১৬ জুলাই, ২০১৬

খায়বার যুদ্ধ - ৩: উমর ইবনে খাত্তাবের কাপুরুষতা!: কুরানে বিগ্যান (পর্ব-১৩২): ত্রাস, হত্যা ও হামলার আদেশ – একশত ছয়

লিখেছেন গোলাপ

(আগের পর্বগুলোর সূচী: এখানে)

"যে মুহাম্মদ (সাঃ)-কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।"

স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও তাঁর অনুসারীরা খায়বারের ইহুদি জনপদবাসীর ওপর যে-অতর্কিত আগ্রাসী হামলাটি পরিচালনা করেছিলেন, তার সিংহনাদ (War cry) কী ছিল; ভীত-সন্ত্রস্ত খায়বারবাসী যখন তাঁদের দুর্গ মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তখন মুহাম্মদ কেন তাঁদের খেজুর গাছগুলো কেটে ফেলার হুকুম জারি করেছিলেন; অতঃপর কী কারণে তিনি তাঁর সেই আদেশ বাতিল করেছিলেন; মাহমুদ বিন মাসলামা নামের এক মুহাম্মদ অনুসারী নাইম দুর্গ-ছায়ার নিচে থাকা অবস্থায় কীরূপে গুরুতর আহত হয়েছিলেন - ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনা আগের পর্বে করা হয়েছে।

মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা আল-নাটার দুর্গগুলো অবরোধ করে রাখেন ও তাঁদের ওপর সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দিনের পর দিন আক্রমণ চালান। মুহাম্মদ ইবনে ইশাক, আল-তাবারী, আল-ওয়াকিদি, ইমাম বুখারী প্রমুখ আদি উৎসের বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকরা এই ঘটনাগুলোর প্রাণবন্ত বর্ণনা তাঁদের নিজ নিজ গ্রন্থে বিভিন্নভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। 

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের (৭০৪-৭৬৮ সাল) বর্ণনা: [1] [2] [3]

'বুরায়েডা বিন সুফিয়ান বিন ফারওয়া আল-আসলামি < তার পিতা সুফিয়ান এর কাছ থেকে প্রাপ্ত হয়ে < সালামা বিন আমর বিন আল-আকওয়া হইতে উদ্ধৃত তথ্যের ভিত্তিতে আমাকে বলেছেন:

আল্লাহর নবী আবু বকর-কে তাঁর ঝাণ্ডাসহ ('সেটি ছিল সাদা রং এর' [4]) খায়বারের এক দুর্গের লোকজনদের ওপর আক্রমণ করার জন্য পাঠান। তিনি যুদ্ধ করেন কিন্তু ক্ষয়ক্ষতির বশবর্তী হয়ে তা জয় না করেই প্রত্যাবর্তন করেন। পরদিন সকালে তিনি উমর-কে পাঠান, অতঃপর সেই একই ঘটনাটি ঘটে। আল্লাহর নবী বলেন, "আগামীকাল আমি এই ঝাণ্ডাটি এমন এক ব্যক্তিকে দেব, যে আল্লাহ ও তার রসুলকে ভালবাসে। তার বদৌলতে আল্লাহ আমাদের বিজয়ী করবে; সে পলায়নপর ব্যক্তি নয়।"

অতঃপর তিনি ডেকে পাঠান আলী-কে, তখন সে ছিল চোখের অসুখে আক্রান্ত; তিনি তার চোখে থুতু নিক্ষেপ করেন ও বলেন, "এই ঝাণ্ডাটি নাও ও রওনা হও, যতক্ষণে না আল্লাহ তোমার মাধ্যমে আমাদেরকে বিজয়ী করে।"

আল-ওয়াকিদির (৭৪৮-৮২২ খ্রিষ্টাব্দ) বর্ণনা: [5]

'নাইম দুর্গের সংখ্যা ছিল অনেক। সে সময় ইহুদিরা তীর নিক্ষেপ করছিলো। আল্লাহর নবীর অনুসারীরা নবীকে রক্ষা করে। তখন আল্লাহর নবী দু’টি বর্ম আবরণ, মস্তকাবরণ ও হেলমেট পরিহিত অবস্থায় আল-যারিব নামের এক ঘোড়ার পিঠে বসেছিলেন। তাঁর হাতে ছিল বল্লম ও ঢাল। তাঁর অনুসারীরা তাঁকে ঘিরে রেখেছিলেন।

