৯ এপ্রিল, ২০১৬

হুদাইবিয়া সন্ধি - ১০: আবু জানদাল বিন সুহায়েল উপাখ্যান!: কুরানে বিগ্যান (পর্ব- ১২০): ত্রাস, হত্যা ও হামলার আদেশ – চুরানব্বই

লিখেছেন গোলাপ

(আগের পর্বগুলোর সূচী: এখানে)

"যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।"
  
কুরাইশ প্রতিনিধি সুহায়েল বিন আমর ও তাঁর সঙ্গীরা স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর সাথে হুদাইবিয়া চুক্তির শর্তাবলী নিয়ে কীভাবে আলাপ আলোচনা শুরু করেছিলেন, সেই আলোচনায় তাঁরা কোন কোন শর্তে সমঝোতায় পৌঁছেছিলেন, "কোনো ব্যক্তি যদি তার অভিভাবকদের অনুমতি ব্যতিরেকে মুহাম্মদের কাছে আসে, তবে মুহাম্মদ তাকে তাঁদের কাছে ফেরত দেবেন" শর্তে মুহাম্মদের রাজি হওয়ার পর সেখানে কীভাবে আবু জানদাল বিন সুহায়েল নামের এক মক্কাবাসী কুরাইশ মুসলমানের আগমন ঘটেছিল, তার আলোচনা আগের পর্বে করা হয়েছে।

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের (৭০৪-৭৬৮ সাল) বর্ণনার পুনরারম্ভ: [1] [2] [3]

পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ১১৯) পর:

'আল্লাহর নবীর অনুসারীরা কোনোরূপ সন্দেহ ব্যতিরেকেই মক্কা দখলের (Occupying) অভিপ্রায়ে যাত্রা করেছিলেন, কারণ আল্লাহর নবী তাঁর মনশ্চক্ষে (vision) তা দেখেছিলেন। কিন্তু যখন তারা শান্তি-চুক্তি ও প্রত্যাবর্তনের আলাপ-আলোচনা ও সেখানে আল্লাহর নবীর অবস্থান প্রত্যক্ষ করেন, তখন তারা এতটাই বিষণ্ণ হয়ে পড়েন যে, মনে হয়ে তারা যেন মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছেন।

সুহায়েল যখন আবু জানদাল-কে দেখতে পান, তিনি উঠে দাঁড়ান ও তার মুখে আঘাত করেন ও তার কলার চেপে ধরে বলেন, "মুহাম্মদ, এই লোকটি তোমার কাছে আসার আগেই আমরা চুক্তির সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি।" তিনি জবাবে বলেন, "তোমার কথা ঠিক।" তিনি তাকে তার কলার ধরে রূক্ষভাবে টেনে নিয়ে এসে কুরাইশদের কাছে ফেরত পাঠান।

তখন আবু জানদাল তার গলার প্রায় সমস্ত শক্তি দিয়ে তীক্ষ্ণ চিৎকার করা শুরু করে ও বলে, "হে মুসলিমরা, আমাকে কী মুশরিকদের (polytheists) কাছে ফেরত পাঠানো হবে, যাতে তারা আমাকে আমার ধর্ম থেকে বিচ্যুত করার প্ররোচনা দিতে পারে?" এই ঘটনা তাঁর অনুসারীদের বিষণ্ণতা আরও বাড়িয়ে দেয়।

আল্লাহর নবী বলেন, "হে আবু জানদাল, ধৈর্য ধারণ করো ও নিজেকে সংযত রাখো, কারণ আল্লাহ তোমাকে ও তোমার মত অসহায় লোকদের কষ্ট লাঘব করবে ও পলায়নের একটা উপায় প্রদান করবে। আমরা তাদের সাথে এক শান্তি-চুক্তিতে সম্মত হয়েছি ও আমরা ও তারা সেই চুক্তি সংরক্ষার জন্য আল্লাহকে আহ্বান করেছি; তাদের সঙ্গে আমরা অসাধু কারবার করতে পারি না।" ---

আল-ওয়াকিদির (৭৪৮-৮২২ খ্রিষ্টাব্দ) অতিরিক্ত বর্ণনা:

