১৩ জুলাই, ২০১৬

কোরআন যেভাবে অবতীর্ণ: মক্কা অধ্যায় - গোপন প্রচারের তিন বছর (পর্ব ০৪)

লিখেছেন নরসুন্দর মানুষ


{প্রশ্ন জাগতে পারে, অবতীর্ণ হবার ধারাবাহিকতা অনুসারে কোরআন পাঠে লাভ কী? আর নবী মুহাম্মদের জীবন জানার জন্য এর কী ভূমিকা আছে? আজ তার উত্তর দেবার পালা; এটাকে আত্মপ্রচারও বলা যেতে পারে!

মূলত নবী মুহাম্মদের মৃত্যুর দশ বছরের মধ্যে ইসলাম ধর্ম সিরিয়া, মিশর, ইরাক, ইরান পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে, অ-আরবীয় মুসলমানের সংখ্যা বাড়তে থাকে হু হু করে; ইচ্ছা অথবা অনিচ্ছা সত্ত্বেও সবার মনে নবী মুহাম্মদ এবং আল্লাহকে জানার প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়; আর এই আগ্রহই শেষ পর্যন্ত কোরআন সংকলন, নবী-জীবনী রচনা আর হাদিস চর্চার জন্য মূল নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায়।

খোলা চোখে দেখলে বোঝা যায়, কোরআন ছাড়া মুহাম্মদের যত প্রাচীন জীবনী এবং হাদিস সংকলন আমরা দেখি, তার রচয়িতার ৯৯ ভাগই বংশসুত্রে হিজাজ-এর (তাবুক থেকে মদিনা, মক্কা হয়ে তাইফ পর্যন্ত) নাগরিক নন; এবং সবার দৃষ্টিভঙ্গির আত্মপ্রকাশ শুরুই হয়েছে বিস্ময়ের চোখে মুহাম্মদকে দেখা থেকে; আর এ কারণেই হয়ত ১৪০০ বছরের ইতিহাসে একটি পূর্ণাঙ্গ নিরপেক্ষ নবী মুহাম্মদের জীবনীর জন্ম দিতে পারেননি; ইবনে ইসাহাক, মামর ইবনে রশিদ, আল ওয়াকেদী, ইবনে সাদ, তাবারী সহ কোনও মুসলমানই! ক্রমশ সবাই সত্যের নামে মিথের জন্ম ও চর্চা করে গেছেন বিশ্বাস আর ভালবাসা থেকে। হাদিস সংকলনের ক্ষেত্রে মিথ্যা আর মিথের চর্চা হয়েছে সবচেয়ে বেশি (সবচেয়ে প্রথম সংকলিত হাদিস সংকলনে প্রায় ১৫০০ জাল এবং যইফ হাদিস আছে); সত্যিকার অর্থে কোরআনের ব্যাখ্যা তাফসীর-কে চিন্তার আওতায় না নিলে, কোরআন সংকলন সবচেয়ে কম মিথ আর মিথ্যার দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে!

নবী মুহাম্মদ-এর বদলে একজন মানুষ মুহাম্মদ-এর জীবন বোঝার ক্ষেত্রে তাই কোরআনকে প্রকাশ করার ধারাবাহিকতা অনুসারে বন্টন না করে কাজ এগুতে পারে না মোটেই; কিন্তু প্রশ্ন জাগে: তা কেন?

একটি চতুমার্ত্রিক মানুষ মুহাম্মদ-এর জীবনী লেখার জন্য। কারণ বর্তমানে প্রাপ্ত সকল জীবনী মুহাম্মদের কেবলমাত্র ২৫ ভাগ প্রকাশ করে!