তিনি যুদ্ধের ঝাণ্ডাটি মুহাজিরদের একজনকে দেন, কিন্তু সে কোনোকিছু অর্জন না করেই ফিরে আসে। অতঃপর তিনি ঝাণ্ডাটি অন্য একজনকে দেন, কিন্তু সেও কোনোকিছু অর্জন না করেই ফিরে আসে। অতঃপর আল্লার নবী ঝাণ্ডাটি আনসারদের একজনকে দেন, সে রওনা হয় ও কোনোকিছু অর্জন না করেই প্রত্যাবর্তন করে। ----আল্লাহর নবী বলেন, "আগামীকাল আমি এই ঝাণ্ডাটি এমন একজন লোককে দেবো, যাকে আল্লাহ ও তার রসুল ভালবাসে; আল্লাহ তার মাধ্যমে আমাদের জয়যুক্ত করবে এই কারণে যে, সে পলায়ন করবে না। হে মুহাম্মদ বিন মাসলামা, আনন্দ করো, কারণ যদি আল্লাহ চায়, আগামীকাল তোমার ভাইয়ের এই লড়াই চলবে ও ইহুদিরা পলায়ন করবে।"

আল্লাহর নবী সকালবেলা আলী ইবনে আবু তালিবকে ডেকে পাঠান, তখন তার চোখে ছিল ইনফেকশন। সে বলে, "আমি উপত্যকা বা পাহাড় কোনোকিছুই দেখতে পাই না।" আল্লাহর নবী তার কাছে যান ও বলেন, "তোমার চোখ খোল।" যখন সে তার চোখগুলো খোলে, আল্লাহর নবী তাতে থুতু নিক্ষেপ করেন; আলী বলেছে, "তারপর থেকে আমার চোখে কোনো অসুখ হয়নি।" আল্লাহর নবী তার হাতে ঝাণ্ডাটি দেন এবং তাঁর ও তাঁর সঙ্গে গমনকারী অনুসারীদের জন্য দোয়া করেন, যেন তারা বিজয়ী হতে পারে।"

আল-তাবারীর (৮৩৮-৯২৩ খ্রিষ্টাব্দ) অতিরিক্ত বর্ণনা: [6]

‘ইবনে বাশার <মুহাম্মদ বিন জাফর < আউফ (বিন আবি জামিলাহ আল-রাবি (৬৭৮-৭৬৫ সাল) <মেইমুন (আবু আবদুল্লাহ) <আবদুল্লাহ বিন বুরায়েদা (৬৩৭-৭৩৩ সাল) <বুরায়েদা আল-আসলামি (মৃত্যু ৬৭৯-৬৮৪ সাল) হইতে বর্ণিত:

যখন আল্লাহর নবী খায়বার দুর্গের জনপদবাসীদের অভিমুখে শিবির স্থাপন করেছিলেন, তিনি উমর বিন আল-খাত্তাবকে যুদ্ধের ঝাণ্ডাটি দেন। তার সঙ্গে কিছু লোক যাত্রা করে ও তারা খায়বার অধিবাসীদের মুখোমুখি হয়। উমর ও তার সঙ্গীরা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে। যখন তারা আল্লাহর নবীর কাছে প্রত্যাবর্তন করে, উমরের সঙ্গীরা তাকে কাপুরুষ হিসাবে অভিযুক্ত করে; সে ও তাদেরকে অভিযুক্ত করে একই অভিযোগে। আল্লাহর নবী বলেন, "আগামীকাল আমি এই ঝাণ্ডাটি এমন একজন লোককে দেবো যে, আল্লাহ ও তার রসুলকে ভালবাসে এবং যাকে ভালবাসে আল্লাহ ও তার রসুল।" পরদিন ---------’

- অনুবাদ, টাইটেল, ও [**] যোগ - লেখক।

ইমাম বুখারী (৮১০-৮৭০ সাল) বর্ণনা:
ইমাম বুখারীর বর্ণনা (৫:৫৯:৫২১) মুহাম্মদ ইবনে ইশাক, আল-তাবারী ও আল ওয়াকিদির বর্ণনারই অনুরূপ, কিন্তু ঘটনার পূর্ণ বিবরণ সেখানে অনুপস্থিত[3]

