৭ জানু, ২০১৬

লওহে মাহফুজের সন্ধানে: ক্যাটম্যান সিরিজ - ০৮

লিখেছেন ক্যাটম্যান

মুক্তচিন্তা চর্চা, প্রচার ও প্রসারের কারণে ধর্মান্ধ মৌলবাদী জঙ্গীগোষ্ঠীর নৃশংস হামলার শিকার হুমায়ুন আজাদ, রাজিব হায়দার, অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, অনন্ত বিজয় দাশ, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয় ও ফয়সল আরেফিন দীপন সহ নিহত ও আহত সকল মুক্তচিন্তকের স্মরণে এই লেখাটি অপরিমেয় ভালোবাসার স্মারক স্বরূপ নিবেদন করছি।


কিন্তু তা সত্ত্বেও মূসা হাল ছাড়ার পাত্র নন। নিজের প্রতি ইস্রায়েলের জনগণের আস্থা অটুট রাখতে পুনরায় ঈশ্বর প্রদর্শনের উদ্যোগ গ্রহণ করলেন। তেমন নজির পাই আমরা বাইবেলের নিম্নোক্ত শ্লোকসমূহে:
পরে মোশী ও আরোন, নাদাব ও আবিহু এবং ইস্রায়েলের প্রবীনবর্গের মধ্য থেকে সত্তরজন আরোহণ করলেন। তাঁরা ইস্রায়েলের পরমেশ্বরকে দেখলেন: তাঁর পদতলের স্থান নীলকান্তমণিতে তৈরী এমন শিলাস্তরের কাজের মত, যার শুচিশুভ্রতা আকাশেরই মত। তিনি কিন্তু ইস্রায়েল সন্তানদের এই প্রধানদের বিরুদ্ধে হাত বাড়ালেন না; না, তারা পরমেশ্বরকে দেখলেন, তথাপি খাওয়া-দাওয়া করতে পারলেন। [যাত্রাপুস্তক ২৪:৯-১১]
পুনরায় ঈশ্বর প্রদর্শনের উদ্যোগ নিলেও এক্ষেত্রে মূসা এক সুকৌশলী পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন। ইস্রায়েলের সকল জনগণকে ঈশ্বর দর্শনের সুযোগ না দিয়ে তাদের মধ্য থেকে শুধুমাত্র সত্তরজন প্রবীণ ব্যক্তিকে বেছে নিলেন। কারণ প্রবীণ ব্যক্তিগণ সকলেই ছিলেন ক্ষীণদৃষ্টি সম্পন্ন। বিধায় দূর থেকে বিশেষ কিছু দেখার ক্ষমতা তাদের সীমিত। এছাড়াও প্রবীণবর্গের পক্ষে উঁচু পাহাড়ে আরোহণ অসম্ভব বিধায় পাহাড় চূড়ায় পরমেশ্বরের অবতরণস্থলে পৌঁছাতেও তাঁরা অপারগ। যদি তাঁরা নিদেনপক্ষে পাহাড়ের পাদদেশ অথবা পাদদেশ সংলগ্ন নিরাপদ উচ্চতায় আরোহণ করতে সক্ষম হনও, তবুও ঈশ্বরের অবতরণস্থলের নাগাল তাঁরা কখনই পাবেন না। তাই মূসার পরমেশ্বরকে স্পষ্টত দেখার সুযোগ ও সম্ভাবনার কোনোটাই ইস্রায়েলের সত্তরজন প্রবীণবর্গের নেই। প্রবীণবর্গের এমন অপারগতাসমূহকে কাজে লাগিয়ে মূসা তার কল্পিত পরমেশ্বরকে স্পষ্টত প্রদর্শনের বিড়ম্বনা থেকে সহজেই রেহাই পান।

উক্ত সত্তরজন প্রবীণ ব্যক্তির বর্ণনা মুহম্মদ তার কুরআনেও অন্তর্ভুক্ত করেছেন। যেমন:
আর মূসা (তার সাথে) আমার নির্ধারিত সময়ে হাযির হবার জন্য নিজের জাতির সত্তর জন লোককে নির্বাচিত করলো। [সূরা আরাফ ১৫৫]
অপরদিকে ইস্রায়েলের অন্য কোনো সমর্থবান ব্যক্তি যেন গোপনে পাহাড়ে আরোহণ করে ঈশ্বরদর্শনের চেষ্টায় লিপ্ত না হয়, তেমন সম্ভাবনা রোধ ও যথাযথ গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে মূসা পাহারাদার হিসাবে নাদাব, আবিহু ও তার আপন ভ্রাতা আরোনকে সাথে নেয়।

