরাও করে রাখেন, ইহুদিরা তাঁদের এই দুর্গ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। আর যে ইহুদিরা পালাতে ব্যর্থ হয়ে নাটার অন্যান্য দুর্গ মধ্যেই অবস্থান করছিলেন, আল ওয়াকিদিরি এই বর্ণনা মতে তাঁদের মাত্র দু'-একজন ছাড়া ঐ হতভাগ্যদের ভাগ্যে কী ঘটেছিলো, তার ইতিহাস কোথাও বর্ণিত হয়নি।

মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা 'কালাত আল-যুবায়ের' দুর্গটি অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন ঠিকই কিন্তু তার ভেতরে প্রবেশের ব্যবস্থা তারা করতে পারেনি। তাই মুহাম্মদ এই দুর্গের সম্মুখে পাহারার ব্যবস্থা করেন ও যে ইহুদিরাই তাদের সম্মুখে আসে, তাঁদের সকলকেই তারা খুন করে। তিন দিন যাবত এমত অবস্থা চলে। অতঃপর এই ইহুদিদের মধ্য থেকে ঘাযযাল নামের এক ব্যক্তি মুহাম্মদের কাছে এসে জানান যে, মুহাম্মদ যদি তাকে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন, তবে সে মুহাম্মদকে এমনভাবে সাহায্য করবে যে অতি শীঘ্রই মুহাম্মদ এই দুর্গটি দখলের মাধ্যমে আল-নাটার জনপদবাসীদের সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত  করে খায়বারের আল-শিইক নামক স্থানের লোকদের আক্রমণ করার জন্য রওনা হতে পারবে। মুহাম্মদ যখন তার এই প্রস্তাবে রাজি হয়, তখন সে তাঁকে জানায় যে, এই দুর্গের ভূগর্ভস্থ স্থানে পানি পান করার ব্যবস্থা আছে। সে মুহাম্মদকে তাদের সেই পানির উৎসটি কেটে দেয়ার পরামর্শ দেন, মুহাম্মদ তাঁদের সেই পানির উৎসটি বন্ধ করে দেন।

>> পানির অপর নাম জীবন, কারণ পানি ছাড়া কোনো জীব বাঁচতে পারে না। যখন কোনো জনপদের একমাত্র পানির উৎসটি বন্ধ করে দেয়া হয়, তখন সেই জনপদের দুগ্ধপোষ্য শিশু থেকে শুরু করে সকল বয়সের শিশু-কিশোর, গর্ভবতী মহিলা, বৃদ্ধ, অতি বৃদ্ধসহ সকল বয়সের মানুষরা পিপাসিত অবস্থায় তিলে তিলে কষ্ট ভোগ করেন। সমস্ত পৃথিবীতে প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মস্তিষ্কের একজন মুসলমানকেও হয়তো পাওয়া যাবে না, যে ‘কারবালা প্রান্তরে’ ইমাম হুসেইনের পরিবার-সদস্যদের পানিবঞ্চিত অবস্থায় প্রচণ্ড নিষ্ঠুরতায় তৃষ্ণার্ত ও পিপাসিত রাখার খবর কখনোই শোনেননি। তাঁরা এই ঘটনাকে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও করুণ ইতিহাসের একটি হিসাবে আখ্যায়িত করে প্রতিবছর মহরম মাসে দোয়া-মিলাদ মাহফিল, ইবাদত বন্দেগী, রোজা রাখা, তাজিয়া উৎসব - ইত্যাদি বিভিন্ন ভাবে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা স্মরণ করেন।

আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি, প্রচণ্ড নিষ্ঠুরতায় অনুরূপ পানিবঞ্চিত, তৃষ্ণার্ত ও পিপাসিত রেখে যুদ্ধে জয়ী হবার এই অমানবিক কৌশলের গোড়াপত্তনকারী ব্যক্তিটি ছিলেন এই ইসলাম অনুসারীদেরই স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)! কারবালা প্রান্তরের এই নৃশংস ঘটনার সাড়ে ছাপ্পান্ন বছর পূর্বে, ৬২৪ সালের মার্চ মাসে, এই ইমাম হুসেইনেরই নানা মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কুরাইশদেরকে প্রচণ্ড নিষ্ঠুরতায় অনুরূপ পানিবঞ্চিত, তৃষ্ণার্ত ও পিপাসিত রাখার কৌশলের গোড়াপত্তন করে যুদ্ধ জয় করেছিলেন (বিস্তারিত আলোচনা '"নৃশংস যাত্রার সূচনা [পর্ব ৩২]" পর্বে)। আদি উৎসের ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় আমরা আবারও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখতে পাই।

'কারবালা প্রান্তর' ইতিহাসের সেই খুনিদের সবাই ছিলেন মুহাম্মদ অনুসারী! তারা কোনো কাফের, মুশরিক, ইহুদি-খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সদস্য ছিলেন না। নবীর শিক্ষায় শিক্ষিত এই অনুসারীরা যুদ্ধে জয়ী হবার এই অমানবিক মোক্ষম কৌশলটি তাদের সেই নবীরই প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র ও তাঁর পরিবার ও সহযাত্রীদের ওপর প্রয়োগ করেছিলেন!

ইসলামের ইতিহাস বড়ই বিচিত্র!

ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে আল-ওয়াকিদির মূল ইংরেজি অনুবাদের অংশটিও সংযুক্ত করছি।


The detailed narrative of Al-Waqidi: [1]

Al-Waqidi said: Ibn Abi-Sabra related to me from Ishaq b Abdullah. He said,
‘----Meanwhile the Muslims roamed the fortress of al-Sab b Muadh, and it had entrances. They brought out a Jew, and cut of his head, and were surprised at the blackness of his blood. One of them says, “I have never seen such black blood.” He said: A speaker says, “One of those shelves holds garlic and broth,” and so the Jew was revealed. They brought him forward and cut of his head.

The Jews of the fortress of Naim, all of them, those from the fortress of al-Sab b Muadh, and those from every fortress in Nata were transferred to a fortress named Qalat al-Zubayr. The Messenger of God and the Muslims marched to them. They besiezed them and imprisoned them in their fortress, which was inaccessible. Indeed it was on the top of a rock and neither horse nor man could ascend it, for it was inaccessible. The rest stayed, and there is no mention of them, in the fortress of al-Nata- but a man or two. The Messenger of God placed men in front of them to keep watch over them. A Jew did not appear before them but they killed him. The Messenger of God stayed besieging those who were in Qalat al-Zubayr for three days.

A man from the Jews named Ghazzal arrived. He said, “Abu Qasim, grant me protection and I will lead you to what will relieve you from the people of al-Nata and you will go out to the people of al-Shiqq, for indeed the people of al-Shiqq are destroyed from fear of you.” He said: The Messenger of God granted security to him, his family and property. The Jew said, “If you stayed a month they would not care, for they have streams under the Earth. They would go out at night, drink there and return to their fortress, which is inaccessible to you. But if you cut of their water, they will be distressed.”

The Messenger of God went to their streams and stopped them. When he stopped their drinking source they were not able to stay thirsty. They set out and fought a strong battle. A few Muslims were killed, at that time, and ten Jews were taken at that day. The Messeenger of God conquered it and it was the last of the fortresses of Nata. When the Messenger of God finished with Nata he commanded that they transfer, and the troops move from their station in al-Raji back to al-Manzilo. The Messenger of God was protected from night attacks, the war of the Jews, and what he feared from them. The people of Nata were the most violent of the Jews and the people of the Najd were among them. Then the Messenger of God moved to the people of Shiqq. ---’

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] “কিতাব আল-মাগাজি”- লেখক:  আল-ওয়াকিদি (৭৪৮-৮২২ খৃষ্টাব্দ), ed. Marsden Jones, লন্ডন ১৯৬৬; ভলুম ২, পৃষ্ঠা ৬৬৫-৬৬৭; ইংরেজি অনুবাদ: Rizwi Faizer, Amal Ismail and Abdul Kader Tayob; ISBN: 978-0-415-86485-5 (pbk); পৃষ্ঠা ৩২৮