২৪ জুলাই, ২০১৬

খায়বার যুদ্ধ - ৪: আলী ইবনে আবু তালিবের বীরত্ব!: কুরানে বিগ্যান (পর্ব-১৩৩): ত্রাস, হত্যা ও হামলার আদেশ – একশত সাত

লিখেছেন গোলাপ

(আগের পর্বগুলোর সূচী: এখানে)

"যে মুহাম্মদ (সাঃ)-কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।"

স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও তাঁর অনুসারীদের অতর্কিত আগ্রাসী হামলার আকস্মিকতা কাটিয়ে ওঠার পর খায়বারের ইহুদি জনপদবাসী তাঁদের প্রাণ ও সম্পদ রক্ষার প্রচেষ্টায় যে-প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তা মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়ে আবু বকর ইবনে আবি কুহাফা ও উমর ইবনে আল-খাত্তাব যখন তাদের দলবল নিয়ে মুহাম্মদের কাছে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন, তখন মুহাম্মদ তাঁর অনুসারীদের উদ্দেশ্যে কী ঘোষণা দিয়েছিলেন;  উমরের সঙ্গে অংশগ্রহণকারী মুহাম্মদ অনুসারীরা উমরের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ এনেছিলেন; পরদিন সকালে চোখের অসুখে আক্রান্ত আলী ইবনে আবু তালিব-কে যুদ্ধের ঝাণ্ডাটি দেয়ার আগে মুহাম্মদ কীভাবে আলীর চোখের চিকিৎসা করেছিলেন [কুরান (পর্ব: ১-৯ ও ১৩) ও হাদিস গ্রন্থে এরূপ বহু 'ইসলামী বিগ্যান' এর সন্ধান পাওয়া যায়!]; মুহাম্মদ তাঁর দশ বছরের মদিনা-জীবনে অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে যে বিপুল সংখ্যক সংঘর্ষে জড়িত ছিলেন, তার কয়টিতে তিনি উমর ইবনে খাত্তাব ও আবু বকর ইবনে আবি কুহাফা-কে অধিনায়ক হিসাবে নিয়োগ করেছিলেন; নেতৃত্ব-পদমর্যাদায় (Leadership position) নিম্নতম অভিজ্ঞতা ও এ সকল যুদ্ধ-বিগ্রহের কোনোটিতেই কোনোরূপ বিশেষ অবদানের স্বাক্ষর না রাখা সত্ত্বেও মুহাম্মদের মৃত্যুর দিনটিতে তাঁর লাশটি বিছানায় ফেলে রেখে আবু বকর কোন ব্যক্তির প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন; মৃত্যুকালে আবু বকর সেই ব্যক্তিকে কী পুরস্কারে পুরস্কৃত করেছিলেন - ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনা আগের পর্বে করা হয়েছে।

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের (৭০৪-৭৬৮ সাল) বর্ণনা পুনরারম্ভ: [1] [2]
পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ১৩২) পর:

'তাই আলী সেটি [ঝাণ্ডা] নিয়ে রওনা হয়, ত্বরা করার কারণে সে হাঁপাচ্ছিল আর আমরা তার পথ অনুসরণ করে পেছনে পেছনে আসছিলাম যতক্ষণে না সে তার ঝাণ্ডাটি দুর্গের নিচের এক স্তূপ পাথরের ওপর আটকে রাখে। এক ইহুদি ওপর থেকে তাকে দেখে ও জিজ্ঞাসা করে যে, সে কে, যখন সে তাকে তা জানায়, তখন সে বলে, "তুমি জিতে গেছো, যা মুসার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছিল!", কিংবা এরকম কোনো বাক্য (আপাতদৃষ্টিতে ইহুদিটি আলীর নামটি-কে ওমেন (omen) মনে করেছিল যখন সে বলেছিল 'আলাতুম'); তার মাধ্যমে আল্লাহর বিজয় অর্জন না হওয়া পর্যন্ত সে ফিরে আসে না।

আল্লাহর নবীর মুক্তিপ্রাপ্ত আবু রাফি নামের এক দাস হইতে > তার পরিবারের এক সদস্যের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে > আবদুল্লাহ বিন হাসান আমাকে বলেছেন:

