১৮ মার্চ, ২০১৬

লওহে মাহফুজের সন্ধানে: ক্যাটম্যান সিরিজ - ১৬

লিখেছেন ক্যাটম্যান

মুক্তচিন্তা চর্চা, প্রচার ও প্রসারের কারণে ধর্মান্ধ মৌলবাদী জঙ্গীগোষ্ঠীর নৃশংস হামলার শিকার হুমায়ুন আজাদ, রাজিব হায়দার, অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, অনন্ত বিজয় দাশ, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয় ও ফয়সল আরেফিন দীপন সহ নিহত ও আহত সকল মুক্তচিন্তকের স্মরণে এই লেখাটি অপরিমেয় ভালোবাসার স্মারক স্বরূপ নিবেদন করছি।


তাই ঈশ্বর প্রদর্শনে বারবার ব্যর্থ মূসা তার পরিকল্পিত ঈশ্বরের ধারণায় আমূল পরিবর্তন আনয়ন করেন। ইস্রায়েলের জনগণকে দেখানোর জন্য মূসা এতদিন যে-পরমেশ্বরকে বিভ্রান্তিকর কৌশলে হাজির করতেন, প্রকৃতপক্ষে তেমন ঈশ্বরের অনস্তিত্ব হেতু তারা তাকে দেখতে ব্যর্থ হলেও তাদের মধ্যে এমন ধারণা প্রচলিত ছিল যে, তারা তাকে না দেখলেও স্বীয় পরমেশ্বরকে মূসা নিশ্চয়ই দেখে থাকবেন। কারণ ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি, নিজ জনগণের উদ্দেশ্যে মূসা একাধিকবার স্বীয় পরমেশ্বরকে দেখানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। যদি মূসা স্বীয় পরমেশ্বরকে না দেখে থাকেন, তাহলে তিনি কোন আত্মবিশ্বাস থেকে সেই পরমেশ্বরকে বারবার দেখানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন? 