এ কারণেই

প্রথমত: প্রকাশ হবার ধারাবাহিকতা অনুসারে কোরআনকে বন্টন করা দরকার।

দ্বিতীয়ত: সকল হাদিসের একটি সময়ক্রমিক ধারাবাহিক সারাংশ সংকলন করা উচিত।

তৃতীয়ত: নবী মুহাম্মদকে বেষ্টন করে থাকা পরিবার-পরিজন, শত্রু-মিত্র, সাহাবী, দাস-দাসী, পরিবেশ-পরিস্থিতি ও বিশ্বাসকে সময় অনুসারে ব্যাখ্যা এবং বন্টনের সংকলন করা দরকার।

এই তিনটি বিষয় একত্রিত করতে পারলেই সত্যিকার অর্থে একটি পূর্ণাঙ্গ মানুষ মুহাম্মদ-এর জীবনী লেখা সম্ভব হতে পারে।

এই সিরিজটিতে ধারাবাহিকতা অনুসারে কোরআনকে বন্টন করার চেষ্টা মানুষ মুহাম্মদ নামে মুহাম্মদের জীবনী সংকলন-এর প্রথম পর্বের কাজ শেষ করার প্রকাশ মাত্র। এই ধারাবাহিকটি শেষ হবার পর বিছিন্ন ভাবে প্রাপ্ত প্রায় ৪১ হাজার হাদিসকে একত্রিত করে সময়ক্রমিক হাদিস সংকলন সংক্ষেপ প্রকাশ শুরু করা হবে (৬০ ভাগ কাজ হয়ে আছে); মনে রাখা উচিত, মৌলিক হাদিসের সংখ্যা ৩ থেকে ৪ হাজারের মধ্যে। তৃতীয় অংশের সময়ক্রমিক ব্যাখ্যা ও বন্টনের জন্য আপাতত হাতে নিতে হয়েছে প্রায় ১০০ টি আলাদা আলাদা লেবেল চিহ্নিত স্পাইরাল ফাইল (কাজ চলছে - দুটি ছবি সংযুক্ত করে দিচ্ছি)!

নবী মুহাম্মদের জীবনের যত অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা, তার বেশির ভাগই কোরআন-হাদিস দিয়েই অকার্যকর প্রমাণ করা সম্ভব। (এই ধারাবাহিকে চাঁদ দিখণ্ডিত হবার আয়াত প্রকাশের পর্বে তার একটি উদাহরণ দেওয়া থাকবে।) 

যদিও তৃতীয় অংশের কাজ সরাসরি প্রকাশ করা হবে না; তবে সর্বশেষ কাজটি হবে একটি চতুমার্ত্রিক মানুষ মুহাম্মদ নামে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক নবী মুহাম্মদের পূর্ণাঙ্গ নিরপেক্ষ জীবনী লেখা; যা ১৪০০ বছরের এই অপূর্ণতাকে পূর্ণ করতে পারে।

এই মানুষ মুহাম্মদ-এর প্রতি অধ্যায়ে কোরআন যেভাবে অবতীর্ণ সিরিজের প্রতিটি অংশ প্রকাশের কারণ এবং পরিস্থিতির বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যাবে; যতদিন সেটা না হচ্ছে, এই সিরিজটিও কোরআনের অনুবাদ পড়ার মতই রসকসহীন মনে হওয়া স্বাভাবিক! তারপরেও মক্কা দ্বিতীয় অধ্যায়: দেড় কিলোমিটারে সাত বছর - পর্ব ০৭ থেকে প্রতি প্রকাশের সংক্ষিপ্ত কারণ তুলে দেবার চেষ্টা থাকবে।

এই কাজ করার আগ্রহ পাবার ক্ষেত্রে দু'জন মানুষের নাম আমি প্রাতঃস্মরণীয় হিসেবে উল্লেখ করতে চাই: প্রথম জন ইরানী স্কলার আলী দস্তি এবং দ্বিতীয় জন এই ধর্মকারীর কোরানে বিগ্যান সিরিজের লেখক গোলাপ মাহমুদ

আর এক যুগ আয়ু পেলে এই কাজের পরিসমাপ্তি টানা সম্ভব হবে, আশা করি! 