>>> আদি উৎসের ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় আমরা জানতে পারি যে, অতর্কিত আক্রমণের ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার পর নিজেদের জীবন ও সম্পদ রক্ষার প্রচেষ্টায় খায়বার জনপদবাসী তাঁদের দুর্গ-মধ্য থেকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। আদি উৎসের ওপরে বর্ণিত আল-তাবারীর অতিরিক্ত বর্ণনায় আমরা জানতে পারি যে, খায়বার হামলাকালে মুহাম্মদের কিছু অনুসারী উমর ইবনে খাত্তাবকে 'কাপুরুষ' বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। 'ত্রাস, হত্যা ও হামলার আদেশ' শিরোনামের গত একশত পাঁচটি পর্বের আলোচনায় আমরা উমর ইবনে খাত্তাব সম্বন্ধে আর যে-তথ্যগুলো জানতে পেরেছি, তা হলো:

১) মুহাম্মদ তাঁর দশ বছরের মদিনা জীবনে যে প্রায় একশোটি হামলার সঙ্গে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন, তার মাত্র একটিতে তিনি উমর ইবনে খাত্তাবকে নেতৃত্ব-পদমর্যাদায় (Leadership position) নিয়োগ দিয়েছিলেন! সেই হামলাটি হলো তুরাবা হামলা - যার আলোচনা 'আল ফাতহ' বনাম আঠারটি হামলা (পর্ব- ১২৪)' পর্বে করা হয়েছে। এই হামলাটি হলো মুহাম্মদের সবচেয়ে অখ্যাত হামলাগুলোর একটি, সিংহভাগ ইসলাম-বিশ্বাসী যার নামও কখনো শোনেননি। উল্লেখ্য, মুহাম্মদ তাঁর জীবদ্দশায় উমরের মতোই আবু-বকরকেও মাত্র একটি হামলায় নেতৃত্ব-পদমর্যাদায়  নিয়োগ দিয়েছিলেন (বানু ফাযারাহ হামলার নেতৃত্বে কে ছিলেন, এ বিষয়ে আদি উৎসে দ্বিমত আছে - যার বিস্তারিত আলোচনা 'উম্মে কিরফা হত্যাকাণ্ড (পর্ব: ১১০)' পর্বে করা হয়েছে); আর সেই হামলাটিও হলো মুহাম্মদের সবচেয়ে অখ্যাত হামলাগুলোর আর একটি - নাম: 'নাজাদ আক্রমণ (পর্ব: ১২৪)']

২) হুদাইবিয়া সন্ধি প্রাক্কালে যখন কুরাইশ প্রতিনিধি সুহায়েল বিন আমর ও তাঁর সঙ্গীরা (পর্ব: ১১৮) মুহাম্মদের সাথে সন্ধিচুক্তি নিয়ে আলোচনা করছিলেন ও মুহাম্মদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সুহয়েল পুত্র আবু জানদাল-কে তাঁর পিতার কাছে ফেরত পাঠানো হচ্ছিল তখন:

‘উমর লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ান ও আবু জানদালের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে বলেন, "ধৈর্য ধারণ করো, কারণ তারা শুধুই মুশরিক, তাদের রক্তে (তাবারী: 'তাদের যে কোন একজনের রক্তে') কুকুরের রক্ত ছাড়া আর কিছুই নাই," এবং তিনি তার তরবারির হাতলটি তার নিকটে নিয়ে আসেন। উমর প্রায়ই বলতেন, "আমি আশা করেছিলাম যে, সে ঐ তরবারিটি নেবে ও সেটি দিয়ে তার পিতাকে হত্যা করবে;”’ - যার বিস্তারিত আলোচনা 'উমর ইবনে খাত্তাবের অভিপ্রায় (পর্ব: ১২১)!' পর্বে করা হয়েছে। 

প্রশ্ন হলো:
“জন্মদাতা পিতাকে খুন করার জন্য সন্তানকে অস্ত্র জোগান দিয়ে যে-ব্যক্তি সাহায্য করার চেষ্টা করে, সেই ব্যক্তিটির মানসিকতাকে কীভাবে মূল্যায়ন করা যেতে পারে?”