'আল্লাহর নবী তাঁর স্বপ্নে যা দেখেছিলেন, তা হলো এই যে, তিনি "কাবা ঘর"-এর ভেতরে প্রবেশ করেছেন, তাঁর মস্তকের চুল কামানো হয়েছে, "কাবা ঘরের" চাবিকাঠি গ্রহণ করেছেন ও আরাফাতের বিরতি স্থানে দাঁড়িয়ে আছেন। তাই, তিনি তাঁর অনুসারীদের উমরা পালনে অংশ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তারা তাদের প্রস্তুতি ত্বরান্বিত ও যাত্রা শুরু করেছিলেন। ----' [4]

'আল্লাহর নবীর অনুসারীরা এই চুক্তিটি দারুণ অপছন্দ করেন। তারা যে-কারণে কাবা শরীফ উদ্বোধন (Opening) নিশ্চিতরূপে সম্পন্ন করবেন বিশ্বাসটি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন, তা হলো, আল্লাহ নবীর স্বপ্ন দর্শন; যেখানে তিনি দেখেছিলেন যে, তিনি কাবা ঘরের ভেতরে প্রবেশ করেছেন, তাঁর মস্তকের চুল কামানো হয়েছে, তিনি কাবা ঘরের চাবিকাঠি গ্রহণ করেছেন ও আরাফাতে দাঁড়িয়ে আছেন। তাই, তারা যখন এই চুক্তিপত্রটি প্রত্যক্ষ করেন, তখন তারা প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মত হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। 

যখন লোকেরা চুক্তিপত্র সমাপ্ত হয়েছে বিবেচনা করে, কিন্তু চুক্তিপত্র লিপিবদ্ধ করা তখনও সম্পন্ন হয়নি, আবু জানদাল বিন সুহায়েল সেখানে আসে। সে তার শেকল খুলে মুক্ত হয়ে একটি তরবারি নিয়ে মক্কার নিম্নভাগ দিয়ে পায়ে হেঁটে পালিয়ে এসেছে। সেই নিম্নাঞ্চল থেকে যাত্রা করে যখন সে আল্লাহর নবীর কাছে আসে, তখন তিনি সুহায়েল-এর সাথে কথা বলছিলেন। সুহায়েল তার মাথা উঁচু করে ও দেখে, কে সেখানে এসেছে, সেখানে যে এসেছে, সে হলো - তারই পুত্র আবু জানদাল।  সুহায়েল তার কাছে উঠে আসেন ও গাছের এক কণ্টক-যুক্ত শাখা দিয়ে তার মুখে আঘাত করেন ও তার ঘাড় ধরে নিয়ে আসেন। (---Suhayl raised his head, and lo and behold, there was his son Abu Jandal.  Suhayl went up to him and struck his face with a thorny branch and took him by his throat. ---’ )

আবু জানদাল উচ্চ স্বরে চিৎকার করে বলে, "হে মুসলমানেরা, তোমরা কি আমাকে মুশরিকদের কাছে ফেরত পাঠাবে, যারা আমাকে আমার ধর্ম থেকে বিচ্যুত করতে প্রলুব্ধ করবে?" ইতিমধ্যেই সেখানে অবস্থিত মুসলমানদের আশঙ্কার চাপকে সে আরও বৃদ্ধি করে, তারা আবু জানদালের ঐ কথায় চিৎকার শুরু করে। [3]

আল-তাবারীর (৮৩৯-৯২৩ সাল) অতিরিক্ত বর্ণনা:

'আল্লাহর নবী যখন চুক্তিনামাটি লিখছিলেন - তিনি ও সুহায়েল বিন আমর- হঠাৎ সেখানে সুহায়েল বিন আমরের পুত্র আবু জানদাল বেড়ি পায়ে ছোট ছোট ধাপে হেঁটে হাজির হয়। তিনি আল্লাহর নবীর কাছে পালিয়ে এসেছিলেন। (‘When the Messenger of God was writing the document- he and Suhayl bin Amr- suddenly Abu Jandal, the son of Suhayl b Amr came walking with short steps in shackles. He had escaped to the Messenger of God. ---’) [2]

