২০ আগস্ট, ২০১৬

ঈশ্বরের ইতিহাস - ৬ (অলৌকিক ঘটনা)

লিখেছেন মেসবাহ উস সালেহীন


মিরাকল আরবি হল মুজেজা। বাংলায় বলা যেতে পারে অলৌকিক ঘটনা। "দ্য স্টোরি অফ গড"-এর ৬ নাম্বার এপিসোডে বিভিন্ন ধর্মে প্রচলিত বিভিন্ন মিরাকল সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়েছেন; এগুলো কেন ঘটে, সেই ব্যাখ্যা খুঁজেছেন মরগ্যান ফ্রিম্যান।

সেমেটিক ধর্মগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মজাদার মিরাকলটা হচ্ছে হজরত মুসার সাথে সম্পর্কিত। মিশরের নীল নদের তীরে মূসা নামে একজন ক্রীতদাস সরদার এক ঈশ্বরের ধারণা নিয়ে এলেন। তাঁর ঈশ্বরের নাম জিহোভা। স্থানীয় প্রশাসন তাকে তার ধর্ম প্রচারে বাধা দিলে তিনি দলবল নিয়ে নীল নদ পার হয়ে ইজরাইলে এসে বসতি স্থাপন করলেন। (নীল নদ কীভাবে পার হলেন সেটা নিয়ে অনেক মিথ আছে।প্রচলিত গল্প হচ্ছে এই যে, তিনি তাঁর হাতের অলৌকিক লাঠির সাহায্যে নদীর পানিতে আঘাত করলে নদীতে ৭ টি সেতু তৈরি হল। মূসার লোকেরা সবাই সেই সেতুগুলো দিয়ে পার হল। ধাওয়া করে আসা ফেরাউনের সৈন্যরাও সেই সেতুগুলোয় উঠল পার হওয়ার জন্য। কিন্তু তারা মাঝামাঝি আসতেই সেতুগুলো ভেঙে পড়ল। সৈন্যরা সব পানিতে ডুবে মারা গেল। আরজ আলি মাতব্বর এই ঘটনার ব্যাখ্যা হিসেবে বলেছেন, সম্ভবত মূসা নবীর লোকেরা নদী পার হয়েছেন ভাটার সময় আর ফেরাউনের সৈন্যরা ডুবে গেছে জোয়ারের পানিতে। মূসা নবী লাঠি ব্যবহার করে দেখেছিলেন, কোথায় পানির গভীরতা কম।

খ্রিষ্টানরা বিভিন্ন ইস্যুতেই মিরাকল বিশ্বাস করে। তারা বিশ্বাস করে, যিশুর জন্ম কোনো স্বাভাবিক নিয়মে ঘটেনি। যিশুর বাবা হচ্ছেন স্বয়ং ঈশ্বর, তাঁর মা হচ্ছেন মরিয়ম। ওই সময়ের প্রেক্ষিতে সময়ের যে কোনো এলিট ব্যক্তির নামেই এই ধরনের মিথ প্রচলিত হয়ে যেত।পীথাগোরাস সহ অনেক গ্রীক-রোমান দার্শনিকদের ক্ষেত্রেও এরূপ মিথ প্রচলিত হয়েছিল যে, তাঁদের জন্ম হয়েছে অলৌকিক উপায়ে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত শিশু ছিলেন এপোলোনিয়াস

এই ২০০০ সালে এসে অবশ্য কেউ এই ধরনের দাবি করে না। কেউ এই ধরনের দাবি করলে স্রেফ একটা ডিএনএ টেস্ট করলেই সত্যিকার বায়োলজিকাল বাবা-মা'র পরিচয় সহজেই বের হয়ে যেত।

ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী যিশু/ঈসা নবী ঈশ্বরের পুত্র নয়, তবে তিনি যোসেফ বা অন্য কোনো পুরুষেরও সন্তান নন। তিনি শুধুমাত্র মায়ের ডিম্বানু নিয়েই জন্মেছেন। (আমার পরিচিত এক মেডিকেল ছাত্র এ‌ই ঘটনাকে পার্থেনকার্পিক ফলের সাথে তুলনা করেছেন। পার্থেনোজেনেসিস-এ ছেলে-ফুল আর মেয়ে-ফুলের গ্যামেটের মিলন হয় না, এমনিতেই ফল উৎপন্ন হয়ে যায়, উদাহরণ - কলা। তবে এই ধরনের কলার বিচি হয় না। উদ্ভিদ বাদে প্রাণীর ক্ষেত্রে এই ধরনের পার্থেনোজেনেসিস সম্ভব নয়। ধরে নিলাম, যদি হয়ও, সেক্ষেত্রে যিশু হবে ইনফার্টাইল, তার যৌনক্ষমতা থাকবে না। "দ্য ভিঞ্চি কোড" থেকে আমরা দেখি যে, যিশুর বংশধর ছিল)

সকল মহাপুরুষের জন্ম নিয়েই কম-বেশি রহস্য/অস্বাভাবিকতা রয়েছে। যিশুর গল্প তো গেল, ইসমাইল নবীর জন্ম নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।ইব্রাহিম এবং তার বউ সারাহ অনেক বুড়ো হয়ে গিয়েছিল। তাদের কোনো সন্তান হচ্ছিল না। ইসলামী ভার্শন অনুযায়ী, সন্তানের আশায় ইব্রাহিম হাজেরা নামক এক কম বয়সি মেয়েকে বিয়ে করে। কয়েক মাসের ব্যবধানেই বুড়ি সারাহর গর্ভে ইসহাক (অপর নাম ইজরাইল) এবং যুবতী হাজেরার গর্ভে ইসমাইলের জন্ম হয়। মেনোপজ হয়ে যাওয়ার পরেও ইসহাক-এর জন্মটাই সত্যিকারের মিরাকল — এটাই দাবি ইহুদি আর খ্রিষ্টানদের। তাদের দাবি, হাজেরা বউ না, ও ছিল স্রেফ ইব্রাহীমের বাসার কাজের লোক। ওর গর্ভে যে সন্তান এসেছে, সেটা অবৈধ সন্তান। ইসমাইল অবৈধ সন্তান — এই দাবিতে ইব্রাহিমের বউ (মহারানী) বাচ্চা এবং ওর মা হাজেরাকে মরুভূমিতে নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন। সেই মরুভূমিতেই ইসমাইলের কুদরতে জমজম কূপ তৈরি হয়েছিল বলে দাবি করে মুসলিমরা। ইসমাইলের বংশধর বলে পরবর্তীতে নবী মুহম্মদ দাবি করেন এবং সবাইকে তার দ্বীন গ্রহণ করার আহবান জানান। ইহুদি আর খ্রিষ্টানরা এই দাবি কখনো মেনে নেয়নি। তাদের যুক্তি: আল্লাহ শেষ যমানায় একজন নবী অবশ্যই পাঠাবেন, কিন্তু সেই নবী অবশ্যই আসবে ইসরাইলের বংশ থেকে (অর্থাৎ বনি ইসরাইল থেকে), অবৈধ সন্তান ইসমাইলের বংশধরদের মধ্য থেকে (মানে বনি ইসমাইল) আল্লাহ নবী নির্বাচন করবেন না। (বিস্তারিত দেখুন এখানে

