২ জুন, ২০১৬

কোরআন আসলে কার বাণী? - ২

লিখেছেন সাঈদুর রহমান

আগের পর্ব

এখানে লক্ষ্য করার মত বিষয় হল, যিনি মুহাম্মদকে কোরআন শিক্ষা দিচ্ছিলেন, তিনি কোরআন লেখার বিষয়ে একটা স্পষ্ট এবং কঠোর অবস্থানে ছিলেন । মুহাম্মদ কিংবা অন্য কেউ কোরআন লিখেছে বা বানিয়েছে, সেটাকে তিনি খুব গুরুতর অপরাধ হিসেবেই দেখতেন (যার কারণে তাকে শাস্তি পেতে হবে); এমনকি যারা বলে আসছিল কোরআন মুহাম্মদ লিখছে, তাদের চরম বিরোধিতাসহ তিনি একটা চ্যালেঞ্জও তাদের প্রতি ছুড়ে দেন। নিম্নোক্ত আয়াতগুলোর দিকে খেয়াল করুন:

" সুতরাং দুর্ভোগ তাহাদের জন্য যাহারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে এবং তুচ্ছ মূল্য প্রাপ্তির জন্য বলে, ইহা আল্লাহর নিকট হইতে। " (কোরআন ২:৭৯)... "তারা কি বলে? আপনি কোরআন রচনা করে এনেছেন? আপনি বলে দিন আমি যদি রচনা করে এনে থাকি, তবে সে অপরাধ আমার।" (কোরআন ১১:৩৫)... "সে যদি আমাদের নামে কোন কথা রচনা করত, তবে আমি তার দক্ষিণ হস্ত ধরে ফেলতাম, অতঃপর কেটে দিতাম তার গ্রীবা।"  (কোরআন ৬৯:৪৪-৪৬)... "তারা কি বলে যে, রসূল একে রচনা করেছে? বলুন, যদি আমি রচনা করে থাকি, তবে তোমরা আল্লাহর শাস্তি থেকে আমাকে রক্ষা করার অধিকারী নও।" (কোরআন ৪৬:৮)... "মানুষ কি বলে যে, সে ইহা রচনা করেছে ? বলে দাও, তোমরা নিয়ে এসো একটিই সূরা, আর ডেকে নাও, যাদেরকে নিতে সক্ষম হও আল্লাহ ব্যতীত।" (কোরআন ১০:৩৮)

যদি আমরা উপরের আয়াতগুলোর বক্তব্য মেনে নিই যে, মুহাম্মদ কোরআন লেখেনি, তাহলে অবশ্যই মনে প্রশ্ন ওঠে: তাহলে কে লিখেছে এই কোরআন? এর ভেতরের কথাগুলোই বা কার?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে আমাদেরকে যার কাছে যেতে হবে, সে হল জীবরাঈল। এর কারণ হল - এই জীররাঈলই মুহাম্মদকে কুরআন শিক্ষা দিয়েছিল (কোরআন ২৬:১৯৩ ); অতএব যদি আমরা জীবরাইলকে ভাল ভাবে বুঝতে পারি, তাহলে আমাদের উত্তর পাওয়াটা হয়ত কিছুটা সহজ হবে। কোরআনের বাংলা অনুবাদক, হাদিস বর্ণনাকারী এবং ইসলামী পণ্ডিতগণ জীবরাঈলকে ফেরেশতা হিসেবেই সব জায়গায় উপস্থাপন করেন। আমি আমার পরবর্তী লেখাগুলোতে এই বিষয়টারই বিরোধিতা করে যাব এবং দেখাতে চেষ্টা করব, কোরআন অনুসারে - জীবরাঈল ফেরেশতা নয় বরং অন্য এক জাতীয় সত্তা, যাকে ‘রূহ’ বলে ডাকা হত।

রূহ নিয়ে কিছু বলার আগে পাঠকদের একটা বিষয় আমি নজরে আনতে চাই। তা হল, মক্কা এবং মদিনায় ইসলামকে দেখা হত অনেকটা এলিয়েন ধর্ম হিসেবে। এলিয়েন বললাম এই অর্থে যে, মুহাম্মদের ইসলাম মক্কাবাসীদের নতুন কিছু বিষয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল, যা তারা আগে থেকে জ্ঞাত ছিল না। তন্মধ্যে একটি ছিল কেয়ামত দিবস।

এই আয়াতটি দেখুন: "লোকে আপনাকে কেয়ামত দিবস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন ইহার জ্ঞান কেবল আল্লাহরই আছে" (কোরআন ৩৩:৬৩); এখানে স্পষ্টতই বোঝা যায়, মুহাম্মদ যখন মক্কাবাসীদের কেয়ামত নিয়ে বলছিল, তখন তারা তার কাছে জানতে চাচ্ছিল, এই কেয়ামতটা কী? কখন হবে? কী ঘটবে সেদিন? আর মুহাম্মদ যখন তার কোরআন শিক্ষকের কাছে এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে চাচ্ছিলেন, তখন সেই শিক্ষক তাকে এই আয়াত দিয়েছিলেন। তাছাড়া ইব্রাহিম নিয়েও মুহাম্মদের ইসলাম একই এলিয়েন কথাবার্তা বলে বেড়াত। যেমন ইব্রাহিম ইয়াহুদিও ছিল না, খ্রিষ্টানও ছিল না (কোরআন ৩:৬৭); মুহাম্মদের ইসলাম নিয়ে মক্কাবাসীদের দৃষ্টিভঙ্গিটা একটু খেয়াল করুন: "আমরা তো অন্য ধর্মে এরূপ কথা শুনি নাই, ইহা এক মনগড়া উক্তি মাত্র (কোরআন ৩৮:৭)।

একইভাবে রূহও ছিল মুহাম্মদের ইসলামে নতুন সংযোজন, যার সম্পর্কে মক্কাবাসীরা অবগত ছিলেন না। এই আয়াতটি খেয়াল করুন: "তারা আপনাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দিন: রূহ আমার পালনকর্তার আদেশ ঘটিত। এ বিষয়ে তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে (কোরআন ১৭:৮৫) ।

এই রূহ নিয়ে কিছু বলার আগে মুহাম্মদের কোরআন শিক্ষক নিয়ে মক্কাবাসীদের কিছু বক্তব্য লক্ষ্য করা যাক: "আমরা তো ভালভাবেই জানি যে, তারা বলে: তাকে জনৈক ব্যক্তি শিক্ষা দেয়। যার দিকে তারা ইঙ্গিত করে, তার ভাষা তো আরবী নয় এবং এ কোরআন পরিষ্কার আরবী ভাষায়"  (কোরআন ১৬:১০৩)।

এই আয়াতটা থেকে যে-জিনিসটা বোঝা যায়, তা হল, মুহাম্মদের সাথে ভিন্নভাষী এক লোক থাকত, যাকে মক্কাবাসীরা মুহাম্মদের কোরআনের শিক্ষক বলে চিহ্নিত করেছিলেন । কিন্তু এই আয়াতটি দিয়ে সেটা নাকচ করার চেষ্টা করা হয়।