(অনুবাদ, টাইটেল ও [**] যোগ - লেখক।)

ইমাম বুখারী (৮১০-৮৭০ সাল) বর্ণনা:

এই প্রসঙ্গে ইমাম বুখারীর বর্ণনা (৩:৫০:৮৯১) মুহাম্মদ ইবনে ইশাক, আল-তাবারী ও আল-ওয়াকিদির ওপরে বর্ণিত বর্ণনারই অনুরূপ; পার্থক্য হলো এই যে, তিনি আবু জানদাল বিন সুহায়েল যে সুহায়েল বিন আমরেরই পুত্র সন্তান, এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের কোনো উল্লেখই করেননি! [5]

মুহাম্মদ তাঁর স্বরচিত ব্যক্তিমানস জীবনীগ্রন্থে যা উল্লেখ করেছেন:


৪৮:২৭- ‘আল্লাহ তাঁর রসূলকে সত্য স্বপ্ন দেখিয়েছেন। আল্লাহ চাহেন তো তোমরা অবশ্যই মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে নিরাপদে মস্তকমুন্ডিত অবস্থায় এবং কেশ কর্তিত অবস্থায়। তোমরা কাউকে ভয় করবে না। অতঃপর তিনি জানেন যা তোমরা জান না। এছাড়াও তিনি দিয়েছেন তোমাদেরকে একটি আসন্ন বিজয়’।            

>>> আদি উৎসের ওপরে বর্ণিত বর্ণনা ও মুহাম্মদের স্বরচিত ব্যক্তিমানস জীবনীগ্রন্থের উদ্ধৃতি মতে যে-বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট, তা হলো মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ যখন সুহায়েল বিন আমরের সাথে চুক্তি আলোচনায় রত ছিলেন ও মুহাম্মদের নির্দেশে তা লিপিবদ্ধ করা চলছিল, সেই সময়টিতে সেখানে অবস্থিত মুহাম্মদের প্রায় সমস্ত অনুসারীই মুহাম্মদের ওপর যে-কারণে ভরসা হারিয়েছিলেন, তা হলো, মুহাম্মদের ঘোষিত এক "স্বপ্ন দর্শন।" মক্কার উদ্দেশে তাঁর এই যাত্রা শুরুর আগে মুহাম্মদ তাঁর অনুসারীদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তিনি যে-স্বপ্নটি দেখেছেন, তা হলো এই যে, তিনি কাবা ঘরে সফলভাবে প্রবেশ করেছেন ও কাবা ঘরের চাবি তার হাতের মুঠোয়

বনি কুরাইজার নৃশংস গণহত্যার (পর্ব: ৮৭-৯৫) পর গত একটি বছরে মুহাম্মদের একের পর এক উপর্যুপরি সফলতায় উজ্জীবিত তাঁর অনুসারীরা নিশ্চিত ছিলেন যে, মুহাম্মদের এই "স্বপ্ন-দর্শন" অবশ্যই সত্য! কাবার চাবি মুহাম্মদের হাতে, যার সরল অর্থ হলো এই যে, তাঁরা এই যাত্রায় অবশ্যই মক্কা বিজয় করবেন, কিংবা ন্যূনতম পক্ষে বিনা বাধায় ওমরা পালন করতে পারবেন। কিন্তু মক্কা প্রবেশের আগেই যখন তাঁরা তাঁদের এই সুনিশ্চিত বিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র প্রত্যক্ষ করেন, তখন তাঁদের প্রায় সকলেই অত্যন্ত হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন ও তাঁর প্রতি বিশ্বাস হারিয়েছিলেন; যাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন মুহাম্মদের অত্যন্ত বিশ্বস্ত অনুসারী উমর ইবনে খাত্তাব ও। আদি উৎসের সকল ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় আর যে-বিষয়টি সুস্পষ্ট, তা হলো, আবু জানদাল সেখানে আসার আগেই মুহাম্মদের প্রায় সমস্ত অনুসারীই আর যে একটি বিশেষ কারণে অত্যন্ত হতাশ হয়ে পড়েছিলেন, তা হলো এই শর্তটি:

