২২ জুলাই, ২০১৬

'রঙ্গিলা রাসুল' সমাচার, পাকিস্তানের জন্মে এর সম্ভাব্য ভূমিকা এবং পাকিস্তানে ব্ল্যাসফেমি আইন - ৩

লিখেছেন মার্ক এন্টনি


ইকবাল তাঁর ভীতি সম্পর্কে বলেন, সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতা ইসলাম ও মুসলিম সমাজের আধ্যাত্মিক ভিত্তিকে কেবলমাত্র ধ্বংসই করে দেবে না, বরং ভারতের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যাও মুসলিমদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করবে। তিনি তাঁর মিশর, আফগানিস্তান, ইরান ও তুরস্ক ভ্রমণেও বৃহৎ ইসলামিক রাজনৈতিক সহযোগিতা ও একতাকে প্রমোট করেছিলেন। তিনি এই সকল মুসলিম রাষ্ট্রের মধ্যকার জাতীয়তার পার্থক্যকে ঘুচিয়ে দেবার দাবি তুলেছিলেন। বিভিন্ন আয়োজনে তিনি মুসলিম রাজনৈতিক ক্ষমতা নিশ্চিত করার কথা বলেছিলেন। ডঃ বি আর আম্বেদকারের সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তিনি ভারতের অঙ্গরাজ্যগুলোকে সরাসরি ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে স্বয়ংসম্পূর্ণ একক হিসেবে দেখতে চান, কিন্তু কোনো কেন্দ্রীয় ভারতীয় সরকার তিনি চান না। তিনি ভারতে একটি স্বায়ত্বশাসিত মুসলিম অঙ্গরাজ্যের স্বপ্ন দেখেন। তিনি ভয় পেতেন যে, একটি একক ইন্ডিয়ান ইউনিয়নে মুসলিমরা থাকলে তাদেরকে বিভিন্ন ভাবে বৈষম্যের শিকার হতে হবে। ১৯৩০ সালে এলাহাবাদ অধিবেশনে আল্লামা ইকবাল মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং তিনি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের অধিনে একটি স্বাধীন অঙ্গরাজ্য গঠনের লক্ষ্য স্থির করেন। তিনি বলেন,

“আমি পাঞ্জাব, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু ও বেলুচিস্তান নিয়ে একটি একক রাজ্য দেখতে চাই, যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে অথবা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ছাড়াই একটি স্বায়ত্তশাসিত সরকার গঠন করবে। একটি একক উত্তর-পশ্চিম ভারতীয় মুসলিম রাজ্যই আমার চোখে ভারতের মুসলিমদের অন্তিম ভাগ্য, অন্তত উত্তর-পশ্চিম ভারতের মুসলিমদের জন্য তো বটেই।”

তাঁর এই বক্তৃতায়, ইকবাল জোর দিয়ে বলেন, ইসলাম ধর্ম খ্রিষ্টধর্মের মত নয়। ইসলাম তার আইনী ধারণা, রাজনৈতিক গুরুত্ব এবং তার ধর্মীয় আদর্শকে সাথে নিয়ে এসেছে, যাকে একটি অলঙ্ঘনীয় সামাজিক নীতি বলেই বিবেচনা করতে হবে। তাই, 

“জাতীয়তার ভিত্তিতে কোনো নীতি প্রস্তুত করার অর্থ হল - ইসলামী সার্বভৌমত্বের নীতি থেকে দূরে সরে আসা। মুসলিমদের ক্ষেত্রে এটা চিন্তা করা যায় না।”

