২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬

হুদাইবিয়া সন্ধি - ২: তাঁরা ছিলেন সশস্ত্র!: কুরানে বিগ্যান (পর্ব- ১১২): ত্রাস, হত্যা ও হামলার আদেশ – ছিয়াশি

লিখেছেন গোলাপ

পর্ব ১ > পর্ব ২ > পর্ব ৩ > পর্ব ৪ > পর্ব ৫ > পর্ব ৬ > পর্ব ৭ > পর্ব ৮ > পর্ব ৯ > পর্ব ১০ > পর্ব ১১ > পর্ব ১২ > পর্ব ১৩ > পর্ব ১৪ > পর্ব ১৫ > পর্ব ১৬ > পর্ব ১৭ > পর্ব ১৮ > পর্ব ১৯ > পর্ব ২০ > পর্ব ২১ > পর্ব ২২ > পর্ব ২৩ > পর্ব ২৪ > পর্ব ২৫ > পর্ব ২৬ > পর্ব ২৭ > পর্ব ২৮ > পর্ব ২৯ > পর্ব ৩০ > পর্ব ৩১ > পর্ব ৩২ > পর্ব ৩৩ > পর্ব ৩৪ > পর্ব ৩৫ > পর্ব ৩৬ > পর্ব ৩৭ > পর্ব ৩৮ > পর্ব ৩৯ পর্ব ৪০ > পর্ব ৪১ পর্ব ৪২ > পর্ব ৪৩ > পর্ব ৪৪ > পর্ব ৪৫ > পর্ব ৪৬ > পর্ব ৪৭ > পর্ব ৪৮ > পর্ব ৪৯ > পর্ব ৫০ > পর্ব ৫১ > পর্ব ৫২ > পর্ব ৫৩ > পর্ব ৫৪ > পর্ব ৫৫ > পর্ব ৫৬ > পর্ব ৫৭ > পর্ব ৫৮ > পর্ব ৫৯ > পর্ব ৬০ > পর্ব ৬১ > পর্ব ৬২ > পর্ব ৬৩ > পর্ব ৬৪ > পর্ব ৬৫ > পর্ব ৬৬ > পর্ব ৬৭ > পর্ব ৬৮ > পর্ব ৬৯ > পর্ব ৭০ > পর্ব ৭১ > পর্ব ৭২ > পর্ব ৭৩ > পর্ব ৭৪ > পর্ব ৭৫ > পর্ব ৭৬ > পর্ব ৭৭ > পর্ব ৭৮ > পর্ব ৭৯ > পর্ব ৮০ > পর্ব ৮১ > পর্ব ৮২ > পর্ব ৮৩ > পর্ব ৮৪ > পর্ব ৮৫ > পর্ব ৮৬ > পর্ব ৮৭ > পর্ব ৮৮ > পর্ব ৮৯ > পর্ব ৯০ > পর্ব ৯১ > পর্ব ৯২ > পর্ব ৯৩ > পর্ব ৯৪ > পর্ব ৯৫ > পর্ব ৯৬ > পর্ব ৯৭ > পর্ব ৯৮ > পর্ব ৯৯ > পর্ব ১০০ > পর্ব ১০১ > পর্ব ১০২ > পর্ব ১০৩ > পর্ব ১০৪ > পর্ব ১০৫ > পর্ব ১০৬ > পর্ব ১০৭ > পর্ব ১০৮ > পর্ব ১০৯ > পর্ব ১১০ > পর্ব ১১১

"যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।"

হুদাইবিয়া সন্ধির মাত্র তিন মাস আগে বনি আল-মুসতালিক গোত্রের ওপর এবং দু'মাস আগে 'বানু ফাযারাহ' গোত্রের ওপর আগ্রাসী হামলা, লুণ্ঠন, উম্মে কিরফা-সহ অন্যান্য লোকদের অমানুষিক নৃশংসতায় খুন ও মুক্ত মানুষদের জোরপূর্বক ধরে নিয়ে এসে দাস ও যৌনদাসী-রূপে রূপান্তরিত ও ভাগাভাগি সম্পন্ন করার পর, হিজরি ৬ সালের জিলকদ মাসে (মার্চ, ৬২৮ সাল) স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর ৭০০-১৪০০ জন অনুসারীদের সঙ্গে নিয়ে কী বার্তা ঘোষণা দিয়ে মক্কার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিলেনে, তার আলোচনা গত পর্বে করা হয়েছে।