"যদি কোনো ব্যক্তি তার অভিভাবকদের অনুমতি ব্যতিরেকে মুহাম্মদের কাছে আসে তবে তিনি তাকে তাঁদের কাছে ফেরত দেবেন; কিন্তু মুহাম্মদের পক্ষের কোনো ব্যক্তি যদি কুরাইশদের কাছে আসে, তবে কুরাইশরা তাকে তাঁর কাছে ফেরত দেবেন না।"  

সুহায়েল বিন আমরের প্রস্তাবিত এই শর্তটি মুহাম্মদের প্রায় সকল অনুসারীই তাঁদের জন্য এক অত্যন্ত অবমাননাকর শর্ত বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। আর মুহাম্মদ যখন সুহায়েলের এই শর্তটিও মেনে নিয়েছিলেন, তখন তারা "প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মত হতাশাগ্রস্ত" হয়ে পড়েছিলেন। আর এই ঘটনাটিও ঘটেছিল সুহায়েল পুত্র আবু জানদাল সেখানে আসার আগেই।

এমনই এক পরিস্থিতিতে চুক্তি-আলোচনার ঐ স্থানটিতে আবু জানদাল বিন সুহায়েল এর আগমন ঘটে। মুহাম্মদ ইবনে ইশাক, ইমাম বুখারী ও আল-তাবারীর বর্ণনায় যা স্পষ্ট, তা হলো, আবু জানদাল মক্কা থেকে পালিয়ে "পায়ে বেড়ি পরিহিত অবস্থায়" হাঁটতে হাঁটতে মুহাম্মদের কাছে এসে হাজির হন। আর আল-ওয়াকিদির বর্ণনায় যা স্পষ্ট, তা হলো, আবু জানদাল তার "পায়ের বেড়ি খুলে মুক্ত হয়ে" একটি তরবারি নিয়ে মক্কার নিম্নভাগ দিয়ে পায়ে হেঁটে পালিয়ে এসেছেন।

হুদাইবিয়া স্থানটি  মক্কার হারাম শরিফ থেকে প্রায় ৯-১০ মাইল দূরে অবস্থিত। সম্পূর্ণ এলাকাটিই তখন ছিল কুরাইশ ও অন্যান্য মুশরিকদের (Polytheist) অধীন ও জনপদ সমৃদ্ধ। আর মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের এই আগমনে পরিস্থিতি ছিল টান টান উত্তেজনা ও সতর্ক সাবধানী। এমনই এক সময় ও পরিস্থিতিতে একজন মানুষ তার “পায়ের বেড়ি খুলে মুক্ত হয়ে” পায়ে হেঁটে অবিশ্বাসী জনপদের মানুষদের দৃষ্টি ও মনোযোগ এড়িয়ে ৯-১০ মাইল রাস্তা পায়ে হেঁটে হুদাইবিয়া সন্ধি স্থানে এসে হাজির হয়েছিলেন - এই বর্ণনাটির বিশ্বাসযোগ্যতা, লোকটি তার "পায়ে বেড়ি পরিহিত অবস্থায়” ঐ সমস্ত লোকদের মনোযোগ ও দৃষ্টি এড়িয়ে পায়ে হেঁটে সন্ধি স্থানে এসে হাজির হয়েছিলেন বর্ণনাটির চেয়ে অনেক অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য। কারণটি হলো, পায়ে বেড়ি পরিহিত অবস্থায় যদি কোন লোক রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায় তখন তা প্রতিটি পথিকেরই মনোযোগ ও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কিন্তু যদি কোনো লোক সাধারণ ভাবে অন্যান্য পথিকের মত পায়ে হেঁটে যায়, তবে তার প্রতি কোন পথিকেরই কোন বিশেষ মনোযোগ ও দৃষ্টি থাকে না। সময় পরিস্থিতি ও যুক্তি বিচারে, ওপরে বর্ণিত মুহাম্মদ ইবনে ইশাক, ইমাম বুখারী ও আল-তাবারীর বর্ণনার চেয়ে আল-ওয়াকিদির বর্ণনাটি অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য। অর্থাৎ আবু জানদাল মুক্ত হয়েই সেখানে এসেছিলেন।