এভাবে ইকবাল মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি রাজনৈতিক একতাই শুধু চাননি, তিনি ইসলামী নীতি ভিন্ন অন্য কোনো নীতির অধীনে কোনো বিস্তৃত সম্প্রদায়ের মাঝে মুসলিমদের অস্তিত্বকেও মেনে নিতে পারেননি। একইভাবে তিনি কোনো জাতিসত্তার ভিত্তিতে আলাদা আলাদা রাজ্য বা রাষ্ট্র গড়ে উঠুক তাও কখনও চাননি। তাঁর কাছে ধর্মই রাষ্ট্র বা রাজ্য তৈরির মূল ভিত্তি ছিল। যাই হোক, এভাবেই আল্লামা ইকবাল সাহেব প্রথম একটি তত্ত্ব প্রদান করেছিলেন, পরবর্তীকালে যা “দ্বিজাতিতত্ত্ব” নামে পরিচিতি পায়। এই নীতি অনুসারে, মুসলিমরা একটি আলাদা জাতি এবং তাই তারা সবসময় ভারতের অন্যান্য অঞ্চল ও অন্যান্য সম্প্রদায় থেকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা আশা করে। তিনি পরিষ্কারভাবে তাঁর স্বপ্নের রাষ্ট্রে বা রাজ্যে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদকে প্রত্যাখ্যান করেন।

তো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে যে, আল্লামা ইকবালের রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ মতাদর্শগুলোর সব ক'টির জন্মই হয় ১৯৩০ সালে ইলমুদ্দিনের মৃত্যুর কয়েক মাস পর। আমি এটা বলছি না যে, রঙ্গিলা রাসুলের প্রকাশে ক্ষুব্ধ হওয়া কিংবা ইলমুদ্দিনের মৃত্যুর কারণে শোকাগ্রস্ত হয়ে তিনি এরকম একটার পর একটা তত্ত্বের জন্ম দিতে থাকেন। আমি এটাই বলতে চেয়েছি শুধু, ইলমুদ্দিন তৎকালীন ভারতীয় পশ্চিমাঞ্চলের মুসলিমদের একটি বড় অংশের মানুষের মধ্যে যে একটি ক্ষোভ ও ধর্মীয় চেতনার সৃষ্টি করেছিল, তা হয়তো আল্লামা ইকবালকে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করেছিল। এখান থেকে আমরা আরেকটি বিষয় যেটা লক্ষ্য করছি, তা হল - অন্যান্য মুসলিম লীগ নেতার প্রতি আল্লামা ইকবালের প্রচণ্ড ক্ষোভ। ইকবাল বারবার বলছিলেন যে, নেতারা ইসলাম ও সাধারণ মুসলিমদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তারা সঠিক ইসলাম মেনে চলছে না। জিন্নাহ থেকে শুরু করে সকল মুসলিম লীগ নেতার ওপরেই তাঁর এই রাগ ছিল। কিন্তু এই রাগ মুসলিম লীগ নেতাদের ইলমুদ্দীনের পাশে তেমনভাবে না দাঁড়ানোর কারণেও কিছুটা হতে পারে। সাধারণ মুসলিমের পাশে দাঁড়ানো বলতে তিনি ইলমুদ্দিনকে সমর্থন করা হাজার মানুষের পাশে দাঁড়ানোকেও বোঝাতে পারেন। যাই হোক, সকল মুসলিম লীগ নেতার প্রতি ক্ষোভ থাকলেও পরবর্তীতে আমরা জিন্নাহর প্রতি ইকবালের আস্থা ও সমর্থনকে দেখতে পাই। 

ইকবাল দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, জিন্নাহই একমাত্র নেতা, যিনি ভারতের মুসলিমদের একত্রিত করতে পারেন এবং ব্রিটিশদের ও কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মুসলিম লীগকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। তিনি জিন্নাহকে চিঠি লেখেন, “আমি জানি, আপনি খুব ব্যস্ত। কিন্তু আমি আশা করি, আমি যদি মাঝেমাঝে আপনাকে চিঠি লিখি, আপনি কিছু মনে করবেন না, কারণ আপনিই এখন ভারতের একমাত্র মুসলিম, যাকে উত্তর-পশ্চিম ভারতের মুসলিম সম্প্রদায় এবং, সম্ভবত, সমগ্র ভারতের মুসলিম সম্প্রদায় তাদের পথপ্রদর্শক হিসেবে আস্থা রাখতে পারে।”

(চলবে)