৩) হুদাইবিয়া সন্ধি প্রাক্কালে মুহাম্মদ উমরকে "কী কারণে তিনি এখানে এসেছেন" তা তাঁর পক্ষ হতে কুরাইশ নেতাদের অবহিত করানোর জন্য মক্কায় কুরাইশদের কাছে প্রেরণ করার জন্য তলব করেন, তখন উমর মুহাম্মদকে বলেন যে, তিনি কুরাইশদের হাতে মৃত্যুভয়ে ভীত -তিনি সুপারিশ করেন যে, সেখানে তার চেয়ে বেশি পছন্দের কোনো লোককে যেন পাঠানো হয়, যেমন উসমান। - যার বিস্তারিত আলোচনা 'উসমান ইবনে আফফান হত্যার গুজব (পর্ব: ১১৬)!' পর্বে করা হয়েছে।

প্রশ্ন হলো:
“মৃত্যুভয়ে ভীত হয়ে যে-কাজটি কোনো ব্যক্তি নিজে করতে পারে না কিন্তু 'অজুহাত হাজির করে', সেই একই কাজটি করার জন্য অন্য একজনকে সুপারিশ করে - সেই ব্যক্তিটিকে কি 'সাহসী যোদ্ধা' হিসাবে মূল্যায়ন করা যায়?”

৪) মুহাম্মদের নেতৃত্বে 'বানু আল-মুসতালিক' অভিযানকালে মুহাজির ও আনসাররা কোন্দলে লিপ্ত হয় ও সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মদিনার আল-খাযরাজ গোত্র-নেতা আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল রোষান্বিত হয়ে “এক উক্তি করেছেন” বার্তাটি শোনামাত্র তার কোনোরূপ সত্যতা যাচাই না করেই এই উমর ইবনে খাত্তাব মুহাম্মদকে যে-পরামর্শটি দিয়েছিলেন, তা হলো: “আববাদ বিন বিশার-কে হুকুম করুন যেন সে তাকে খুন করে।" - যার বিস্তারিত আলোচনা ‘মুমিন বনাম মুনাফিক–বিভাজনের শুরু (পর্ব: ৯৮)!’ আবদুল্লাহ বিন উবাই পুত্রের আর্জি (পর্ব: ৯৯)!’ পর্বে করা হয়েছে।

প্রশ্ন হলো:
"খবরের সত্যতা যাচাই ছাড়াই যে-ব্যক্তি কোনো মানুষকে খুন করার সুপারিশ করতে পারে, সেই ব্যক্তিকে কি কখনো মহান ও বিবেকবান হিসাবে আখ্যায়িত করা যায়? বা বিবেচনাও কি করা যায়?"

৫) ওহুদ যুদ্ধের প্রাক্কালে আহত মুহাম্মদকে যুদ্ধের ময়দানে অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে মুহাম্মদের যে সমস্ত অনুসারী দিকভ্রান্তের মতো সেদিন পালিয়ে গিয়েছিলেন, তাদের একজন ছিলেন উমর ইবনে খাত্তাব - যার বিস্তারিত আলোচনা 'নিহত মুহাম্মদ (পর্ব: ৬২)!নবী গৌরব ধূলিসাৎ! (পর্ব: ৬৯)' পর্বে করা হয়েছে।

প্রশ্ন হলো:
"নিজ নেতাকে অসহায় অবস্থায় শত্রু কবলে ফেলে রেখে যে-ব্যক্তি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করে, তাকে কি অসীম সাহসী যোদ্ধা ও নেতার প্রতি সুগভীর ভালবাসার অধিকারী ব্যক্তি হিসাবে আখ্যায়িত করা যায়?"

৬) বদর যুদ্ধশেষে পথিমধ্যেই দু'জন যুদ্ধবন্দীকে বন্দী অবস্থাতেই খুন করার পর বাকি ৬৮ জন বন্দীকে মদিনায় ধরে নিয়ে আসার পর তাঁদেরকে কী করা হবে, সে বিষয়ে যখন মুহাম্মদ তাঁর বিশিষ্ট সাহাবিদের মতামত জানতে চান, তখন এই উমর ইবনে খাত্তাব মুহাম্মদকে যে-পরামর্শটি দিয়েছিলেন, তা হলো, "নবীর উচিত এই বন্দীদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করা এবং তা যেন হয় এই বন্দীদের একান্ত নিকট-আত্মীয়দের মাধ্যমে!" মুহাম্মদ তার এই পরামর্শ গ্রহণ না করায় অনুতপ্ত হয়ে পরদিন সকালে "আল্লাহর নামে" যে-ওহী নাজিল করেছিলেন তা হলো,
৮:৬৭-৬৯ - "নবীর পক্ষে উচিত নয় বন্দীদিগকে নিজের কাছে রাখা, যতক্ষণ না দেশময় প্রচুর রক্তপাত ঘটাবে। তোমরা পার্থিব সম্পদ কামনা কর, অথচ আল্লাহ চান আখেরাত। আর আল্লাহ হচ্ছেন পরাক্রমশালী হেকমতওয়ালা। যদি একটি বিষয় না হত যা পূর্ব থেকেই আল্লাহ লিখে রেখেছেন, তাহলে তোমরা যা গ্রহণ করছ সেজন্য বিরাট আযাব এসে পৌছাত। ---।" এ বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা 'বন্দীদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত - কী ছিল আল্লাহর পছন্দ (পর্ব: ৩৬)?' পর্বে করা হয়েছে।