"যখন আল্লাহর নবী তাঁর যুদ্ধের ঝাণ্ডাটি সহ আলীকে প্রেরণ করেন, আমারা তার সঙ্গে রওনা হই। অতঃপর যখন সে দুর্গের নিকটে আসে তখন দুর্গ-সেনারা বের হয়ে আসে ও সে তাদের সাথে যুদ্ধ করে। এক ইহুদি তাকে এমনভাবে আঘাত করে যে, তার ঢালটি তার হাত থেকে পড়ে যায়, তাই আলী দুর্গ পাশের এক দরজা টেনে তুলে তা ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে। যুদ্ধরত অবস্থায় সেটি সে তার হাতেই ধরে রাখে যতক্ষণে না আল্লাহ আমাদের বিজয়ী করে, সবকিছু শেষ হলে সেটা সে দূরে নিক্ষেপ করে। আমি যা নিজে দেখেছি, তা হলো, আরও সাতজন লোক নিয়ে সেই দরজাটি আমরা ওল্টানোর চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু আমরা তা পারিনি।

আল-ওয়াকিদির (৭৪৮-৮২২ খ্রিষ্টাব্দ) বর্ণনা: [3]

'প্রথমেই যে ব্যক্তি বের হয়ে তাদের দিকে আসে সে হলো মারহাবের ভাই আল-হারিথ ও তার দল। মুসলমানরা তাদের সম্মুখীন হয়, আলী লাফ দিয়ে গিয়ে তাকে সজোরে আঘাত করে ও তাকে হত্যা করে। আল-হারিথের সঙ্গীরা দুর্গে ফিরে যায় ও ভেতরে প্রবেশ করে তারা সেটির দরজা বন্ধ করে নিজেদের আবদ্ধ করে রাখে।---

আবু রাফি হইতে বর্ণিত: "যখন আল্লাহর নবী আলীকে তার ঝাণ্ডাসহ প্রেরণ করেন তখন আমরা তার সাথে ছিলাম। দুর্গের দরজায় আলী এক লোকের সম্মুখীন হয়। লোকটি আলীকে আঘাত করে, আর আলী তার ঢাল দিয়ে নিজেকে রক্ষা করে। অতঃপর আলী দুর্গ মধ্যে অবস্থিত একটি দরজা হাতে নেয় ও সেটি দিয়ে নিজেকে রক্ষা করে। তার মাধ্যমে আল্লাহর এই দুর্গ জয়ের পূর্ব পর্যন্ত দরজাটি ছিল তার হাতেই। সে দুর্গ জয় করে তার ভেতরে প্রবেশ করতে যাচ্ছে খবরটি পৌঁছে দেয়ার জন্য সে এক লোককে আল্লাহর নবীর কাছে পাঠায়। এই দুর্গটি ছিল মারহাবের।

(‘The first of those who set out to them was al-Harith, the brother of Marhab, with the runners. The Muslims appeared, and Ali Jumped and struck hard, and Ali killed him. The companions of al-Harith returned to the fortress, entered and locked themselves in.’---)

- অনুবাদ, টাইটেল, ও [**] যোগ - লেখক।

>>> আদি উৎসের ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় আমরা জানতে পারি, পর পর দুই-তিন দিন ব্যর্থ হামলার পর নাটার এই দুর্গটির পতন হয় আলী ইবনে আবু তালিবের নেতৃত্বে। 'ত্রাস, হত্যা ও হামলার আদেশ' শিরোনামের গত একশত ছয়টি পর্বের বিস্তারিত আলোচনায় আমরা জেনেছি যে, অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে মুহাম্মদের বিপুল সংখ্যক যুদ্ধবিগ্রহে আলী ইবনে আবু তালিব বিভিন্ন সময়ে যে-বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন, এই উপাখ্যানটি তার আর একটি উদাহরণ। মুহাম্মদের জীবদ্দশায় বিভিন্ন যুদ্ধে আলী ইবনে আবু তালিবের বীরত্বগাথার যে-পরিচয় আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি, তা হলো:

