২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬

লওহে মাহফুজের সন্ধানে: ক্যাটম্যান সিরিজ - ১৪

লিখেছেন ক্যাটম্যান

মুক্তচিন্তা চর্চা, প্রচার ও প্রসারের কারণে ধর্মান্ধ মৌলবাদী জঙ্গীগোষ্ঠীর নৃশংস হামলার শিকার হুমায়ুন আজাদ, রাজিব হায়দার, অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, অনন্ত বিজয় দাশ, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয় ও ফয়সল আরেফিন দীপন সহ নিহত ও আহত সকল মুক্তচিন্তকের স্মরণে এই লেখাটি অপরিমেয় ভালোবাসার স্মারক স্বরূপ নিবেদন করছি।


এর দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, মূসা তার পরিকল্পিত পরমেশ্বরের আজ্ঞাবহ দাস নন; বরং মূসার পরিকল্পিত পরমেশ্বর স্বয়ং মূসার আজ্ঞাবহ দাস। তাই মূসার আজ্ঞাবহ দাসসুলভ পরমেশ্বর দশ আজ্ঞাবিশিষ্ট প্রস্তরফলক ভেঙে ফেলার অপরাধে মূসাকে জবাবদিহির সম্মুখীন না করে বরং মূসার উদ্দেশ্যের অনুকূলে ভেঙে ফেলা দশ আজ্ঞাবিশিষ্ট প্রথম প্রস্তরফলক দু'টির অনুরূপ আরও দু'টি প্রস্তরফলক প্রদানের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। কারণ সেই প্রতিশ্রুতি স্বয়ং মূসা তার পরিকল্পিত পরমেশ্বরের জবানিতে আরোপ করেছেন। আর স্বীয় পরমেশ্বরের প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষিতে মূসা পর্বতচূড়ায় আরোহণ করে দশ আজ্ঞা বিশিষ্ট প্রস্তরফলক দু'টির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রণয়নকালে একেশ্বরবাদের গুরুত্ব এবং মূর্তিপূজার কুফল বিবেচনায় যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় আজ্ঞা প্রণয়ন করেন। যা নিম্নরূপ:
প্রথম আজ্ঞা: “তখন পরমেশ্বর এই সমস্ত কথা বললেন, 'আমি তোমার পরমেশ্বর প্রভু, যিনি মিশর দেশ থেকে, দাসত্ব-অবস্থা থেকে তোমাকে বের করে এনেছেন: আমার প্রতিপক্ষ কোন দেবতা যেন তোমার না থাকে!" [যাত্রাপুস্তক ২০:১-৩]
দ্বিতীয় আজ্ঞা: “তুমি তোমার জন্য খোদাই করা কোন প্রতিমূর্তি তৈরি করবে না; উপরে সেই আকাশে, নিচে এই পৃথিবীতে ও পৃথিবীর নিচে জলরাশির মধ্যে যা কিছু রয়েছে, তার সাদৃশ্যেও কোন কিছুই তৈরি করবে না। তুমি তেমন বস্তুগুলির উদ্দেশে প্রণিপাত করবে না, সেগুলির সেবাও করবে না; কেননা আমি, তোমার পরমেশ্বর প্রভু যিনি, আমি এমন ঈশ্বর, যিনি কোন প্রতিপক্ষকে সহ্য করেন না; যারা আমাকে ঘৃণা করে, তাদের বেলায় আমি পিতার শঠতার দন্ড সন্তানদের উপরে ডেকে আনি - তাদের তৃতীয় ও চতুর্থ পুরুষ পর্যন্ত; কিন্তু যারা আমাকে ভালবাসে ও আমার আজ্ঞাগুলি পালন করে, আমি সহস্র পুরুষ পর্যন্তই তাদের প্রতি কৃপা দেখাই।" [যাত্রাপুস্তক ২০:৪-৬]
ওপরোক্ত আজ্ঞা দু'টি মূসার পরিকল্পিত পরমেশ্বরের পক্ষে রক্ষাকবচের ভূমিকা পালন করবে, এই বিবেচনায় মূসা তা প্রণয়ন করেন।

