১০ আগস্ট, ২০১৬

'রঙ্গিলা রাসুল' সমাচার, পাকিস্তানের জন্মে এর সম্ভাব্য ভূমিকা এবং পাকিস্তানে ব্ল্যাসফেমি আইন - ৫

লিখেছেন মার্ক এন্টনি

পর্ব ১ > পর্ব ২ > পর্ব ৩ > পর্ব ৪

পাকিস্তানের বর্তমান অবস্থা, ব্ল্যাসফেমি আইন এবং ইলমুদ্দিন ইস্যু

এতক্ষণ যা বলেছি, তার সবই থিওরি মাত্র। এর কোনো নিশ্চিত সত্যতা নেই। কিন্তু এখন যা বলব, সেগুলো ফ্যাক্ট। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। একশো বছর আগে লাহোরে ধর্মানুভূতিতে আঘাত নিয়ে যে-সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল, তা আজ পাকিস্তানের লাহোরসহ অন্যান্য অঞ্চলে এখনও হয়ে চলেছে। এর আগে, চলুন, কিছু জিনিস জেনে নেয়া যাক।

ইলাম দিনের হত্যার অনেক সুদূরপ্রসারী প্রভাব ছিল। এর ফলে ইন্ডিয়ান পেনাল কোডে একটি নতুন অধ্যাদেশ যুক্ত হয়, যেখানে কারও ধর্মানুভূতিতে আঘাত করলে তা অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। পরবর্তীতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হবার পর পাকিস্তান পেনাল কোড অনুসারে “কথায়, দৃশ্যতভাবে, অভিযোগের মাধ্যমে বা ব্যঙ্গ করে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উপায়ে নবী মুহম্মদকে অপমান করা”-কে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। এরপর প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের সময়ে ১৯৮২ সালে ২৯৫বি সেকশনে কোরান অবমাননার শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১৯৮৬ সালে ২৯৫সি সেকশন অনুযায়ী নবী মুহম্মদ সম্পর্কে কটুক্তি করলে মৃত্যুদণ্ডের বিধান দেয়া হয়।

এখন আসি পাকিস্তানের অবস্থা ও এই ব্লাসফেমি আইনের অপব্যবহার প্রসঙ্গে। পাকিস্তানের কারাগারগুলোতে দেখা যায়, সেখানকার কয়েদিদের একটি বড় অংশ ব্ল্যাসফেমি আইনের দায়ে দণ্ডিত। এর মধ্যে বেশিরভাগই যে খ্রিষ্টান, হিন্দু ও আহমদিয়া (এরা রাষ্ট্র কর্তৃক ঘোষিত অমুসলিম) হবে, তা তো বোঝাই যায়, কিন্তু এরা ছাড়াও এখানে কিছু মুসলিমও আছে। জানা যায়, তাদেরকে ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে ব্ল্যাসফেমি আইনে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। কখনও সম্পত্তি নিয়ে কলহের কারণে, কখনও জমিজমা নিয়ে ঝামেলার কারণে বা কখনও ব্যক্তিগত বিরোধের সূত্রে তাদের ওপরে ব্লাসফেমি আইন এক ধরনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

এ তো গেল আইনিভাবে ভুক্তভোগীদের কথা। আবার জিন্নাহর কথায় ফিরে আসি। ইলমুদ্দিনকে সমর্থন করে জিন্নাহ তাঁর জাতির পুত্রদেরকে একটা জিনিস খুব ভালভাবেই শিখিয়ে গেছেন, সেটা হল - ধর্মরক্ষায় আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া হয়েছে এই অজুহাতে দোষীকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করা। জিন্নাহ এই কাজটি করে ইলমুদ্দিনকে তো বীরের আসনে বসিয়েছেনই, সেই সাথে এরকম আরও যে করবে, তারাও পাকিস্তানে বীর বলে বিবেচিত হবে, সেই ইঙ্গিতও তিনি এরই মাধ্যমে দিয়ে গেছেন। অনেক জায়গায় ধর্ম অবমাননার কারণে বিচার বহির্ভূতভাবে মানুষকে হত্যা করা হয়। হত্যাকারীরা মনে করে, ধর্ম অবমাননাকারী কাউকে যদি হত্যা করা হয়, তাহলে সেটা বৈধ বলে বিবেচিত হবে এবং সেটাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। আবার এরকমও তারা মনে করে যে, কাউকে হত্যা করে তার নামে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ চাপিয়ে দিলে শাস্তির আর কোনো ভয় থাকবে না। মজার ব্যাপার হল, তাদের এই চিন্তাটি খুব একটা অবাস্তব নয়। সত্যি সত্যি এদেরকে রক্ষা করতে আইনজীবী, মোল্লারা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতারা পর্যন্ত সবাই এগিয়ে আসে। বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে একটা উদাহরণ দিই।

