১২ জানু, ২০১৬

মহাভারতের সময়ে যৌনতা

লিখেছেন কৌস্তুভ

এক শ্রেণীর মানুষ মনে করে, প্রাচীন যুগের সবকিছুই ছিল বিশুদ্ধ, পবিত্র, আর আমাদের উচিত সেই প্রাচীন যুগের পুঁথিটুথি পড়ে সেইমত ‘পবিত্র’ জীবন যাপনের চেষ্টা করা। রামায়ণ-মহাভারতের মত বাস্তব-নির্ভর মেগা-উপন্যাস – ‘এপিক’ উপযুক্ত শব্দ এই জাতের বইগুলির জন্য – তাদের কাছে শুধুই মহত্ব-বীরত্ব-সতীত্ব এসবের আখ্যান। এরা কেউ আসল মহাভারত-রামায়ণ পুরোটা পড়েছে কি না সন্দেহ; হিন্দিভাষীরা প্রধানত পড়ে তুলসীদাসের সংক্ষিপ্ত, sanitized ভার্শন। সে বইয়ের ছত্রগুলিকে তারা সুর করে আউড়ে চলে মন্দিরে বা বাড়িতে, যেমন করে পাঠ করা হয় সুরা বা বাইবেলের ছত্রগুলি। মাইকেল মধুসূদন দত্ত যেভাবে রাম বা রাবণের চরিত্র বিশ্লেষণ করেছেন তাঁর মেঘনাদবধ কাব্যে, তা অমন অধিকাংশ মানুষকে শোনাতে গেলে ব্লাসফেমি বলে তেড়ে আসবে। তাঁদের ‘পুরুষোত্তম’ রামের সাথে মহানবীর একটা ব্যাপারে বেশ মিল আছে – মিথ্যা বলার ‘তাকিয়া’র সাহায্যে শত্রুর মুণ্ডু ঘ্যাচাং করার তাঁরা দু'জনেই উৎসাহী সমর্থক।

রামায়ণের চেয়ে মহাভারত আকারে অনেক বড়, আর তাই এর বিস্তারও বেশি – কাহিনী, ঘটনাবলী, বিবরণ সব দিক থেকেই। তাই মহাভারত আমাদের সে সময়ের জীবনচিত্র, নৈতিকতা সবকিছুরই একটা ভালো ছবি দিতে পারে, যদি অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে পড়া যায়।

তা মহাভারতের সেই প্রাচীন যুগে যৌনসম্পর্কের সামাজিক রীতি-রেওয়াজ, নৈতিকতা, কড়াকড়ি কেমন ছিল? দ্রৌপদীর পাঁচ স্বামীর মত ব্যাপারের উল্লেখ করলে অনেকে বলেন, ওটা ব্যতিক্রম। বাইবেল-অনুগতদের যেমন মাঝে মাঝে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হয়, সেই যুগে ‘নৈতিক বিবাহ’ কেমন ছিল – ধর্ষিতা ধর্ষককে বিবাহ করতে বাধ্য, বা পুত্রহীন বিধবা তার দেবরকে বিবাহ করতে বাধ্য, তেমনই মহাভারতেও এমন অনেক যৌনতার কাহিনী পাওয়া যায়, যা এ যুগের শালীনতার মানদণ্ডে যথেষ্ট অনাচার কিন্তু মহাভারতকার লিপিবদ্ধ করতে কোনো সঙ্কোচ করেননি। শামিম আহমেদের ‘মহাভারতে যৌনতা’ (গাঙচিল প্রকাশনী, কলকাতা) নামের গবেষণামূলক কিন্তু অ-সহজপাঠ্য বইটি পড়তে পারেন আগ্রহীরা। ইন্টারনেটেও কিছু সাইটে এমন কিছু ঘটনার উল্লেখ আছে। আপাতত কয়েকটি ঘটনার সংক্ষিপ্ত তালিকা দেওয়া হল।

মহাভারত খুঁটিয়ে পাঠ করলে মনে হয়, সে সময়ে যৌনতার ব্যাপারে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অনেক খোলামেলা। বিবাহ-পূর্ব বা বিবাহ-বহির্ভূত যৌনতা, প্রকাশ্য যৌনতা, এমন কি পশুসঙ্গমের উল্লেখও পাওয়া যায় সেখানে। বলাই বাহুল্য, বিবাহ-পূর্ব বা বিবাহ-বহির্ভূত যৌনসম্পর্ক আজকের সমাজেও বহুল প্রচলিত, কিন্তু তা সামাজিক নৈতিকতার দৃষ্টিতে এখনও নিন্দনীয়, এবং তা ‘পাশ্চাত্য সংস্কৃতির কুপ্রভাব’ হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু যা দেখা যাচ্ছে, এগুলি আমাদের দেশেরই হাজার বছরের পুরোনো প্রচলিত রীতি, যা নিয়ে সেই সময় সঙ্কোচও অত ছিল না সম্ভবত।