প্রশ্ন হলো:
"নিরস্ত্র বন্দী অবস্থায় ৬৮ জন লোককে যে-ব্যক্তি ঐ বন্দীদেরই একান্ত নিকট-আত্মীয়দের মাধ্যমে একে একে গলা কেটে খুন করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে, তাকে "ঠাণ্ডা মাথার এক ভয়ঙ্কর খুনি" ছাড়া আর কীভাবে মূল্যায়ন করা যেতে পারে?"

>> ইসলামের ইতিহাসে উমর ইবনে আল-খাত্তাব একটি অতি পরিচিত নাম। তিনি ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের দ্বিতীয় খুলাফায়ে রাশেদিন। মুহাম্মদের মৃত্যুর (জুন, ৬৩২ সাল) দিনটিতে তাঁর লাশটি বিছানায় ফেলে রেখে মুহাম্মদ অনুসারীরা কোন্দলে লিপ্ত হন। ইস্যু, "কে বসবেন ক্ষমতায়?" আনসারদের পক্ষ থেকে সা'দ বিন উবাইদা (Sa’d bin Ubadah)-এর অধীনে আনসাররা; আর মুহাজিরদের পক্ষে আবু বকর ও উমর (মুহাম্মদের দুই শ্বশুর) গং, এবং আলীর পক্ষে কিছু আনসার, তালহা ও যুবায়ের গং (এ বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা পরবর্তীতে করা হবে); মুহাম্মদের একান্ত পরিবার-সদস্যবৃন্দ ও কিছু আনসার সদস্য তখন মৃত মুহাম্মদের সৎকার-কার্য নিয়ে ব্যস্ত।  উমর ইবনে খাত্তাবের প্রত্যক্ষ (এক পর্যায়ে 'সশস্ত্র') হস্তক্ষেপে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন আবু বকর ইবনে কুহাফা (৫৭৩-৬৩৪ সাল) - ইসলামের ইতিহাসের প্রথম খুলাফায়ে রাশেদিন!

উমরের এই সাহায্যের প্রতিদান আবু বকর তাকে দিয়েছিলেন। দুই বছরের শাসন শেষে (৬৩২-৬৩৪ সাল) মৃত্যুকালে তিনি উমর ইবনে খাত্তাবকে মুসলিম জাহানের শাসক হিসাবে নিযুক্ত (Selected) করেন। আবু বকরের নিযুক্ত এই শাসক মুসলিম জাহানের অধিপতি হিসাবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকেন সুদীর্ঘ দশ বছর - ৬৩৪ থেকে ৬৪৪ সাল। উমর তার শাসন-আমলে ইসলামের নামে দিকে দিকে “আরব সাম্রাজ্যবাদ”-এর বিস্তার লাভ করান।

কী ভাবে?
“অবশ্যই তলোয়ারের মাধ্যমে!”

উমর ইবনে খাত্তাব তার দশ বছরের শাসন-আমলে কমপক্ষে বারোটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ৬৪১ সাল থেকে ৬৪৪ সাল পর্যন্ত সময়ে পারস্যবাসীদের (বর্তমান ইরান) বিরুদ্ধে উমর পর পর বেশ কয়েকটি নৃশংস আক্রমণ চালান। এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের  ফসল, ৬৪৪ সালে তার সম্পূর্ণ পারস্য বিজয়। ঐ একই বছর আবু লুলু ফিরোজ (Abu Lulu Firoz) নামের এক আদি পারস্যবাসী অগ্নি-উপাসক দাসের মারফত তিনি নৃশংসভাবে খুন হন। উমর ইবনে খাত্তাবের এই করুণ মৃত্যুর মাধ্যমে শেষ হয় খুলাফায়ে রাশেদিন নামের মুহাম্মদের শ্বশুর-জামাই রাজত্বের প্রথম অধ্যায়, "মুহাম্মদের দুই শ্বশুরের রাজত্বকাল!" অতঃপর শুরু হয় শ্বশুর-জামাই রাজত্বের দ্বিতীয় অধ্যায়, "মুহাম্মদের দুই জামাইয়ের রাজত্বকাল!" স্থায়িত্বকাল পরবর্তী সতের বছর (৬৪৪-৬৬১ সাল), যার পরিসমাপ্তি ঘটে আলী ইবনে আবু-তালিবকে নামাজরত অবস্থায় নৃশংস খুনের মাধ্যমে!

