১১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬

নীরব নাস্তিকতা নয় আর

লিখেছেন লেখক অন্তরালে

আজকাল খুব শুনতে পাই এই কথাটা: "আপনি আপনার নাস্তিকতা নিয়ে থাকুন না, ভাই! আমি আমার ধর্ম নিয়ে থাকি। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। খামাখা আপনারা ধর্মের পিছনে লেগে, তার নানা অসামঞ্জস্য খুঁজে ধার্মিকদের মনে কষ্ট দেন কেন? তারা তো আপনাদের পেছনে লাগতে যায় না! ধর্ম হলো বিশ্বাসের ব্যাপার - যে যার মত নিজের বিশ্বাস নিয়ে থাকলে ক্ষতি কী? দুনিয়াতে ধর্ম ছাড়াও আরো হাজারো সমস্যা আছে, সেগুলো নিয়ে কথা বলুন।"

এটা মোটামুটি উদারপন্থী মডারেট ধার্মিকের বয়ান। তবে তার চেয়ে যারা একটু কম উদার, তাঁরা বলেন: "ভাই, আপনারা ধর্ম নিয়ে লিখলে ধার্মিকেরা অনুভূতিতে আঘাত পায়। কাজেই আপনারা এইসব লেখালেখি বন্ধ করেন, নিজের নাস্তিকতা নিয়ে নিজেরা থাকেন। দেখেননি, আগের দিনে লালন শাহ, বেগম রোকেয়া, কবি নজরুল, আরজ মাতুব্বর কীভাবে নাস্তিকতা করে গেছেন? তাদেরকে কি কেউ খারাপ বলে, কিংবা চাপাতি নিয়ে কোপাতে যায়? তাদেরকে কেউ উগ্র নাস্তিক বলে? বলে না।"

আমি অবাক হয়ে শুনি তাদের কথা। তাদের ভাষ্য মতে, আমাকে নীরব নাস্তিক হয়ে যেতে হবে, আমার নাস্তিকতা আমার ঘরের ভেতরে তুলে রেখে বাইরে থেকে তালা দিয়ে রাখতে হবে, যেন কেউ দেখতে না পায়, কিংবা কারো অনুভূতি আহত না হয়। যারা কয়েক মিলেনিয়াম ধরে প্রাচীন ধ্যান-ধারণা আজকের দুনিয়ায় চর্চা করছে, যারা মসজিদে দিনে পাঁচবার আজান দিয়ে কিংবা মন্দিরে বারো মাসে চোদ্দবার ঢোল পিটিয়ে সবাইকে দাওয়াত দিয়ে সে কাজ করতে পারবে, আর আমি মানবজাতির প্রগতির বাহন বিজ্ঞান ও দর্শনের আলোকে সেগুলোকে ভ্রান্ত মনে করি বলে আমাকে চুপ থাকতে হবে। যে ২+২ = ৫ বলে বেড়াচ্ছে, এবং তা দিয়ে সমাজে নানা সমস্যা তৈরি করে বেড়াচ্ছে, সে সরবে তা বলে বেড়াবে, আর আমি ২+২ = ৪ বললে তাতে ওদের অনুভূতি আহত হবে! ধর্ম এবং ঈশ্বর আধুনিক বিজ্ঞানের কাছে একটি ব্যর্থ অনুকল্প। দুনিয়া অনেকদুর এগিয়েছে। এখনো আমরা যদি কাউকে কুসংস্কারে আবদ্ধ দেখি, অন্ধবিশ্বাসে আবদ্ধ দেখি, প্রাচীন অতিপ্রাকৃত ভিত্তিহীন ঈশ্বরের আরাধনায় ব্যস্ত দেখি, আমি কি আমার ভাবনাগুলোকে আমার নিজের দেয়ালে, নিজের পাতায়, নিজের আকাশেও প্রকাশ করতে পারব না?


