৮ জুলাই, ২০১৬

জাকির নায়েকের ‘কোরআন ও আধুনিক বিজ্ঞান’ এবং তার যুক্তিখণ্ডন - পর্ব ২

লিখেছেন Enigmatic Jihad


এর পর জাকির নায়েক তার বইতে জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে কোরআনের সামঞ্জস্যতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

২. জ্যোতির্বিজ্ঞান: জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে বলতে গিয়ে জাকির নায়েক প্রথমেই বলেছেন “বিগ ব্যাং”-এর কথা। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘কোরআনের সূরা আম্বিয়ার ৩০ নং আয়াত এবং বিগ ব্যাং তত্ত্বের মধ্যে বিস্ময়কর সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। আয়াতটায় বলা হয়েছে: "কাফেররা কি ভেবে দেখে না যে, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর মুখ বন্ধ ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে খুলে দিলাম এবং প্রাণবন্ত সবকিছু আমি পানি থেকে সৃষ্টি করলাম।" অর্থাৎ এখানে বলা হয়েছে, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর মুখ বন্ধ ছিলো, যা পরে খুলে দেয়া হয়েছে। এবার আসুন, বিগ ব্যাং থিওরি সম্পর্কে জেনে নিই।

বিগ ব্যাং থিওরি অনুযায়ী, মহাবিশ্বের যাবতীয় বস্তুকণা একটি কেন্দ্রস্থলে পুঞ্জীভূত ছিলো। ঘটনাটা ১৩.৭ বিলিয়ন বছর আগের। যেখানে একটি বৃহৎ বিস্ফোরণ ঘটে, যার ফলে আমাদের আজকের মহাবিশ্বের সৃষ্টি। এখানে কোরানে বর্ণিত "আকাশ ও পৃথিবীর মুখ বন্ধ ছিলো" কথাটাকে যদি একটু ব্যাখ্যা করে দেখা যায়, তবে জিনিসটা দ্বারা এই বোঝা যায় যে, আকাশ ও পৃথিবী একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্র বা বিন্দু বা যার জন্য বিজ্ঞানে “Singularity” শব্দটার জন্ম, সেখানে পুঞ্জীভূত ছিলো। এবার প্রশ্ন হচ্ছে, আকাশ কী? এটা কি কোনো বস্তু? আকাশকে এভাবে বর্ণনা করা যায়, আমাদের গ্রহকে ঘিরে জলীয় বাষ্প, বিভিন্ন গ্যাস ও ধূলিকণার মিশ্রণে যে আবরণ সৃষ্টি হয় তাকে আকাশ বলে। আর আলোচনাটা যেহেতু বিগ ব্যাং নিয়ে, তাই আকাশ বলতে আমরা মহাকাশ বলতে পারি। আর মহাকাশ বলতে মূলত আমরা বুঝি স্পেস। তাহলে কোরআনের ভাষায়, বিগ ব্যাং হলো স্পেস ও পৃথিবীর পুঞ্জীভূত অবস্থা। স্পেস (Space) এর অর্থ খুঁজলে পাওয়া যায় - জায়গা বা স্থান। স্পেস বা স্থান কী করে পূঞ্জীভুত থাকতে পারে, তা একটি বিরাট প্রশ্ন, যার ব্যাখ্যা কোরআন কিংবা জাকির নায়েক কেউ দেননি। আর যদি ধরেও নিই যে, স্পেস পুঞ্জীভূত ছিলো, তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, শুধু স্পেস আর পৃথিবী একত্রে পুঞ্জীভূত অবস্থা থেকে বিস্ফোরণটাই কি বিগ ব্যাং? তাহলে আর গ্রহ-নক্ষত্রগুলো কোথা থেকে উৎপন্ন হলো? প্রকৃতপক্ষে, পৃথিবী এই মহাবিশ্বের তুলনায় অতি অতি সামান্য, অতীব ক্ষুদ্র একটি গ্রহ, যেটাকে যাকে কখনও বিগ ব্যাং-এর মূল বস্তু হিসেবে ধরা যায় না। যদি সেটাই ধরে নিই, তাহলে এটা যৌক্তিক হয় যে, পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র। এখন আমরা সবাই নিশ্চিতভাবে জানি, পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়। কেন্দ্রটি কোথায়, তার সঠিক উত্তর কারো জানা নেই। কেন্দ্রহীন এই বিশাল মহাবিশ্বের কেন্দ্র খোঁজা নেহাত যুক্তিহীন। জাকির নায়েক বিগ ব্যাং ঠিকভাবে বোঝেন কি না, তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। উক্ত আয়াতের কথাটা যদি কোনো সাধারণ মানুষ বলতো, তবে এটাকে পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দেয়া হতো। তখন এর মাঝে আজকের মডারেট মুসলিম বা জাকির নায়েক কেউই বিজ্ঞান খুঁজে পেতেন না।

এরপর জাকির নায়েক ছায়াপথ সৃষ্টির পূর্বে প্রাথমিক গ্যাস সম্পর্কে বলেন। তিনি বলেন, "মহাবিশ্বের ছায়াপথ গঠিত হওয়ার পূর্বে আকাশ সম্পর্কিত পদার্থগুলো গ্যাস জাতীয় পদার্থের আকারে ছিলো।" তিনি মহাবিশ্বের তৈরির আগে এই গ্যাস এর পক্ষে কোরআন থেকে যে আয়াত উল্লেখ করেন, তা হলো: "অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন যা ছিল ধুম্রকুঞ্জ, অতঃপর তিনি তাকে ও পৃথিবীকে বললেন, তোমরা উভয়ে আস ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। তারা বলল, আমরা স্বেচ্ছায় আসলাম।" (সূরা হা-মীম সেজদাহ, আয়াত ১১)

আকাশ ধুম্রকুঞ্জ ছিলো, জিনিসটাকে মেনে নিলাম, যদিও গ্যাসকে ধোঁয়া দ্বারা প্রকাশ করা সর্বজ্ঞানীর সাজে কি না, আমার জানা নেই। তবে এই আয়াতের "অতঃপর তিনি তাকে (তাকে বলতে আকাশ বোঝানো হয়েছে) ও পৃথিবীকে বললেন, তোমরা উভয়ে আস ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। তারা বলল, আমরা স্বেচ্ছায় আসলাম" দ্বারা যা বোঝাচ্ছে, আল্লাহ আকাশ আর পৃথিবীকে আসতে বললেন। কোথায়? মনে করলাম একত্রে আসতে বললেন। তবে লক্ষণীয়, এখানেও আকাশ ও পৃথিবীকে মুখ্য ইঙ্গিত করা হয়েছে, আগের মতই। যারা পরস্পরের কাছে আসে। মহাবিশ্বে আকাশ (যা দ্বারা মহান জ্ঞানী আল্লাহ মহাকাশ বুঝিয়েছেন) আর পৃথিবী ছাড়া আল্লাহ আর কোনো বস্তু খুঁজে পাননি ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য। যেখানে আজকের বিজ্ঞানীরা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে লক্ষ-কোটি গ্রহ-নক্ষত্র-গ্যালাক্সির সন্ধান পেয়ে ও তাদের সম্পর্কে অনেক তথ্য আহরণ করেও অকপটে স্বীকার করে, "মহাবিশ্বের সামান্য জানতে পেরেছি," সেখানে কোরআনে শুধু আকাশ আর পৃথিবী সম্পর্কে আগডুমবাগডুম বলে মহাবিশ্বের সব রহস্য নাকি সমাধান করে ফেলেছে!