ইসলামের ইতিহাসের চারজন খুলাফায়ে রাশেদিনের তিনজনকেই নৃশংসভাবে খুন হতে হয়েছে! শেষের দু'জনকে (উসমান ও আলী) খুন করেছেন মুহাম্মদ অনুসারীরা!

সেই ইতিহাসের পর কালের পরিক্রমায় প্রায় ১৪০০ বছর গত হয়েছে। কিন্তু পারস্যবাসীরা (ইরানীরা) উমর ইবনে খাত্তাবকে এখনও এমনভাবে মনে রেখেছেন যে, তাঁরা তাঁদের কোনো সন্তানের নাম 'উমর' রাখেন না (তাঁদের কাছে 'আয়েশা'-ও এমনই একটি নাম); ইরানীদের কাছে 'উমর' নামটি হলো একটি গালি, যেমন বাংলায় 'মীর জাফর' নামটি। বাংলায় যেমন "আমি মীর জাফর নই!" প্রবাদ বাক্যটির মাধ্যমে বক্তা বোঝাতে চান যে, তিনি কোনো খারাপ ও বিশ্বাসঘাতক ব্যক্তি নন, যেমন "তুই একটা মীর জাফর!" প্রবাদ বাক্যের মাধ্যমে বাঙালিরা অপরকে দেয় গালি; তেমনই ইরানীরা তাঁদের ফারসি ভাষায় "মান উমর নিসতাম (আমি উমর নই)!" প্রবাদ বাক্যটির মাধ্যমে বোঝাতে চান যে, তিনি কোনো খারাপ ও বিশ্বাসঘাতক ব্যক্তি নন, "তু উমর হাসতি (তুই একটা উমর)!" প্রবাদ বাক্যের মাধ্যমে তাঁরা অপরকে দেয় গালি। জীবনের অনেকগুলো বছর আমি কাটিয়েছি ইরানে, "উমর ও আয়েশা" নামের শিয়া মুসলমানদের কেউ আছেন, এমন খবর আমি কক্ষনো শুনিনি।

অন্যদিকে,
সুন্নি সম্প্রদায়ভুক্ত মুসলমানরা উমর ইবনে খাত্তাবকে জানেন এক অতি চরিত্রবান, মহানুভব ও অসীম সাহসী যোদ্ধা হিসাবে!

সেলুকাস! কী বিচিত্র ইসলামের ইতিহাস!

ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে আল-ওয়াকিদি ও আল-তাবারীর মূল ইংরেজি অনুবাদের অংশটিও সংযুক্ত করছি। ইবনে ইশাকের মূল ইংরেজি অনুবাদ ইন্টারনেটে বিনামূল্যে ডাউনলোড লিঙ্ক: তথ্যসূত্র [1]

The narrative of Al- Waqidi: [5]
‘The Fortressess of Naim were numerous. The Jews aimed at that time with arrows. The Companions of Messenger of God shielded the Messenger of God. At that time The Messenger of God wore two armors, cap and helmet, and he was on a horse named al-Zarib. In his hand was a spear and shield. His companions surrounded him.  He gave the flag to a man from the Muhajirin, and he returned without accomplishing anything. Then he gave the flag to another, and he returned without accomplishing anything. Then the Messenger of God gave the flag of the Ansar to one of the Ansar and he set out and returned without accomplishing anything. ---- The Messenger of God said, “Tomorrow I will give the flag to someone that God and His messenger loves, and God will conquer through him for he will not flee. Rejoice, O Muhammad b Maslama, for tomorrow if God wills, the battle of your brother will be fought and the Jews will flee.”  In the morning the Messenger God sent for Ali b Abi Talib, who had an eye infection.  He said, “I cannot see either valley or mountain.” The prophet went to him and said, “Open your eyes.” And when he opened them, and the prophet spat on them, Ali said: I have had no eye disease since that time. The Messenger of God handed him the flag, and prayed for him and those who were with him from his companions, to be victorious.” 

