২১ মে, ২০১৬

কোরআন আসলে কার বাণী? - ১

লিখেছেন সাঈদুর রহমান

ইসলামীয় ইতিহাস মতে, ৬১০-৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে মুহাম্মদ নামক এক আরবীয়র নিকট একটি ঐশ্বরিক ধর্মগ্রন্থ কোরআন ওহী আকারে নাযিল হয়েছিল। ইসলামী পণ্ডিতগণ বলেন, জিবরাঈল নামক এক ফেরেশতা মুহাম্মদকে এই কোরআন শিক্ষা দিয়েছিল। মুহাম্মদের সাথে জিবরাঈলের প্রথম সাক্ষাতের পুরো বর্ণনা বুখারী হাদিস গ্রন্থের খণ্ড ১, গ্রন্থ ১-এর ৩ নাম্বার হাদিসটিতে বর্ণিত আছে।

আমার এই লেখাটির মুল বিষয়বস্তু হল, ওপরে বর্ণিত ইসলামীয় এই চিরাচরিত রূপকে নিয়ে প্রশ্ন করা। এই লেখাটির মাধ্যমে আমি কিছু দাবি করব, যা মূলত নিম্নরূপ:
১. বর্তমানের লিখিত কোরআন অরিজিনাল কিংবা আল্লাহর কোরআন নয়, বরং কোরানে কথিত জিবরাঈল এবং অন্যান্য লেখকের নিজস্ব বাণী।
২. মূল কোরআন আরবি ব্যতীত অন্য ভাষায় লেখা ছিল।
৩. ওহী নিয়ে আসা জিবরাঈল কোনো ফেরেশতা নয়, বরং অন্য কিছু।
পয়েন্টগুলো সরাসরি আলোচনা করার আগে পাঠকদের আমি একটা বিষয় পরিষ্কার করে নিতে চাই । আমার এই লেখা শুধুমাত্র কোরআনের আয়াতগুলোর ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে। হাদিস কিংবা অন্যান্য সহায়ক গ্রন্থকে আমি একেবারেই উপেক্ষা করে গেছি। তার কারণ হল: কোরআনকে আমি কোরাআনের দৃষ্টি থেকে দেখতে চেয়েছি। কোরআন নিয়ে কোরআনের পণ্ডিতগণ যেসব দৃষ্টিভঙ্গি রাখেন, আমার এই লেখাটি সেসবের অনেক কিছুকেই চ্যালেঞ্জ করবে। প্রথমেই বর্তমান কোরআন এবং মোহাম্মদ নিয়ে কিছু বলি।

কোরআন নিয়ে বর্তমান কোরআনটিতে বলা আছে, এটা জগৎসমুহের প্রতিপালক আল্লাহ হতে জীবরাঈলের মাধ্যমে (কোরান ২৬:১৯৩) আরবি ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে (কোরান ১২:২, কোরান ৪৩:৩) শবে কদরের রাতে (কোরান ৯৭:১), যার কথা এর আগের কিতাবসমূহে উল্লেখ আছে (কোরান ২৬:১৯৬) যা এগুলোকে সত্যায়ন দান করে (কোরান ৩:৩, কোরান ২৯:৩০) এবং এটা বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ (কোরান ১৬:১০২, কোরান ৬৮:৫২) ও বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য হেদায়েত এবং রহমত স্বরূপ (কোরান ৩:২০); এই কোরআন নাযিলের মূল উদ্দেশ্যে ছিল মক্কা এবং এর আশেপাশের এলাকাগুলোতে বসবাসকারী সম্প্রদায়কে বিভিন্ন বিষয়ে সতর্ক করা (কোরান ৪২:৭)।