হুদাইবিয়া সন্ধির প্রাক্কালে ঠিক কত জন অনুসারী মুহাম্মদের সঙ্গে ছিলেন, সে বিষয়ে আদি মুসলিম ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের বর্ণিত (৭০০-১৪০০ জন ) উৎসটি ছাড়াও আল-তাবারী তাঁর "তারিক আল রসুল ওয়াল মুলুক" গ্রন্থে আরও পাঁচটি আদি উৎসের রেফারেন্স যোগ করেছেন [1]। সেই উৎসগুলোর তিনটি-তে তিনি এই সংখ্যা ১৪০০ জন, মুহাম্মদ ইবনে সা’দের (৭৮৪-৮৪৫ খ্রিষ্টাব্দ) বর্ণনায় তা ১৫২৫ জন ও অন্য একটি উৎসের বর্ণনায় তা ১৩০০-১৯০০ জন বলে উল্লেখ করেছেন [2]। এ ছাড়াও ইমাম বুখারী (৮১০-৮৭০ সাল) তাঁর হাদিস গ্রন্থে এই সংখ্যা ১৩০০-১৪০০ জন, আর আল-ওয়াকিদি (৭৪৮-৮২২ খ্রিষ্টাব্দ) তাঁর 'কিতাব আল-মাগাজি' গ্রন্থে এই সংখ্যা ১৪০০-১৬০০ জন  উল্লেখ করেছেন। [3] [4]

আদি উৎসের অধিকাংশ ঐতিহাসিকদের মতে, হুদাইবিয়া সন্ধির প্রাক্কালে খালিদ বিন আল-ওয়ালিদ তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি ও তিনি ছিলেন মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের সক্রিয় বাধাদানকারী কুরাইশ দলের অশ্বারোহী সদস্যদের একজন। কুরাইশরা তাঁকে কিছু অশ্বারোহী সহ 'কুরাল-ঘামিম' নামক স্থানে প্রেরণ করেন (পর্ব: ৯৬)। কিন্তু অন্য এক আদি উৎসের উদ্ধৃতি দিয়ে আল-তাবারী এই তথ্যও বর্ণনা করেছেন যে, উক্ত উৎস (নিম্নে বর্ণিত) মতে হুদাইবিয়া সন্ধির পূর্বেই খালিদ বিন আল-ওয়ালিদ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, মদিনায় হিজরত করেছিলেন ও এই সন্ধির প্রাক্কালে তিনি কুরাইশদের বিরুদ্ধে মুহাম্মদকে সাহায্য করেছিলেন।

জগতের সকল ইসলাম বিশ্বাসী পণ্ডিত ও অপণ্ডিতরা হুদাইবিয়া সন্ধির ইতিহাস বয়ানকালে যে-তথ্যটি অতি উচ্চস্বরে প্রচার করে থাকেন, তা হলো - এই যাত্রায় মুহাম্মদ তীর্থযাত্রীর পোশাক পরিধান করে ওমরা করার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন ও কুরবানির জন্য এক দল উটের পাল সঙ্গে নিয়েছিলেন। তাই এই তথ্যটি ইসলাম বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী জনগণের অনেকেই অবগত আছেন। কিন্তু যে-অতি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি অধিকাংশ লোকেরই অজানা তা হলো, ইসলামের ইতিহাসের আদি উৎসে (Primary source of history of Islam) এই তথ্যটিও বর্ণিত আছে যে, এই যাত্রায় মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা তাদের মজুদ অস্ত্রশস্ত্র ও যুদ্ধ-ঘোড়া সঙ্গে নিয়েছিলেন, তারা ছিলেন সশস্ত্র!

