১৪ জুন, ২০১৬

কোরআন আসলে কার বাণী? - ৩

লিখেছেন সাঈদুর রহমান

প্রথম পর্ব > দ্বিতীয় পর্ব

এই আয়াতটি খেয়াল করুন: "তারা আপনাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দিনঃ রূহ আমার পালনকর্তার আদেশ ঘটিত। এ বিষয়ে তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে।" (কোরআন ১৭:৮৫) এই রুহ নিয়ে কিছু বলার আগে মুহাম্মদের কোরআন শিক্ষক নিয়ে মক্কাবাসীদের কিছু বক্তব্য লক্ষ্য করা যাক: "আমরা তো ভালভাবেই জানি যে, তারা বলে: তাকে জনৈক ব্যক্তি শিক্ষা দেয়। যার দিকে তারা ইঙ্গিত করে, তার ভাষা তো আরবী নয় এবং এ কোরআন পরিষ্কার আরবী ভাষায়। (কোরআন ১৬:১০৩) এই আয়াতটা থেকে যে-জিনিসটা বোঝা যায়, তা হল - মুহাম্মদের সাথে ভিন্নভাষী এক লোক থাকত, যাকে মক্কাবাসীরা মুহাম্মদের কোরআনের শিক্ষক বলে চিহ্নিত করেছিলেন। কিন্তু এই আয়াতটি দিয়ে এই সেটা নাকচ করার চেষ্টা করা হয়।

ওপরের দু'টি আয়াত থেকে আমি একটি প্লজেবল সিনারিও দাড় করাচ্ছি। মুহাম্মদের সাথে ভিন্নভাষী কোনো লোক ছিলেন, যাকে মক্কাবাসীরা সন্দেহ করতেন, সে-ই মুহাম্মদকে কোরআন শিক্ষা দিচ্ছে। কিন্তু পরের আয়াত (কোরআন ১৬:১০৩) দিয়ে মুহাম্মদ সেটা নাকচ করে তাদেরকে রুহের কথা বলেন। আর তখনই তারা রুহ নিয়ে প্রশ্ন করে এবং প্রথম আয়াতটি (কোরআন ১৭:৮৫) তাঁকে দেয়া হয়। কিন্তু রুহ নিয়ে স্বয়ং মুহাম্মদকেও তেমন কিছু বলা হয়নি।

এবার আমি জীররাঈল যে কোনো ফেরেশতা ছিল না, সেটার সপক্ষে কিছু আয়াত দিয়ে একটা পয়েন্ট দাঁড় করাব। পাঠকরা হয়ত ভাবছেন, জীবরাঈল এবং ফেরেশতাকে আলাদা করে দেখানোর প্রয়োজনটা কী? আমি এই বিষয়ে পরে বলছি।

