৬ মে, ২০১৬

ইসলামরক্ষাকারীরা

লিখেছেন জুলিয়াস সিজার

বাংলাদেশের যে কোনো একটি এলাকায় মনে করুন চরডাঙা জেলার শীষখালী উপজেলার আলফা-বিটা গ্রামের একটি বাড়ি স্থানীয় উত্তেজিত ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা ঘিরে রেখেছে। সেই বাড়িতে ভয়ঙ্কর এক অপরাধী রয়েছেন। পরিস্থিতি বেশ থমথমে। যে কোনো মুহূর্তে উত্তেজিত লোকজন হামলে পড়তে পারে সেই বাড়ির ওপর। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক আলী জনতার উদ্দেশে বললেন,'পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছে। আপনারা শান্ত হোন, একটু ধৈর্য ধরুন। পুলিশ না আসলে আমিই সবার আগে এই বাড়িতে হামলা শুরু করব।'

মুহূর্তেই সেই খবর চরডাঙ্গা থেকে ঢাকায় পুলিশের আইজিপি হয়ে, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীপরিষদ, সেনাপ্রধান, বিমান ও নৌবাহিনীর প্রধান, সচিবালয় সবখানে পৌঁছে গেছে। দুর্ধর্ষ সেই অপরাধীকে ধরতে দফায় দফায় মিটিং হচ্ছে ঢাকায়। এই অপরাধীকে ধরতে পারলে দেশে সরকারে ইমেজ বাড়বে, আর ধরতে না পারলে সরকারের ভাবমূর্তি চরম সংকটে পড়ে যাবে। বিরোধীদল ঈগলের চোখ রেখেছে চরডাঙা উপজেলার আলফা-বিটা গ্রামের সেই বাড়িটির ওপর। যদি কোনোক্রমে সরকার সেই অপরাধীকে ধরতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তারা সেটাকে ইস্যু বানিয়ে আন্দোলনে নামবে।

অবশেষে আলফা-বিটা গ্রামের সেই বাড়িটিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি 'স্পেশাল ফোর্স'-কে পাঠানো হলো। ওপর থেকে হেলিকপ্টার চক্কর দিচ্ছে। সেই বাড়িকে কেন্দ্র করে বাড়ির আশেপাশের পাঁচ মাইল এলাকাকে নিয়ে একটা বৃত্তাকার সেনাবেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে, যেন কোনোভাবেই অপরাধী পালাতে না পারে। অবশেষে রাত সাড়ে ৮ টার দিকে দুর্ধর্ষ সেই অপরাধী ২০ বছরের তরুণীটিকে গ্রেপ্তার করতে সমর্থ হলো স্পেশাল ফোর্স। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ,'তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে আল্লাহ ও কোরআন নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছেন।'

ওদিকে ঢাকায় এই সফল অপারেশনের খবর পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব, উপ-সচিব, সেনাপ্রধান, নৌবাহিনী প্রধান, বিমান বাহিনীর প্রধান - মোট কথায় দেশের হর্তাকর্তারা একে অন্যকে অভিনন্দন জানালেন। হতাশ বিরোধীদল এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি, কী প্রতিক্রিয়া জানাবে। স্থানীয় উত্তেজিত জনতা হাততালি দিয়ে অভিবাদন জানিয়েছে সরকার ও প্রশাসনের ভূমিকাকে। 'ইসলাম রক্ষা করে ফেলেছে'(!) এমন একটা তৃপ্তি নিয়ে বোকাচোদারা বুক ফুলিয়ে সিনা টানটান করে বাড়ি ফিরে গেলো। ইসলামের সাফল্যের মুকুটে যুক্ত হলো আরও একটি পালক!

ওই তরুণীর বাড়ি থেকে পুলিশ বোমা, গ্রেনেড, গানপাউডার কিংবা কোনো আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি। তাঁর পড়ার টেবিল থেকে আরজ আলী মাতব্বর রচনাসমগ্র, সত্যের সন্ধানে, বার্ট্রান্ড রাসেল, হুমায়ুন আজাদ, প্রবীর ঘোষ, আহমদ শরীফদের কিছু বিপজ্জনক বই (যা অন্ধকে আলো দেয়, ১৪০০ বছর আগের অন্ধকার দূর করে) উদ্ধার করেছে পুলিশ। তরুণীটির ওই মন্তব্যের কারণে জাতীয় অর্থনীতির কোনো ক্ষতি হয়নি, কোনো ফ্লাইওভার ভেঙে জনগণের ওপর পড়েনি, রানা প্লাজাও ধ্বসে পড়েনি, ব্যাংকের টাকা খোয়া যায়নি, শেয়ার বাজারে ধ্বস নামেনি। তিনি জনগণের অর্থ, সম্পদও লুটেপুটে খাননি।

তার পরদিন পত্রিকায় সরকারের এই সফলতার খবর ছাপানো হয়েছে। অফিসে বসে সেই খবর পড়তে পড়তে সেনাপ্রধান ভাবতে লাগলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের কোথায় আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে একটি পর্যটন কেন্দ্র বানিয়ে নিজের ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ানো যায়। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা ভাবতে লাগলেন, কোন সেতু, সড়ক কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রকল্প থেকে টাকা সরানো যায়। সচিব, উপ-সচিব, সরকারী আমলারা ভাবতে লাগলেন, কোন ফাইলটি আটকে দিয়ে নিজের পকেটে কিছু মালপানি জমা করা যায়। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক আলী ভাবতে লাগলেন, প্রতিবেশী কোন নগেন কিংবা হরিদাশ মণ্ডলের ভিটেমাটি দখল করে জোর করে ভারত পাঠিয়ে দেওয়া যায়। মোসাদ্দেকের দল এখন ক্ষমতায়, তিনি নৌকার লোক।

আর বাড়িটিকে ঘিরে থাকা জনতাদের কেউ কেউ পথেঘাটে, চিপায় ঘুরে বেড়ায় - কখন কার মুখ চেপে ধরে ধর্ষণ করা যায়, ভিড়ের ভেতরে পাছায় হাত দেওয়া যায়। কোন মালুর মেয়েটা ডাঙর হয়েছে - তাদের চোখ এখন সেদিকে।

অথচ সে রাতে সবাই মিলে ইসলাম রক্ষা করেছিলো।