আল-তাবারী (৮৩৮-৯২৩ খৃষ্টাব্দ) বর্ণনা: [5]

'ইবনে হুমাযেদ < ইয়াকুদ বিন ইয়াকুদ বিন কুম্মি [6] <জাফর (ইবনে আবি আল-মুঘিরাহ) < ইবনে আবযা হইতে বর্ণিত:

যখন আল্লাহর নবী কুরবানির জন্য উটগুলো নিয়ে ধু আল-হুলায়েফা নামক স্থানে পৌঁছান, তখন উমর তাঁকে বলেন, "আল্লাহর নবী, আপনি কি অস্ত্রশস্ত্র ও ঘোড়াগুলো সঙ্গে না নিয়েই এমন লোকদের এলাকায় গমন করবেন, যারা আপনার সঙ্গে যুদ্ধে জড়িত?" তাই আল্লাহর নবী তাদেরকে মদিনায় প্রেরণ করেন ও সেখান থেকে সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র ও ঘোড়াগুলো নিয়ে আসেন, কিছুই অবশিষ্ট রাখেন না। যখন তিনি মক্কার নিকটবর্তী হন, তারা তাঁকে সেখানে প্রবেশে বাধা প্রদান করেন; তাই তিনি মিনার পথে যাত্রা করেন ও সেখানে সাময়িক যাত্রা বিরতি দেন। তাঁর গুপ্তচর তাঁর কাছে খবর নিয়ে আসে, "ইকরিমা বিন আবু জেহেল ৫০০ লোক সঙ্গে নিয়ে আপনার বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে।" [7] [8]

আল্লাহর নবী খালিদ বিন ওয়ালিদ-কে বলেন, "খালিদ, তোমার চাচার পুত্র অশ্বারোহীদের সঙ্গে নিয়ে তোমার বিরুদ্ধে এসেছে।"

খালিদ বলে, "আমি হলাম আল্লাহ ও তার রসুলের তরবারি! আল্লাহর নবী, আমাকে হুকুম করুন, যেমনটি আপনি চান।" - ঐ দিন সে ‘আল্লাহর তরবারি’ উপাধিটি পেয়েছিল।

তিনি অশ্বারোহী দলের অধিনায়ক রূপে তাকে প্রেরণ করেন ও সে এক গভীর গিরিখাত (canyon) এর মধ্যে ইকরিমার সম্মুখীন হয় ও তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে, এইভাবে সে ইকরিমা-কে তাড়িয়ে মক্কার দেয়াল ঘেরা বাগানে ফেরত পাঠায়। ইকরিমা আবার ফিরে আসে ও খালিদ তাকে বাধা দেয় ও তাড়িয়ে মক্কার দেয়াল ঘেরা বাগানে ফেরত পাঠায়। ইকরিমা তৃতীয়বার ফিরে আসে, খালিদ তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে মক্কার দেয়াল ঘেরা বাগানে ফেরত পাঠায়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ নাজিল করে, "তিনি মক্কা শহরে তাদের হাত তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাত তাদের থেকে নিবারিত করেছেন তাদের উপর তোমাদেরকে বিজয়ী করার পর" - থেকে "যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দিতাম” উক্তিটি পর্যন্ত।" (কুরান: ৪৮:২৪-২৫

[৪৮:২৪-২৫ - "তিনি মক্কা শহরে তাদের হাত তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাত তাদের থেকে নিবারিত করেছেন তাদের উপর তোমাদেরকে বিজয়ী করার পর। তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ তা দেখেন। (২৫) তারাই তো কুফরী করেছে এবং বাধা দিয়েছে তোমাদেরকে মসজিদে হারাম থেকে এবং অবস্থানরত কোরবানীর জন্তুদেরকে যথাস্থানে পৌছতে। যদি মক্কায় কিছুসংখ্যক ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী না থাকত, যাদেরকে তোমরা জানতে না। অর্থাৎ তাদের পিষ্ট হয়ে যাওয়ার আশংকা না থাকত, অতঃপর তাদের কারণে তোমরা অজ্ঞাতসারে ক্ষতিগ্রস্ত হতে, তবে সব কিছু চুকিয়ে দেয়া হত; কিন্তু এ কারণে চুকানো হয়নি, যাতে আল্লাহ তা’আলা যাকে ইচ্ছা স্বীয় রহমতে দাখিল করে নেন। যদি তারা সরে যেত, তবে আমি অবশ্যই তাদের মধ্যে যারা কাফের তাদেরকে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি দিতাম।"]