আবু জানদাল বিন সুহায়েল তাঁর পায়ে বেড়ি পরিহিত অবস্থায় হাঁটতে হাঁটতে আসুন কিংবা পায়ের বেড়ি খুলে মুক্ত অবস্থায় হাঁটতে হাঁটতে এসে তাঁর পিতা সুহায়েল বিন আমর ও মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহর চুক্তি আলোচনা স্থানটিতে এসে হাজির হন, আদি উৎসের বর্ণনায় যে-বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট, তা হলো - আবু জানদাল যখন সেখানে এসে হাজির হন, তখন কোনো “চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি।" সেখানে চুক্তির শর্ত নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছিল ও মুহাম্মদের আদেশে আলী ইবনে আবু তালিব তা লিপিবদ্ধ করছিলেন। আদি উৎসের সকল ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় যা অত্যন্ত স্পষ্ট, তা হলো - পিতা সুহায়েল বিন আমর ছিলেন মুশরিক, আর তাঁর পুত্র এই আবু জানদাল ছিলেন ধর্মান্তরিত নব্য মুসলমান। এই ধর্মান্তরিত ছেলেকে পূর্ব ধর্মে ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি ও তাঁর পরিবারের লোকেরা তাঁদের এই ছেলেটিকে বিভিন্নভাবে প্রলুব্ধ করে আসছিলেন। তাই, আবু জানদালের উক্তি, "হে মুসলমানেরা, তোমরা কি আমাকে মুশরিকদের কাছে ফেরত পাঠাবে, যারা আমাকে আমার ধর্ম থেকে বিচ্যুত করতে প্রলুব্ধ করবে?" আর পুত্র আবু জানদাল যেন পালিয়ে মদিনায় 'হিজরত' করে মুহাম্মদের দলে যোগ দিতে না পারে, সেই কারণে পিতা সুহায়েল বিন আমর তাঁর এই সন্তানটিকে বাড়িতে আবদ্ধ করে রেখেছিলেন। সেই সন্তানটিই যখন পালিয়ে ঘটনাস্থলে এসে মুহাম্মদের দলে যোগ দেয়ার আর্জি করে, তখন সেখানে উপস্থিত পিতা তাঁর এই সন্তানটিকে নিয়ে কী করবেন? আদর করে মুহাম্মদের হাতে তুলে দেবেন? নাকি অবাধ্য সন্তানটির গালে কষে একটি চড় মেরে ঘাড় ধরে বাড়িতে পাঠিয়ে দেবেন? এমত পরিস্থিতিতে একজন পিতার যা কর্তব্য সুহায়েল বিন আমর তাইই করেছিলেন, “তিনি তাঁর এই সন্তানটিকে মারধর করে ঘাড় ধরে বাড়িতে ফেরত পাঠিয়েছিলেন!"

>> এই ঘটনাটিকে ইসলাম বিশ্বাসী পণ্ডিত ও অপণ্ডিতরা (অধিকাংশই না জেনে) মুসলমানদের প্রতি কুরাইশদের অকথ্য অত্যাচারের এক উদাহরণ হিসাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী যাবত বয়ান করে চলেছেন! এই ঘটনার বর্ণনায় তাঁরা যে-প্রতারণার আশ্রয় নেন, তা হলো আবু জানদাল ও সুহায়েলের “পিতা-পুত্র সম্পর্ক”! এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি জানা না থাকলে বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ। বিষয়টি আরও সহজভাবে বোঝার জন্য আজকের পৃথিবীর বর্তমান পরিস্থিতির সাথে এই সুহায়েল পরিবারের 'পারিবারিক দ্বন্দ্ব'-এর তুলনামূলক আলোচনা করা যেতে পারে।

