২৩ জানুয়ারী, ২০১৬

ঈশ্বরের অনৈশ্বরিক কর্মকাণ্ড - ৯

লিখেছেন সমকোণী বৃত্ত

প্রসঙ্গ: গুণহীনের গুণাবলীর গুণকীর্তন

মাথায় যত প্রকার গুণের কথা আসা সম্ভব, তার সবগুলোই আস্তিকেরা তাদের স্ব স্ব ঈশ্বরের ওপর চাপিয়ে দিয়ে থাকেন। যত প্রকার গুণ আছে, সেগুলোর সবই ঈশ্বরের হওয়া চাই। এ যেন গুণগ্রাসী ঈশ্বর। গুণাবলী গ্রাস করাতেই তার আনন্দ। এই গ্রাসকার্যে সাহায্য করতে ঈশ্বরের অন্ধ অনুসারীদের জুড়ি মেলা ভার।

"ঈশ্বরেরা" গুণবান, নাকি গুণহীন, সেটা সংক্ষেপে দেখবো। প্রথমেই দেখে নিই "ঈশ্বর" না বলে "ঈশ্বরেরা" বলার কারণ। এখানে "ঈশ্বরেরা" ব্যবহার করেছি এ জন্য যে, পৃথিবীতে সৃষ্ট ধর্মের সংখ্যাও যেমন অগণিত, তেমনি অগণিত ধর্মের ঈশ্বরের সংখ্যাও অগণিত। আমার এই কথাটাতে সকল আস্তিকই প্রবল আপত্তি জানাবে, আর বলবে, "ঈশ্বর একজনই। আমার ধর্মে যার কথা বলা আছে, তিনিই সেই এক ও অদ্বিতীয় ঈশ্বর।" উক্ত কথাটা কিন্তু শুধুমাত্র একজন আস্তিকের নয়, সকল আস্তিকই স্ব স্ব ধর্মের ঈশ্বরকেই এক ও অদ্বিতীয় বলে বিশ্বাস করে। এ বিশ্বাস টিকিয়ে রাখতে তারা রক্ত দিতে প্রস্তুত, প্রস্তুত রক্ত নিতেও।

বলা বাহুল্য, এক ধর্মের ঈশ্বরের সাথে অন্য ধর্মের ঈশ্বরের বৈশিষ্ট্যে, কাজে ফারাক অনেক।

কিছু কিছু ধর্ম ও সেই ধর্মগুলোর অনুসারীরা ঈশ্বর যে "এক ও অদ্বিতীয়" তা প্রমাণ করতে বলে থাকে, "ঈশ্বর যদি একাধিক থাকতো, তবে উভয়েই ধ্বংস হয়ে যেতো। ঈশ্বর একাধিক থাকলে সব কিছু এত সুষ্ঠভাবে চলতো না।নিজেদের মাঝেই বিবাদ সৃষ্টি করতো।"

মজার বিষয় হলো, আস্তিকেরা ঈশ্বরকে গুণবান বানাতে গিয়ে অনেক সময়ই গুণহীন বানিয়ে ফেলে। যেমনটা এক্ষেত্রে করেছে।

তারাই জোর গলায় প্রচার করে, ঈশ্বর আমাদের মতো অর্থাৎ মানুষের মত নন, তিনি আমাদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি গুণসম্পন্ন।আবার তারাই ঈশ্বরকে আমাদের মতো বলেও দিব্যি বলে যাচ্ছে। আমরা যেমন অধিকজন মিলে কাজ করি, এতে সুবিধার পাশাপাশি কিছু অসুবিধাও হয়। একজনের সাথে অন্যের কিছু অমিল থাকে। আমরা অনেক সময়ই তা মানিয়ে নিতে পারি না, তাই ঝামেলায় সৃষ্টি হয়। তাই ভাগাভাগি করে কিছু করা থেকে বিরত থাকে অনেকেই। এ নিয়ে আমাদের এখানে একটা প্রবাদ প্রচলিত আছে। তা হলো: "হাঝা (ভাগাভাগি) করে কিনবো'বল'? > তারচে ভালো, গিয়ে ঘুমাই চল।" এমনটা বলার কারণ হলো আমাদের আচরণ। আমাদের আচরণের সাথে তো ঈশ্বরদের আচরণের তুলনা চলে না, তাঁদের আচরণ ভালই হবে (যা কিছু ভাল, সবই তো তাঁদের)।

তাহলে, তাঁরা (ঈশ্বরেরা) একাধিক থাকলেই সমস্যা কী? একাধিক থাকলেই যে তাঁরা আমাদের মত বিবাদে লিপ্ত হবেন এটা কেমন কথা? ঈশ্বরদের এত নিচে নামানো কি ঠিক? তাছাড়া এমন কাজ ঈশ্বরদের গুণাবলীর সাথে যায় না! এটা গুণহীনের সাথেই যায়। আরো একটা কথা, ঈশ্বর যে ভাল হবেনই, এমন ভাবাটা কি যুক্তিযুক্ত? আমাদের সকল প্রয়োজন মেটানোর জন্য একজন ভাল ঈশ্বরের দরকার। দরকার হলেই যে থাকতে হবে, এমন কোনো কথা নেই।