কোরআনে প্রতিবারই মোহাম্মদকে শিক্ষাদানকারী সত্তাকে রুহ বলা হয়েছে। অন্যদিকে ফেরেশতা বোঝাতে মালাইকা শব্দের ব্যবহার করা হয়েছে এবং অনেক আয়াতেই এই দুই সত্তাকে আলাদা করে দেখানো হয়েছে। নিম্নোক্ত আয়াতগুলো খেয়াল করুন:
যেদিন রূহ ও ফেরেশতাগণ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবে। দয়াময় আল্লাহ যাকে অনুমতি দিবেন, সে ব্যতিত কেউ কথা বলতে পারবে না এবং সে সত্যকথা বলবে। (কোরআন ৭৮:৩৮) 
ফেরেশতাগণ এবং রূহ আল্লাহ তা’আলার দিকে উর্ধ্বগামী হয় এমন একদিনে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর। (কোরআন ৭০-৪) 
যে ব্যক্তি আল্লাহ তাঁর ফেরেশতা ও রসূলগণ এবং জিবরাঈল ও মিকাঈলের শত্রু হয়, নিশ্চিতই আল্লাহ সেসব কাফেরের শত্রু। (কোরআন ২:৯৮) 
আমি একে নাযিল করেছি শবে-কদরে। এতে প্রত্যেক কাজের জন্যে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে। (কোরআন ৯৭:১ ও ৪)
ওপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, রুহ এবং ফেরেশতা আলাদা আলাদা সত্তা। যদি না হতো, তাহলে তাদের আলাদা করে ডাকা হলো কেন? এবার এই আয়াতগুলোতে তাকান:
যখন আমি তাকে সুষম করব এবং তাতে আমার রূহ ফুঁকে দেব, তখন তোমরা তার সম্মুখে সেজদায় নত হয়ে যেয়ো। (কোরআন ৩৮:৭২)
 আমি মরিয়ম তনয় ঈসাকে সুস্পষ্ট মোজেযা দান করেছি এবং পবিত্র রূহের মাধ্যমে তাকে শক্তিদান করেছি। (কোরআন ২:৮৭)
প্রথম আয়াতটি খেয়াল করুন। আল্লাহ যখন আদমকে বানাচ্ছিল, তখন আল্লাহ তার নিজের রুহকে আদমের ভেতরে ফুঁকে দেয়ার কথা বলা হচ্ছে, যাকে ফেরেশতাদের সেজদা করার কথা বলা হয়েছিল। এখানেই প্রশ্ন যে, যদি ফেরেশতা এবং রুহ এক হয় তাহলে আল্লার রুহ কি ফেরেশতা? তাহলে কি আদমের মাটির শরীরের ভেতরে আল্লাহ ফেরেশতা ঢুকিয়ে দিয়েছিল? আবার অন্য আয়াতটিতে বলা হচ্ছে ঈসাকেও এই রুহ দিয়েই শক্তিশালী করে দেয়া হয়েছিল, যার মাধ্যমে সে মৃতকে জীবিত করতে পারত, মাটির পাখিতে জীবন দান করতে পারত। (কোরআন ৫:১১০) এগুলো কি তাহলে ফেরেশতা করত? জীবরাঈল যে ফেরেশতা নয়, এ নিয়ে সর্বশেষ তিনটি আয়াত বলব। প্রথম দু'টি হল ফেরেশতা নিয়ে মক্কাবাসীদের বক্তব্য। এই আয়াতটি দেখুন:
উহারা বলে … তাহার নিকট কোন ফেরেশতা কেন অবতীর্ণ করা হইল না ,যে তাহার সঙ্গে থাকিত সতর্ককারী রূপে।  (কোরআন ২৫:৭)
তাহার বলে (মক্কাবাসীরা) তাঁর কাছে কোন ফেরেশতা কেন প্রেরণ করা হল না ? যদি আমি কোন ফেরেশতা প্রেরণ করতাম, তবে গোটা ব্যাপারটাই শেষ হয়ে যেত। (কোরআন ৬:৮)
এই দু'টি আয়াত থেকে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, মুহাম্মদের নিকট কোনো ফেরেশতা আসছে, এমন কথা মুহাম্মদ মক্কাবাসীদের কাছে কখনো বলেননি। সর্বশেষ এটি... কোরআন ৫৩:৫-৬: "কোরআন ওহী, যা প্রত্যাদেশ হয়, তাঁকে শিক্ষা দান করে এক শক্তিশালী, প্রজ্ঞাসম্পন্ন।" এখানে বলা হচ্ছে, মুহাম্মদকে যিনি কোরআন শিক্ষা দিচ্ছে, তিনি শক্তিশালী ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন এক সত্ত্বা। অপরদিকে কোরআনে (২:৩২) ফেরেশতাদের নিয়ে বলা হয়েছে, তাদের আল্লাহ যা জ্ঞান দেয়, তা-ই তারা জানে, এর বাইরে তারা কিছুই জানেন না। তার মানে, এরা প্রজ্ঞাসম্পন্ন নয়। সুতরাং মুহাম্মদকে শিক্ষাদানকারী জীবরাঈল কোনো ফেরেশতা নন, অন্য একটি সত্তা (অন্য কথায় রুহ), যাকে মুহাম্মদ মক্কাবাসীদের কাছে নতুন পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।