নবীকে তাদের ওপর বিজয়ী করার পর, মুহাম্মদকে মক্কাবাসীদের ওপর বিজয়ী করার পর মক্কায় অবস্থানরত অবশিষ্ট মুসলমানদের কারণে আল্লাহ তাঁকে তাদের কাছ থেকে নিবৃত্ত করেছে; কারণ আল্লাহ এটা চায় না যে, অশ্বারোহীরা অনিচ্ছাকৃতভাবে তাদেরকে পদদলিত করুক।'

- অনুবাদ, টাইটেল, ও [**] যোগ - লেখক।]

>>> আল-তাবারীর সম্পাদিত আদি উৎসের ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় আমরা জানতে পারি যে, মদিনা থেকে রওনা হয়ে ৫-৬ মাইল দূরবর্তী ধু আল-হুলায়েফা নামক স্থানে পৌঁছার পর উমর ইবনে খাত্তাবের পরামর্শে মুহাম্মদ মদিনায় মজুত সকল অস্ত্রশস্ত্র ও ঘোড়াগুলো নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন। তারপর সেই অস্ত্রশস্ত্র ও ঘোড়গুলো সঙ্গে নিয়ে মক্কার উদ্দেশে যাত্রা করেন। মুহাম্মদ ইবনে ইশাক ও হাদিস গ্রন্থের মুখ্য লেখকদের কেউই 'আল-হুলায়েফা-র' এই ঘটনার কোনো উল্লেখ করেননি। মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা তাঁদের এই যাত্রায় কী ধরণের অস্ত্রশস্ত্র সঙ্গে নিয়েছিলেন, তারও কোনো সরাসরি বর্ণনা তাঁদের লেখায় খুঁজে পাওয়া যায় না। তা সত্ত্বেও তাঁদের রচিত হুদাইবিয়া অধ্যায়ের বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহের বর্ণনায় আমরা অতি সহজেই বুঝতে পারি যে, মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা ছিলেন সশস্ত্র! অন্যদিকে, আল-ওয়াকিদি ধু আল-হুলায়েফা ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর বর্ণনায় তিনি যা উল্লেখ করেছেন তা হলো এই যে, ধু আল-হুলায়েফা নামক স্থানে পৌঁছার পর যখন উমর ইবনে খাত্তাব মুহাম্মদকে মজুদ অস্ত্রশস্ত্র ও ঘোড়াগুলো সঙ্গে নেয়ার পরামর্শ দেন, তখন মুহাম্মদ তাঁর সেই প্রস্তাবে রাজী হননি।

আল-ওয়াকিদির প্রাসঙ্গিক বর্ণনা:
'তারা খাপের মধ্যে তলোয়ার ছাড়া অন্য কোনো অস্ত্রশস্ত্র না নিয়েই রওনা হোন। তাঁর অনুসারীদের এক দল লোক কুরবানির পশুদের পরিচালনা করে। --তারা সেগুলোকে ধু আল-হুলায়েফা নামক স্থানে তাঁর যাত্রা বিরতি পর্যন্ত নিয়ে আসে। --উমর ইবনে খাত্তাব বলে, "হে আল্লাহর নবী, আপনার কি আশংকা হয় না যে, আবু সুফিয়ান বিন হারব ও তার অনুসারীরা আমাদের আক্রমণ করতে পারে কারণ যুদ্ধের জন্য আমরা কোনো প্রস্তুতি নিইনি?" আল্লাহর নবী বলেন, "আমি জানি না। আমার ইচ্ছা নয় যে, তীর্থযাত্রা কালে আমি কোনো অস্ত্রশস্ত্র বহন করি।"’ [9]