১) বদর যুদ্ধে আলী নৃশংসভাবে হত্যা করেছিলেন প্রথমে ওতবা বিন রাবিয়ার ছেলে আল-ওয়ালিদ বিন ওতবা কে, অতঃপর তাঁর পিতা ওতবা বিন রাবিয়াকে - যার বিস্তারিত আলোচনা "নৃশংস যাত্রার সূচনা (পর্ব ৩২)!" পর্বে করা হয়েছে।

২) ওহুদ যুদ্ধে যখন মুহাম্মদ গুরুতর আহত হয়েছিলেন, এই আলী ইবনে আবু তালিব তাঁর হাতটি ধরে রাখেন ও তালহা ইবনে ওবায়েদুল্লাহ তাঁকে টেনে ওঠান, যতক্ষণে না তিনি খাড়া হয়ে দাঁড়াতে পারেন। এই যুদ্ধে মুহাম্মদের বডি-গার্ড মুসাব বিন উমায়ের নিহত হওয়ার পর মুহাম্মদ যুদ্ধের ঝণ্ডাটি দিয়েছিলেন আলীকে, আর আলী অন্যান্য মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিলেন - যার বিস্তারিত আলোচনা "আহত মুহাম্মদ (পর্ব: ৬০)!" "আক্রান্ত মুহাম্মদ (পর্ব: ৬১)!” পর্বে করা হয়েছে।

৩) খন্দক যুদ্ধে আলী তাঁরই পিতার বন্ধু আমর বিন আবদু উদ্দ-কে নৃশংসভাবে হত্যা করেন! তাঁর পিতার এই বন্ধুটি সেখানে বলেছিলেন, "হে আমার ভাতিজা, আমি তোমাকে হত্যা করতে চাই না।" প্রতি-উত্তরে আলী তার জবাব দিয়েছিলেন এই বলে, "কিন্তু আমি তোমাকে হত্যা করতে চাই।"- যার বিস্তারিত আলোচনা "আলী ইবনে আবু তালিবের নৃশংসতা (পর্ব ৮২)!" পর্বে করা হয়েছে।

অন্যদিকে,
আদি উৎসের বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকদের রচিত 'সিরাত ও হাদিস' গ্রন্থের বর্ণনায় যে-বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট, তা হলো - মুহাম্মদ তাঁর জীবদ্দশায় আবু বকর ও উমর-কে কোনোরূপ গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব-পদমর্যাদায় শুধু যে-নিয়োগ দান করেননি (পর্ব: ১৩২) তাইই নয়, এই বিপুল সকল যুদ্ধবিগ্রহের কোনোটিতেই এই দুই ব্যক্তি আলী ইবনে আবু তালিব ও মুহাম্মদের অন্যান্য বিশিষ্ট অনুসারীদের মত কোনো 'বিশেষ বীরত্ব' প্রদর্শন করেছিলেন, এমন তথ্যও কোথাও বর্ণিত হয়নি। সাধারণ সুন্নি মুসলমানদের কাছে এই তথ্যটি খুবই আশ্চর্যজনক মনে হতে পারে, কিন্তু আদি উৎসের বর্ণনায় এই প্রামাণিক তথ্যটি (Evidence) অত্যন্ত স্পষ্ট।

তা সত্ত্বেও,
মুহাম্মদের মৃত্যুর পর মুহাম্মদের এই দুই অনুসারী কী প্রক্রিয়ায় নিজেদেরকে মুসলিম জাহানের অধিপতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তা আদি উৎসের বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকরা অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় তাঁদের নিজ নিজ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। ওমর ইবনে খাত্তাবের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর মুহাম্মদের একান্ত পরিবার সদস্যদের বিরুদ্ধে এই আবু-বকর ও ওমর কীরূপ আচরণ করেছিলেন, তার আলোচনা "হিন্দের প্রতিশোধ স্পৃহা! (পর্ব ৬৪)" পর্বে করা হয়েছে। আদি উৎসের মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি যে, আয়েশার প্রতি অপবাদ শ্রবণ করার পর যখন মুহাম্মদ এ বিষয়ে পরামর্শের জন্য আলী ইবনে আবু তালিব-কে  তলব করেন ও তাঁর পরামর্শ চান, তখন আলী তাঁকে যে-পরামর্শটি দিয়েছিলেন, তা হলো, "অঢেল মহিলা আছে, আপনি সহজেই একজনের পরিবর্তে অন্য একজনকে গ্রহণ করতে পারেন (পর্ব: ১০৩)।" - এই ঘটনাটি কোনোভাবেই আলী ইবনে আবু-তালিবের সঙ্গে আয়েশা ও তার পরিবারের সুসম্পর্কের ইঙ্গিত বহন করে না।  নিজ কন্যার বিরুদ্ধে এমন একটি অপমানজনক উক্তি অতি সহজেই  কী কেউ ভুলে যেতে পারেন? অসহায় সেই মুহূর্তে আলীর এই অপমানজনক উক্তি কি আয়েশার পক্ষে ভুলে যাওয়া সম্ভব?