মূসার নেতৃত্বে মিশর থেকে বের হয়ে আসার পরে সিনাই প্রান্তরে মূসার দীর্ঘকালব্যাপী অনুপস্থিতি ইস্রায়েলের জনগণের মাঝে নেতৃত্বশূন্যতার সৃষ্টি করে। তারা ভেবেছিল, পরমেশ্বরের সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে মূসা হয়ত মারা গিয়েছেন। যে-কারণে মরুভূমির প্রতিকূল পরিবেশে নেতৃত্বশূন্যতা ও হতাশাবোধ থেকে ইস্রায়েলের জনগণ নিজেদের নেতৃত্বশূন্যতা পূরণ ও হতাশা দূরীকরণের লক্ষ্যে মূসা ও তার পরিকল্পিত পরমেশ্বরের বিকল্প হিসাবে একটি বাছুরের মূর্তি নির্মাণ করে। এই ঘটনা দৃষ্টে মূসা উপলব্ধি করেন, মিশরে অতি চর্চিত পৌত্তলিক সংস্কৃতির মাঝে দীর্ঘকাল অবস্থান করায় পৌত্তলিক সংস্কৃতির প্রতি আবিষ্ট ইস্রায়েলের জনগণ মিশর থেকে বেরিয়ে আসার সময় মিশরীয়দের সাংস্কৃতিক দূষণ ও দুর্বলতাসমূহও বহন করে এনেছে বিধায় তাদের পক্ষে যখন-তখন পৌত্তলিকতার প্রতি ধাবিত হওয়া কোনও অস্বাভাবিক বিষয় নয়। স্বভাবতই তারা যখন বাস্তবিক কোনও সমস্যায় নিপতিত হয়, তখন তা থেকে উদ্ধার পেতে তারা অতিপ্রাকৃত কোনও সত্তার শরণাপন্ন হতে চায়। আর সেই চাহিদা পূরণে মূসা তার কল্পিত পরমেশ্বরকে পুঁজি করে ইস্রায়েলের জনগণকে যে-অতিপ্রাকৃত সত্তার যোগান দিয়েছেন, হয়ত তা তাদের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট ছিল না। 

কারণ মূসার যোগানকৃত পরমেশ্বরকে ইস্রায়েলের জনগণ কখনও চাক্ষুষরূপে দেখেননি। তবে পরমেশ্বরকে চাক্ষুষরূপে দেখার সুযোগ তাদের যেন মেলে, সে-লক্ষ্যে মূসা একাধিকবার ঈশ্বর প্রদর্শনের বিভ্রান্তিকর নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন; যা ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি।

মূসা তার পরিকল্পিত পরমেশ্বরকে প্রদর্শনের জন্য যে-সব উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, তার সেই প্রতিটি উদ্যোগ ছিল সহজসাধ্য, তবে একইসাথে চরম কৌশলপূর্ণ। কারণ বাস্তবিক পরমেশ্বরকে প্রদর্শনের জন্য কোনোরকম কৌশলের আবশ্যকতা না থাকলেও পরিকল্পিত পরমেশ্বরকে বাস্তব আঙ্গিকে প্রদর্শনের জন্য নানাবিধ কৌশল অবলম্বনের আবশ্যকতা রয়েছে। সেই আবশ্যকতা থেকেই মূসা যেমন কৌশল প্রয়োগ করেছেন মঞ্চসজ্জায়, তেমনি কৌশল প্রয়োগ করেছেন দর্শক নির্বাচন ও দর্শক বিন্যাসে। আর তাই মূসার প্রয়োগকৃত সেই কৌশলসমূহ গভীরভাবে বোঝার জন্য সে-বিষয়ে আরও একটু চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক।

(চলবে)