>>> কিন্তু, অন্যান্য উৎসের রেফারেন্স সম্বলিত আল-ওয়াকিদির হুদাইবিয়া অধ্যায়ের অন্যান্য ঘটনা প্রবাহের বর্ণনায় আমরা আরও যে-সমস্ত তথ্য পাই, তার একটি হলো:  'যখন মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা হুদাইবিয়ার নিকটবর্তী এক কুপের কাছে এসে পৌঁছান, সেখানে যে কূপটি ছিল, তাতে পানির পরিমাণ ছিল খুবই অল্প। সেই অবস্থায় মুহাম্মদ তাঁর তূণী থেকে তীর বের করে তাঁর অনুসারীদের দেন ও বলেন, তারা যেন এই তীরটি ঐ কূপের পানিতে বসায়। তারা তাই করে। আর তারপর অলৌকিক উপায়ে সেই কূপ পানি-পূর্ণ হয়ে যায় এবং সেই পানির সাহায্যে মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা তাঁদের পানির চাহিদা পূরণ করে [10]। এই একই ঘটনার বর্ণনা ইবনে ইশাক, আল-তাবারী ও ইমাম বুখারী তাঁদের নিজ নিজ গ্রন্থে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন। এই ঘটনার বর্ণনায় যে-গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি অত্যন্ত স্পষ্ট, তা হলো - শুধুমাত্র তলোয়ারই নয়, মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা তীর-ধনুকও সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। [11] [12] [13]

আল-ওয়াকিদির বর্ণনায় আমরা আরও জানতে পারি যে, যখন মুহাম্মদ তাঁর এক গুপ্তচর মারফত জানতে পারেন, কুরাইশরা তাঁদেরকে বাধা প্রদানের জন্য সমবেত হয়েছে; তখন তিনি তাঁর অনুসারীদের নিয়ে বৈঠকে বসেন ও এই পরিস্থিতিতে কী করা উচিত, তা তাঁর অনুসারীদের কাছে জানতে চান। আবু বকর, আবু হুরাইরা ও আল-মিকদাল বিন আমর নামের এক অনুসারী তাঁকে পরামর্শ দেন যে, যদি কুরাইশার তাদেরকে বাধা প্রদান করে, তবে তারা তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। এই একই ঘটনার বর্ণনা ইমাম বুখারী তাঁর হাদিস গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন; যেখানে তিনি আরও যা লিপিবদ্ধ করেছেন, তা হলো, যদি কুরাইশরা তাদেরকে বাধা প্রদান করে, তবে তাদের পরিবার ও সন্তানদের মুহাম্মদ ধ্বংস করবেন কি না, সে বিষয়ে মুহাম্মদ তাঁর অনুসারীদের কাছে পরামর্শ চেয়েছিলেন ("O people! Give me your opinion. Do you recommend that I should destroy the families and offspring of those who want to stop us from the Ka'ba?")। [14] [15]

সুতরাং প্রশ্ন হলো, মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা যদি যুদ্ধ করার জন্য কোনো অস্ত্রশস্ত্র না নিয়ে গিয়ে থাকেন, তবে বিনা অস্ত্রে তারা কীভাবে সশস্ত্র কুরাইশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন ও নবীকে যুদ্ধের পরামর্শ দিয়েছিলেন? আর বিনা অস্ত্রে মুহাম্মদই বা কীভাবে সশস্ত্র কুরাইশদের পরিবার ও সন্তানদের ধ্বংস করবেন কি না, সেই পরামর্শ আহ্বান করেছিলেন? মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা যে তাঁদের অস্ত্রশস্ত্র ও যুদ্ধ-ঘোড়া সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো মুহাম্মদেরই স্বরচিত ব্যক্তিমানস জীবনীগ্রন্থ (Psycho-biography) কুরান। "হুদাইবিয়া সন্ধি" সম্পন্ন করার পর সেখান থেকে ফিরে এসে মুহাম্মদ ঐ প্রসঙ্গে সূরা আল ফাতহ (চ্যাপ্টার ৪৮) প্রচার করেন, তাঁর এই জবানবন্দির "৪৮:২২-২৫" বাণীটি-কে একটু মনোযোগের সাথে বিশ্লেষণ করা যাক।

মুহাম্মদের ভাষায়:

৪৮:২২-২৩ – “যদি কাফেররা তোমাদের মোকাবেলা করত, তবে অবশ্যই তারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করত। তখন তারা কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী পেত না। (২৩) এটাই আল্লাহর রীতি, যা পূর্ব থেকে চালু আছে। তুমি আল্লাহর রীতিতে কোন পরিবর্তন পাবে না।”  

>>> কী ভাবে? কোনো সশস্ত্র আক্রমণকারী দল কোনো নিরস্ত্র মোকাবেলাকারী দলকে দেখে “অবশ্যই পৃষ্ঠপ্রদর্শন” কেন করবে? এটা তখনই সম্ভব, যখন মোকাবেলাকারী দল, আক্রমণকারী দলের মতই সশস্ত্র।