অতঃপর চব্বিশটি বছর (৬৩২-৬৫৬ সাল) মুহাম্মদের নিজস্ব পরিবারের (হাশেমী বংশের) কোনো সদস্য মুসলিম জাহানের অধিপতি হবার সুযোগ পাননি। মুহাম্মদের মৃত্যুর চব্বিশ বছর পর ইসলামের ইতিহাসের তৃতীয় খুলাফায়ে রাশেদিন উসমান ইবনে আফফানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর এক অস্বাভাবিক পরিবেশে মুহাম্মদের নিজস্ব পরিবারের সদস্য এই আলী ইবনে আবু-তালিব ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবার সুযোগ পান। অতঃপর বিভিন্ন প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সীমাহীন নৃশংসতার উদাহরণ সৃষ্টি করেও (পর্ব: ৮২) মুহাম্মদের নিজস্ব পরিবারের এই সদস্য মাত্র পাঁচ বছর (৬৫৬-৬৬১ সাল) ক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছিলেন!

শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত মুসলমানরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, মুহাম্মদের মৃত্যুর ঐ দিনটি থেকেই আলী ইবনে আবু-তালিব সহ মুহাম্মদের নিজস্ব পরিবার (হাশেমী বংশ) সদস্যদের নেতৃত্ব বঞ্চিত করতে যে-লোকগুলো ক্ষমতার রাজনীতি শুরু করেছিলেন, তাদের প্রথম ও প্রধান ছিলেন আবু-বকর ইবনে আবি কুহাফা ও উমর ইবনে আল-খাত্তাব। শিয়া মুসলমানদের কাছে উমর ও আবু বকর (ও আয়েশা) নামটি হলো ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত চরিত্র!  তাঁদের এই বিশ্বাসের ভিত্তি হলো আদি উৎসে বর্ণিত ইসলামের ইতিহাসের এই সব তথ্য-উপাত্ত।

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:


[1] “সিরাত রসুল আল্লাহ”- লেখক: মুহাম্মদ ইবনে ইশাক (৭০৪-৭৬৮ খৃষ্টাব্দ), সম্পাদনা: ইবনে হিশাম (মৃত্যু ৮৩৩ খৃষ্টাব্দ), ইংরেজি অনুবাদ: A. GUILLAUME, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, করাচী, ১৯৫৫, ISBN 0-19-636033-1, পৃষ্ঠা ৫১৪ http://www.justislam.co.uk/images/Ibn%20Ishaq%20-%20Sirat%20Rasul%20Allah.pdf

[2] অনুরূপ বর্ণনা: “তারিক আল রসুল ওয়াল মুলুক”- লেখক: আল-তাবারী (৮৩৮-৯২৩ খৃষ্টাব্দ), ভলুউম ৮, ইংরেজী অনুবাদ: Michael Fishbein, University of California, Los Angeles, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৮৭, ISBN 0-7914-3150—9 (pbk), পৃষ্ঠা (Leiden) ১৫৮১ 

[3] “কিতাব আল-মাগাজি”- লেখক:  আল-ওয়াকিদি (৭৪৮-৮২২ খৃষ্টাব্দ), ed. Marsden Jones, লন্ডন ১৯৬৬; ভলুম ২, পৃষ্ঠা ৬৫৪-৬৫৫; ইংরেজি অনুবাদ: Rizwi Faizer, Amal Ismail and Abdul Kader Tayob; ISBN: 978-0-415-86485-5 (pbk); পৃষ্ঠা ৩২২