আর ঈশ্বরদর্শনের এই সাধারণ মানের আয়োজনে ইস্রায়েলের সত্তরজন প্রবীণ ব্যক্তি যা দেখলেন, ঈশ্বর দর্শনের বর্ণনা হিসাবে তা খুবই বিভ্রান্তিকর। এ বিষয়ে বাইবেলের বর্ণনা নিম্নরূপ:
তাঁরা ইস্রায়েলের পরমেশ্বরকে দেখলেন: তাঁর পদতলের স্থান নীলকান্তমণিতে তৈরী এমন শিলাস্তরের কাজের মত, যার শুচিশুভ্রতা আকাশেরই মত। [যাত্রাপুস্তক ২৪:১০]
বাইবেলের এই বর্ণনায় ঈশ্বরের উপস্থিতি স্পষ্টতই অনুপস্থিত। কারণ মূসার বাছাইকৃত সত্তরজন ইস্রাইলি প্রবীণ ব্যক্তি সেদিন কোনো ঈশ্বরকে দেখেননি। পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে তারা ক্ষীণদৃষ্টিতে পাহাড় চূড়ার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। কারণ মূসার বর্ণনামতে পাহাড় চূড়াই হলো পরমেশ্বরের অবতরণস্থল। তাই ক্ষীণদৃষ্টি সম্পন্ন সত্তরজন প্রবীণবর্গের নিকট পাহাড় চূড়াটি পরমেশ্বরের পদতলের স্থান বা গডপ্যাড বলে প্রতিভাত হলো এবং উক্ত স্থানে ঈশ্বরদর্শন তো দূরের কথা, ঈশ্বরের পা দর্শনের সুযোগও তাঁদের হয়নি। বিধায় তারা ঈশ্বরদর্শনের অভিজ্ঞতায় চাক্ষুষ কোনো ঈশ্বরের বর্ণনা না দিয়ে তার পদতল স্থানের বর্ণনা প্রদান করে নিজেদের আক্ষেপ মিটিয়েছেন। বস্তুত তাঁরা পাহাড় চূড়ার ওপরে অবস্থানরত শুভ্র মেঘমালাকে দেখতে পেয়ে সেটিকেই ঈশ্বরের পদতল স্থান ভ্রমে সন্দেহজনক ভাবে রহস্যপূর্ণ বিবৃতি দিয়েছেন।

তাছাড়া ইস্রায়েলের সত্তরজন প্রবীণবর্গ মূসার পরমেশ্বরকে যে কখনোই দেখতে পাননি, এই ঘটনার অব্যবহিত পরেই তার স্বীকৃতি মেলে।

এ দিকে মূসা তার পরমেশ্বরের সাথে একান্তে সাক্ষাতের অজুহাতে ইস্রায়েলের প্রবীণবর্গের নিকট থেকে দীর্ঘ সময়ের জন্য আলাদা হয়ে সেই পাহাড় চূড়ায় আরোহণ করেন, যেথায় তার কল্পিত পরমেশ্বরের নিত্য আনাগোনা। আর যাওয়ার পূর্বে ইস্রায়েলের প্রবীণবর্গকে দেখভালের দায়িত্ব হারূন ও হুরের ওপর ন্যস্ত করে যান। বাইবেলে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:
পরে প্রভু মোশীকে বললেন, ‘পর্বতের কাছে এসে ওইখানে অপেক্ষা কর; আমি তোমাকে সেই প্রস্তর ফলকগুলো এবং সেই বিধান ও আজ্ঞাগুলি দেব, যা আমি তাদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য লিখেছি। তাই মোশী ও তাঁর সহকর্মী যোশুয়া উঠে পড়লেন, আর মোশী পরমেশ্বরের পর্বতে গিয়ে উঠলেন। তিনি প্রবীণদের বলেছিলেন, ‘যতদিন না আমরা তোমাদের কাছে ফিরে আসি, ততদিন তোমরা এখানে আমাদের অপেক্ষায় থাক। দেখ, তোমাদের সঙ্গে আরোন ও হুর রইল; কারও কোন সমস্যা হলে, সে তাদের কাছে যেতে পারবে।’ [যাত্রাপুস্তক ২৪:১২-১৪]
(চলবে)