২৭ জুন, ২০১৬

ধর্ম, রাজনীতিবিদ ও ধর্মের তামাশা

লিখেছেন লিংকন রায় অন্তর

’৯২ সালে ভারতের বাবরি মসজিদ ভেঙেছিল ভগবানের দল এবং সে দাঙ্গার ফলে এদেশের ভাঙা হয়েছিলো বহু মন্দির। তখন এক বুড়োকে আমরা জিজ্ঞেস করেছিলাম, "নানা, মন্দির কারা ভেঙেছে?" উত্তরে বুড়ো বলেছিলেন, "ভগবানের ঘর খোদায় ভেঙেছে।"... যাহোক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যদি এহেন কাজ করতে পারে, তাহলে জনসাধারণের ভরসার স্থান আর থাকলো কোথায়?

কোনো এক সময়ে এক বড়ো ভাইয়ের এক খ্রিষ্টান সহকর্মী নিখোঁজ হলো, তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। দু’দিন পর পত্রিকার একটি খবর দেখে তার আত্মীয়-স্বজন, পুলিশসহ ১২ নং মিরপুর গিয়ে একটি কবর খুঁড়ে লাশ উদ্ধার করে। তখন মিরপুরে এতো ঘনবসতি ছিল না। ১২ নম্বরের কোনো এক কানাগলিতে তার এক বন্ধু তাকে কায়দা করে এনে ভাড়াকরা গুণ্ডা দিয়ে খুন করে একটি বস্তির ঘরে ফেলে গেলে স্থানীয়রা তাকে সনাক্ত করার জন্য তার প্যান্ট খুলে দেখলো তার লিঙ্গ কাটা নেই, তাই তারা ধরে নিলো, সে হিন্দু। অতঃপর ঠাকুর ডেকে হিন্দুশাস্ত্র মতে মুখে অগ্নিসংযোগ করে তাকে মাটিচাপা দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ তিনি হিন্দুদের ভগবানের ইচ্ছাতে তার নিকট যাবার মতো মন্ত্র সঙ্গে নিয়ে গেছেন! লাশ উদ্ধারের পর আবার আত্মীয়-স্বজনরা পাদ্রি ডেকে খ্রিষ্টান ধর্মমতে মন্ত্রোচ্চারণ করে পুনরায় কবর দেয়। বড়ো ভাইয়ের ওই সহকর্মী তাহলে কার কাছে গেলো, ভগবান নাকি ঈশ্বরের কাছে? হিন্দুর ভগবান কি খ্রিষ্টানের ঈশ্বরের কাছে পরাজিত হলো?

আর একটি ঘটনা, এদেশের নয়, বিদেশের। এক ব্যক্তি হুজুর ডেকে তার মৃত ছেলেকে কোরান শরীফের বিধানমতে সমস্ত শেষকৃত্যানুষ্ঠান শেষে যখন কবরস্থানে নিয়ে যাচ্ছিলো, তখন তার হিন্দু ধর্মালম্বী স্ত্রী বাধা দিলো। ওই ব্যক্তি তার স্ত্রীর অমতে কিছু করতে পারলেন না, তিনি ছেলের লাশ মায়ের হাতে সঁপে দিলেন। মা ঠাকুর ডেকে হিন্দু শাস্ত্রমতে সৎকার করলো। তাহলে মুসলমানের আল্লা কি হিন্দুর ভগবানের নিকট পরাজিত হলো? আর ওই ছেলেটিই বা কার কাছে গেলো?

ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় আমরা এতোটাই অন্ধ যে, মনুষ্যত্ববোধ এখানে কোনোই কাজ করে না। প্রশ্ন হলো: খোদা-ভগবান-ঈশ্বর এরা কি ভিন্ন ভিন্ন সত্তা, নাকি একই সত্তা? অনেকে বলেন, যে নামেই ডাকো না কেন, তারা এক। কিন্তু তা কি করে? তাহলে কেন এমন বিদঘুটে ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ তারা তাদের নবী-রাসূল, দেবতাদের মাধ্যমে প্রচার করে পৃথিবীতে এক মহারক্তারক্তি বাঁধিয়ে রেখেছে? আদৌ তারা কি মানুষের শান্তি চায়? যাহোক, আমরা এমনই ধার্মিক যে, মৃতদেরও এর হাত থেকে রেহাই নেই। আমাদের ধার্মিকতা দেখে মনে হচ্ছে, আমরা দিন-দিন ধার্মিকই হচ্ছি কিন্তু, মানবতা হারাচ্ছি। আমরা প্রতিনিয়তই অতিলোভী হচ্ছি, তাই দেখে আল্লা-ভগবানেরাও কি লোভী হচ্ছে? ধর্মও নির্দিষ্ট করে দেয়নি যে, কতো বেশি ধার্মিক হলে মানবতা ভুলুণ্ঠিত হবে না? কতো বেশি লোভী হলে তা সর্বোচ্চ লোভ? কতো বেশি ধনী হলে সর্বোচ্চ ধনী? কতো বেশি হিংস্র হলে তা হিংস্রতা? কতো বেশি পশু হলে তা পশুত্ব? কতো ধন-সম্পদ লুটতরাজ যথেষ্ট? কতো গরীবের জায়গা-জমি দখল যথেষ্ট? কতো ক্ষদ্র ব্যবসায়ী গিলে খাওয়া যথেষ্ট? কতো বেশি লাভ পেলে তা সর্বোচ্চ লাভ? কতো বড় চুরি বিচারের কাঠগড়ায় ওঠার জন্য যথেষ্ট? কতোখানি প্রতারণা হলে প্রতারণা বলা হবে না? রাষ্ট্রের কতো বড় অর্থনৈতিক ক্ষতিকে ক্ষতি বলা হয়? কতো বড় স্টকমার্কেট কেলেংকারিকে কেলেংকারি বলা যাবে? কতো বেশি জালিয়াতি করলে তাকে জালিয়াত বলা যাবে? কিছুই বলা যাবে না, কারণ ক্ষমতাধরদের হাতেই ধর্ম এবং রাষ্ট্রের সব চাবিকাঠি। সমাজে ক্ষমতাধর ধার্মিকরা, রাষ্ট্রে ক্ষমতাধর অসৎরা। তাই তারা যা করে, তাতে সাধারণের সমর্থন বা মতামতের তোয়াক্কা করে না। ক্ষমতা না থাকলে ছেঁচড়া চোর হওয়া যায়, কিন্তু প্রকৃত দুর্নীতিবাজ হওয়া যায় না। তাই তো আমরা সকলেই চাই ক্ষমতা, হোক তা ধর্মীয়, হোক তা রাষ্ট্রের ক্ষমতা। জাতিগতভাবে আমরা আর কতো ঘুষ খেলে তা পর্যাপ্ত হবে? কতো বেশি দুর্নীতি করলে আমরা তৃপ্ত হবো? দুর্নীতিতে কতোবার প্রথম হলাম, কিন্তু তাতে তৃপ্ত নই, অতৃপ্তি আমরা এখন ছুঁয়েছে হিমালয়, এখন ভাঙবো নিজেদের রেকর্ডখানি।

দুর্নীতিই তো আরো ক্ষমতাবান হওয়ার সিঁড়ি। অতি-মুনাফা, অতি-ক্ষমতা, অতি-আমিত্ব, অতি-অহংকারই আজকালকার সর্বশ্রেষ্ঠ নেতার গুণাবলী। কতো বড় নেতা যথেষ্ট বড়ো নেতা? কতোখানি ক্ষমতা যথেষ্ট ক্ষমতা? কতো গলাবাজি যথেষ্ট গলাবাজি? কতো অভিনয় যথেষ্ট অভিনয়? কতো ইন্ডাস্ট্রির মালিক যথেষ্ট? কতো বেশি জাহাজ-উড়োজাহাজ থাকলে যথেষ্ট? কতো বেশি ট্যাক্স ফাঁকি যথেষ্ট? কতো বেশি নকল টাকা, নকল সার্টিফিকেট তৈরি যথেষ্ট? কতো বেশি চেক জালিয়াতি যথেষ্ট? খাদ্যে কতো বেশি ভেজাল দেওয়া যথেষ্ট? কতো বিষ দিয়ে ফল, শাক-সব্জি, দুধ, মাছ... সংরক্ষণ যথেষ্ট? কতো বেশি ডাক্তারি ফি নিলে তা পর্যাপ্ত? কতো বেশি ভূমিদখল করলে ভূমিদস্যুদের বিচার হবে? কতো বেশি গরিব চুষলে তা অন্যায়ের তালিকায় পড়বে? কতো বেশি বিখ্যাত হলে যথেষ্ট? কতো বেশি সময় ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা যথেষ্ট? কতো বেশি ধার্মিক হলে তা মনুষ্যত্ব নষ্ট করে না? কতো মিলিয়ন টাকা হলে তৃপ্ত হবো, কতো বিলিয়ন যথেষ্ট বিলিয়ন? এক জীবন পার করতে কতো বিলিয়নের প্রয়োজন? কতো বেশি টাকা হলে একজন মূর্খও সমাজের/রাষ্ট্রের/রাজনীতির নেতৃত্ব পায়? কতো টাকা হলে একজন মানুষ সুখী থাকবে, তৃপ্ত হবে? কতো বেশি টাকা হলে পরমায়ু কিনতে পারা যায়? কতো বেশি ক্ষমতাধর হলে তা যথেষ্ট, ধর্ম তার সীমানা নির্ধারণ করে দেয়নি, তাই আমাদের লোভেরও সীমা নেই। ধর্মকে কেউ অপমান করলে তার মুণ্ডুপাত না ঘটিয়ে ছাড়ে না যে-জাতি, সে জাতির এ অধঃপতন কেন?

রাজনৈতিক দুর্বাত্তায়নের বিরুদ্ধে ধার্মিকরা একদমই চুপ কেন? প্রতিনিয়তই দেখা যায়, ধর্মীয় ও বিবিধ রাজনৈতিক দল এবং জনসাধারণ চিৎকার করে 'ধর্ম গেলো ধর্ম গেলো' বলে। কিন্তু নৈতিকতা যে কবেই চলে গিয়েছে, সে বিষয়ে কারো হুঁশ নেই। কারণ এটা ধার্মিকদের দেশ, মানবতার দেশ নয়।