১৯ জুলাই, ২০১৬

বাবার বোধোদয়

লিখেছেন পাপ্পু

ছোটবেলা থেকেই ঈশ্বর বিষয়ে একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন আমার থাকতোই...

সব কথাগুলোর মানে মনের সাথে মেলাতে পারতাম না। শুধু একা একা ভাবতাম। আসলে নাস্তিক কাকে বলে, আমি তখনও জানতাম না, কিন্ত আমি এমন সব প্রশ্ন মানুষকে করতাম, সবাই বলতো - এসব বলতে নেই, বললে এইটা হবে ঐটা হবে, জাহান্নামের সেই ভয়াবহ আগুন যার রং হবে কালো, যার তাপ হবে পৃথিবীর আগুনের চেয়ে ১০ গুণ বেশি...

খুব ভয় পেতাম আমি, কিন্ত আমার বাবাকে কখনো নামাজ-রোজা করতে দেখিনি। একবার বলেছিলাম, "কেন নামাজ পড়ো না, বাবা?"

বাবা জানিয়েছিলেন, এক সময় তিনি পুরোপুরি ধার্মিক ছিলেন। বাবার অনেক অভাব চলছিল। তখন আমরা গ্রামে থাকতাম, বাবার একটা মাত্র মুদি দোকান ছিল, অভাব ঘোঁচাবার জন্য গোটা দশেক মুরগি দিয়ে একটা খামার খুলেছিলেন। এই অভাবের মাঝেও বাবা নামাজ-রোজা ছাড়েননি। একদিন বাবা শবেবরাতের নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন, মা-ও ঘরে নামাজ পড়ছিলেন। সারারাত নামাজ পড়া শেষে সকালে বাড়িতে এসেই বাবা মুরগিকে খাবার দেওয়ার জন্য খামারে গেলেন।

কিন্ত গিয়েই তাঁর মাথায় হাত! বাঁশের বেড়া ভেঙে দুটো গুঁই সাপ পেট ফুলিয়ে রেখেছে। সাপের পেটে আর কিছু নেই, আছে শুধু বাবার কষ্টের টাকায় কেনা সেই মুরগিগুলো।

বাবা এর বেশি কিছু বললেন না, কিন্তু আমি বুঝে গেছি, যার বন্দনা তিনি করে গেছেন সারাটা জীবন, যার উদ্দেশে ধার্মিক বাবা নামাজ পড়লেন সারা রাত - শবেবরাতের রাতে, সেই সর্বশক্তিমান আল্লাহও বাবার কষ্টের টাকায় কেনা মুরগিগুলোকে বাঁচাতে পারেনি। কী হবে সেই আল্লাহকে মেনে? 

বাবা আজো নামাজ পড়েন না, রোজা রাখেন না। আমি এই প্রসঙ্গ তুললে বাবা আমাকে বলেন, "আল্লাহ মেনে কী হবে! মানবতাই আসল। তোর ভেতরে মানবতা না থাকলে সেই জীবনের কোনো মূল্য নেই।"

তবু বাবা এখনো প্রতি শুক্রবার আমাকে বলেন, "যা, নামাজ পড়ে আয়।" এটুকু না বললে তো আবার ধর্মের মুখোশ-পরা লোকগুলোর ঈমানদণ্ডে আঘাত লাগবে, হয়তো চাপাতি হাতে বলবে, "ওই শালা নাস্তিক! ওরে জবাই করা সুন্নৎ!"