কোরআন অবতীর্ণ হবার ধারাবাহিকতা অনুসারে প্রকাশের আজ ৪র্থ পর্ব; এই পর্বেও থাকছে ধারাবহিকভাবে ছয় অংশ। অনুবাদের ভাষা ৫০ টির বেশি বাংলা/ইংরেজি অনুবাদ অনুসারে নিজস্ব।}

নবী মুহাম্মদ দ্বারা ১৯ তম প্রকাশ; সূরা আল মুদ্দাসসির (৭৪) (কম্বল আচ্ছাদিত ব্যাক্তি) ৮ থেকে ১০ আয়াত:

৮. যেদিন শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে;
৯. সেদিন হবে কঠিন দিন,
১০. কাফেরদের জন্যে এটা সহজ নয়।

নবী মুহাম্মদ দ্বারা ২০ তম প্রকাশ; সূরা আল লাইল (৯২) (রাত্রি) ২১ আয়াত:

১. শপথ রাত্রির, যখন সে আচ্ছন্ন করে,
২. শপথ দিনের, যখন সে আলোকিত হয়
৩. এবং তাঁর, যিনি নর ও নারী সৃষ্টি করেছেন,
৪. নিশ্চয় তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা বিভিন্ন ধরনের।
৫. অতএব, যে দান করে এবং খোদাভীরু হয়,
৬. এবং উত্তম বিষয়কে সত্য মনে করে,
৭. আমি তাকে সুখের বিষয়ের জন্যে সহজ পথ দান করব।
৮. আর যে কৃপণতা করে ও বেপরোয়া হয়
৯. এবং উত্তম বিষয়কে মিথ্যা মনে করে,
১০. আমি তাকে কষ্টের বিষয়ের জন্যে সহজ পথ দান করব।
১১. যখন সে অধঃপতিত হবে, তখন তার সম্পদ তার কোনোই কাজে আসবে না।
১২. আমার দায়িত্ব - পথ প্রদর্শন করা।
১৩. আর আমি মালিক ইহকালের ও পরকালের।
১৪. অতএব, আমি তোমাদেরকে প্রজ্বলিত অগ্নি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছি।
১৫. এতে নিতান্ত হতভাগ্য ব্যক্তিই প্রবেশ করবে,
১৬. যে মিথ্যারোপ করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়।
১৭. এ থেকে দূরে রাখা হবে খোদাভীরু ব্যক্তিকে,
১৮. যে আত্মশুদ্ধির জন্যে তার ধন-সম্পদ দান করে।
১৯. এবং তার ওপর কারও কোনো প্রতিদানযোগ্য অনুগ্রহ থাকে না।
২০. তার মহান পালনকর্তার সন্তুষ্টি অন্বেষণ ব্যতীত।
২১. সে সত্বরই সন্তুষ্টি লাভ করবে।

নবী মুহাম্মদ দ্বারা ২১ তম প্রকাশ; সূরা আল মাআরিজ (৭০) (সোপানশ্রেণী), ৫ থেকে ১৮ আয়াত:

৫. অতএব, আপনি উত্তম সবর করুন।
৬. তারা এই আযাবকে সুদূরপরাহত মনে করে,
৭. আর আমি একে আসন্ন দেখছি।
৮. সেদিন আকাশ হবে গলিত তামার মত।
৯. এবং পর্বতসমূহ হবে রঙিন পশমের মত,
১০. বন্ধু বন্ধুর খবর নেবে না।
১১. যদিও একে অপরকে দেখতে পাবে। সেদিন গোনাহগার ব্যক্তি পনস্বরূপ দিতে চাইবে তার সন্তান-সন্ততিকে,
১২. তার স্ত্রীকে, তার ভ্রাতাকে,
১৩. তার গোষ্ঠীকে, যারা তাকে আশ্রয় দিত।
১৪. এবং পৃথিবীর সবকিছুকে, অতঃপর নিজেকে রক্ষা করতে চাইবে।
১৫. কখনোই নয়। নিশ্চয় এটা লেলিহান অগ্নি।
১৬. যা চামড়া তুলে দেবে।
১৭. সে সেই ব্যক্তিকে ডাকবে, যে সত্যের প্রতি পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেছিল ও বিমুখ হয়েছিল।
১৮. সম্পদ পুঞ্জীভূত করেছিল, অতঃপর আগলিয়ে রেখেছিল।