কেউ কেউ বলবেন, ধর্মকে আহত না করে কিংবা ধার্মিকদেরকে আহত না করে আপনাদের মতগুলো প্রকাশ করুন। কিন্তু যখন দেখি, এই সব অন্ধবিশ্বাস আর কুসংস্কার মানুষের জীবনকে, সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, পেছনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে এবং সহিংসতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তখনো কি আমরা চুপ থাকব? ওরা যখন বাহাত্তুরের সেক্যুলার বাংলাদেশকে, কিংবা বাংলাদেশের স্বাধীনতার একটা প্রধান স্তম্ভ - ধর্মনিরপেক্ষতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে ধর্মভিত্তিক তথা চাপাতিভিত্তিক প্রজাতন্ত্র বানিয়ে ফেলবে, তখন আমরা তাতে বাধা দেব না? ওরা যখন সভ্যতার সূতিকাগার টাইগ্রীস-ইউফেটিস বিধৌত মেসোপটেমিয়াকে হাবিয়া দোজখ বানিয়ে ফেলবে কল্পিত মহাজনের নামে, তখনো কি আমরা মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকব? ধর্মের কারণে ওসামা বিন লাদেন আমেরিকার টুইন টাওয়ারে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে, বাংলাদেশে মসজিদ-মন্দির-প্যাগোডা ভাঙা হয়, ব্লগারদেরকে হত্যা করা হচ্ছে দিনের আলোতে, তারপরেও আমরা, সত্য জানা সত্ত্বেও, চুপ করে থাকব? নিজের ভাবনাগুলো নিজের মাথায় আবদ্ধ করে রেখে 'ভদ্র' নাস্তিকের তকমা জোটাব? ধর্মবিশ্বাসের কারণে আজ জার্মানীতে এক পাকিস্তানী বাবা তার উনিশ বছরের মেয়েকে হত্যা করেছে, কারণ সে তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়েছিল। ধর্মবিশ্বাসের কারণে ব্রিটেনের বা অস্ট্রেলিয়ার তরুণ মুসলমান ছেলেরা সিরিয়ায় জঙ্গীবাহিনীতে যোগ দিচ্ছে। ধর্মবিশ্বাসের কারণে কর্ণাটকে মুক্তচিন্তক ও গবেষক অধ্যাপক কুলবার্গি খুন হয়ে যান, খুন হয়ে যান ভাষাতত্ত্ববিদ সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ। ধর্মবিশ্বাসের কারণে বাংলাদেশের তরুন নাফিস নিউইয়র্কে বোমা হাতে ধরা পড়ে। ধর্মবিশ্বাসের কারণে বাংলার হাজারো মানুষ হজ্জ্বের নামে সৌদি রাজতন্ত্রকে সোনার মার্সিডিজ কেনার তহবিল যোগান দিয়ে যাচ্ছে। কল্পিত এক শয়তানকে পাথর ছুঁড়ে মারতে গিয়ে সহযাত্রীদের পদতলে পিষ্ট হয়ে মরছে হাজারে হাজারে। ধর্মের নামে ময়মনসিংহে-এলাহাবাদে জাকাত/পূণ্যের আশায় মানুষেরা একে-অপরকে পদদলিত করে প্রাচীন দেবতাদের পীঠস্থান কাবায় পদদলিত হয়ে মরে হাজারে হাজার মানুষ। ধর্মবিশ্বাসের কারণে পাকিস্তানে, আফগানিস্তানে মেয়েরা শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, বঞ্চিত হয় জীবনের নানা অধিকার থেকে। ধর্মবিশ্বাসীদের কারণে দেশের অনেক মুক্তচিন্তককে দেশছাড়া হতে হয়েছে ও হচ্ছে। তবুও এই ভুল বিশ্বাসে বিশ্বাসীরা জনসমক্ষে তাদের বিশ্বাসের চর্চা করে যাবে, আর সচেতন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষেরা তাদের ভাবনাকে সিন্দুকে পুরে রাখবে?