মূলত তিনি ভেবেছিলেন, হয়ত স্বীয় পরিকল্পিত পরমেশ্বরকে প্রদর্শনের জন্য তার গৃহীত সুকৌশলী উদ্যোগই যথেষ্ট। কিন্তু তিনি যখন দেখলেন, তার গৃহীত উদ্যোগ সাফল্যের মুখ দেখছে না, বরং তার প্রতারণার জাল ছিন্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছে, তখন তিনি সেই উদ্যোগের রাশ টেনে ধরলেন। পুনরায় ঈশ্বর প্রদর্শনের আর কোনও উদ্যোগ গ্রহণ না করে ইস্রায়েলের জনগণের মাঝে এই বার্তা পৌঁছানোর চেষ্টা করলেন, যে-পরমেশ্বরকে এতদিন তারা প্রত্যক্ষরূপে দেখার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন, আদতে সেই পরমেশ্বরকে মূসা নিজেই কখনও দেখেন নি। কারণ মূসার পরমেশ্বরকে কোনও মানুষের পক্ষে দেখা সম্ভবপর নয়। তাই তাকে প্রত্যক্ষরূপে দেখার ও দেখানোর সামগ্রিক প্রয়াস ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে, এটাই স্বাভাবিক। বিধায় মূসার পরমেশ্বরকে প্রত্যক্ষরূপে দেখতে না পেরে ইস্রায়েলের জনগণ যেন হতাশ হয়ে মূসা ও তার পরমশ্বরের প্রতি আস্থা হারিয়ে না ফেলেন এবং সেই প্রেক্ষাপটে তারা যেন মূসার পরমেশ্বরের বিরুদ্ধে কোনোরকম বিদ্রোহাত্মক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত না হন। আর মূসা নিজেই কখনও স্বীয় পরমেশ্বরকে দেখেননি, এই মর্মে বাইবেলে যা বর্ণনা করা হয়েছে, তা নিম্নরূপ:
তিনি তাঁকে বললেন, 'দোহাই তোমার, আমাকে তোমার গৌরব দেখাও!' তিনি বললেন, 'আমি এমনটি করব, যেন আমার সমস্ত মঙ্গলময়তা তোমার সামনে দিয়ে যায়, এবং তোমার সামনে আমার আপন নাম ঘোষণা করব: প্রভু! আমি যাকে দয়া করতে চাই, তাকে দয়া করব; আর যার প্রতি করুণা দেখাতে চাই, তার প্রতি করুণা দেখাব।' তিনি আরও বললেন, 'তুমি কিন্তু আমার মুখমণ্ডল দেখতে পাবে না, কারণ কোন মানুষ আমাকে দেখলে জীবিত থাকতে পারে না।' প্রভু বলে চললেন, 'দেখ, আমার কাছাকাছি এই এক জায়গা আছে; তুমি ওই শৈলের উপরে দাঁড়াও; আর আমার গৌরব যখন তোমার সামনে দিয়ে যাবে, আমি তোমাকে শৈলের এক ফাটলে রাখব ও আমার যাওয়াটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমার হাত দিয়ে তোমাকে ঢেকে রাখব। পরে আমি হাত উঠিয়ে নেব, আর তুমি আমার পিঠ দেখতে পাবে। কিন্তু আমার মুখমণ্ডল, না, তা দেখা যাবে না।' [যাত্রাপুস্তক ৩৩:১৮-২৩]
পরমেশ্বরের ওপরোক্ত নির্দেশের অব্যবহিত পরেই যা ঘটল, তার বাইবেলীয় বর্ণনা নিম্নরূপ:
তখন প্রভু মেঘে নেমে এসে সেইখানে তাঁর সঙ্গে দাঁড়িয়ে 'প্রভু' নাম ঘোষণা করলেন। প্রভু তাঁর সামনে দিয়ে যেতে যেতে ঘোষণা করলেন: 'প্রভু, প্রভু, স্নেহশীল, দয়াবান ঈশ্বর; ক্রোধে ধীর, কৃপা ও বিশ্বস্ততায় ধনবান। তিনি সহস্র সহস্র পুরুষ ধরে কৃপা রক্ষা করেন; অপরাধ, অন্যায় ও পাপ ক্ষমা করেন; কিন্তু শাস্তি থেকে আদৌ রেহাই দেন না; পিতার শঠতার দণ্ড সন্তানদের ও সন্তানদের সন্তানসন্ততিদের উপরে ডেকে আনেন তাদের তৃতীয় ও চতুর্থ পুরুষ পর্যন্ত। মোশী সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে মাথা নত করে প্রণিপাত করলেন; বললেন, 'প্রভু, আমি যদি সত্যিই তোমার দৃষ্টিতে অনুগ্রহ পেয়ে থাকি, দোহাই তোমার, প্রভু, আমাদের মাঝখানে থেকে আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চল। হ্যাঁ, এরা তো শক্তগ্রীব এক জাতি; কিন্তু তুমি আমাদের শঠতা ও পাপ মোচন কর: আমাদের তোমার আপন উত্তরাধিকার-রূপে গ্রহণ কর।' [যাত্রাপুস্তক ৩৪:৫-৯]
মূসার পরমেশ্বর দর্শনের ওপরোক্ত বর্ণনাসমূহ এতটাই অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিকর যে, কোনোভাবেই স্পষ্টত বোঝার উপায় নেই, পরমেশ্বর মূসাকে মূলত কোন প্রক্রিয়ায় দর্শন দান করেছিলেন।

তবে উক্ত বর্ণনাসমূহে একটি বিষয় পরিষ্কার, মূসা তার পরমেশ্বরকে কখনও নিজ চর্মচক্ষে দেখেননি। কারণ তিনি বাইবেলে পরমেশ্বরের যে-অবাস্তব গল্প ফেঁদে বসেছেন, সেই পরমেশ্বরের আদৌ কোনও অস্তিত্ব নেই। তাই তাকে দেখার প্রশ্ন অবান্তর। 

(চলবে)