ধরা যাক, মক্কা ও তার আশে পাশের সমস্ত জনপদ এখন মুশরিক (Polytheist) কুরাইশদের দখল ও পদচারণায় সমৃদ্ধ! আর ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ নামের এক লোকের নেতৃত্বে বর্তমান "ইসলামিক স্টেট (IS)" সংগঠনটি মদিনায় হেড-কোয়ার্টার স্থাপন করে কুরাইশ কাফেলায় হামলা সহ চতুর্দিকের বিভিন্ন স্থানে তাদের নৃশংস কার্যকলাপ পরিচালনা করছে [হুদাইবিয়া সন্ধি:প্রেক্ষাপট (পর্ব ১১১)]। সেই অবস্থায় মক্কার মুশরিক পরিবারের এক সন্তান ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে ও সে 'ইসলামিক স্টেট" দলটির সাথে যোগ দেয়ার জন্য 'হিজরত' করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে তার পিতা, পরিবার সদস্য ও অন্যান্য কুরাইশরা সেই সন্তানটিকে বিভিন্ন উপায়ে পূর্বধর্মে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন এবং সে যেন গোপনে পালিয়ে গিয়ে 'ইসলামিক স্টেট' সংগঠনটির সাথে যোগ দিতে না পারে, তার জন‌্য তাঁরা তাকে বাড়িতে আবদ্ধ করে রেখেছেন। অতঃপর পরবর্তী ঘটনাটি ওপরে বর্ণিত হুদাইবিয়া ঘটনাটির অনুরূপ। এমত পরিস্থিতিতে এই সন্তানের পিতার আচরণ যেমনটি হতে পারে, সুহায়েল বিন আমরের আচরণও ঠিক তেমনটিই ছিল!

ইসলাম বিশ্বাসী পণ্ডিত ও অপণ্ডিতরা গত ১৪০০ বছর যাবত আবু জানদাল বিন আমর-এর এই উপাখ্যানটিকে হুদাইবিয়া সন্ধির প্রতি মুহাম্মদ বিশ্বস্ততার এক অনন্য উদাহরণ হিসাবে বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে 'বয়ান' করে চলেছেন। তাঁদের দাবি এই যে: "হুদাইবিয়া সন্ধির' প্রতিটি শর্তের প্রতি মুহাম্মদ এতই বিশ্বস্ত ছিলেন যে, চুক্তি স্বাক্ষরের আগেই কুরাইশদের কাছে প্রতিশ্রুত শর্তের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আবু-জানদালকে তিনি কুরাইশদের কাছে ফেরত পাঠিয়েছিলেন!" তাঁদের এই দাবীটি এক্কেবারেই "নো সেন্স ননসেন্স!" (পর্ব ২২)! কী ভাবে?


যে কোনো চুক্তি বলবত হয়, তা দুই পক্ষের প্রতিনিধি মারফত স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে, যদি না কখন থেকে তা বলবত হবে তার সুনির্দিষ্ট তারিখ সেই চুক্তিপত্রে উল্লেখিত না থাকে।

১) হুদাইবিয়ায় যে-চুক্তিশর্তে মুহাম্মদ রাজী হয়েছিলেন, তা হলো, “কুরাইশদের কোন ব্যক্তি যদি মুহাম্মদের কাছে আসে তবে মুহাম্মদ তাকে তাঁদের কাছে ফেরত দেবেন" - যা তখনও স্বাক্ষরিত হয়নি। এই ঘটনাটির আগে কুরাইশ ও মুহাম্মদের সাথে এ ধরনের কোনো চুক্তিপত্র কখনোই সংঘটিত হয়নি, যেখানে উল্লেখিত আছে যে, "কুরাইশদের কোন ব্যক্তি যদি মুহাম্মদের কাছে আসে তবে মুহাম্মদ তাকে তাঁদের কাছে ফেরত দেবেন না!"