The additional Narrative of Al-Tabari: [6]
‘According to Ibn Bashshar < Muhammad b Jafar < Awf < Maymun (Abu Abdullah) < Abdallah b Buraydah < Buraydah Al-Aslami, who said: When the Messenger of God encamped at the fortress of the people of Khaybar, he gave the banner to Umar b al-Khattab. Some of the people set out with him, and they encountered the people of Khaybar. Umar and his companions were put to flight. When they returned to the Messenger of God, Umar’s companions accused him of cowardice, and he accused them of the same. The Messenger of God said, “Tomorrow I shall give the banner to a man who loves God and his Messenger and whom God and his Messenger loves.” ---

(চলবে)

[কুরানের উদ্ধৃতি সৌদি আরবের বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ (হারাম শরীফের খাদেম) কর্তৃক বিতরণকৃত বাংলা তরজমা  থেকে নেয়া, অনুবাদে ত্রুটি-বিচ্যুতির দায় অনুবাদকারীর। কুরানের ছয়জন বিশিষ্ট ইংরেজি অনুবাদকারীর ও চৌত্রিশ-টি বিভিন্ন ভাষায় পাশাপাশি অনুবাদ এখানে]

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] “সিরাত রসুল আল্লাহ”- লেখক: মুহাম্মদ ইবনে ইশাক (৭০৪-৭৬৮ খৃষ্টাব্দ), সম্পাদনা: ইবনে হিশাম (মৃত্যু ৮৩৩ খৃষ্টাব্দ), ইংরেজি অনুবাদ: A. GUILLAUME, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, করাচী, ১৯৫৫, ISBN 0-19-636033-1, পৃষ্ঠা ৫১৪

[2] অনুরূপ বর্ণনা: “তারিক আল রসুল ওয়াল মুলুক”- লেখক: আল-তাবারী (৮৩৮-৯২৩ খৃষ্টাব্দ), ভলুউম ৮, ইংরেজী অনুবাদ: Michael Fishbein, University of California, Los Angeles, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৮৭, ISBN 0-7914-3150—9 (pbk), পৃষ্ঠা (Leiden) ১৫৮০ 

[3] অনুরূপ বর্ণনা- সহি বুখারী: ভলিউম ৫, বই ৫৯, নম্বর ৫২১ ও ৫২০
Narrated Sahl bin Sad:  On the day of Khaibar, Allah's Apostle said, "Tomorrow I will give this flag to a man through whose hands Allah will give us victory. He loves Allah and His Apostle, and he is loved by Allah and His Apostle." The people remained that night, wondering as to who would be given it. In the morning the people went to Allah's Apostle and every one of them was hopeful to receive it (i.e. the flag). The Prophet said, "Where is Ali bin Abi Talib?" It was said, "He is suffering from eye trouble O Allah's Apostle." He said, "Send for him." 'Ali was brought and Allah's Apostle spat in his eye and invoked good upon him. So 'Ali was cured as if he never had any trouble. Then the Prophet gave him the flag. 'Ali said "O Allah's Apostle! I will fight with them till they become like us." Allah's Apostle said, "Proceed and do not hurry. When you enter their territory, call them to embrace Islam and inform them of Allah's Rights which they should observe, for by Allah, even if a single man is led on the right path (of Islam) by Allah through you, then that will be better for you than the nice red camels.

[4] Ibid “সিরাত রসুল আল্লাহ”- ইবনে হিশামের নোট নম্বর ৭৬২, পৃষ্ঠা ৭৭০

[5] “কিতাব আল-মাগাজি”- লেখক:  আল-ওয়াকিদি (৭৪৮-৮২২ খৃষ্টাব্দ), ed. Marsden Jones, লন্ডন ১৯৬৬; ভলুম ২, পৃষ্ঠা ৬৫২-৬৫৪; ইংরেজি অনুবাদ: Rizwi Faizer, Amal Ismail and Abdul Kader Tayob; ISBN: 978-0-415-86485-5 (pbk); পৃষ্ঠা ৩২১-৩২২

[6] Ibid “তারিক আল রসুল ওয়াল মুলুক”- লেখক: আল-তাবারী; পৃষ্ঠা (Leiden) ১৫৭৯