ইসলামের নবীর জন্ম পরিচয় নিয়েও বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। তাঁর জন্মের পর পরেই তাঁর মা তাঁকে দান করে দেন হালিমা নামে আরেক মহিলার কাছে। এই হালিমাই মুহম্মদকে বুকের দুধ পান করান। মুসলিম ইতিহাসবিদেরা এই ঘটনার ব্যাখ্যা দেন এইভাবে যে, সেই সময়ে আরবের কালচার ছিল এই যে, নতুন বাচ্চাকে ব্রেস্ট ফিডিং-এর জন্য অন্য মেয়ের কাছে দিয়ে দেওয়া হত। তবে মজার ব্যাপার হল, সমসাময়িক আর কোনো সাহাবি কিংবা নবীর ছেলেমেয়ে নাতিপুতিদের কাউকেই দুধ মা’র কাছে দেওয়ার ইতিহাস খুজে পাওয়া যায় না। মহানবীর বাবা সম্পর্কেও বলা হয়ে থাকে যে, মুহম্মদের জন্মের আগেই তিনি মারা গিয়েছেন। স্বভাবতই সন্দেহ জাগে যে, নবীর বাবা-মা হয়তো এই সন্তানের দায়িত্ব স্বীকার করতে চাননি, তাই তার জন্মের প্রথম কয়েক বছরে বেশ কয়েকটা পরিবারে তাকে ঘুরে বেড়াতে হয়েছিল। ৮ বছর বয়সে আবু তালিব তাকে আশ্রয় দেয় এবং নিজের ভাতিজা পরিচয় দিয়ে লালন পালন করতে থাকে।

যিশুর জন্ম থেকে শুরু করে খ্রিষ্টধর্মের অনুসারীরা এখনো মিরাকল খুঁজে বেড়ায়। তারা সমসাময়িক বিভিন্ন সাধু-সন্ন্যাসীর জীবন থেকেও মিরাকল খুঁজে বেড়ায় ।

ভ্যাটিকান সিটিতে পন্টিফিকাল একাডেমি অফ সায়েন্স নামে একটা কমিটি আছে। এদের কাজ হল, কেউ যখন কোনো অলৌকিক ঘটনার দাবি করে, তখন সেটা পরীক্ষা করা। কোনো খ্রিষ্টানের জীবনের সাথে সম্পর্কিত কমপক্ষে ২ টা মিরাকল-এর প্রমাণ পাওয়া গেলে তাকে সেইন্ট উপাধি দেওয়া হয়। সর্বশেষ এইভাবে সেইন্ট উপাধি পেয়েছিলেন সাবেক পোপ দ্বিতীয় জন পল। এর মিরাকল হচ্ছে, তাঁর আশীর্বাদে ২ জন রোগী সুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।

যিশু সম্পর্কে আরেকটা মিরাকল খুব প্রচলিত আছে। যিশুকে একদিন খবর দেওয়া হল, আপনার এক শিষ্য মারা গেছে। যিশু তাকে দেখতে যান। গিয়ে তার শিষ্যের মৃতদেহর পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, "আমি তোমাকে জীবিত করে দিলাম। উঠে বসো।" সাথে সাথে সেই শিষ্য জ্যান্ত হয়ে উঠে বসল।

অনেক মনীষী সম্পর্কেই এই ধরনের মরা মানুষ জ্যান্ত করার মিরাকল শোনা যায়। তবে মেডিকেল হিস্ট্রিতে এটা একেবারে অসম্ভব নয়।বিভিন্ন কারনেই অনেক মানুষকেই ক্লিনিকালি ডেড ঘোষণা করার পরেও তাদের জীবন ফিরে পাবার ঘটনা ঘটেছে। ল্যাজারাস সিনড্রোম নামে এক রোগ আছে। এই রোগে মানুষের হৃদপিণ্ড বন্ধ হয়ে যাওয়ার কয়েক ঘন্টা পরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবার হৃদপিণ্ড চালু হয়ে যায়।ইতিহাসের পাতা জুড়ে অনেক ল্যাজারাস সিন্ড্রোমের রোগী পাওয়া যায়। এখানে এমন অনেক ঘটনা পাওয়া যাবে।

এছাড়া হৃদপিণ্ড বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও ডাক্তার/নার্স কিংবা অভিজ্ঞরা হৃদপিণ্ডে পাম্প করে বন্ধ হয়ে যাওয়া হৃদপিণ্ড চালু করে ফেলতে পারেন। মুখে ফু দিয়ে বাতাস ঢুকিয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া ফুসসুস আবার চালু করা যেতে পারে। মেডিকেল পরিভাষায় একে বলে CPR দেওয়া। পানিতে ডোবা রোগীর ক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার সময় এইভাবে সিপিআর দেওয়া হয়।