Ø  যেখানে এ ধরনের কোনো চুক্তি এই ঘটনার আগে কখনোই সংঘটিত হয়নি, সেখানে মুহাম্মদ কীসের ভিত্তিতে দাবি করতে পারেন যে, তিনি আবু-জানদাল-কে তাঁর পিতার কাছে ফেরত দেবেন না? কোন অধিকারে? ছেলেটি আবদার ধরেছে তাই? পিতা-মাতা ও ছেলেটির পরিবার কি তা হতে দিতে পারেন? আবু জানদাল-কে তার পরিবারের কাছে ফেরত না দেয়ার প্রশ্ন একেবারেই অবান্তর!

Ø  আরও সহজভাবে এই বিষয়টি বুঝতে হলে ওপরে বর্ণিত 'ইসলামিক স্টেট' উদাহরণটি আবারও ব্যবহার করা যেতে পারে। "--ছেলেটি বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে তার পিতার সামনেই 'ইসলামিক স্টেট' প্রধানের কাছে বায়না ধরেছে যে, সে তার দলে যোগ দিতে চায়।" ছেলেটি বায়না ধরেছে বলেই 'ইসলামিক স্টেট' প্রধান তাকে তার পরিবার ও অন্যান্য স্বজনদের কাছ থেকে নিয়ে আসার কোনো ন্যায়সঙ্গত অধিকার রাখেন না।

২) শুধু তাইই নয়, যদি শর্তটি তার বিপরীতটিও হতো; অর্থাৎ "কুরাইশদের কোন ব্যক্তি যদি মুহাম্মদের কাছে আসে তবে মুহাম্মদ তাকে তাঁদের কাছে ফেরত দেবেন না" - যা তখনও স্বাক্ষরিত হয়নি,

Ø  তথাপি তা স্বাক্ষরিত না হওয়ার কারণে মুহাম্মদের কোনো বৈধ (Legal) অধিকারই নেই, যার মাধ্যমে তিনি আবু জানদাল-কে মদিনায় নিয়ে যাওয়ার দাবি উত্থাপন করতে পারেন। কারণ যে কোন চুক্তি বলবত হয় তা দুই পক্ষের প্রতিনিধি মারফত স্বাক্ষরিত হওয়ার পর, তার আগে নয়। সেক্ষেত্রেও, আবু জানদাল-কে তাঁর পরিবারের কাছে ফেরত না দেয়ার প্রশ্ন অবান্তর!

এক কথায়, হুদাইবিয়া সন্ধি পরিস্থিতিতে মুহাম্মদ কোনোভাবেই আবু জানদাল-কে মদিনায় নিয়ে যেতে পারেন না।

>> আদি উৎসের ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় যা সুস্পষ্ট, তা হলো: আবু জানদাল ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন ও তার পরিবার সদস্যরা তাদের এই সন্তানটিকে শারীরিক মারধরসহ বিভিন্নভাবে পূর্ব ধর্মে ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা ও সে যেন পালিয়ে (হিজরত) মুহাম্মদ অনুসারীদের সাথে যোগ দিতে না পারে তার চেষ্টা করে আসছিলেন। কুরাইশরা সংঘবদ্ধভাবে নব্য মুসলমানদের ওপর যথেচ্ছ অকথ্য অত্যাচার চালাতেন ও তাদেরকে জোরপূর্বক মক্কা থেকে বিতাড়িত করেছিলেন, এই দাবির যে কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই 'আবু-জানদাল' এর এই ঘটনাটি তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই চিত্র মুহাম্মদ (কুরান) ও তাঁর অনুসারীদের দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত! কুরাইশরা তাঁদের ধর্মান্তরিত সন্তানদের জোরপূর্বক ধরে রাখার চেষ্টা করছেন, বিতাড়িত করতে নয়। আর মুহাম্মদ তাঁদের ধর্মান্তরিত সন্তানদের উপদেশ দিচ্ছেন, "আল্লাহ তোমাকে পলায়নের একটা উপায় প্রদান করবে।"