যে ব্যক্তিকে (মুহাম্মদকে) এই কোরআন দেয়া হয়েছে, তাকে নিয়ে কোরআন থেকে যতটুকু জানা যায়, তার মধ্যে একটি হল - তিনি ছিলেন একজন নিঃস্ব (কোরান ৯৩:৮), এতিম (কোরান ৯৩:৬); কোরআন অনুসারে মুহাম্মদ এর আগে কখনো কোনো প্রকার ধর্মগ্রন্থ লেখেননি (কোরান ২৯:৪৮), এই কোরআন সম্বন্ধেও তিনি ছিলেন অজ্ঞ (কোরান ৪:১১৩, ‌কোরান ১২:২), এবং ইসলামীয় ঈমান নিয়েও তাঁর কোনো জ্ঞান ছিল না (কোরান ৪২:৫২); তবে এই কোরআন মুহাম্মদকে কোনো কাগজে বা অন্য কিছুতে লিখে দেয়া হয়নি (কোরান ৬:৭), বরং জিবরাঈল তাকে হৃদয় দিয়ে মুখস্থ করতে বলেছিল (কোরান ২৬:১৯৪)।

ধর্মগ্রন্থ এবং পুরুষ রাসুল পাঠিয়ে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে সতর্ক করা মূলত ইসলামী ধর্মতত্ত্বের একটা চলমান প্রক্রিয়া (কোরান ১৬:৪৩); এর আগেও মুসা, ঈসা, ঈব্রাহিম নামক নবীসহ আরো অনেক নবীদের এমন ঐশ্বরিক গ্রন্থ দেয়া হয়েছিল (কোরান ৪:১৬৩, কোরান ৭:৭২);
কিন্তু এর পূর্বে মক্কা এবং এর আশেপাশের এলাকাগুলোতে কোনো ঐশ্বরিক ধর্মগ্রন্থ দেয়া হয়নি এবং এদের সতর্ক করতে কোনো নবীও আসেননি (কোরান ৩২:৩); যে সম্প্রদায় বা জাতিকে কোনো সতর্ককারী এবং কোনো ধর্মগ্রন্থ দেয়া হয় না, সে জাতিকে ইসলামে মূলত ‘উম্মি’ বলে ডাকা হয়। কোরআনের অনেক জায়গাতেই (ওপরে দেখে নিন) বলা হয়েছে, মুহাম্মদ কোরআনের আগে অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থ পড়েননি বা লেখেননি এবং যে এলাকায় তিনি বড় হয়েছেন, এই এলাকায় এর আগে কোনো নবী আসেননি, সুতরাং মুহাম্মদকে (কোরান ৭:১৫৭) এবং অন্যান্য মক্কাবাসীদের (কোরান ২:৭৮) কোরআনে উম্মি হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়েছে ।

মুহাম্মদের হঠাৎ করে নবী হয়ে ওঠা এবং ইসলাম প্রচার করাটাকে ততকালীন মক্কাবাসীরা কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি (কোরান ৩৮:৮); তারা মুহাম্মদকে আল্লাহর প্রেরিত রাসুল নয় বলে তাকে প্রত্যাখ্যান করে (কোরান ১৩:৪৩) এবং পূর্বপুরুষদের মূর্তিপূজার ঐতিহ্য ছেড়ে ইসলামের মত একটা একেশ্বরবাদী ধর্ম পালনের আহ্বান শুনে মুহাম্মদকে একজন বিদ্রূপের পাত্র (কোরান ২১:৩৬) এবং পাগল বলেই সম্বোধন করতে থাকে (কোরান ১৫:৬); ওদের ভাষায় "আমরা কি এক উন্মাদ কবির কথায় আমাদের ইলাহগণকে বর্জন করিব?"(কোরান ৩৭:৩৬); এছাড়াও তাদের দাবি ছিল, অন্য ভাষার এক লোক (কোরান ১৬:১০৩) এবং জ্বীন সম্প্রদায়ের লোকেরা (কোরান ২৫:৪) তাকে কোরআনের শিক্ষা দিচ্ছে এবং কোরআনকে তারা মুহাম্মদের রচনা বলেই গণ্য করেছিল (কোরান ১০:১৫,৩৮; কোরান ১১:৩৫)।

(চলবে)