মহাভারতের আদিপর্বে ৬৩ অধ্যায়ে দেখা যায়, ঋষি পরাশর কোনো বিবাহ ছাড়াই ধীবরকন্যা সত্যবতীর সাথে মিলিত হয়ে তৃপ্ত হন। ঋষির আশীর্বাদে তার গায়ের মৎসগন্ধ রূপান্তরিত হয় সুগন্ধে। এর ফলে যে-সন্তান জন্ম নেয়, সে-ই পরবর্তীকালের মহাভারত রচয়িতা ব্যাসদেব।

আদিপর্বের ১০৪ অধ্যায়ে বলে উতথ্য ঋষির পুত্র দীর্ঘতমা ঋষি সবার সামনেই এক রমণীর সাথে মিলিত হয়েছিলেন।

মহাভারতে এক পুরুষের একাধিক বৌ থাকা অতি স্বাভাবিক ব্যাপার, পঞ্চপাণ্ডব সহ প্রায় প্রত্যেকেরই ছিল। অর্জুনের দ্রৌপদী ছাড়াও কৃষ্ণের বোন সুভদ্রা, নাগকন্যা উলূপী, চিত্রাঙ্গদা ইত্যাদি অনেকগুলি বৌয়ের কথা সুবিদিত। বৌ ছাড়াও রাজাদের দাসীসঙ্গমের কথা তো বাদই দিলাম। প্রকাশ্যেই দাসদাসী হিসাবে নারী-পুরুষ-শিশু কেনাবেচা হত। দুর্যোধন কর্ণকে অঙ্গদেশের রাজা করে দেন, সেখানে এমন প্রকাশ্য কেনাবেচার উল্লেখ আছে।

এক নারীর বহু পুরুষ সঙ্গমও প্রচুর দেখা যায়। অর্জুনের মা কুন্তী এক জায়গায় বলেছেন যে কোনো নারী পাঁচ বা তার বেশি পুরুষের সাথে সঙ্গম করলে কেবল তখনই তাকে ‘বন্ধকী’ বা বেশ্যা বলা সঙ্গত। এদিকে তিনি নিজেই পাঁচজন পুরুষের সাথে মিলিত হয়েছেন, যদিও একটির কথা লোকেদের অজানা ছিল তাই তিনি সমাজের কাছে ভালো মেয়েই ছিলেন। কুন্তী কুমারী অবস্থাতেই গোপনে সূর্যদেবের সাথে মিলিত হয়ে কর্ণের জন্ম দেন, দিয়ে লোকলজ্জায় তাকে ভাসিয়ে দেন। তারপর পুরুবংশের রাজা পাণ্ডুর সাথে বিয়ের পরে অনেক চেষ্টা করলেও কোনো সন্তান হয় না যেহেতু পাণ্ডু ছিলেন নির্বীর্য। তখন পাণ্ডুর অনুরোধে তিনি তিন দেবতা ধর্ম, বায়ু ও ইন্দ্রকে আহ্বান করে তাদের সাথে মিলিত হন ও যুধিষ্ঠির, ভীম ও অর্জুনের জন্ম দেন। এই সন্তানেরা পাণ্ডুর ‘ক্ষেত্রজ’ পুত্র হিসেবেই পরিচিত হয় ও বাবার মৃত্যুর পরে রাজ্যভার পায়।

অতিথিকে বা কোনো ঋষিকে তুষ্ট করতে নিজের স্ত্রীকে পাঠানো গৃহকর্তার পক্ষে গর্বের বিষয় বলেই গণ্য করা হত এবং তাঁর আতিথেয়তা প্রশংসিত হত। এতে ওই নারীর চরিত্রে কলঙ্কও হত না। রাজা সুদর্শনের স্ত্রী ওঘবতী, রাজা যযাতির কন্যা মাধবী এইভাবে ব্যবহৃত হয়েছেন।

আদিপর্বে আরো বলা হয়েছে, কোনো কুমারী কন্যা যদি যৌনসম্পর্কের ইচ্ছা প্রকাশ করে, তা পূরণ করা উচিত, না হলে সমাজ-ধর্ম বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এই কথা অর্জুনকে তরুণী উলূপীও বলেছিলেন, যে কোনো নারীকে তৃপ্ত করার জন্য এক রাত তার সাথে কাটালে কারো ধর্মনাশ হবে না। অপ্সরা ঊর্বশী যখন অর্জুনের রূপে মুগ্ধ হয়ে তার সঙ্গে মিলিত হতে চান, অর্জুন তা প্রত্যাখান করেন যেহেতু ঊর্বশী তার পিতা ইন্দ্রের ভোগ্যা, তাই ঊর্বশী তাঁর মায়ের মত। আবার ঊর্বশী পুরুবংশের প্রতিষ্ঠাতা রাজা পুরুরবারও সন্তানদের মাতা, যে বংশের বংশধর অর্জুন। এতে ঊর্বশী রেগে গিয়ে অর্জুনকে নির্বীর্য বলে গালি দেন, এবং বলেন যে এমন মিলনে কোনো দোষ হয় না। 