এটা একটি সাম্প্রতিক ঘটনা। মুহম্মদ কাদরি ছিল পাকিস্তানের একজন পুলিশ এবং ইসলামিক মৌলবাদী। সে এলিট ফোর্সের কমান্ডো হিসেবে প্রমোটেড হয় এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের গভর্নর সালমান তাসীরের বডিগার্ড হয়। সে ২০১১ সালের ৪ জানুয়ারিতে সালমান তাসীরকে গুপ্তহত্যা করে। তার ভাষ্যমতে, সালমান তাসীর বিবি আয়শাকে দোষারোপ করেছিল বলে ধর্ম অবমাননার কারণে সে তাকে হত্যা করেছে।

এরপরেই খেলা শুরু। জিন্নাহর উদাহরণ ধরে পাকিস্তানের শিক্ষিত আইনজীবীদের মঞ্চে প্রবেশ। সেদিনকার জিন্নাহর মতই মুহম্মদ কাদরীর কেসকে ডিফেন্স করেছেন লাহোর হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত চিফ জাস্টিস খাজা মোহাম্মদ শরিফ এবং অবসরপ্রাপ্ত জাস্টিস মিয়া নাজির আক্তার, যারা মুমতাজ কাদরি কেসের আপিলেট ডিফেন্স লইয়ার ছিলেন। সস্তা খ্যাতি পাওয়ার জন্য তারা ইলমুদ্দিনের উদাহরণ ব্যবহার করে জিন্নাহরই মত খুনিকে সমর্থন করছেন। কিন্তু এটা ভুলে গেছেন যে, ধর্ম অবমাননার কারণে কাউকে খুন করলেও খুন খুনই হয়। শুধু তাই নয়, তাঁরা এটাও চিন্তা করছেন না যে, তাদের মুমতাজ কাদরিকে সমর্থন দেবার ফলে কাদরি সকলের কাছে জাতীয় বীরে পরিণত হবেন এবং সালমান তাসীরকে হত্যা করা সকলের চোখে বৈধ হয়ে যাবে, আর এই উদাহরণটি পরবর্তীতে আরও বেশি অমুসলিম ও একইসাথে মুসলিম নিরপরাধী ব্যক্তিকেও ভোগাবে। আর এটাও তো প্রমাণ করার কোনো পথ নেই যে, সালমান তাসীর আসলেই ধর্ম অবমাননা করেছিল কি না।

১৯২৯ সালের অক্টোবরে ইলমুদ্দিনের ফাঁসি ঠেকাতে মোল্লারা অনেক প্রতিবাদ মিছিল বের করে। একইভাবে দেখা গেছে, মুমতাজ কাদরির মুক্তির জন্যও মোল্লারা অনেক প্রতিবাদী মিছিল বের করেছে, রাইট উইং কলামিস্টরা তাকে নিয়ে বিস্তর লেখালেখি করেছে, তার সপক্ষের শিক্ষিত আইনজীবীরা যে-বিচারক কাদরির মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, তার অফিস ভাংচুর করেছে। যাই হোক, ৬ অক্টোবর ২০১১ সালে তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। আর দীর্ঘ ৫ বছর পর ২০১৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারিতে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

ব্ল্যাসফেমি আইনের কুপ্রভাব পাকিস্তানে এখন খুব ভালভাবেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পাকিস্তানের এই বর্তমান চিত্রটি দেখলে আমাদের চোখের সামনে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ চিত্রটাই ভেসে ওঠে। এরকম দিন এই বাংলাতেও আসবে কি না, এটা ভেবে ভয় হয়। 

তথ্যসূত্র:
http://www.rationalistpakistan.com/from-ghazi-to-qadri/
http://www.siasat.pk/forum/showthread.php?53028-The-Story-of-Ghazi-Ilm-Din-Shaheed
http://www.allamaiqbal.com/person/biography/biotxtread.html
http://www.allamaiqbal.com/person/movement/move_main.htm
https://en.wikipedia.org/wiki/Mumtaz_Qadri