এই মূহুর্তে আমার ভাল গাড়ি, বাড়ি দরকার, কিন্তু নেই। এসব করার সামর্থ্যও নেই। কেউ আমাকে মেরেছে, কিন্তু আমি এই প্রতিশোধ নিতে অক্ষম। তাই একজনকে কল্পনা করে নিলাম, যিনি অতিশয় ভাল। তিনি এখন না দিলেও মরার পর আমাকে ঠিকই গাড়ি-বাড়ি দেবেন এবং আমার হয়ে প্রতিশোধও নিয়ে নিবেন। যদিও এতে কল্পসুখ ছাড়া আর কিছুই মিলবে না!

যাই হোক, আমাদের প্রয়োজনেই আমরা ভাল ঈশ্বরের কল্পনা করি। কিন্তু তিনি তো খারাপও হতে পারেন কিংবা তাঁর মাঝে ভাল-খারাপ দুটোই থাকতে পারে। তিনি খারাপ হলে আমাদের অসুবিধা হতে পারে, তাই আমরা তা স্বপ্নেও ভাবি না যে, ঈশ্বর খারাপ হতে পারে। কিন্তু ঈশ্বরকে ভাল ভেবে নেওয়ার কল্পনা কোনো কাজেই আসবে না, যেমনটা কাজে আসে না হরিণের ক্ষেত্রে। হরিণ অনেক সময় একটু ঝোপ পেলেই নিজের মাথাটা ঢুকিয়েই আত্মতৃপ্তি লাভ করে এই ভেবে যে, তাকে শিকারি জন্তুটা দেখছে না।কিন্তু যথাসময়ে শিকারি ঠিকই তাকে খেয়ে ফেলে। আত্মতৃপ্তি কোনই কাজেই আসে না। যেমনটা আমরা আত্মতৃপ্তি লাভ করি ঈশ্বরকে ভাল গুণের অধিকারী বলে বিশ্বাস করে।

আস্তিকরা ধর্মের ও ঈশ্বর থাকার গুরুত্ব বোঝাতে আরেকটা মোক্ষম যুক্তি ব্যবহার করে থাকে, তা হলো: "আপনি যদি ঈশ্বরে বিশ্বাস না করেন তাহলে আপনি বিভিন্ন অন্যায় কাজে খুব সহজেই লিপ্ত হতে পারেন। কেননা আপনার ঈশ্বরভীতি নেই। আপনি পাপকাজ করতে পারেন, কেননা আপনার শাস্তি পাওয়ার ভয় নেই। আপনার ভালমন্দ কাজের জন্য জবাবদিহিতার ব্যবস্থা না থাকলে এবং ভালমন্দ কাজের বিচার করার মতো যদি কেউ না থাকে, তাহলে আপনি স্বাভাবিকভাবেই অসৎকাজে লিপ্ত হতে পারেন।"

তাদের এই 'মোক্ষম' যুক্তিটা একটু তাদের দিকেই ঘুরিয়ে দেওয়া যাক। আস্তিকদের মতে ঈশ্বরের ওপরে কিছু নেই। তিনিই সর্বোচ্চ। তাঁকে তাঁর কাজের জন্য কারো কাছেই জবাবদিহিতা করতে হয় না।আপনাদের যুক্তি অনুসারেই - জবাবদিহিতার ব্যবস্থা না থাকলে অন্যায় করার প্রবণতা থাকে। ঈশ্বর মশাইয়ের ভাল বা মন্দ কোনো কাজেরই যখন কৈফিয়ত দিয়ে হয় না, তাহলে তিনি যে অন্যায় করেন নি বা করছেন না বা করবেন না, এর নিশ্চয়তা কী?

যদি বলেন জবাবদিহিতা ছাড়াও অন্যায় থেকে বিরত থাকা যায়, তাহলে আগে নিজের যুক্তি সামলানোর কাজে লেগে পড়েন। যদি বলেন মানুষ এবং ঈশ্বরের ব্যাপার ভিন্ন, তাহলে একাধিক ঈশ্বর থাকলে মানুষের মত ঝগড়া করতো এমন ভাবেন কেন? তারা ঝগড়াই করবে কেন আর ধ্বংসই বা হবে কেন? সুতরাং নিজেদের যুক্তি সামলানোর কাজে লেগে পড়েন।

আমি চাই, ঈশ্বর থাকলে ভাল হয় এবং এটাও চাই, তিনি যেন ভাল হন। কিন্তু চাইলাম বলেই যে থাকবে, তা তো নয়! তাছাড়া তিনি যে শুধু ভালই হবেন, এটা কেমন কথা? তিনিও যে ভুলের ঊর্ধ্বে নন, সে বিষয়গুলো নিয়ে পরবর্তী লেখায় হাজির হবো।