৪৮:২৪-২৫ - "তিনি মক্কা শহরে তাদের হাত তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাত তাদের থেকে নিবারিত করেছেন তাদের উপর তোমাদেরকে বিজয়ী করার পর। তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ তা দেখেন। (২৫) তারাই তো কুফরী করেছে এবং বাধা দিয়েছে তোমাদেরকে মসজিদে হারাম থেকে এবং অবস্থানরত কোরবানীর জন্তুদেরকে যথাস্থানে পৌছতে। যদি মক্কায় কিছুসংখ্যক ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী না থাকত, যাদেরকে তোমরা জানতে না। অর্থাৎ তাদের পিষ্ট হয়ে যাওয়ার আশংকা না থাকত, অতঃপর তাদের কারণে তোমরা অজ্ঞাতসারে ক্ষতিগ্রস্ত হতে, তবে সব কিছু চুকিয়ে দেয়া হত; কিন্তু এ কারণে চুকানো হয়নি, যাতে আল্লাহ তা’আলা যাকে ইচ্ছা স্বীয় রহমতে দাখিল করে নেন। যদি তারা সরে যেত, তবে আমি অবশ্যই তাদের মধ্যে যারা কাফের তাদেরকে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি দিতাম।"

>>> ওপরে বর্ণিত খালিদ বিন ওয়ালিদ ও ইকরিমা বিন আবু জেহেল বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে মুহাম্মদ এই বাণীটি রচনা করুন, কিংবা তিনি এটি অন্য কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রচনা করুন; এই বাণীটি নিঃসন্দেহে তিনি তাঁর অনুসারীদের উদ্দেশে ঘোষণা দিয়েছিলেন, যারা জানতেন না যে, "মক্কায় কিছুসংখ্যক ইমানদার পুরুষ ও ইমানদার নারী যারা আছেন তারা কারা?" বলা হচ্ছে, এই না জানার কারণে কুরাইশদের সঙ্গে তাদেরও "পিষ্ট হয়ে যাওয়ার আশংকা" আছে বলেই "তোমাদের হাত তাদের থেকে নিবারিত করেছেন" - অর্থাৎ, সে কারণেই মুহাম্মদ কুরাইশদের আক্রমণ করেননি। যদি এই আশংকা না থাকতো "তবে সব কিছু চুকিয়ে দেয়া হত" -অর্থাৎ, কুরাইশদের আক্রমণ করে ধ্বংস করা হতো। এটা তখনই সম্ভব, যখন মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা হবেন সশস্ত্র।

বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুহাম্মদ অনুসারীদের সংখ্যা ছিল ৩১৩ জন (পর্ব: ৩৪) ও ওহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুহাম্মদ অনুসারীদের সংখ্যা ছিল ৭০০ জন (পর্ব: ৫৫)। সে তুলনায় মুহাম্মদের এই মক্কা যাত্রায় তাঁর অনুসারীদের সংখ্যা ছিল বিশাল, ওহুদ যুদ্ধের তুলনায় দ্বিগুণ! আদি উৎসের ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় আমরা জানতে পারি যে, উমর ইবনে খাত্তাবের পরামর্শে মুহাম্মদ ধু আল-হুলায়েফা থেকে তাঁর কিছু অনুসারীকে আরও অতিরিক্ত অস্ত্রশস্ত্র ও যুদ্ধ-ঘোড়া নিয়ে আসার জন্য মদিনায় ফেরত পাঠাক কিংবা না পাঠাক, তারা যে নিরস্ত্র অবস্থায় মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেননি, তা আদি উৎসের সকল বিশিষ্ট 'সিরাত ও হাদিস' লেখকদের বর্ণনায় অত্যন্ত স্পষ্ট।

সুতরাং, আবারও সেই একই প্রশ্ন: এমত অবস্থায় অবিশ্বাসী জনপদের ওপর বহু আগ্রাসী ও নৃশংস হামলার নেতৃত্ব ও আদেশ দানকারী মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ও তাঁর অনুসারীদের সঙ্গে কুরাইশদের কীরূপ আচরণ সভ্য মনুষ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে? নিজেদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা না করে মুহাম্মদকে বিশ্বাস করে তাঁকে ও তাঁর অনুসারীদের সাদর আমন্ত্রণে মক্কায় ঢুকতে দেয়া? নাকি নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের মক্কা প্রবেশে বাধা দেওয়া?

ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে মূল ইংরেজি অনুবাদের অংশটিও সংযুক্ত করছি। - অনুবাদ, টাইটেল ও [**] যোগ - লেখক।]

The narrative of Al-Tabari:

‘According to Ibne Humayd < Yaqud b Qummi [6] < Jafar (i.e Ibn Abi Al Mughirah) < Ibn Abza, who said:

When the Messenger of God set out with camels for sacrifice and reached Dhu al-Hulayfah, Umar said to him, “Messenger of God, will you without arms or horses enter the territory of people who are at war with you?” So the prophet sent to Medina and left no horses or weapons there untaken. When he approached Mecca, they prohibited him from entering; so he marched to Mina and halted there. His spy brought him word saying, “Ikrimah b Abi Jahl has come out against you with five hundred men.” [7][8]

The Messenger of God said to Khalid b al-Walid, “Khalid, here is your paternal uncle’s son come against you with horsemen.” Khalid said, “I am the sword of God and the sword of His Messenger!”– he received the name sword of God on that day – “Messenger of God, direct me wherever you wish!” He sent him in command of horsemen, and he met ‘Ikrimah in the canyon and routed him, so that he drove Ikrimah back into the walled gardens of Mecca. Ikrimah returned again, and Khalid routed him, driving him back into the walled gardens of Mecca. Ikrimah returned in third time, and Khalid routed him, so that he drove him back into the walled gardens of Mecca.  God revealed concerning him, “It is He who restrained their hands from you, and your hands from them, in the hollow of Mecca, after He made you victors over them” – until the words, “painful punishment.” [Q: 48:24-25].

Having made the Prophet victor over them, God restrained him from them on account of remnant of Muslims who remained in Mecca after He had made Muhammad victor over the Meccans; for God did not want the horsemen to trample them unwittingly.’ 

(চলবে)

[কুরানের উদ্ধৃতিগুলো সৌদি আরবের বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ (হারাম শরীফের খাদেম) কর্তৃক বিতরণকৃত বাংলা তরজমা থেকে নেয়া, অনুবাদে ত্রুটি-বিচ্যুতির দায় অনুবাদকারীর। কুরানের ছয়জন বিশিষ্ট অনুবাদকারীর পাশাপাশি অনুবাদ এখানে।] 

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] “তারিক আল রসুল ওয়াল মুলুক”- লেখক: আল-তাবারী (৮৩৮-৯২৩ খৃষ্টাব্দ), ভলুউম ৮, ইংরেজী অনুবাদ: Michael Fishbein, University of California, Los Angeles, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৮৭, ISBN 0-7914-3150—9 (pbk), পৃষ্ঠা (Leiden) ১৫২৯-১৫৩০ 

[2] মুহাম্মদ ইবনে সা'দ (৭৮৪-৮৪৫ খৃষ্টাব্দ): কিতাব আল-তাবাকাত আল-কাবির গ্রন্থের লেখক:

[3] সহি বুখারি: ভলিউম ৫, বই ৫৯, নং ৪৭৫

Narrated By Jabir bin 'Abdullah: On the day of Al-Hudaibiya, Allah's Apostle said to us' "You are the best people on the earth!" We were 1400 then. If I could see now, I would have shown you the place of the Tree (beneath which the Pledge of allegiance was given by us)," Salim said, "Our number was 1400." 'Abdullah bin Abi Aufa said, "The people (who gave the Pledge of allegiance) under the Tree numbered 1300 and the number of Bani Aslam was 1/8 of the Emigrants."