নবী মুহাম্মদ দ্বারা ২২ তম প্রকাশ; সূরা আশ-শামস (৯১) (সূর্য) ১১ থেকে ১৫ আয়াত:

১১. সামুদ সম্প্রদায় অবাধ্যতা বশতঃ মিথ্যারোপ করেছিল।
১২. যখন তাদের সর্বাধিক হতভাগ্য ব্যক্তি তৎপর হয়ে উঠেছিল।
১৩. অতঃপর আল্লাহর রসূল তাদেরকে বলেছিলেন: আল্লাহর উষ্ট্রী ও তাকে পানি পান করানোর ব্যাপারে সতর্ক থাক।
১৪. অতঃপর ওরা তার প্রতি মিথ্যারোপ করেছিল এবং উষ্ট্রীর পা কর্তন করেছিল। তাদের পাপের কারণে তাদের পালনকর্তা তাদের ওপর ধ্বংস নাযিল করে একাকার করে দিলেন।
১৫. আল্লাহ তা’আলা এই ধ্বংসের কোনো বিরূপ পরিণতির আশংকা করেন না।

নবী মুহাম্মদ দ্বারা ২৩ তম প্রকাশ; সূরা কুরাইশ (১০৬) (কুরাইশ গোত্র), ৪ আয়াত:

১. কোরাইশের আসক্তির কারণে,
২. আসক্তির কারণে তাদের শীত ও গ্রীষ্মকালীন সফরের।
৩. অতএব তারা যেন এবাদত করে এই ঘরের পালনকর্তার
৪. যিনি তাদেরকে ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন এবং ভয় থেকে তাদেরকে নিরাপদ করেছেন।

নবী মুহাম্মদ দ্বারা ২৪ তম প্রকাশ; সূরা আল ফাজর (৮৯) (ভোরবেলা), ১ থেকে ১৪ এবং ২৭ থেকে ৩০ আয়াত:

১. শপথ ভোরবেলার,
২. শপথ দশ রাত্রির, শপথ তার,
৩. যা জোড় ও যা বিজোড়
৪. এবং শপথ রাত্রির, যখন তা গত হতে থাকে
৫. এর মধ্যে আছে জ্ঞানী ব্যক্তির জন্যে শপথ।
৬. আপনি কি লক্ষ্য করেননি, আপনার পালনকর্তা আদ বংশের ইরাম গোত্রের সাথে কী আচরণ করেছিলেন,
৭. যাদের দৈহিক গঠন স্তম্ভ ও খুঁটির ন্যায় দীর্ঘ ছিল এবং
৮. যাদের সমান শক্তি ও বলবীর্যে সারা বিশ্বের শহরসমূহে কোনো লোক সৃজিত হয়নি
৯. এবং সামুদ গোত্রের সাথে, যারা উপত্যকায় পাথর কেটে গৃহ নির্মাণ করেছিল।
১০. এবং বহু সৈন্য শিবিরের অধিপতি ফেরাউনের সাথে
১১. যারা দেশে সীমালঙ্ঘন করেছিল।
১২. অতঃপর সেখানে বিস্তর অশান্তি সৃষ্টি করেছিল।
১৩. অতঃপর আপনার পালনকর্তা তাদেরকে শাস্তির কশাঘাত করলেন।
১৪. নিশ্চয় আপনার পালকর্তা সতর্ক দৃষ্টি রাখেন।
২৭. হে প্রশান্ত চিত্ত,
২৮. তুমি তোমার পালনকর্তার নিকট ফিরে যাও সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে।
২৯. অতঃপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও।
৩০. এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ কর।

(চলবে)