অজাচার বা incest সাধারণভাবে নিন্দিত হলেও পুরাণে এর উল্লেখ প্রচুর পাওয়া যায়, এমনকি দেবতাদের মধ্যেও। ঋগবেদে পূষা (সূর্যদেব), অগ্নি ও যম তাঁদের বোনেদের বিবাহ করেছিলেন বলে লেখা আছে। যমের বোন যমী নাকি যৌবনপ্রাপ্ত হলে যমের সাথে মিলিত হবার প্রবল আগ্রহ প্রকাশ করেন, এই বলে যে এমন ভাইয়ের প্রয়োজন কি যে নিজের বোনের পাশে উপস্থিত থাকলেও বোনের চাহিদা মেটাতে পারে না? হরিবংশ পুরাণে বলে, দেবতা ইন্দ্র তাঁর প্র-নাতি জন্মেজয়ের বৌয়ের সাথেও সঙ্গম করেছিলেন। আরো নানা অজাচারের উল্লেখ আছে সেখানে, যেমন বশিষ্ঠ মুনির কন্যা শতরূপা তাঁকেই নিজের স্বামী বলে মনে করতেন এবং মুনির সাথে মিলিত হয়ে সন্তানের জন্ম দেন। ঋষি অগস্ত্য নাকি নিজের মেয়ের পবিত্রতা রক্ষার জন্য তাকে সবার চোখের অন্তরালে বড় করে তোলেন এবং মেয়ে উপযুক্ত বয়সের হলে তাকে নিজেই বিবাহ করেন।

দেবরাজ ইন্দ্র গৌতম মুনির স্ত্রী অহল্যাকে ধর্ষণ করেন, যাকে কেউ কেউ পৃথিবীর প্রথম ধর্ষণ বলে মনে করেন। ঋষি বৃহস্পতি তাঁর দাদা ঋষি উতথ্যের বৌ মমতাকে ধর্ষণ করেন।

মহাভারতে অন্যান্য নানা অদ্ভুত ঘটনার কথাও পাওয়া যায়, যেমন মানুষের সাথে সাপ বা মাছের বা জড় পদার্থের মিলন। এ কথা যেমন শোনা যায় যে দুই মানুষের মিলনে সন্তান হিসাবে পাখি বা সাপের জন্ম হয়, আবার উল্টোটাও পাওয়া যায় যে পাখিদের এমন কি জড় পদার্থের মিলনে মানবসন্তানের জন্ম। পশ্বাচার বা পশু-সঙ্গম এর আরেকটি উদাহরণ: রাজা যখন অশ্বমেধ যজ্ঞ করতেন তখন সেই সুলক্ষণযুক্ত ঘোড়াটির সাথে রাণীকে সঙ্গম করতে হত যজ্ঞের অংশ হিসাবে, এ কথা যজ্ঞের গাইডবুক ‘শতপথ ব্রাহ্মণ’এই পাওয়া যায়। মানুষের সাথে অপ্সরা, যক্ষ বা রাক্ষসীর মিলন তো আছেই। মৃত মানুষের সাথে সঙ্গমেও মহিলারা সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। অন্যদিকে ‘অযোনিজ’ বা কোনো মিলন ছাড়াই আপনা-আপনি মানুষের জন্মও হয়েছে।

মহাভারতে সমকামী বা রূপান্তরকামী (LGBT) লোকেদের উল্লেখও পাওয়া যায়। রাজা দিলীপ মারা গেলে এক ঋষির আদেশে তাঁর দুই বিধবা স্ত্রী সমকামিতায় লিপ্ত হন। তার মাধ্যমে সন্তানও লাভ করেন। অজ্ঞাতবাসের সময় অর্জুন ক্লীব হিসাবে নারীর পোশাকে বৃহন্নলা নাম নিয়ে থাকতেন, যার বর্তমান প্রতিশব্দ হিজড়া। দ্রুপদ রাজার সন্তান শিখণ্ডী নারী হিসাবে জন্ম নিলেও থাকতেন পুরুষের মত, শেষে একজনের সাথে লিঙ্গ প্রতিস্থাপন করে পূর্ণাঙ্গ পুরুষ রূপ পান। অথচ বর্তমান কালে সাধারণ মানুষ এমনকি আইন-প্রণেতারাও সমকাম ইত্যাদিকে পাশ্চাত্যের কুপ্রভাব মনে করে বেআইনি করে রেখেছেন।

এইসব ঘটনা পড়ে অনেক ধর্মপ্রাণ হিন্দু হয়তো চটে যাবেন, এইসব অস্বস্তিকর তথ্য তুলে আনার জন্য চেরি-পিকিং-এর অভিযোগ করবেন। আবার অনেক হিন্দুবিদ্বেষী আনন্দিত হবেন হিন্দুধর্মের নিন্দনীয় লোকগাথাগুলো সামনে আসায়। তাঁদের মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে, বাইবেল-কোরান-হাদিসেও এসব ধরনের ঘটনা কিছু কম নেই।