[4] “কিতাব আল-মাগাজি”- লেখক:  আল-ওয়াকিদি (৭৪৮-৮২২ খৃষ্টাব্দ), ed. Marsden Jones, লন্ডন ১৯৬৬; ভলুম ২, পৃষ্ঠা ৫৭৪: http://www.britannica.com/biography/al-Waqidi
ইংরেজি অনুবাদ: Rizwi Faizer, Amal Ismail and Abdul Kader Tayob; ISBN: 978-0-415-86485-5 (pbk); পৃষ্ঠা ২৮২

[5] Ibid আল-তাবারী পৃষ্ঠা (Leiden) ১৫৩১-১৫৩২

[6] ইয়াকুদ বিন আবদুল্লাহ আল-কুম্মি ৭৯০ খৃস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

[7] ধু আল-হুলায়েফা: মদিনা থেকে ৬-৭ মাইল দূরবর্তী মক্কা যাওয়ার পথে অবস্থিত একটি স্থান।

[8] মিনা: মক্কা শহরের পূর্বদিকে ৫ মাইল দূরবর্তী, তীর্থযাত্রীদের ঐতিহ্যগত মক্কা ও আরাফাত গমন পথের মধ্যবর্তী এক সঙ্কীর্ণ উপত্যকায় এই স্থানটি অবস্থিত।

[9] Ibid “কিতাব আল-মাগাজি”- লেখক:  আল-ওয়াকিদি- ভলুম ২, পৃষ্ঠা ৫৭২;
ইংরেজি অনুবাদ: পৃষ্ঠা ২৮১

[10] Ibid “কিতাব আল-মাগাজি”- লেখক:  আল-ওয়াকিদি- ভলুম ২, পৃষ্ঠা ৫৮৭;
ইংরেজি অনুবাদ: পৃষ্ঠা ২৮৮

[11] অনুরূপ বর্ণনা (Parallal):  “সিরাত রসুল আল্লাহ”- লেখক: মুহাম্মদ ইবনে ইশাক (৭০৪-৭৬৮ খৃষ্টাব্দ), সম্পাদনা: ইবনে হিশাম (মৃত্যু ৮৩৩ খৃষ্টাব্দ), ইংরেজি অনুবাদ:  A. GUILLAUME, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, করাচী, ১৯৫৫, ISBN 0-19-636033-1, পৃষ্ঠা ৫০১.  http://www.justislam.co.uk/images/Ibn%20Ishaq%20-%20Sirat%20Rasul%20Allah.pdf

[12] অনুরূপ বর্ণনা (Parallal): Ibid আল-তাবারী পৃষ্ঠা (Leiden) ১৫৩৩-১৫৩৪

[13] অনুরূপ বর্ণনা- সহি বুখারী: ভলিউম ৩, বই ৫০, নম্বর ৮৯১
অনেক বড় হাদিস, প্রাসঙ্গিক অংশ:
‘Narated By Al-Miswar bin Makhrama and Marwan: -----The Prophet changed his way till he dismounted at the farthest end of Al-Hudaibiya at a pit (i.e. well) containing a little water which the people used in small amounts, and in a short while the people used up all its water and complained to Allah's Apostle; of thirst. The Prophet took an arrow out of his arrow-case and ordered them to put the arrow in that pit. By Allah, the water started and continued sprouting out till all the people quenched their thirst and returned with satisfaction------‘.

[14] Ibid “কিতাব আল-মাগাজি”- লেখক:  আল-ওয়াকিদি- ভলুম ২, পৃষ্ঠা ৫৮০; ইংরেজি অনুবাদ: পৃষ্ঠা ২৮৫

[15] অনুরূপ বর্ণনা: সহি বুখারী: ভলিউম ৫, বই ৫৯, হাদিস নম্বর ৪৯৫
প্রাসঙ্গিক অংশ:
‘ --- There his spy came and said, "The Quraish (infidels) have collected a great number of people against you, and they have collected against you the Ethiopians, and they will fight with you, and will stop you from entering the Ka'ba and prevent you." The Prophet said, "O people! Give me your opinion. Do you recommend that I should destroy the families and offspring of those who want to stop us from the Ka'ba? If they should come to us (for peace) then Allah will destroy a spy from the pagans, or otherwise we will leave them in a miserable state." On that Abu Bakr said, "O Allah Apostle! You have come with the intention of visiting this House (i.e. Ka'ba) and you do not want to kill or fight anybody. So proceed to it, and whoever should stop us from it, we will fight him." On that the Prophet said, "Proceed on, in the Name of Allah!"’