মুহাম্মদের রচিত কুরান ও আদি উৎসে মুসলিম ঐতিহাসিকদেরই বর্ণিত বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের তথ্য-উপাত্তের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে আমরা প্রায় নিশ্চিতরূপেই জানতে পারি যে, কুরাইশরা নব্য মুসলমানদের মক্কা থেকে বিতাড়িত করেননি, এমনকি মুহাম্মদকেও নয়! উদ্দেশ্য সাধনের প্রয়োজনে বিভিন্ন প্রলোভন ও হুমকির মাধ্যমে মুহাম্মদ নিজেই তাঁর অনুসারীদের তাড়িয়ে নিয়ে এসেছিলেন। এ বিষয়ের আংশিক আলোচনা "তারা বলেঃ এ ভূখণ্ডে আমরা ছিলাম অসহায়! 'শয়তানের বানী'- প্রাপক ও প্রচারক মুহাম্মদ!" পর্বে (পর্ব: ৪১-৪২) করা হয়েছে, বিস্তারিত আলোচনা 'আইয়্যামে জাহিলিয়াত ও হিজরত' অধ্যায়ে করা হবে।

(চলবে)

[কুরানের উদ্ধৃতিগুলো সৌদি আরবের বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ (হারাম শরীফের খাদেম) কর্তৃক বিতরণকৃত বাংলা তরজমা থেকে নেয়া, অনুবাদে ত্রুটি-বিচ্যুতির দায় অনুবাদকারীর। কুরানের ছয়জন বিশিষ্ট অনুবাদকারীর পাশাপাশি অনুবাদ এখানে] 

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] “সিরাত রসুল আল্লাহ”- লেখক: মুহাম্মদ ইবনে ইশাক (৭০৪-৭৬৮ খৃষ্টাব্দ), সম্পাদনা: ইবনে হিশাম (মৃত্যু ৮৩৩ খৃষ্টাব্দ), ইংরেজি অনুবাদ:  A. GUILLAUME, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, করাচী, ১৯৫৫, ISBN 0-19-636033-1, পৃষ্ঠা ৫০৫

[2] “তারিক আল রসুল ওয়াল মুলুক”- লেখক: আল-তাবারী (৮৩৮-৯২৩ খৃষ্টাব্দ), ভলুউম ৮, ইংরেজী অনুবাদ: Michael Fishbein, University of California, Los Angeles, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৮৭, ISBN 0-7914-3150—9 (pbk), পৃষ্ঠা (Leiden) ১৫৪৭-১৫৪৮

[3] অনুরূপ বর্ণনা (Parallel): “কিতাব আল-মাগাজি”- লেখক:  আল-ওয়াকিদি (৭৪৮-৮২২ খৃষ্টাব্দ), ed. Marsden Jones, লন্ডন ১৯৬৬; ভলুম ২, পৃষ্ঠা ৬০৭-৬০৯ http://www.britannica.com/biography/al-Waqidi
ইংরেজি অনুবাদ: Rizwi Faizer, Amal Ismail and Abdul Kader Tayob; ISBN: 978-0-415-86485-5 (pbk); পৃষ্ঠা ২৯৯-৩০০

[4] Ibid আল-ওয়াকিদি, ভলুম ২, পৃষ্ঠা ৫৭২; ইংরেজি অনুবাদ - পৃষ্ঠা ২৮১
[5] সহি বুখারী: ভলিউম ৩, বই ৫০, নম্বর ৮৯১
অনেক বড় হাদিস, এই পর্বের প্রাসঙ্গিক অংশ:
‘---- Then Suhail said, "We also stipulate that you should return to us whoever comes to you from us, even if he embraced your religion." The Muslims said, "Glorified be Allah! How will such a person be returned to the pagans after he has become a Muslim? While they were in this state Abu- Jandal bin Suhail bin 'Amr came from the valley of Mecca staggering with his fetters and fell down amongst the Muslims. Suhail said, "O Muhammad! This is the very first term with which we make peace with you, i.e. you shall return Abu Jandal to me." The Prophet said, "The peace treaty has not been written yet." Suhail said, "I will never allow you to keep him." The Prophet said, "Yes, do." He said, "I won't do.: Mikraz said, "We allow you (to keep him)." Abu Jandal said, "O Muslims! Will I be returned to the pagans though I have come as a Muslim? Don't you see how much I have suffered?"Abu Jandal had been tortured severely for the Cause of Allah.’----